Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯ , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.2/5 (13 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৯-২০১৩

যৌনকর্মীদের জন্য মমতার মুক্তির আলো


	যৌনকর্মীদের জন্য মমতার মুক্তির আলো
কলকাতা, ৯ নভেম্বর- এক দিন ছিল, যখন ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যা-রেখাদের চোখের ইশারায় কুঠুরিতে ঢুকে পড়তেন অচেনা বাবু। এভাবে কেটেছে রাতের পর রাত। আঁধার ঘনালেই সস্তার ঝলমলে শাড়ি আর রুজ-লিপস্টিক মেখে ‘খদ্দের’ধরতে রাস্তায় নেমে পড়া। শরীর বেচে রোজগারের অর্থে দিন কাটানো।
 
সেই শরীর আর নেই। তাই বাবুরাও নেই। কিন্তু যত দিন প্রাণ আছে, তত দিন খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে তো!
 
পতিতালয়ে সন্ধ্যা-রেখারা সে চেষ্টা চালিয়েও পেরে উঠছেন না জেনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ওদের দিকে ভরসার হাত বাড়িয়েছে।
 
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধা যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের কাজে নেমে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন। টালিগঞ্জে চারু মার্কেটের কাছে আবাসন দপ্তরর একটি পুরনো দোতলা বাড়ি সংস্কার করে তাদের জন্য ‘হোম’ তৈরি হচ্ছে।
 
প্রকল্পের নাম দিয়েছেন মমতা ‘মুক্তির আলো’। ১০০ জন বৃ্দ্ধা যৌনকর্মীকে নিয়ে পথ চলা শুরু করবে ‘মুক্তির আলো’।
 
কলকাতার উত্তর-দক্ষিণে একাধিক যৌনপল্লিতে সমীক্ষা চালিয়ে ইতিমধ্যে ৭৮৯ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা বৃদ্ধা, দুর্বল, প্রায় কপর্দকহীন, এবং হোমে থাকতে ইচ্ছুক। ওই সব বৃদ্ধাদের আজীবন দেখাশুনার দায়িত্ব সরকারই নেবে।
 
পশ্চিমবঙ্গের সমাজকল্যাণ-সচিব রোশনী সেন জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে এক বছরের জন্য ৫০ লাখ রূপি মঞ্জুর করেছে অর্থ দপ্তর। কলকাতায় যৌনকর্মীর সংখ্যা বেশি বলে উদ্যোগটি শুরু হচ্ছে এখানে। পরে একে সারা রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের লক্ষ্য। ক্রমে হোমের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সকলের থাকার ব্যবস্থা করা হবে বলেও সচিব জানিয়েছেন।
 
প্রথম পর্যায়ে চিহ্নিত ৭৮৯ জনের মধ্যে যাদের আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ, প্রথমে তেমন একশ’ জনকে এই সুযোগ দেয়া হবে। প্রাথমিক ভাবে এমনটাই ভাবা হয়েছে। তবে অনেকে লটারির মাধ্যমে বাছাইয়ের পক্ষেও মত দিয়েছেন।
 
প্রকল্পটিতে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হবে। কেউ যৌনপেশা ছাড়তে চাইলে তার জন্য বিকল্প উপার্জনের সংস্থান, পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্য হোমের ব্যবস্থা করা।
 
আশি পেরোনো সন্ধ্যার এই মুহূর্তে ঠিকানা বৌবাজারের হাড়কাটা গলির রোয়াক। বয়সের ভারে, রোগেভোগে কুঁজো হয়ে গিয়েছেন। লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা। সম্বল বলতে একটা পুঁটলি, কয়েকটা ছেঁড়া শাড়ি। ষোল বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পরে স্বামীর হাত ধরে ঢাকার মিরপুর থেকে চলে এসেছিলেন কলকাতার পার্ক সার্কাসে। সময়টা দেশভাগের কিছু আগে। “তার পরে কলকাতায় মারামারি-কাটাকাটি শুরু হল। স্বামী ট্রাম কোম্পানিতে কাজ করত। এক দিন বেরিয়ে আর ফিরল না!” স্মৃতিচারণ করেন বৃদ্ধা। অসহায় যুবতীকে ‘কাজ’ দেওয়ার নামে সেই যে যৌনপল্লিতে বেচে দিল এক পড়শি, তখন থেকে ওটাই স্বর্গ-নরক সব কিছু। বলেন, “গোড়ায় মানতে পারিনি। পরে ভালই খদ্দের জুটত।”
 
মমতার ‘মুক্তির আলো’ প্রকল্পের কথা শুনে সন্ধ্যা এক গাল হেসে বললেন, “মমতা নিজে তো মেয়ে। তাই আমাদের যন্ত্রণা বুঝতে পারল। ওকে আশীর্বাদ করছি।”
 
টানা ছেষট্টি বছর নিষিদ্ধপল্লির অলি-গলিতে কাটানো সন্ধ্যা এখন ভগ্নস্বাস্থ্য, কপর্দকহীন। রাস্তার ভিখিরি। বছর পঁচাত্তরের রেখার অবস্থাও একই। সোনাগাছির গলিতে মাথা গোঁজার একটা ঘর থাকলেও জানেন না, কয়দিন ভাড়া জোটাতে পারবেন। ষাট বছর আগে হাবড়ার কিশোরীকে পাড়ারই এক চাচী বেচে দিয়েছিলেন সোনাগাছির মাসির কাছে। সেই থেকে টানা জীবন-যুদ্ধ। গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে তিন ভাইকে বড় করেছেন। ভাইরা অবশ্য বোনের খোঁজ রাখেন না। অসুস্থ বৃদ্ধার দিনের বেশিটা কাটে বিছানায় শুয়ে। পাড়ার দোকান থেকে দুটো রুটি বা একটা ওষুধ কিনে আনার লোকও সব সময় পান না।
 
যৌনকর্মী রেখা বলেন, “আমাদের জীবনে সবই অন্ধকার। বয়স থাকতে অনেকে ভাল রোজগার করে। পরে তা বারো ভূতে লুটেপুটে খায়। মাথা গোঁজার আশ্রয় আর দুবেলা খাবার পেলে অন্তত পথে পড়ে থেকে কুকুরের মতো মরতে হয় না।”
 
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হিংয়ের কচুরি’ গল্প অবলম্বনে সত্তরের দশকে তৈরি হয়েছিল ‘নিশিপদ্ম।’ সেখানে দেখা গিয়েছিল, যৌনকর্মী পুষ্প পাশের গৃহস্থবাড়ির ছোট্ট ছেলে ভুতোকে নিজের ছেলের মতো ভালবাসেন। বহু বছর বাদে সহায়-সম্বলহীন, অসুস্থ পুষ্পকে মেসবাড়ির ঝিয়ের কাজ থেকে ছাড়িয়ে মায়ের মর্যাদা দিয়ে বাড়ি নিয়ে যায় ভুতো। শেষ বয়সে মায়ের মর্যাদা না-পেলেও মুক্তির আলোয় রেখা-সন্ধ্যারা অন্তত বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পেতে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে