Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-০১-২০১৯

লে. জামশেদ মানেকশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্মৃত নায়ক

প্রকাশ ভান্ডারি


লে. জামশেদ মানেকশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্মৃত নায়ক

প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখেন।  তিনি দ্বাদশ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের ক্যাপ্টেন হিসাবে বার্মার ফ্রন্টে লড়াই করেছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে গুরুতর আহত হন। কিন্তু আরও একজন মানেকশ, লে. জামশেদ মানেকশ (জিমি), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চট্টগ্রাম ফ্রন্টের দোহাজারী এলাকায় জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তা পৃথিবীর কাছে অনেকটাই অজানা।

সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে শ্যাম আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও জিমি শহীদ হন। লে. জামশেদ মানেকশ (জিমি) মারা যান ১৯৪৪ সালের ১৪ মে।

লে. জামশেদ অবিভক্ত ভারতের গুজরাট রাজ্যের বুলসারে ছিলেন এবং কমিশন্ড অফিসার হিসাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগে তিনি আফগানিস্তানের কাবুলে কাজ করেন। তাকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে জাপানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। তখন এটি পূর্ব বাংলার অংশ ছিল, যা এখন বাংলাদেশের অংশ। এখানে যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান এবং আফ্রিকান মারা গিয়েছিল। এই অঞ্চলেই ধর্মীয় রীতিতে এই সাহসী সৈন্যদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সমাহিত করা হয়। এ জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কয়েকটি সমাধিক্ষেত্র তৈরি করে যেখানে শহীদদের পুরো সামরিক মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। লে. জামশেদ মানেকশ (জিমি) ভারতের পার্সি সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। পার্সিয়ানরা মূলত জরাথুস্ট্র ধর্মের যারা ইরান থেকে পালিয়ে এসে ভারতে বসতি স্থাপন করে। ইরান থেকে এসে প্রথমে গুজরাটে অবস্থান নিলেও পরবর্তীকালে তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায় সাফল্য পায়। অবিভক্ত ভারতের অর্থনীতিতে তারা অবদান রেখেছিল এবং কিছু পরিবার ঢাকা ও চট্টগ্রামেও তাদের ব্যবসা বিস্তৃত করে। চট্টগ্রামে অবস্থানরত এমনই একজন ব্যবসায়ী মেরধোরার সহায়তায় ব্রিটিশরা লে. জামশেদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

ধারণা করা হয়, তাঁর শেষকৃত্য পার্সি ধর্ম অনুসারেই করা হয়েছিল। এই সমাধিস্থলে ৪০০টি সমাধি ছিল এবং পরবর্তীতে যখন চট্টগ্রামে কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্র নির্মাণ করা হয় তখন এই সমাধিগুলিও নতুন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ এ শহীদ হওয়া ৭৩১ জনের সমাধি রয়েছে এই কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধীক্ষেত্রে, যার মধ্যে ১৭ জনের পরিচয় অজানা। এর রক্ষণাবেক্ষণ করে ব্রিটেনের কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন।

কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্রটি চট্টগ্রাম শহরের বাদশা মিয়া রোডে অবস্থিত। তৎকালীন চট্টগ্রাম শহর থেকে আড়াই মাইল দূরে এর অবস্থান ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর চৌদ্দতম সেনা শিবির চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়েছিল। যেখানে সেনা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং ব্রিটিশ জেনারেল হাসপাতাল ছিল। ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালটি চালু ছিল।

সমাধিক্ষেত্রটি ফিনলের গেস্ট হাউজের পিছনই চারপাশে জঙ্গল, ফল এবং ফুল গাছে ভরা ছিল। যার ফলে এটি রাস্তা থেকে সহজে দেখা যেত না।

মইন ফাউন্ডেশন জয়পুর কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন ক্যাম্পের দলনেতা হিসাবে আমি নিয়মিত ঢাকায় আসি। ২০১৭ সালে যখন ক্যাম্পের আয়োজন করা হচ্ছিল তখন আমার সঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ ছিলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ প্রাক্তন ভারতীয় আমলা যিনি রাজস্থান সরকারের মুখ্য সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জয়পুরের নির্বাহী সভাপতি ছিলেন। সমাধিস্থলগুলোর প্রতি সালাহউদ্দিনের প্রচণ্ড আবেগ ছিল। ভারতীয় সমাধিস্থল ছাড়াও মিয়ানমার ও মিশরে তিনি ভ্রমণ করেছিলেন মহান যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

বাংলাদেশে এসে তিনি এবং তার ব্যাঙ্গালুরুর বন্ধু কল্যাণ গাঙ্গুলি সমাধিস্থলটি দেখতে চট্টগ্রামে চলে এসেছিলেন। আমরা সকালে সেখানে পৌঁছে সারি সারি ফলক দিয়ে যেভাবে এটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল তা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ফলকে সৈনিকের নাম, তার ইউনিটের নাম এবং মৃত্যুর বছর উল্লেখ করা। প্রতিটি ফলকে তাদের ধর্মীয় চিহ্ন আঁকা। সৈনিকটি খ্রিস্টান হলে ক্রস এবং হিন্দু হলে মন্দিরের চিহ্ন দেওয়া। প্রতিটি ফলক দেখতে দেখতে আমরা এগুচ্ছিলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম একটিমাত্র ফলকে পার্সি চিহ্ন দেওয়া। অবাক হয়ে আমি দেখতে পেলাম যে সারি সারি শহীদের মাঝে এখানে একমাত্র পার্সি হলেন লে. জামশেদ মানেকশ (জিমি)। তার ফলকে লেখা--

Lieutenant Jamshed S Manekshaw, Royal Indian Army Service Corps, 14th May 1944 Age 33, O Rest, Dear Partner of My Days I Pledge My Troth To Thee Always….

আমি সালাহউদ্দিন এবং তার বন্ধু কল্যাণ গাঙ্গুলিকে ফলকটি দেখার জন্য ডাকলাম। তারা এসে ফলকটির লেখা পড়ল এবং আমার মতোই অবাক হয়েছিল। এই নামটি আমাদেরকে ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ আমাদের জানামতে সেনাবাহিনীর একমাত্র মানেকশ ছিলেন তিনি। কিন্তু এই মানেকশ একজন অজানা শহীদ ছিলেন যার সম্পর্কে আমরা কখনও শুনিনি।

ছবি তোলার পর আমার মনে হয়েছিল অবশ্যই ফলকটির ছবি প্রয়াত জিমি মানেকশের পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠাতে হবে। সালাহউদ্দিন তার বন্ধু ব্রিগেডিয়ার দারা গোয়াদিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনিও একজন পার্সি ছিলেন। জিমির পরিবার সম্পর্কে জানার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হন। ফেসবুকের মাধ্যমে মানেকশ পদবীর সবাইকে আমি ফলকের ছবিটি পাঠাই এবং তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই। একইভাবে, সালাহউদ্দিনও তার সাধ্যমত যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনও সাফল্য আসেনি। সাহায্যের জন্য আমার বন্ধু ফারোক মানেকশের সঙ্গে যোগাযোগ করি, যে গোয়ায় একটি রিসোর্ট চালায়। যোগাযোগের বেশ কয়েক মাস পরে, তিনি আমাকে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান জিমি মানেকশের ছেলেকে খুঁজে পেয়েছেন। তার ছেলে নাউজার মানেকশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার। নাউজার বিশ্বাসই করতে পারেননি যে আমরা তার বাবার সমাধির সন্ধান পেয়েছি।

বাবার স্মৃতি বলতে গিয়ে নাউজার বলেন, আমি যখন বাবাকে যখন হারিয়েছি তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ মাস। তিনি দেখতে কেমন ছিলেন তা আমার মনে নেই। একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে আমাদের পরিবার দুর্দশায় পড়ে। আমার মা জেরিন ভেঙে পড়েছিলেন। কারণ আমি তখনও ছোট বাচ্চা ছিলাম এবং আমাদের পুরোটা জীবন পড়ে ছিল। আর্মি জেনারেল আমার মাকে বাবার মৃত্যুর কথা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তখন আমরা গুজরাটের বুলসারে ছিলাম। আমার মা মধ্যপ্রদেশের হশাঙ্গাবাদ শহরে চলে এসেছিলেন এবং সেখানে কিছুদিন ছিলেন। খুব কষ্টে মা আমাকে বড় করেন। তিনি নাসিকের একটি স্কুলে চাকরি পেয়েছিলেন। তিনি একজন ভালো চিত্রশিল্পী ছিলেন। এই দক্ষতা তাকে শিক্ষকতার চাকরি পেতে সহায়তা করে। সেই চল্লিশের দশকে, ব্রিটিশরা প্রতি মাসে আমার মাকে ১০০ টাকা এবং নাবালক হিসাবে আমার জন্য ৩০০ টাকা পেনশন মঞ্জুর করে। বিদ্যালয় এবং কলেজের পড়াশোনা শেষ করে নাসিক থেকে স্নাতক হয়েছি। তবে সবসময় আমার বাবার কথা মনে পড়ে। চট্টগ্রাম থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে দোহাজারীতে যখন আমার বাবার সমাধি হয় তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। আমি এখন ৭৬ বছর বয়সী। আমি আমার মায়ের সাথে তখন দোহাজারীতে যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে এসেছিলাম। দোহাজারীতে সেই সফরের স্মৃতি এখন ম্লান। কিন্তু আমার এখনও মনে আছে, আমার মা কীভাবে বাবার সমাধিতে কেঁদেছিলেন। আমার মা কাঠকয়লা দিয়ে আমার বাবা এবং তার নিজের একটি ছবি আঁকেন। সেটি স্টুডিওতে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় বাবার সাথে মায়ের তোলা একটি ছবি থেকে অনুপ্রাণিত। এটি আমার কাছে বাবা-মায়ের একমাত্র ছবি। আমি আজও এটা দেখি।

নাউজার জানতেন না যে তার বাবার মৃতদেহ অন্যদের সঙ্গে চট্টগ্রামের নতুন কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্রে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে নাউজার বলেন, যখন আপনি এবং সালাহউদ্দিন সাহেব চট্টগ্রামের এই নতুন কবরস্থান সম্পর্কে আমাকে জানান তখন আমি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং আমার পুরো পরিবারকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আমরা আমাদের টিকিট এবং হোটেল বুক করে দিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম আমার ছেলেরা এবং নাতি-নাতনিরা আমার বাবার শেষ সমাধিস্থানটি চিনুক। মা বেঁচে থাকলে ভালো হতো। আমি বোম্বাই পুলিশে যোগ দেওয়ার পর মা আমার সঙ্গেই ছিলেন। তিনি কষ্ট করেছেন কিন্তু আমাকে খুব ভালোভাবে বড় করেছেন। আমি মুম্বাই পুলিশকে একজন সৎ পুলিশ অফিসার হিসাবে সেবা দিয়ে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসাবে অবসর নিয়েছি। এখনও কাজ করছি নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে।

নাউজার তার তিন ছেলে জিমি, রুমি এবং স্যামকে নিয়ে চট্টগ্রামে পাড়ি জমান। তার তৃতীয় ছেলে স্যামের নামকরণ করা হয়েছিল ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশের নামানুসারে। যিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণকে ত্বরান্বিত করেছিলেন যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

আমি তিন ছেলে ও পুত্রবধু, দুই নাতী এবং দুই নাতনী সবাইকে নিয়ে চট্টগ্রামে জিমি মানেকশের স্মৃতিস্তম্ভে গিয়েছিলাম।

সাদা গোলাপ এবং সাদা পদ্মযুক্ত পুষ্পস্তবক স্থাপন করা হয়েছিল সমাধিতে এবং ফলকে একটি বাতি জ্বালানো হয়েছিল। যখন ফলকের পিছনের দিকে নাউজার তার মায়ের আঁকা কাঠকয়লার সেই ছবিটির একটি ফটো ফ্রেম রাখছিলেন তখন নাউজারের চোখ ভেজা ছিল। পরিবারের সবাই যোগ দিয়েছিল প্রার্থনায়। সব মিলিয়ে একটি মর্মস্পর্শী মুহূর্ত ছিল সেটি। নাউজারের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। তার পুত্র, নাতি-নাতনী এবং পুত্রবধূরা শ্রদ্ধা জানাতে পরের দুই দিন সেখানে গিয়েছিলেন।

নাউজার বলল, আমি চট্টগ্রামের এই সমাধিস্থলে কাটানো সময়গুলো সারা জীবন মনে রাখবে। আমার জন্য এটি সমাধিক্ষেত্র নয় তীর্থস্থান। আমি বাবাকে সালাম জানাই।

লেখক: প্রকাশ ভান্ডারী, প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক। তিনি টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে কর্মরত ছিলেন।

আর/০৮:১৪/০১ ডিসেম্বর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে