Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০ , ১৫ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১১-২০২০

দুই বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখল না

আবদুল গাফফার চৌধুরী


দুই বছর কেটে গেল কেউ কথা রাখল না

৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর পূর্ণ হলো। কারাগারে তিনি কেমন আছেন—এ সম্পর্কে দুই রকম কথা শোনা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, ‘তিনি রাজার হালে আছেন।’ আর বিএনপি নেতারা বলছেন, তিনি দীর্ঘ কারাবাসের ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে মুক্তি না দিলে তাঁর জীবন সংশয় হতে পারে। তাঁকে যাঁরা চিকিৎসা করছেন, সেই ডাক্তাররা শেষোক্ত কথা সমর্থন করছেন না।

চিকিৎসকরা বলছেন অন্য কথা। তাঁদের অভিমত, বেগম জিয়া কারাবাসের আগেই নানা জটিল রোগে ভুগতেন। কারাগারে আসার পরে তা বাড়ে-কমে। কিন্তু সুচিকিৎসা চলছে। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন নয়। আমারও ধারণা, তিনি কারাগারে রাজা বা রানির হালে না থাকলেও শারীরিকভাবে সুখে আছেন। জেলে সুচিকিৎসা চলছে। একজন পরিচারিকা রাত-দিন তাঁর সেবা করছে। ব্রিটিশ কারাগারে থাকার সময় গান্ধী, নেহরু, আজাদের মতো নেতা কিংবা পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু সেবার জন্য পরিচারক বা পরিচারিকা পাননি। তাঁদের কক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিল না। তাঁরা রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন। দুর্নীতির দায়ে আদালতের বিচারে দণ্ডিত অপরাধী ছিলেন না।

খালেদা জিয়া যদি রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে কারাগারে যেতেন, তাঁর স্বাস্থ্যহানি ঘটত, তাহলে তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ আমিও তাঁর মুক্তি দাবি করতাম। কিন্তু তাঁর বর্তমান অবস্থান হলো, পুত্র বিদেশে পলাতক, নিজে কারাবন্দি, দল ছত্রভঙ্গ—এসব দেখেও তাঁর প্রতি আমার (সম্ভবত আমার মতো আরো অসংখ্য মানুষের) কোনো সহানুভূতিই মনে জাগছে না। পাঠকরা আমাকে দয়া করে ক্ষমা করবেন, আমার মনে হচ্ছে এটা এই পরিবারের পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে মনের কিছু ক্ষোভ আগে প্রকাশ করতে চাই। বিএনপি আজ তাদের নেত্রীর স্বাস্থ্যভঙ্গের ধুয়া তুলে মুক্তি দাবি করছে। এই নেত্রী তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যে নৃশংসতার পরিচয় দেখিয়েছেন, তার কোনো তুলনা নেই। বঙ্গবন্ধু খালেদা জিয়ার প্রতি পিতৃস্নেহ দেখিয়েছেন। তাঁকে ডিভোর্সি নারী হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। ১০ বছরের কিশোরপুত্র, সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূ এবং প্রায় গোটা পরিবারসহ সেই বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর দিনটিকে জেনেশুনে এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে নিজের জন্মদিন বানাতে এবং ৫০-৬০ পাউন্ড ওজনের কেক কেটে তা পালন করার সময় কিশোর রাসেলের রক্তাক্ত চেহারা কি একবারও তাঁর মনে ভেসে ওঠেনি? নানা জনের নানা প্রতিবাদ সত্ত্বেও তিনি এই বানোয়াট জন্মদিন পালন করেছেন বছরের পর বছর।

২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সভায় বর্বর গ্রেনেড হামলা হয় (যে হামলায় তাঁর পুত্রও জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ)। হাসিনা দৈবক্রমে বেঁচে যান, কিন্তু আহত হন। বেগম আইভি রহমান মারা যান। শতাধিক লোক আহত-নিহত হয়। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি খবর শুনে প্রথমে বলেছেন, ‘এটা আওয়ামী লীগের সাজানো নাটক।’ তারপর পরিস্থিতি যখন গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়, তখন হাসিনাকে দেখতে আসার নাটকটি তিনি নিজেই করেন। একদিকে এই নাটক, অন্যদিকে তাঁর সরকারের পুলিশ ও সৈন্য ঘটনাস্থলে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের এই ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার আলামত নষ্ট করার কাজে ব্যস্ত ছিল।

কী করে খালেদা জিয়ার কৃত অপরাধগুলোকে খাটো করে দেখব? এই মহিলার হৃদয়ে কোমলতা ও মানবতাবোধের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় কি? আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ওপর জামায়াতিদের হামলা, শীর্ষ বুদ্ধিজীবী হুমায়ুন আজাদকে হত্যা, আহসান উল্লা মাস্টার, কিবরিয়াসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডে মমত্বহীন খালেদা জিয়ার এক উক্তি ‘এগুলো আওয়ামী লীগের সাজানো নাটক’। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকার সময় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছেন। একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের বিচার বানচাল করার চক্রান্ত করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি রাজপথে মাসের পর মাস ধরে আন্দোলনের নামে অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুকে পেট্রলবোমায় নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন। অগ্নিদগ্ধ ১০ বছরের বালক, ২৫ বছরের সদ্য বিবাহিত নারী যখন হাসপাতালে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, তিনি একবারও তাদের কাউকে দেখতে যাননি। তাঁর দলকে এই নৃশংসতা বন্ধ করতে বলেননি। সন্ত্রাস দ্বারা তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছেন। সেই সন্ত্রাসের বাঘই এখন বিএনপির ঘাড় মটকে দিয়েছে।

একটি বা দুটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার ১০ বছর জেল হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক অপরাধগুলো বিবেচনা করলে দেশের আদালত তাঁকে হয়তো আর্জেন্টিনার ইসাবেলা পেরনের মতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিতেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ, স্বাধীনতার শত্রুদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দান এবং ক্ষমতায় শরিক করা। এটা রাষ্ট্রদ্রোহ। রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধীকে আমেরিকায় প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। বিজ্ঞানী রোজেন বার্গ দম্পতির কি অপরাধে প্রাণদণ্ড হয়েছিল? আমাদের দেশেও খুনের সহায়তাকারীকে সমান অপরাধী সাব্যস্ত করে প্রাণদণ্ড দেওয়া না হলেও দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া তো শুধু স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলানো নয়, একাত্তরের বর্বর ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীদেরও ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। এই অপরাধে বিচার হলে তাঁর কী শাস্তি হওয়া উচিত ছিল? শেখ হাসিনা তো মমতাময়ী এবং মহানুভব। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার ও শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সহযোগীদের অব্যাহতি দিয়েছেন।

এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি বিখ্যাত কবিতায় আছে, তেত্রিশ বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখল না। খালেদা জিয়ার বেলায় বলা চলে, দুই বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখল না। না, তাঁর দল কথা রাখেনি, দেশের রাজনীতিতে নতুন বন্ধুরা কথা রাখেনি, কথা রাখেনি বিদেশি বন্ধুরাও। দুই বছর ধরে তিনি কারাবাসে, যাঁরা তাঁকে মুক্ত করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন, কেউ কথা রাখেননি।

তাঁর দল বলেছিল, আন্দোলন করে তাঁকে মুক্ত করে আনবে। এ ক্ষেত্রে তর্জন-গর্জন ছাড়া আর কিছু হয়নি। হরতাল ডাকলে, বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচি দিলে মানুষ তাতে সাড়া দেয় না। মির্জা ফখরুল, রিজভী, ব্যারিস্টার মওদুদ নিজেদের মুখরক্ষার জন্য মাঝেমধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে আন্দোলনের হুমকি দেন, এখনো দিচ্ছেন। এসব হুংকার হয়তো বেগম জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক রহমানের কর্ণতৃপ্তির জন্য। তাঁরা মাঠে নামেন না। তাঁরা রাজপথে নামার অ্যাকশন প্রগ্রাম দেন। রাজপথে নামেন না।

নির্বাচনের আগে কাদের সিদ্দিকী হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, তিনি নিজে কারাগারে ঢুকে তাঁর নেত্রীকে মুক্ত করে নিয়ে আসবেন। এখন আর তাঁর সাড়াশব্দ নেই। প্রমাণিত হয়েছে তিনি ‘কাগজের বাঘ’। ড. কামাল হোসেন আবার উকিলের গাউন গায়ে চড়িয়েছেন তাঁর নতুন নেত্রীকে মুক্ত করে আনার জন্য মামলায় লড়তে। বিএনপি মহলে তাতে মহা উৎসাহ। তাঁরা ভুলে গেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের মামলায় ড. ইউনূসের পক্ষ নিয়ে ড. কামাল তাঁর কী দশা ঘটিয়েছিলেন। কেউ খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা রাখছে না। না, তাঁর দল, না তাঁর নতুন রাজনৈতিক মিত্ররা।

হালে আবার বেগম জিয়ার মুক্তি দাবিতে মাঠ গরম করার চেষ্টা হচ্ছে। মির্জা ফখরুল, রিজভী মুখ খুলেছেন। অর্থাৎ নেত্রীকে লিপ-সার্ভিস দিচ্ছেন। ড. কামাল শিষ্টাচারবহির্ভূত ভাষায় হাসিনা সরকারকে ধমক দিচ্ছেন। তাঁর ধমকের ভাষা সুস্থ মানসিকতার মানুষের নয়। বিএনপির মুরব্বি ডা. জাফরুল্লাহ, যিনি এত দিন দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁর গলায় এখন নতুন সুর। তিনি দলকে পরামর্শ দিয়েছেন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া না হলে বিএনপি যেন আর কোনো নির্বাচনে না যায়। ড. কামাল হোসেনকে তিনি অনুরোধ করেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে তিনি যেন পদযাত্রা-আন্দোলন শুরু করেন।

আগে ডা. জাফরুল্লাহ বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে নির্বাচনে না গেলে বিএনপি লাভবান হবে কী? না, খালেদা জিয়া কারামুক্ত হবেন? ড. কামাল আমারই মতো আশি-ঊর্ধ্ব বয়সের বেতো রোগী। লাঠি ভর করে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তাঁকে দিয়ে পদযাত্রার মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ানো সম্ভব হবে কি? মাও জেদংও লংমার্চ করেছিলেন যুবা বয়সে। ড. কামালের মতো বুড়ো বয়সে নয়।

খবরটি কতটা সঠিক জানি না। ঢাকা থেকে খবর পেয়েছি, মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় ড. কামাল হোসেন নাকি বলেছেন, ‘এদের (হাসিনা সরকারকে) লাথি মেরে ক্ষমতা থেকে তাড়ানো দরকার।’ খবরটি সঠিক হলে বুঝতে হবে তাঁর মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। শেখ হাসিনা যদি মহানুভবতা দেখিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের হৃদরোগের চিকিৎসায় সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন, তাহলে ড. কামাল হোসেনেরও, যাঁকে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিবসের অনুষ্ঠানে সম্মানের সঙ্গে পাশে এনে বসিয়েছিলেন, তাঁরও মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসায় সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন।

সবশেষে বলব, খালেদা জিয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পেরেছেন, বেগম সাহেবার মুক্তির ব্যাপারে কেউ কথা রাখেনি, রাখছে না, রাখবে না। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, খালেদা পরিবার এখন তাঁর অসুস্থতা, দিন দিন শরীর ভেঙে পড়া ইত্যাদি মানবিক কারণ দর্শিয়ে মানবতার দোহাই পেড়ে সরকারের কাছে তাঁকে মুক্তিদানের কাতর আবেদন জানাবেন। আমার মনে হয় নিজেদের দল, ‘নিরপেক্ষ কাল্টের’ মিডিয়া, সুধীসমাজ এবং দুই কাকের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে খালেদা পরিবার যদি খালেদা জিয়ার দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী কৃতকর্মের জন্য ইসাবেলা পেরনের মতো জাতির কাছে ক্ষমা চান, তার ভিত্তিতে সরকারের কাছে আবেদন জানান, তাহলে বিএনপির আন্দোলন ড. কামাল হোসেনের মামলার চেয়ে উপরোক্ত পন্থায় খালেদা জিয়ার কারামুক্তি বেশি দ্রুত হওয়া সম্ভব।

লন্ডন, সোমবার, ১০ ফেরুয়ারি ২০২০

এন কে / ১১ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে