Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (46 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-০৬-২০১৩

তথ্য প্রযুক্তি আইনের প্রয়োগ এবং ভবিষ্যত নিয়ে উৎকণ্ঠা


	তথ্য প্রযুক্তি আইনের প্রয়োগ এবং ভবিষ্যত নিয়ে উৎকণ্ঠা
ঢাকা, ৬ নভেম্বর- জাতীয় সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) বিল-২০১৩' নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ে নানা সংশয় এবং উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। অপরাধ দমনের যেসব কারণ দেখিয়ে আইনটি পাস করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ হতে দাবি করা হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং আইনটি অপব্যবহার হতে পারে বলে অনেকে মতপ্রকাশ করেছেন।
 
গত ৬ অক্টোবর তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে সংসদে বিলটি পাস হয়েছে। এর আগে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের সংশোধনে অধ্যাদেশ জারি করেন। ১৯ আগস্ট এই অধ্যাদেশের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংসদে বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
 
সংশোধিত আইনে শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ন্যূনতম ৭ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ২০০৬ সালে পাস হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছর সাজার বিধান ছিল। সংশোধিত বিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) ছাড়াই আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পুলিশকে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছে। এছাড়া কিছু অপরাধ জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। আগের আইনে সব অপরাধ জামিন যোগ্য ছিল। বিলে আইসিটি সংক্রান্ত বেশকিছু অপরাধ আমলযোগ্য রাখা হয়েছে। এছাড়া আগের আইনে মামলা করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হতো। কিন্তু নতুন আইনে পুলিশ অপরাধ আমলে নিয়ে মামলা করতে পারবে।
 
ব্লগার মশিউর রহমান বিপ্লব, সুব্রত অধিকারী শুভ, রাসেল পারভেজ ও আসিফ মহীউদ্দিন; আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং মানবাধিকার সংগঠন অধিকার'র সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান শুভ্রর বিরুদ্ধে এই আইনেই মামলা হয়েছে। সম্প্রতি মামলা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একেএম ওয়াহেদুজ্জামান'র বিরুদ্ধে।
 
মূল আইনের ৫৪ ধারায় বর্ণিত অপরাধ- কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদির অনিষ্ট সাধন, ৫৬ ধারায় বর্ণিত- কম্পিউটার সিস্টেমের হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধ, ৫৭ ধারায় বর্ণিত- ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও ৬১ ধারায় বর্ণিত- সংরক্ষিত সিস্টেমে প্রবেশ সংক্রান্ত অপরাধ এর দণ্ড পরিবর্তন করে 'অনধিক দশ বছর কারাদণ্ড'র স্থলে 'অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যুন সাত বছর কারাদণ্ড'এ শব্দাবলি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মূল আইনের ৭৬ ধারায় সংশোধনী এনে উপরোক্ত ৫৪, ৫৬, ৫৭ ও ৬১ ধারায় বর্ণিত অপরাধসমুহ আমলযোগ্য (কগনিজেবল) অর্থাৎ এসব অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে এবং এসব অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা হয়েছে। এই ধারার অনুচ্ছেদ (২) প্রতিস্থাপন করে বলা হয়েছে- (ক) ৫৪, ৫৬, ৫৭ ও ৬১ এ উল্লেখিত অপরাধ সমূহ আমলযোগ্য (কগনিজেবল) ও অজামিনযোগ্য হবে এবং (খ) ৫৫, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬২, ৬৩, ৬৪ ও ৬৫ এ উল্লেখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য (নন-কগনিজেবল) ও জামিনযোগ্য হবে।
 
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ হতে বলা হয়েছে, তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ও প্রয়োগ নিশ্চিত এবং তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আইনটি যুগোপযোগী করে বাস্তবতার আলোকে কতিপয় ধারা/উপধারার পরিমার্জন ও সংশোধনের প্রয়োজন। তাই এই বিলটি পাস করা প্রয়োজন।
 
বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। অধ্যাদেশ থেকে ৫৭ ধারা বাতিল করে জাতীয় সংসদে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রদানেরও সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সেই দাবি আমলে না নিয়েই সংসদে বিলটি পাস করা হয়েছে।
 
এই আইন নিয়ে কী ভাবছেন অনলাইন এক্টিভিস্টরা?
'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) বিল-২০১৩' নিয়ে সর্বত্র ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনলাইন এক্টিভিস্টদের কয়েকজন এই আইনের প্রয়োগ ও ভবিষ্যত কী হবে কিংবা কী হতে পারে, প্রিয়.কম এর কাছে তা তুলে ধরেছেন।
 
মাসকাওয়াথ আহসান
এই আইন নাগরিকের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করেছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মতই কালাকানুন এটি। ক্ষমতায় যেই থাকুক; এই আইনকে তারা ব্যবহার করবে ভিন্নমতকে দমনের কাজে। এরকম দমনমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা আমরা চাই না। মোটা দাগে এই আইনের সংশোধিত রূপ গণতন্ত্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।
 
ডিজিটাল বাংলাদেশের ঝান্ডাধারী সরকার এরকম একনায়কতান্ত্রিক আইন প্রণয়ন করায় বিস্মিত হয়েছি। অবিলম্বে এটি বাতিল করে বাস্তবানুগ, প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক করতে হবে। নইলে প্রত্যাখ্যান জুটবে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়কদের কপালে।
 
অমি রহমান পিয়াল
এক্ষেত্রে এক কথায় বলতে গেলে বাকস্বাধীনতার উপর যে কোনো হস্তক্ষেপই অন্যায় (ন্যায়ের খোলসে হলেও) ও অবমাননাকর। যে আইনটি করা হয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রায়োগিক নায্যতা কতখানি জরুরি ছিল বা আদৌ ছিল কিনা সেটা নিয়েও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কারণ চলতি সময়ে যখন অনলাইন প্রোপাগান্ডা মাত্রাছাড়া হয়েছে এবং বাকস্বাধীনতারও ক্ষেত্র বিশেষে অপব্যবহার হয়েছে (যেমন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে হত্যার হুমকি ও উস্কানি), তখনও এর প্রয়োগ তেমন চরম পর্যায়ে দেখা যায়নি। একজন শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীকে 'কথিত' হুমকি দিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন ওই আইনে, কিন্তু জামিনও পেয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ আইনটা প্রণয়ন করলেও এর চূড়ান্ত ব্যবহার করছে না। অথচ এই একই আইনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল একটিভিস্টকে গ্রেফতার এবং তাদের যাবতীয় লেখালেখি মুছে ফেলার ঝুঁকি রয়েছে যদি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আবার ক্ষমতায় আসে। যে শাবলটা দিয়ে সরকার মাটি খোঁড়ার কাজ সারলো, সেটা দিয়েই মাথায় বাড়ি মারবে তারা।
 
শাফকাত রাব্বি
নতুন পাস হওয়া আইসিটি আইনে কাউকে ওয়ারেন্ট বিহীন, জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করা যাবে। আর ‘অপরাধ প্রমাণিত’ হলে নুন্যতম শাস্তি হবে ৭ বছর থেকে ১৪ বছরের জেল। ইন্টারনেটে লেখার কারণে এধরনের মধ্যযুগীয় শাস্তি পৃথিবীর আর ক'টি দেশে আছে জানা নেই। আইনটির প্রায়োগিক দুর্বলতাও প্রচুর। যেমন- সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড হলো ভৌগলিক সীমাহীন প্লাটফর্ম। এই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের কোন ঘটনায় কোন দেশের আদালতের জুরিসডিকশন থাকবে তা নির্ধারণ করা অনেক সময়ই দুরূহ হয়ে যায়। তাছাড়া ইন্টারনেট-বিষয়ক অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ে প্রকৃত তদন্ত চালানোর মতো লোকবল পুলিশ বাহিনীর সারাদেশ জুড়ে আছে কিনা জানা নেই। যদিও সারাদেশ জুড়ে ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তারা পেয়ে গেছেন এই আইনের ফলে। ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরি করে তো যে কোন মানুষকেই জেলে পাঠানো সম্ভব। রাজনীতি বিমুখ মেধাবী তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের কল্যাণে রাজনীতিমুখী হচ্ছিল। এই আইন তাদের হটিয়ে দিয়ে, হালুয়া-রুটিখোর রিস্কটেকারদের হাতেই রাজনীতিকে ঠেলে দেবে।
 
আর্চ সিহাব
কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হবার আগ অবধি তাকে নির্দোষ বিবেচনা করার নিয়ম আছে এবং কাউকে অপরাধী প্রমাণের দায় সাধারণত অভিযোগকারীর উপরেই বর্তায়। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির নামে যে কোন মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করে তাকে হয়রানি করা সম্ভব।
 
কিন্তু অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ধারাগুলো আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করে দেওয়ায় একজন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে কার্যত দোষী হিসেবেই আটক থাকতে হবে।
 
তথ্যপ্রকাশের কথিত অপরাধকে বিচারের আগেই অজামিনযোগ্য করে না দিয়ে তা বিজ্ঞ আদালতের সন্তুষ্টির ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
 
একেএম ওয়াহেদুজ্জামান
আইনটি পাস হবার পর হতেই এটির প্রয়োগ নিয়ে আমি সমালোচনা করেছি। অনেকদিন হতেই ফেসবুক ব্যবহার করি, সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুসহ সরকারি বিভিন্ন অব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমি মতপ্রকাশ করি। কিন্তু যে অপরাধ আমি করিনি, তার জন্য এই মামলায় আমি নিজেই ভিক্টিম হবো এটা কল্পনা করিনি।
 
ফেসবুকে আমার মত অনেকেই পছন্দ করেন, আবার স্বাভাবিকভাবে অনেকই দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। তাই বলে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এই মামলা, এটা খুবই দুঃখজনক। ক্ষমতার পট পরিবর্তনে এই আইনের অপব্যবহার হতে পারে।
 
পিনাকী ভট্টাচার্য
সম্প্রতি পাস হওয়া আইসিটি আইনে ভার্চুয়াল জগতের যে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ ছিল সেটার কণ্ঠরোধ করা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে দ্বিমত থাকলে অনেকেই এই আ্ইনের অপব্যবহারের শিকার হবে। সম্প্রতি ওয়াহেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলাটি উল্লেখ করার মতো।
 
স্ক্রিনশট নিয়ে ওয়াহেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হয়েছে, যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন তাঁরা সবাই জানেন যে এটা কোন ব্যাক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা নয়। ব্যাক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট না করেও তার দায় কেন ব্যাক্তিগতভাবে নিতে হবে? এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে আইনটি থাকলে।
 
শরীফুজ্জামান শরীফ
সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এই আইনটি করা হয়েছে সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে। যদিও কেউ এই ধরণের আইন প্রণয়নের দাবি করেনি। আইনটি নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার পরিপন্থী। কোন একজন মানুষ অপরাধী কি না সেটা নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র আদালতের। আদালত কারো বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার করে কাউকে দোষী সাব্যস্থ করে বা নির্দোষ বলে রায় দেয়। বিচার করে কাউকে খালাস দিতে পারে, আবার শাস্তি ও দিতে পারে। কিন্তু এই আইনে যে প্রক্রিয়ায় গ্রেফতারের বিধান রাখা হয়েছে তাতে আদালতের নির্দেশনা ছাড়া যাকে খুশি তাকে গ্রেফতার করা যাবে। এই গ্রেফতারও এক ধরণের শাস্তি।
 
একজন মানুষ অপরাধ করেছেন কিনা সেটা আইনি প্রক্রিয়ায় না জেনে তাকে আদালতের পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার করে রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পারে না। পুলিশকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সেটার মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসন বিভাগকে বিচার করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যা আদালত অবমাননার পর্যায়ে পরে। আমরা জানি, আমাদের জেলা প্রশাসকরা ছোট খাট বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা চেয়ে বার বার দাবি জানিয়েছেন, কিন্তু এই বিচার করার ক্ষমতা তাদের নেই সেটা দেশের উচ্চ আদালত আগেই জানিয়ে দিয়েছে। বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এক ধরণের শাস্তি, সেই শাস্তি কার্যকরের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে শাসন বিভাগকে! আর বিনা বিচারে এভাবে কেউকে গ্রেফতার ও তাকে আটকে রাখার বিধান সভ্য রাষ্ট্র করতে পারে না। এই আইনের মাধ্যমে দেশে একদিকে পুলিশি রাজত্ব আরও সুদৃঢ় হবে, আদালতের বাইরে আরেক আদালত তৈরি হবে। অন্যদিকে মানুষের হয়রানি বাড়বে বিশেষ করে সরকারের কোন অন্যায় কাজের সমালোচনা করা যাবে না, মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে। এটা নাগরিকদের মুখ বন্ধ করে রাখার আইন। এই আইন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হবে। আর রাজনৈতিক মত প্রকাশের পরিপন্থী ও নাগরিকদের হয়রানির উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন সভ্য সমাজে রাখা কিংবা প্রণয়ন করা উচিৎ নয়।
 
মুক্তা রহমান
বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকে নানা বিতর্কিত পোস্ট শেয়ার করে স্পর্শকাতর মানুষদের উত্তেজিত করে নানা অপকর্ম ঘটছে বলেই সরকার এমন কঠিন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেই আমার ধারণা। কথা বলা বা মুক্ত ভাবে পজিটিভ মতামত প্রকাশে তো বাধা নেই, শুধু উদ্দেশমূলক ভাবে মতামতের মাধ্যমে উস্কানি দিয়ে দেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা ঠেকানোর অধিকার সরকার রাখে।
 
তাই বলব, এই আইন ভাল উদ্দেশে একটি নির্দয় সিদ্ধান্ত। তবে আইনটির অপব্যবহার হলে সরকার স্বৈরাচারি অপবাদে এ ভূষিত হতে পারে। আর পট পরিবর্তন হলে সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের মত এটা বুমেরাং হয়ে আসার সম্ভবনা আছে।
 
কেইস স্টাডি ১
সাংবাদিক ও ব্লগার আরিফ জেবতিক এর নামে ভুয়া ব্লগ (ধর্মবিদ্বেষি ব্লগ) তৈরি করে অপপ্রচারের বিষয়টি একসময় বেশ আলোচিত হয়েছিল। আরিফ জেবতিক একজন সাংবাদিক এবং প্রযুক্তি সচেতন মানুষ হওয়ার কারণে বিষয়টি তিনি সফলভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছেন। উনি তাৎক্ষনিকভাবে বিষয়টি প্রচার করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ডপ্রেস কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে ভুয়া ব্লগটি নিষ্ক্রিয় করতে সমর্থ হন। সেইসাথে উনি সৌভাগ্যবান যে, বিষয়টি কোন মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি। কিন্তু অন্য কোন সাধারণ মানুষের সঙ্গে এরকম ঘটনা ঘটলে বিষয়টি অন্যরকম হতে পারতো।
 
কেইস স্টাডি ২
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পরিবেশবিদ একেএম ওয়াহেদুজ্জামান এর বিরুদ্ধে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ঐ মামলায় বাদী যে কাগজ (তথ্য-প্রমান) দিয়ে মামলা করেছেন, তা আসলে ওয়াহেদুজ্জামানের নয় বলে জানা গেছে। তার নামে ফেসবুকে পেইজ খুলে অথবা 'ফটোশপ' ব্যবহার করে কাজটি করা হয়েছে বলে ওয়াহেদুজ্জামান এর মামলার কাগজ এবং আইনজীবীদের সূত্রে জানা গেছে। হাইকোর্টের বিচারপতি বিষয়টি বুঝতে পেরে ওয়াহেদুজ্জামানের অর্ন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছেন (যদিও মামলাটি অ-জামিন অযোগ্য)। তবে বিষয়টি নিম্ন আদালতে বিচারাধীন থাকায় এর ভবিষ্যত কী হবে তা নিয়ে সন্দিহান ওয়াহেদুজ্জামানের আইনজীবীরা।
 
আশঙ্কা আর আতঙ্কে পরিণত এই আইন
'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধন) বিল-২০১৩' পাস হওয়ার পরে ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীরা গ্রেফতারের আশঙ্কায় সরকারের সমালোচনাসহ বিভিন্ন সমালোচনা করা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকেই লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা নিয়মিত আলোচনা-সমালোচনা করতেন, তারা এখন আর এসব লিখছেন না। এই আইনটি তাদের কাছে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
 
ফেঁসে যেতে পারে যে কেউ
এই বিলটি পাস হওয়ার পরে প্রচলিত ধারার বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির চেয়ে অনলাইনে লেখালেখি/মন্তব্য করা বহুগুণ বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, লেখালেখি না করে থাকলেও 'ফটোশপ' বা অন্য যে কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করে মিথ্যা-বানোয়াট ছবি বা স্কিনশট দিয়ে, কারো নামে অন্য কেউ ফ্রী ব্লগ তৈরি অথবা ফেসবুক একাউন্ট খুলে আপত্তিকর মন্তব্য করে অনলাইনে পক্ষ-বিপক্ষের যে কাউকে ফাঁসিয়ে দেবার মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে