Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৬ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.8/5 (24 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৩-২০১৩

মান্না দে স্মরণে: হৃদয় আছে যার..

লুনা রুশদী


কবে প্রথম মান্না দে’র নাম শুনেছিলাম এখন আর মনে নেই। নাম শোনার আগেই গান শুনেছি বোধহয়। আমি যখন ক্লাস-টু তে পড়ি আমার ছোট মামা মাত্র কলেজ শেষ করেছে। আশির দশকের শুরুর দিকে মামার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঝাঁকড়া চুল, চামড়ার সাথে লেগে থাকা শার্ট আর মাটি ঝাড়ু দেয়া বেলবটম। আম্মা বলতো  ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ঢোলা প্যান্ট। একদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই ঘোষণা দিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গানটা শুনে এসেছে সেইদিন। মামার সবকিছুতেই আমার তখন দারুণ আগ্রহ। উৎসুক হয়ে শুনতে চাইলাম। মামা খালি গলায় শুরু করলো ‘আসে আর যায় কত চৈতালী বেলা, এ জীবনে শুধু মালা গেঁথে ছিড়ে ফেলা, কোন সে বিরহী কাঁদে মোর বুকে তুমি কি শুনিতে পাও... বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও... আমি সাগরেরই বেলা, তুমি দূরন্ত ঢেউ...’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস চোখে বারান্দায় গ্রিলের টবে গোলাপ দেখতে থাকলো। বুঝতে পারলাম মামার অনেক দুঃখ! 


	মান্না দে স্মরণে: হৃদয় আছে যার..
কবে প্রথম মান্না দে’র নাম শুনেছিলাম এখন আর মনে নেই। নাম শোনার আগেই গান শুনেছি বোধহয়। আমি যখন ক্লাস-টু তে পড়ি আমার ছোট মামা মাত্র কলেজ শেষ করেছে। আশির দশকের শুরুর দিকে মামার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ঝাঁকড়া চুল, চামড়ার সাথে লেগে থাকা শার্ট আর মাটি ঝাড়ু দেয়া বেলবটম। আম্মা বলতো  ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ঢোলা প্যান্ট। একদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই ঘোষণা দিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গানটা শুনে এসেছে সেইদিন। মামার সবকিছুতেই আমার তখন দারুণ আগ্রহ। উৎসুক হয়ে শুনতে চাইলাম। মামা খালি গলায় শুরু করলো ‘আসে আর যায় কত চৈতালী বেলা, এ জীবনে শুধু মালা গেঁথে ছিড়ে ফেলা, কোন সে বিরহী কাঁদে মোর বুকে তুমি কি শুনিতে পাও... বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও... আমি সাগরেরই বেলা, তুমি দূরন্ত ঢেউ...’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস চোখে বারান্দায় গ্রিলের টবে গোলাপ দেখতে থাকলো। বুঝতে পারলাম মামার অনেক দুঃখ! যদিও এই গানের মহিমা বুঝতে পারার সময় আমার তখনও আসে নি। তারপরও মামার গাওয়া সেই সুরটা নিশ্চয়ই সেদিন মন ছুঁয়েছিল, নয়তো এই মুহূর্তটা মনে কেন আছে? 
 
আমাকে ঘিরে কত রকম স্বপ্নের যে শুরুতেই দফারফা করে দিয়েছি গুনে শেষ করা যাবে না। একবার ভর্তি হলাম শিশু একাডেমিতে গান শেখার জন্য, অত সব জোরালো স্বতঃস্ফুর্ত কণ্ঠের মাঝখানে আমার ভীতু  ভীতু চিঁ চিঁ মার্কা গলা টিকলোই না। তারপর আজিমপুরে এক ছবি আঁকার স্কুল, সেখানে দুই তিন দিন জানালার দিকে চেয়ে থেকে আর গাছের পাতা নড়া দেখে, আঁকার খাতায় এমনকি একটা সোজা লাইন পর্যন্ত আঁকতে না পেরে আম্মার হতাশা বাড়িয়ে ফেরত আসলাম। আরেকবার আমার নানিকে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। পাশের বিছানাতেই ছিলেন সাবিনা ইয়াসমিনের শাশুড়ি। তাঁকে দেখতে এসেছিলেন সে সময়ের নাম করা কোনো চিত্রপরিচালক। কিছুক্ষণ তাঁর সাথে কথাবার্তার পর আম্মা আর মামা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল তাঁর সামনে ‘বল বল ওই যে ওই ছড়াটা!’ আমি লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে যেতে মেঝের দিকে চেয়ে থেকে মুচকি মুচকি হাসতে থাকলাম। বাড়িতে হেঁটে ফিরলাম বকা খেতে খেতে, আমি ছড়া বললে নাকি সিনেমায় অভিনয় করতে পারতাম। মনে মনে কি যে আফসোস তখন। কিন্তু লোকের সামনে লজ্জা লাগলে কি আর করার আছে আমার? 
 
এরকম সময়েই বোধহয় শেষ ভরসা হিসেবে ঠিক হলো ছায়ানটে গানের ক্লাসে ভর্তির চেষ্টা করা হবে। তখন ছায়ানটে ক্লাস হতো ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে, ছুটির দিনে। অন্যান্য দিন সেটাই ছিল আমার স্কুল। আমাদের তিনতলার বারান্দা থেকে দেখা যেত স্কুলটা। ছায়ানট থেকে গান ভেসে আসতো। গান শুনতে আমি সবসময় বারান্দায় এসে দাঁড়াতাম। মনে হতো সামনের রাস্তায় রিকশা, পায়ে হাঁটা পথিক, গাড়ি, সাইকেল, বেবি ট্যাক্সি, ফুটপাথের কাছে সাইকেল সারাইয়ের দোকানের ছেলেটা এমনকি আমাদের পাড়ার বাউন্ডারির দেয়াল ঘেঁষে উঠে যাওয়া আকাশচুম্বী সেই কড়ই গাছটার ডালগুলো পর্যন্ত গানের তালে তালে দুলছে। সেই বাতাসে সুর ভাসিয়ে দেয়া দলের একজন হয়ে উঠতে পারার আশায় মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। 
 
তখন বোধহয় বর্ষাকাল। মনে আছে মামার সাথে ছায়ানটের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাথের উপরে কদম ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে থাকতে দেখে উপরদিকে মুখ ফিরিয়েছিলাম। গাছটা ছিল আমাদের পাড়ার ভিতরেই আর ডালভর্তি কদম ফুল ছায়া দিয়ে রেখেছিল রাস্তার ফুটপাতটাকে। কদম ফুলের স্মৃতি আমার সেটাই প্রথম। বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন? হয়তো পাতায় বৃষ্টির পানি লেগেছিল, অথবা আমি কল্পনা করে নিচ্ছি এখন। সেই গোল গোল সুগন্ধি ফুল দেখে কি যে অবাক হয়েছিলাম! মামা বোধহয় একটা ফুল তুলেও দিয়েছিল আমাকে। তারপর জানতে চেয়েছিল আমি কী রকম গান শিখতে চাই, রবীন্দ্রসংগীত নাকি নজরুল গীতি? আমি আসলে এত কিছু বুঝতাম না তখনও, গান তো গানই! তবু মামার সেই প্রশ্নে নিজেকে খুব প্রাপ্তবয়স্ক মনে হয়েছিল আর সঙ্গীত শব্দটাও তো গীতির চেয়ে ভারিক্কি লাগে বেশ, তাই বলেছিলাম রবীন্দ্রসংগীতই আমার প্রিয়! 
 
তবে অন্তত সারগামটুকু হারমোনিয়ামে বাজাতে না জানলে ছায়ানটে গানের ক্লাসে নিতো না। আমার তো হারমোনিয়ামই ছিল না  তখনো, বাজাবো কী? যাতে খুব বেশি মন খারাপ না করি তাই নাচের ক্লাসে ভর্তি করে দিল মামা আর সেইদিনই আমার গানের স্যারেরও খোঁজ পেয়ে গেল। স্যার একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে কয়েকজন বন্ধু নিয়ে গান করছিলেন। মামার খুব ভালো লেগে গেল। আলাপে জানা গেল তিনি শেষ বর্ষের ছাত্র। মামার ভালো নাম আনোয়ার সাকিব আর স্যারের নাম আনোয়ার হোসেন। অল্পতেই ভাব হয়ে গেল দুজনের। একজন আরেকজনকে আনোয়ার ভাই, আনোয়ার ভাই করে ডাকতো। 
 

মান্না দে’র নাম আমি মনে রাখার মতন করে শুনেছিলাম স্যারের কারণেই। ততদিনে বেশ কয়েক মাস ধরে স্যারের কাছে গান শিখছি। সুর নিকেতন থেকে কেনা আমার একটা হারমোনিয়ামও হয়েছে। মামা আর স্যারের বন্ধুত্ব বেড়েছে। আমাকে নিয়ে স্যারের বেশ গর্ব ছিল, প্রায়ই বিভিন্ন বন্ধুদের নিয়ে এসে আমার গান শোনাতেন। কেউ ভালো বললে খুশিতে ফেটে পড়তে পড়তে বলতেন ‘দেখতে হবে না কার ছাত্রী?’ তো স্যার একদিন বাসায় নিয়ে এলেন বিদ্যুৎ ভাইকে। যেমন নাম তেমন মানুষ। দেখেই চমকে গেলাম। একদম বিদ্যুতায়িত! ক্লাস থ্রির বছর প্রথম প্রেমে পড়লাম। তাঁকে দেখতে কেমন ছিল এখন একটুও মনে নেই। হাসি আর চোখ খুব ভালো লেগেছিল মনে আছে। প্রথমে কিছুক্ষণ আমার গান শুনলেন। স্যারের সাথে ঝগড়া করলেন। রবীন্দ্রসংগীতের বদলে আমাকে নাকি নজরুল গীতি শেখানো উচিৎ ছিল... ‘মেয়েটার গলা একদম নষ্ট করে দিলেন আপনি!’ বিদ্যুৎ ভাইয়ের বাবার নাম আবু হেনা মোস্তফা কামাল। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম একজন মানুষের এতগুলো নাম শুনে। দেখলাম বাড়ির সবাই আগেই তাঁর নাম শুনেছেন। খুব নাকি অদ্ভুত মানুষ তিনি, ছেলের বন্ধুদেরও আপনি করে বলেন! দেখলাম আমার মতনই মামাও মুগ্ধ বিদ্যুৎ ভাইকে নিয়ে।
 
সেই মুগ্ধতা আরো তীব্র হলো যখন হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে তিনি গাইতে শুরু করলেন ‘জড়োয়ার ঝুমকো থেকে একটা মতি খসে পড়েছে, আমি কুড়িয়ে নিয়েছি, যদি এই মুক্তোর আংটি পরি, পরবে তুমি কী..’ ।
 এর আগে কখনো আমার পরিচিত কেউ এরকম গান করে নি। শব্দগুলো কি অদ্ভুত আর সুরটাও। ‘কী’  বলার সাথে সাথে সুরটা কেঁপে কেঁপে প্রশ্নটা ঘরময় ছড়িয়ে যাচ্ছে। জড়োয়াই বা কী বস্তু? তার মতি খসে পড়লে এইরকম গান কেন গাইতে হয়? এই লোকটারই বা আংটি পরার এত শখ কেন?  গান শেষে মামা উচ্ছ্বসিত। বিদ্যুৎ ভাই বেশ সস্নেহ হেসে মামাকে বললেন ‘হ্যাঁ মান্না-দের গান গাইলেই ভালো, না?’  মামাও বেশ লাজুক হাসতে হাসতে আরো গানের অনুরোধ জানালো। আরো কিছু গান গাইলেন সেদিন বিদ্যুৎ ভাই আর মান্না দে নামটা আমার মনে থেকে গেল। 
 
এর কিছুদিন পরেই একদিন ছায়ানটে নাচের ক্লাস শেষে বের হয়ে মামার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। দেখি অন্য একটা ক্লাসরুম থেকে বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবসহ বিদ্যুৎ ভাই বের হলেন। তাঁকে দেখেই আমার গাল লাল হয়ে গেল, হার্ট-বিট বাড়লো। লজ্জায় মুখের দিকে চাইতেও পারছিলাম না। তবুও হাসিহাসি মুখে তাকালাম। আমাকে দেখতেই পেলেন না! ওঁর এক বান্ধবীর সাথে খুব মগ্ন ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন তিনতলার রেলিং এ হাত রেখে। আমি আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করলাম। নূপুরের ঝুমঝুম শব্দ করলাম। কিছুতেই কিছু হলো না। একটুপরেই বারান্দার নিচে এসে মামা ডাক দিল। সেই প্রথম বিফলতার ভার বয়ে নিয়ে সিঁড়িতে নামতে নামতেই মনে পড়লো... ‘বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও...’, আহা এতদিনে বুঝলাম! 
 
 
ততদিনে একটা টু-ইন ওয়ান ক্যাসেট প্লেয়ার হয়েছে আমাদের। একটা শীতের দুপুর মনে পড়ছে কিংবা হয়তো আসলে অনেকগুলো দুপুর, এতদূর এসে সব এক হয়ে গেছে। খাওয়ার পরে আব্বা-আম্মার শোবার ঘরের মেঝেতে আয়োজন করে কাঁথা সেলাই চলছে। তিনদিক বা চারদিক থেকে সেলাই করছে আম্মা, দাদি, মাঝে মাঝে নানি অথবা খালাতো বোন শিফা আপা (ওরা যখন ঢাকায় থাকতো), আর সে সময় আমাদের বাসার কাজের মানুষ ভানু আপা। আমরাও খুব সেলাই করতে চাইতাম। আমাদের শান্ত রাখতে তাই পুরানো শাড়ির পার খুলে খুলে সুতা বের করতে দিত আম্মা। 
 
ড্রেসিং টেবিলের উপরে ছিল টু-ইন ওয়ান। গান রেকর্ড করার জন্য উপর তলার সালমা আপাদের প্লেয়ারটাও ধার করা হতো। একটা প্লেয়ারে গান বাজিয়ে আরেকটাতে রেকর্ড করতো মামা। আর থেমে থেমে ক্যাসেটের ফ্ল্যাপে লিখতো গানের প্রথম লাইন। সবার একদম চুপ করে থাকতে হতো তখন। তবু মাঝে মাঝে অসাবধানে বলে ফেলা দু’একটা কথা কিংবা হাসি মিশে যেত রেকর্ডে। কত গান যে বাজতো! ‘তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়, তারই মাঝে প্রেম যেন গড়ে খেলাঘর’, ‘তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো, দিতে পারো নি’, ‘তুমি আর ডেকো না...’, ‘কে জানে শ্যাম ছিল নিলাজ না লজ্জাহীনা রাধা...’। 
প্রতিটা গানের কথা নতুন নতুন প্রশ্ন জন্ম দিতো মনে, নতুন নতুন পৃথিবী। গানের সুর আর মান্না দে’র কণ্ঠস্বর যেন রক্তের সাথে মিলে-মিশে সারা শরীরে ঘুরতে ঘুরতে আত্মা ছুঁয়ে ফেলতো। কেমন যে লাগতো আমার! স্তব্ধ হয়ে যেতাম।
 

সেইরকম কোন এক ‘পৌষের কাছাকাছি রোদ-মাখা’ আপন আপন ভরাট দুপুরে প্রথম শুনেছিলাম ‘একই সে বাগানে আজ এসেছে নতুন কুঁড়ি শুধু সেই সেদিনের মালি নেই...’। 
কফি হাউজ কি, সেটা কোথায় বা আদৌ রয়েছে কিনা অথবা গানের সেই মানুষগুলো কারা সেই-সব রহস্য উদ্ঘাটনের আগেই গানটায় ভিতরের দীর্ঘশ্বাসটুকু আমার অস্তিত্বে মিশেছিল। এরপর থেকে যেকোনো সান্নিধ্য, পরিপূর্ণতা অথবা কাছে আসার ভেতরেই সে লুকিয়ে থেকে জানাতে থাকে...থাকবে না কিছুই থাকবে না...।
 
ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় আমরা নাইজেরিয়া গেলাম এক বছরের জন্য। সোকোটো ইউভার্সিটিতে পড়াতো আব্বা। আমরা থাকতাম বিশ্বাবিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত এক বিশাল একতলা বাড়িতে। বিদেশ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণার সাথেই মিল ছিল না জায়গাটার। বরং গ্রামের মতন। সারা বাড়ি ঘিরে তিন চারটা বিশাল নিম গাছ, একদম বাড়ির সামনে একটা কৃষ্ণচূড়া। আরো ছিল সাজনা গাছ, পেয়ারা গাছ, ইউক্যালিপ্টাস আর মাঝখানের উঠানে আম্মার করা মরিচের বাগান। এখন ভাবতে কেমন স্বর্গপুরী মনে হচ্ছে অথচ তখন মাঝে মাঝেই একঘেয়ে লাগতো খুব। আশেপাশে কারো বাড়িতেই খুব যাওয়া হতো না। টিভিতেও হাউসা ভাষার অনুষ্ঠান কিছুই বুঝতাম না। আমাদের সময় কাটতো গান শুনে আর সারা বাগান দৌড়াদৌড়ি করে। ‘সে আমার ছোট বোন’ শুনতে শুনতে কতবার কেঁদেছি! ওই মেয়েটার মতন হতে ইচ্ছা করতো। আম্মাকে জিজ্ঞেস করতাম আমি ভালো করে কথা শেখার আগেই গান গাইতাম কিনা। ‘শিল্পের জন্যই শিল্পী শুধু, এ ছাড়া নেই যে তার অন্য জীবন...’, শুনতে শুনতে ভাবতাম কিছুতেই শিল্পী হওয়া যাবে না। কোকের বোতলে পানি ভরে আর মুখের কাছে আঙুরের ছড়া নিয়ে টলতে টলতে গাইতাম ‘না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাবোনা...’ অথবা ‘আমি তো কুমির ধরে আনিনি ঘরে কেটে খাল’।
 মান্না দে’র কণ্ঠস্বর শুনে ধরেই নিয়েছিলাম তাঁর বয়স বিশ-পঁচিশের বেশি হবে না। পরে একদিন যখন জানলাম তিনি প্রায় আমার দাদার বয়সী আর গান না গাইলে তিনি নাকি কুস্তিগীর হতেন, ভীষণ মন খারাপ করেছিলাম!
 
বাসায় কাজ করতে আসতো আউডু নামের একটা ছেলে। খুব মজার ছিল সে। ভাঙাভাঙা ইংরেজিতেই অনেক কথা বলতো আমাদের সাথে। ওরা কি করে, কী খায় সব গল্প করতো। আর বালতিতে পানি নিয়ে ঘর মুছতে মুছতে সারা বাড়ি কাঁপাতে কাঁপাতে হাউসা ভাষায় গান গাইতো। একদিন আমরা তিনবোন তাকে বললাম ‘তোমার এই হাউসা গান আমরা আর শুনতে চাই না!’ সে বললো ‘তাহলে বাংলা গান শেখাও’। 
আমরাও খুব আগ্রহ নিয়ে কয়েকদিন ধরে মান্না দে’র গান শেখালাম তাকে। এরপর যতদিন ছিলাম আউডু ঘর মুছতে মুছতে পরমানন্দে গাইতো—
“শিভনে খি ফাব নাহহহ
বুলেইশি শে ভাবনানানাহ!”
গানের মাঝে থেমে থেমে তার নাচ দেখে মনে হতো এই গানটায় সৌমিত্রের চেয়ে আউডুকেই বেশি মানিয়েছে। 
 
আরেকটু বড় হওয়ার পর ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজের চেহারা নিজেই দেখে মুগ্ধ হতে হতে শুনতাম ‘এ নদী এমন নদী জল চাই একটু যদি দু’হাত ভরে উষ্ণ বালুই দেয় আমাকে...’ অথবা ‘যদি এখনো আমাকে শুধু ভালো লাগে ভালো না বাসো মন্দ কি...’। 
 কত সন্ধ্যায় একা একা গাড়ি চালাতে চালাতে শুনেছি ‘আমি ফুল না হয়ে কাঁটা হয়েই বেশ ছিলাম...’ অথবা ‘জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই...’।  
এইসব তো শুধু আমার স্মৃতি। একই গান, একই কণ্ঠস্বর কত কোটি মানুষের মনে আলাদা আলাদা ছাপ ফেলে গেছে। গানের সুর আমাদের জীবনে জড়িয়ে থাকে...গায়কেরাও থেকে যান। 
 
সেইদিন পুরানো সিনেমার গান দেখছিলাম। দেখলাম ‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্না অগুন্তি রঙিন বেলুন বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে সমুদ্রের তীর ধরে গান গাইতে গাইতে হেঁটে যাচ্ছেন। মান্না দে’র কন্ঠে গান— ‘একদিন সাপ্নোকা রাহি, চলা যায়ে সাপ্নো সে আগে কাঁহা...জিন্দেগী...’। 
আকাশে উড়ন্ত অতগুলো বেলুন দেখলে আমার হুমায়ূন আহমেদকে মনে পড়ে। গত বছর প্রায় একই সময়ে মারা গেছেন রাজেশ খান্না আর হুমায়ূন আহমেদ। এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল। আর আজ মান্না দেও বেঁচে নেই। তবু রাজেশ খান্নার সেই হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য, চুল এলোমেলো করে দেয়া বাতাস, রঙিন বেলুনের উচ্ছ্বাস এবং সেই কণ্ঠস্বর অতীত মনে হয় না।  আমার অস্তিত্বে একই সাথে দুলতে থাকে সেই আনন্দ এবং ভিতরের দীর্ঘশ্বাসটুকু। আমার মনে হতে থাকে— আমরা বসবাস করি এক অনন্ত বর্তমানে , যার কোনো শেষ নেই, শুরুও নেই।
 
 
লুনা রুশদী: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি, গল্পকার ও অনুবাদক

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে