Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২০ , ২৪ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-২৩-২০২০

মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি চান মুনতাসীর মামুন

এমরান হোসাইন শেখ


মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি চান মুনতাসীর মামুন

ঢাকা, ২৩ জানুয়ারি- সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু চর্চা বাড়লেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চর্বিতচর্বণ হচ্ছে বলে মনে করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, ‘ইদানীং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন। তবে, তাঁকে নিয়ে গবেষণার জন্য তো ম্যাটেরিয়ালস লাগবে। মানুষ তো সেটা পাচ্ছে না। পুরনো জিনিসই বারবার চলছে।’ শতবর্ষ উপলক্ষে শত বইয়ের প্রকাশের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলেও বইয়ের ভেতরকার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ভয় হচ্ছে এই শতবর্ষ উপলক্ষে যেভাবে বই করা হচ্ছে সেগুলোর তথ্য কোথায়। দেখা যাবে সব বইয়েই ঘুরেফিরে একই ধরনের তথ্য ‘শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি দেখতে চান এই গবেষক। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ বায়োগ্রাফি করা গেলে তা স্থায়ী সম্পদে পরিণত হতো মনে করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। লিখেছেন একাধিক বইও। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ারের দায়িত্বও পালন করেন। এর আগে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট’ এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। মুনতাসীর মামুন ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই বিভাগ থেকে ১৯৮৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। স্বাধীনতার পর ইতিহাস বিভাগ থেকে তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মুনতাসীর মামুন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‍উপলক্ষে একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনীর নানাদিক তুলে ধরেন।

প্রতিবেদক: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার‘ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন— এ সময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কী ধরনের কাজ হয়েছে?

মুনতাসীর মামুন: মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমি সেটার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলাম। এটাই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রথম কোনও ইনস্টিটিউট। ১৯৯৯ সালে এটা করা হয়। সেখানে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রির ব্যবস্থা করা হয়। এর সঙ্গে আমরা জাদুঘর ও একটি মূল্যবান আর্কাইভ করি। কিন্তু বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর চলে যাওয়ার পর ড. দূর্গাদাস ভট্টাচার্য্য এসে এটা নিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি করলেন। এক সময় এটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। কিন্তু এরই মধ্যে প্রথম ব্যাচের এমফিল ডিগ্রি সম্পন্ন হয়ে যায়। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বিষয়ে আমরা নানা ধরনের গবেষণা শুরু করি। ওই সময় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ দুই খণ্ডের বইটি প্রকাশ হয়। জার্নালগুলোতেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণাধর্মী নানা কিছু প্রকাশিত হয়। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এটাই প্রথম অর্গানাইজড প্রচেষ্টা। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলেই তা বন্ধ হয়ে যায়। এর পর আওয়ামী লীগ আমলে অনেকে ভিসি হলেও সেটা আর চালু করা হয়নি।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার যেটা আছে, সেটা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এটা জেবুন্নেসা ট্রাস্ট করেছে। সেখানে প্রথমে হাসান আজিজুল হককে চেয়ার করা হয়। কিন্তু সেই সময় তেমন কিছু হয়নি। এরপর আমাকে চেয়ার করা হয়। আমি যতদিন ছিলাম তখন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ওপর অনেকগুলো গবেষণা হয়েছে। সেগুলো বই আকারেও বের হয়েছে।

প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্যক্তি ও সাংগঠনিক পর্যায়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, এগুলো কতটা মৌলিক?

মুনতাসীর মামুন: বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বঙ্গবন্ধু চর্চা বেড়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে একটি— তা হলো বঙ্গবন্ধুর ওপরে গবেষণার জন্য তো ম্যাটেরিয়ালস লাগবে। মানুষ তো তা পায়নি। পুরনো জিনিসই বার বার চলছে। এক্ষেত্রে বড় একটি উপকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যে সিক্রেট রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন, সেখানে আমরা নতুন অনেক তথ্য পাচ্ছি। আমিই ওই তথ্যের আলোকে দুই খণ্ডে বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখেছি। এর একটা হচ্ছে— ‘ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি’, আরেককটা হচ্ছে ‘জেল থেকে জেলে (১৯২০-৫৫)’। এই সিক্রেট রিপোর্ট থেকে অবাক হয়েছি। আমার মনে হয়েছে, আমরা এতদিন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতাম না।

প্রতিবেদক: আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেন, এটার কোনও ভিত্তি আছে?

মুনতাসীর মামুন: বিভিন্ন জন তাদের স্মৃতিকথায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে রিমার্ক করেছেন, তার কোনোটিই ঠিক নয়। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন ওমর কিছু কথা লিখেছেন— যা এতদিন চালু ছিল। অনেকে মনে করতেন ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই। আমি সরকারি গোয়েন্দা রিপোর্ট ও অন্যান্য রিপোর্টের সাহায্যে দেখিয়েছি। ১৯৪৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ১৯৫২ সালে তিনি জেলে থেকেও কাজ করেছিলেন। বাংলা ভাষা নিয়ে তার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। যে কারণে এটা পরবর্তীতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সমালোচকরা যেসব কথা বলার চেষ্টা করেন, তার কোনোটিরই ভিত্তি নেই।

প্রতিবেদক: জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা অ্যাকাডেমি একশ’ বই প্রকাশ করছে। ব্যক্তি উদ্যোগে আরও অনেক বই প্রকাশের কথা শোনা যাচ্ছে— এগুলোতে কী কোনও নতুনত্ব থাকবে বলে আপনার মনে হয়?

মুনতাসীর মামুন: লেখালেখি নিয়ে কিছু বলতে চাই না। কিন্তু এগুলো কতদিন টিকে থাকবে— সেটা নিয়েই প্রশ্ন, আমার ভয় হচ্ছে। এই শতবর্ষ উপলক্ষে যেভাবে বই করা হচ্ছে তা একদিক থেকে ভালো। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে— লেখার জন্য তথ্য কোথায়। দেখা যাবে একই তথ্যনির্ভর বই বার বার বেরুবে। ফলে এটা একটা চর্বিতচর্বণ হবে। এতে গুরুত্ব ততখানি থাকবে কিনা বুঝতেছি না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। এরমধ্যে অনেকগুলো রয়েছে কপি পেস্ট। আর আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এত কম জানি— একটা পূর্ব ধারণা থেকেই বেশিরভাগ কাজ করি। সত্যতা যাচাই না করে সেই ধারণাটাই আমরা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করি।

প্রতিবেদক: সমসাময়িক রাজনীতিকদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে তুলনা করবেন?

মুনতাসীর মামুন: আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম অন্যান্য রাজনীতিকের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে না। তিনি যেটা ভেবেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বপ্ন কার্যকর করিয়েছেন। তিনি যখন ঢাকায় রাজনীতি করা শুরু করেন, তখন অনেকেই তাঁর তুলনায় বড় মাপের রাজনীতিবিদ ছিলেন। কিন্তু তিনি সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন। দেখেছি সংগঠনের ওপর তিনি কী গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক যে ভিত্তিটা গড়ে তুলেছিলেন— সেটার ওপরেই ভর করে কিন্তু আওয়ামী লীগ চলছে।

‘বঙ্গবন্ধু কীভাবে স্বাধীনতা এনেছেন’ এই বইটি করতে গিয়ে আমি আগরতলাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক নতুন তথ্য যোগাড় করি। ১৯৪৯-৫০ সালে যে চিন্তা করেছিলেন তিনি,  ১৯৬২ সালে ভারত যাচ্ছেন আগরতলা যাচ্ছেন। তিনি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে সাজিয়েছেন সরকার কেমন হবে? কীভাবে চলবে। আমরা এর বেশিরভাগ জানি না বলেই নানারকম কথাবার্তা বলি।

প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আর কী কী করা যেতে পারে?

মুনতাসীর মামুন: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কাজের অনেক সুযোগ এখনও আছে। কিন্তু  গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে না করলে তা কাজে দেবে বলে মনে হয় না। আর আমাদের অ্যাকাডেমিক সার্কেলে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একটি তাচ্ছিল্যের ভাব আছে। জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আশির দশকে গবেষণা করা হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় কোনও ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেনি। কাজ করেনি। এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক। তারা আওয়ামী লীগের সুবিধাটা নিতে চান, কিন্তু বঙ্গবন্ধু বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে চান না। দুই-একটি সংকলন আমার চোখে পড়েছে। তবে গবেষণা আর সংকলন তো এক নয়। আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন, সুবিধা নেন, কিন্তু আমার মনে হয়েছে— আমাদের এখানে প্রতিক্রিয়াশীলরা খুবই শক্তিশালী। সব খানে তাদের একটা ব্যাপার আছে। বাধ্য না হলে তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে না, বা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলে না। না হলে এতদিন ধরে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন হয়ে আসছে, সমষ্টিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অথবা পেশাজীবীরা এটা নিয়ে কিছু করেছে? ব্যক্তিগতভাবে হয়তো দু-একজন কিছু করে থাকতে পারে (ব্যক্তিক্রম হয়তো থাকতে পারে), আমি সাধারণ ঝোঁকের কথ বলছি।

প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধু কি কেবল আওয়ামী লীগের সম্পদ?

মুনতাসীর মামুন: বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছেন, ফলে তিনি আওয়ামী লীগের তো বটেই। কিন্তু জাতির জনক হলে শুধু আওয়ামী লীগের হন কী করে? বঙ্গবন্ধু হিসেবে তিনি তো বঙ্গের বন্ধু। জাতির জনক হলে গোটা জাতির জনক।তিনি সবারই জাতির জনক। শুধু আওয়ামী লীগের হবেন কেন? এই দৃষ্টিভঙ্গীটা বিবেচনা করলে এ ধরনের চিন্তাভাবনাটা হবে মূর্খতা।

প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আর কী করা যেতে পারে?

মুনতাসীর মামুন: বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুই। রাবার দিয়ে ইতিহাস মোছা যায় না। উদ্যোগ নিয়ে কী কারও জন্য কিছু করা যায়? এটা মনের ভেতর থেকেই মেনে নিতে হয়। হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। অনেকে মানবে না। না মানুক, কী আসে যায়? তিনি তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির জনক। আমি কী ভাবলাম, মির্জা ফখরুল কী ভাবলেন, জিএম কাদের কী ভাবলেন, আল্লামা শফি কী ভাবলেন— এতে কিচ্ছু আসে যায় না। ইতিহাসের কিছু আসে যায় না।

প্রতিবেদক: অতীতে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ইতিহাস নানাভাবে বিকৃতির চেষ্টা হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন না হয়— তার জন্য কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে?

মুনতাসীর মামুন: ইতিহাস বিকৃতি সব আমলেই কম-বেশি হয়েছে। অন্য দেশেও ইতিহাস বিকৃতি হয়। ভারতেও আমরা ইতিহাস বিবৃতি হতে দেখেছি। তবে, আমার প্রশ্ন হলো— আসল ইতিহাস কী কেউ মুছতে পারবে? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। এটা হয়নি বললে কী সেটা বিশ্বাস করানো যাবে? বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বা তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা চাইলে কী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে? হয়তো সাময়িক চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু সফল হওয়াটা সম্ভব নয়। চাইলেই মানুষকে সঠিক ইতিহাস থেকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। আর ইতিহাস বিকৃতি প্রচেষ্টার প্রতিবাদ সব আমলেই হয়েছে, ভবিষ্যতে তো হবে। এর মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস প্রতিষ্ঠা পাবে। ঠ্যাকা দিয়ে কিছু আটকে রাখা যায় না। যাবে না। বঙ্গবন্ধু জাতির জনক— এটা মানি না মানি কিছু আসে যায় না।

প্রতিবেদক: কথিত আছে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যতটা সফল ছিলেন, সরকার প্রধান হিসেবে ততটা ছিলেন না? আপনার দৃষ্টিতে এই বক্তব্য কতটা সত্য?

মুনতাসীর মামুন: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা কথা চালু আছে, উনি ভালো প্রশাসক ছিলেন না। তিনি তেমন কিছু করে যেতে পারেননি। কিন্তু এই কথাটি মোটেও সত্য নয়। ‘বঙ্গবন্ধু কোষ’ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, আজকে আমরা জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সম্পর্কে যেসব কথা ভাবি, তেলের কথা বলি, সমুদ্রসীমার কথা বলি, এর সব আইন ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ কিন্তু তাঁর আমলেই হয়েছে। আজকে যতগুলো সরকারি করপোরেশন আছে, সেগুলোর আইন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে কী ছিল তা তো আজকের মানুষ বুঝবে না। একটা বিষণ্ণ জাতি, যেখানে প্রত্যেকটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত— দেশে কিছু নেই। সেখানে একজন মানুষ শূন্য থেকে শুরু করে যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা আর কারও পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। আমাদের আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি তিনি করে দিয়ে গেছেন। এই বিষয়গুলো তো মানুষ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি বা করতে চায় না। আজ  যাকিছু দেখছি সবই তো তার আমলে করা। তথ্য যাচাই না করে, তথ্য না জেনে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর মন্তব্য আমরা করে যাচ্ছি। আর আরেকটি অংশ তা বিশ্বাস করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতার মুখে পড়েন। আওয়ামী লীগের একটা অংশ তার বিরোধিতা করেছে, অতিবামপন্থীরা বিরোধিতা করেছে। বাকশাল নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। এগুলো হচ্ছে রাজনৈতিক কিছু ফালতু কথাবার্তা। পরিসংখ্যান কী বলে— সেটা আমাদের দেখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আমলে যে জিডিপি, খাদ্য গ্রহণের যে রেসিও, পুষ্টি ও অন্যান্য বিষয় জিয়ার আমলে তা কম ছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরই তো ওই বছরের ফসল উঠলো এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম কম গেলো।

প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমাদের আরো কী করার আছে?

মুনতাসীর মামুন: সিক্রেট ডকুমেন্টস বের হলে এবং সমসাময়িক যে ওরাল হিস্ট্রি আছে, তা ক্রস চেক করে এবং সমসাময়িক যাদের আত্মজীবনী বের হয়েছে, সেগুলোর সাহায্য নিয়ে ও সেই সময়কার যেসব দলিলপত্র, তা যাচাই করে আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভালো কিছু করতে পারি। তবে, মুশকিল হলো কী আওয়ামী লীগের অফিসে আওয়ামী লীগের দলিলপত্র নেই। আমার মতে, মজিববর্ষে উচিত ছিল বঙ্গবন্ধুর ওপরে একশ’ পৃষ্ঠার একটি অফিসিয়াল বায়োগ্রাফি বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করা। আর এটা করতে হবে সরকারিভাবে, যা সবাইকে পাঠানো হবে। সবাই জানবে। ফ্যাক্টসগুলো থাকবো। সরকার অনেক কিছু করার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু এ ধরনের একটি অফিসিয়াল বায়োগ্রাফির উদ্যোগ কিন্তু নেয়নি। এটা করার দরকার ছিল।এটা পৃথিবীর সব দেশেই থাকে।

প্রতিবেদক: আপনি বলছেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেকেই জানেন না, এই না জানার ঘাটতি পূরণের কোনও উপায় আছে কিনা?

মুনতাসীর মামুন: আমি ব্যক্তিগতভাবে গত ২০ বছর ধরে চেষ্টা করেছি— সর্বস্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়টা ১৯৪৭-৭১ এবং ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত পড়ানো হোক। কাউকে রাজি করাতে পারিনি। আগের শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবের কাছে (নুরুল ইসলাম নাহিদ) অনেকবার গিয়েছি। তারা ইসলামের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী। মাদ্রাসা নিয়ে আগ্রহী। কিন্তু এটা নিয়ে আগ্রহ দেখাতে চান না। আমি পরে সংসদীয় কমিটিতে যাই এবং এ ধরনের কিছু পড়ানো হয় না শুনে তারা বাক হয়েছেন। ওখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হারুন-অর রশীদ ছিলেন। পরে তিনি এক নম্বরের একটি কোর্সের কথা বলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির সব গ্রুপ/বিভাগের শিক্ষার্থীদের এটা পড়ানো হচ্ছে। এর সিলেবাসও আমি করে দিয়েছি। বইও আমি লিখে দিয়েছি। বাংলাদেশে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হবে, কিন্তু সেখানে ইতিহাস বিভাগ থাকবে না, ইতিহাস পড়ানো হবে না— এটা কেমন করে হয়? ইউজিসির আগের চেয়ারম্যান মান্নান সাহেব নির্দেশও দিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ পাত্তা দেয়নি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবো, বঙ্গবন্ধুর কথা হলে বলবো, কেন মনে রাখছি না। কেন বিভ্রান্তি হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান পড়াবো না, এটা তো হয় না।

পৃথিবীর অনেক দেশে এখন আইন হচ্ছে— নাগরিকত্ব নিতে হলে ভাষা জানতে হবে। ইতিহাস জানতে হবে। বিদেশে প্রত্যেক শিক্ষর্থীকে বাধ্যতামূলক ইতিহাস পড়তে হয়। পাকিস্তান ইতিহাস বন্ধ করে দিয়ে ‘পাকিস্তান স্টাডিজ’ করেছে, তার দেখাদেখি আমরা ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ করেছি। তা হয়েছে ওর স্যালাইনের মতো। এক চিমটে সিভিকস, এক চিমটে ইকোনমিকস ও এক চিমটে ইতিহাস।

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়ার জন্য এটাকে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্নভাবে পাঠ্য করতে হবে। আমরা ইতিহাস পড়ানোর ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে জোর দিচ্ছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ইতিহাস বিভাগ সবখানে নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগ খোলেনি। আর  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে কিন্তু শিক্ষক নেই। শুনেছি, ফিজিক্সের শিক্ষকও নাকি ইতিহাস পড়াচ্ছেন। ফিজিক্সের শিক্ষক ইতিহাস পড়ান। এখন আমাকে যদি ফিজিক্স পড়াতে বলা হয়, তা কি হাস্যকর হয় না? এই ধরনের একটি অবস্থা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আছে। এইগুলো তো আমাদের কাজ নয়। অনেকগুলো মন্ত্রণালয় রয়েছে, কিন্তু যা করার তো প্রধানমন্ত্রী একাই করেন।  তাহলে মন্ত্রিসভার প্রয়োজনটা কী, এটা আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনেক পদস্থ কর্মকর্তা বলতে চান, এগুলো পড়ানোর কী দরকার? প্রাকটিক্যাল বিষয়গুলো পড়ানো দরকার। পৃথিবীর সব দেশে, যেমন আমেরিকায় মেডিক্যালে পড়লেও তাকে একটা আর্টসের সাবজেক্ট নিতে হয়। হিউম্যান সম্পর্কিত বিষয়গুলো আমরা না পড়লে তো মানুষ থাকি না। আমাদের ক্ষেত্রে এসব চিন্তা হয় না। রাজনীতিবিদদের পরামর্শ দিতে নেই। প্রভাবশালীদের কখনও পরামর্শ দিতে চাই না। তারা যা করবে সেটাই ঠিক। আমি এ বয়সে এসে কারও বিরাগভাজন হতে চাই না। আমি যা পারছি, আমার মতো করে কাজ করে যাচ্ছি।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

আর/০৮:১৪/২৩ জানুয়ারি

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে