Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-২৩-২০১৩

অপহরণ বিদেশে মুক্তিপণ দেশে

লমগীর হোসেন


অপহরণ বিদেশে মুক্তিপণ দেশে
ঢাকা, ২৩ নভেম্বর- বিদেশের মাটিতে অপহরণ করা হচ্ছে প্রবাসীদের। আর সেই মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে দেশে। মুক্তিপণের টাকা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে অপহরণকারী চক্রের লোকজন, সহযোগী কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা। বিভিন্ন পার্সেল এজেন্সি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা নেয়া হচ্ছে। অভাবী সংসারের আয়-রোজগার বাড়াতে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে নানা কাজ নিয়ে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। যাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে রাখছে বড় ভূমিকা। সেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা এখন প্রতিনিয়তই অপহরণের সম্মুখীন হচ্ছেন। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছেÑ এ অপহরণকারী চক্রগুলোর সদস্যরাও বাংলাদেশী। বিদেশে আস্তানা গেড়ে চক্রের সদস্যরা প্রবাসী স্বদেশিদের টার্গেট করে অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে দুই শতাধিক প্রবাসী অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
 
সম্প্রতি দুবাই, মালয়েশিয়া, কাতার, তুরস্ক, লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে এ অপহরণকারী একাধিক চক্রের দৌরাত্ম্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশের অপরাধী তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম শাখা।
 
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম শাখার প্রধান বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিদেশে অবস্থান করে অপহরণকারী চক্রটি একের পর এক অপহরণসহ নানা অপকর্ম চালালেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চক্রটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করছে মোটা অঙ্কের টাকা।
 
ঘটনা-১ : মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোড়াইকান্দি গ্রামে। সংসারের আয় বাড়াতে পাড়ি জমান সুদূর লিবিয়ায়। লিবিয়ার বেনগাজী শহরের একটি কনফেকশনারি দোকানে কাজ করে ঠিকঠাক মতোই বিদেশি মুদ্রা উপার্জন করে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে স্বদেশি এক প্রবাসীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এরই সূত্র ধরে ওই ব্যক্তি সাদ্দামকে লিবিয়ার অন্য এলাকায় আরও উচ্চ বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেয়। রাজি হন সাদ্দাম। এরপর সাদ্দামকে নির্ধারিত একটি গোপন স্থানে আটকে রাখে বন্ধুরূপী ওই অপহরণকারী। পরে সাদ্দামকে দিয়ে মোবাইল ফোনে অপহরণের কথাটি বলানো হয় তার গ্রামের বাড়ির স্বজনদের। বাসায় শুরু হয় কান্না। পরিবারে দেখা দেয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অপহরণকারী চক্র সাদ্দামের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে ৫০ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। ঢাকার উত্তরার ঠিকানা দিয়ে জনৈক সুমনের নামে ০১৯৫০৯১৪১৭৭ নম্বরে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা দিতে বলে অপহরণকারী চক্র। পরিবারটি জমিজমা বিক্রি ও বন্ধক রেখে তিন দফায় ওই নম্বর ও ঠিকানায় ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়। ঠিক এ অবস্থায় লিবিয়ার পুলিশ ১৫ নভেম্বর শুক্রবার সাদ্দামকে অপহৃত অবস্থা থেকে মুক্ত করেছে। একই সঙ্গে আটক করে অপহরণকারী চক্রের ৩ সদস্যকে। তবে এ বিষয়ে এখনও ভুক্তভোগী পরিবার কোনো মামলা করেনি। মুক্তি পেয়ে সাদ্দাম মুঠোফোনে স্বজনদের জানিয়েছেন, অপহৃতদের মধ্যে একজনের নাম খোকন। তার বাড়িও গাইবান্ধার ভাঙ্গামোড় এলাকায়। আরেকজনের বাড়ি নরসিংদী। অন্যজন লিবিয়ার নাগরিক। অপহণকারীরা একটি ঘরে তাকে বেঁধে রেখে দফায় দফায় শারীরিক নির্যাতন চালায়।
 
ঘটনা-২ : ২০১১ সালে উচ্চ বেতনের কাজ নিয়ে দুবাই যান ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মুলাইপত্তন গ্রামের আলমগীর। তার বাবার নাম জাফর মিয়া। সবকিছু স্বাভাবিক চলছিল। হঠাৎ চলতি বছরের জুন মাসে দুবাইয়ে অবস্থানরত মনির নামে একজন আলমগীরকে তুরস্কে আরও উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেয়। কথামতো আলমগীর তার সঙ্গে বের হলে মনির, সবুজ, এমরানসহ কয়েকজন প্রবাসী তাকে অপহরণ করে। এরপর আলমগীরকে মারধর করে তার আর্তচিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শোনানো হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বসবাসরত স্ত্রী তানিয়াকে। দুই সন্তানের জননী তানিয়া আলমগীরকে ছেড়ে দেয়ার কথা বললে অপহরণকারী চক্র তার কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। উপায়ন্তর না দেখে অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে স্বামীকে বাঁচাতে তানিয়া টাকা দিতে রাজি হন। এরপর দুই দফা বিকাশে এবং পাঁচ দফায় এসএ পরিবহনের মাধ্যমে চক্রের দেয়া পৃথক মোবাইল ফোন নম্বরে প্রায় ১১ লাখ টাকা দিয়েছেন তানিয়া। এর মাঝে ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি ফতুল্লা থানায় বাদী হয়ে মামলা করেছেন। তারপরই আলমগীরকে হত্যা করা হয়েছে বলে ফোনে জানানো হয়েছে। আলমগীরের হত্যার খবর সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার বাবা জাফর মিয়া।
 
কেবল ভোলার আলমগীর কিংবা গাইবান্ধার সাদ্দাম নন, এ রকম আরও অন্তত দুই শতাধিক প্রবাসী এরই মধ্যে বিদেশে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর থেকে জানা গেছে। কিন্তু অপহৃত ব্যক্তির ক্ষতির আশঙ্কায় ভুক্তভোগী বেশিরভাগ পরিবার কোনো রকম মামলা বা অভিযোগ করছে না।
 
এ প্রসঙ্গে অপহৃত আলমগীরের স্ত্রী তানিয়া বেগম বলেন, প্রায় ১১ লাখ টাকা দিয়েও স্বামীকে ফেরত পেলাম না। ১০ জুন স্বামীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। এখনও মাঝেমধ্যেই অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা ফোন করে। একবার বলে মেরে ফেলার কথা আবার বলে বাঁচিয়ে রাখার কথা। টাকা দিলেই মুক্তি দেবে এমন কথাও বলে কিন্তু এখন আর সেই সামর্থ্য নেই। সিআইডি মামলার তদন্ত করছে। কিন্তু এখনও নিশ্চিতভাবে জানতে পারছি না স্বামী কী অবস্থায় আছে। দুই সন্তান নিয়ে এখন চরম অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছি বলে মন্তব্য করেন তানিয়া।
 
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক (সিআইডি) শফিকুল ইসলাম জানান, আলমগীরের অপহরণের ঘটনায় যাদের মোবাইল নম্বরে টাকা নেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেহেতু আলমগীর বিদেশে অপহৃত, তাই ইচ্ছা থাকলেও তাৎক্ষণিক সেখানে গিয়ে পুলিশ অভিযান চালাতে পারছে না। তবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। সিআইডির এসএসপি আশরাফুল ইসলাম বলেন, স্বদেশি অপহরণকারী চক্রের হাতে প্রায়ই প্রবাসীরা অপহৃত হচ্ছেন। তবে সব ঘটনা পুলিশ জানতে পারছে না অথবা পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হচ্ছে না। যেসব ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো তদন্ত করে ওই সব অপহরণকারীর প্রতিনিধি তথা সহযোগীদের (মুক্তিপণ গ্রহণকারী) গ্রেফতার করা হচ্ছে। সিআইডি কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম আরও বলেন, দেশীয় সহযোগীদের দ্রুত গ্রেফতার করা গেলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশে গিয়ে অপহৃতকে উদ্ধারসহ জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা না যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটির পুরোপুরি ইতি টানা যাচ্ছে না। তাই যাতে করে বিদেশে গিয়েই ইন্টারপোল বা সংশ্লিষ্ট দেশের পুলিশের সহায়তা নিয়ে অপহৃতদের উদ্ধার করা যায় সে ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতরকে লিখিতভাবে বলা হয়েছে।

 

অপরাধ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে