Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-২৯-২০১৯

ওরা মৃত মানুষকেও 'জীবিত' দেখায়

এস এম কাওসার


ওরা মৃত মানুষকেও 'জীবিত' দেখায়

বগুড়া, ৩০ নভেম্বর- মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে তামাদি কেস চালু করা, একজনের জমি অন্যজনের নামে রেকর্ড করে দেওয়া, জমির মালিকের নাম টেম্পারিং করে বাদ দিয়ে অন্যের নাম বসিয়ে দেওয়া, একবার বাদীর পক্ষে আবার বিবাদীর পক্ষে জমিসংক্রান্ত মামলার রায় দেওয়াসহ মারাত্মক সব জালিয়াতির বিস্তর অভিযোগ বগুড়া সেটেলমেন্ট বিভাগের কর্তাদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের ভাষায় বলা হয়, জালিয়াতিতে পটু (এক্সপার্ট) ওই বিভাগের কর্তারা।

তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। কারণ রসুনের মতো তারা একই সুতায় গাঁথা। গ্রামের সরল মানুষকে জটিলতায় ফেলে অবৈধভাবে টাকা কামাতেই এসব অবৈধ পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। তাদের অভিযোগের সূত্র ধরে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জালিয়াতির নানা চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সেটেলমেন্ট কর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলাও আছে।

ধুনট উপজেলার এলাঙ্গী ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের মৃত মমতাজুর রহমানের ছেলে সাইদুর রহমানের অভিযোগ- তিনি এবং তাদের পরিবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এলাঙ্গী মৌজার ৩২৫৭নং খতিয়ানে ২০ শতাংশ জমির ওপর বাবার আমল থেকে অর্থাৎ ৭০ বছর আগে থেকে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন। জমিটি সেটেলমেন্ট বিভাগ সর্বশেষ ২০১০ সালে রেকর্ড কাজ করা পর্যন্ত তাদের নামেই রেকর্ড করে দেয়। এ জমির বিষয়ে রেকর্ডের সময় ওয়ারিশদের কোনো আপত্তি ছিল না বিধায় নিয়মানুযায়ী ৩০/৩১ ধারার মামলাও তামাদি হয়ে যায়।

কিন্তু এরই একপর্যায়ে হঠাৎ করে ২০১৬ সালের জুন মাসে সাইদুর রহমান জানতে পারেন, তাদের ওই জমির মালিকানা দাবি করে আপিল কেস করেছেন একই গ্রামের মৃত মজিবুর রহমান, শাসসুল হক, শহিদার রহমান ও চাঁন মিয়া। মজিবুর রহমান ২০০৯ সালে মারা যান অথচ তাকে মামলায় ১নং বাদী দেখানো হয়। এমনকি ওই চারজনের নামে জমিটি রেকর্ডও করে দেওয়া হয়।

বিষয়টি সন্দেহের সৃষ্টি হলে সাইদুর রহমান ছুটে যান অন্য বাদীদের কাছে। তারাও বিষয়টি শুনে হতভম্ব হয়ে যান। পরে সাইদুর রহমান সেটেলমেন্ট অফিসে গেলে এই মামলাটি বন্ধ করার জন্য তার কাছে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দাবি করা হয়।

কিন্তু সাইদুর রহমান একটি ফাঁকফোকর পেয়ে যান। যাকে মামলার ১নং বাদী বানানো হয়েছে তিনি জীবিত নেই, এটা জানতেন না সেটেলমেন্ট কর্মকর্তারা। ফলে বেকায়দায় পড়ে যান তারা। সাইদুর রহমান এও জানতে পারেন, উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আরিফুর রহমান এই জালিয়াতির মূল হোতা। তার নির্দেশেই আপিল কেস সাজিয়েছেন। মূলত অর্থ কামাইয়ের জন্য এই পন্থার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তখন সাইদুর রহমান সেটেলমেন্ট কর্তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। সরকারি সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার কাছে।

দীর্ঘদিন ঘুরে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস থেকে কোনো প্রতিকার না পেয়ে অভিযোগ করেন ঢাকায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে। সেখান থেকে বিষয়টি তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মজিবুল হক ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত এক পত্রে আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নিমিত্তে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। সেসঙ্গে সাইদুর রহমানের নামে পুনরায় জমির রেকর্ড করে দিতে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নির্দেশ দুটির একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। চিঠি দুটি জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে চাপা পড়ে যায় বলেও সাইদুর রহমানের অভিযোগ। তার অভিযোগ, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্তারা আরিফুর রহমানকে বাঁচাতে ফাইলগুলো চাপা দিয়ে রাখেন।

ধুনট উপজেলার শৈলমারী গ্রামের খোদা বক্স এক ব্যক্তির ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে চলতি বছরের ৬ মে দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, তিনি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একটি জমি ভোগদখল করে আসছেন। এই জমিটি সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আরিফুর রহমান (বর্তমান দুপচাঁচিয়া উপজেলায় কর্মরত) ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তিদের নামে রেকর্ড করে দেন। এ বিষয়ে আপিল কেস দায়ের করলে দীর্ঘদিন পর মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে জমিটি তার নামে পুনরায় রেকর্ড করে দেন। কিন্তু এ বিষয়ে জাবেদা চাইলে দেন না।

কয়েক মাস পরে জানতে পারেন, জমিটি আবারও তার প্রতিপক্ষদের নামে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে রেকর্ড করে দিয়েছেন। এভাবে একবার তার নামে আবার তার প্রতিপক্ষের নামে রেকর্ড করে দিয়ে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আরিফুর রহমান এটা নিয়ে ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ তার। তার এই অভিযোগের সত্যতা পায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর। এ বিষয়েও আরিফুুর রহমানকে চলতি ২১ জুন কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এমন একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে। এমন নানা ধরনের হয়রানির কারণে ভুক্তভোগীরা একত্রিত হয়ে 'ভূমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি সংগঠন করেন। তারা ওই সংগঠনের ব্যানারে ৭ এপ্রিল আরিফুর রহমানসহ অসৎ সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সেটেলমেন্ট অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন।

এমন একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে চলতি বছরেই ৩টি বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। মামলাগুলোর শুনানি অব্যাহত আছে বলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস জানায়।

এদিকে জনরোষানলের ভয়ে আরিফুর রহমান ধুনট থেকে দুপচাঁচিয়া উপজেলায় বদলি নেন। বর্তমানে তিনি দুপচাঁচিয়া উপজেলা ছাড়াও জনবল সংকটের কারণে জয়পুরহাটের কালাই ও ক্ষেতলাল এবং আক্কেলপুর উপজেলারও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস জানায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে অভিযোগ সঠিক নয় বলে ফোন কেটে দেন।

জেলার গাবতলী উপজেলার সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে উৎকোচ না দেওয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে টেম্পারিং করে খতিয়ান থেকে জমির মূল মালিকের নাম কেটে অন্যদের নাম বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। গাবতলীর তরফসরতাজ গ্রামের জনৈক জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, তার মা পিয়ারা খাতুনকে তার নানা সোলায়মান আলী ১৯৮৯ সালের ২২ এপ্রিল দাড়াইল মৌজায় ১১ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। গাবতলী রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নম্বর ২০৫৭। বাবার কাছ থেকে জমি পাওয়ার পর পিয়ারা খাতুন তা ভোগদখল করে আসছেন।

এদিকে এই জমির ১৯১নং খতিয়ানে ভুলবশত প্রতিবেশী ছাবেদ আলী ও সৈয়দ আলীর নামে পোয়া (এক-চতুর্থাংশ) শতক করে জমি খতিয়ানভুক্ত হয়। ওই দু'জনের নাম বাদ দিয়ে খতিয়ান সংশোধন করার জন্য পিয়ারা খাতুন ২০১৫ সালের ২৯ জুন বগুড়ার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত সংশ্নিষ্ট ভূমি অফিসকে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। ভূমি অফিস নোটিশ দিয়ে দু'পক্ষকে ডেকে তদন্ত করে। তদন্ত প্রতিবেদনে ওই দু'জনের নাম বাদ দিয়ে খতিয়ান সংশোধন করার সুপারিশ করা হয়।

এদিকে গাবতলী উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মিজানুর রহমান এই কাজটি করে দিতে এ বাবদ জাহাঙ্গীর আলমকে অফিসে ডেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। অন্যথায় খতিয়ান সংশোধন করা হবে না বলে জানিয়ে দেন। ঘুষ না দেওয়ায় ওই কর্মকর্তা প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। এরপর পিয়ারা খাতুনের নাম খতিয়ান থেকে টেম্পারিং করে কেটে দেন এবং প্রতিপক্ষদের নামে খতিয়ান প্রকাশ করেন। এ বিষয়েও জাহাঙ্গীর আলম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে অভিযোগ দিয়ে কোনো প্রতিকার না পেয়ে বাধ্য হয়ে এ ব্যাপারে আদালতে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলাটি বর্তমানে আদালতে ঝুলে আছে।

এদিকে মিজানুর রহমানকে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে সহকারী জেলা সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে প্রমোশন দিয়ে বদলি করা হয়। জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে ঘুষ চাওয়া ও জালিয়াতির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগ ভিত্তিহীন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেডের মূল হোতা মনতাজ আলী নামে এক সাবেক জেলা সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা। তিনি জোনাল অফিসে বসতেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে এমন একাধিক অভিযোগের কারণে তাকে জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলায় বদলি করা হয়। তার জায়গায় গাবতলী উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে বসানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে জেলার যে কোনো সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার কোনো অবৈধ কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধার করেন মনতাজ আলী। এই বিভাগের অবৈধভাবে ইনকাম করা টাকার ক্যাশিয়ারও তিনি। তার কাছে টাকা জমা হওয়ার পর তিনি অবৈধভাবে উপার্জিত এই টাকার ভাগবাটোয়ারা কর্তাদের মাঝেও বণ্টন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মনতাজ আলী অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, জমিসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে গেলে রায় কারও পক্ষে যায় আবার কারও বিপক্ষে যায়। যাদের বিপক্ষে যায় তারা ঘুষ নিয়ে রায় দেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিয়োগ করেন বলে তার দাবি।

বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা মিলে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস। এর আওতায় ১৬টি উপজেলা রয়েছে। ১৬টি উপজেলায় ১৬ জন সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার মধ্যে ১১টি পদই শূন্য। যে ৫ উপজেলায় সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আছেন তারাই একেকজন ৩-৪টি করে উপজেলার দায়িত্বে আছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান বলেন, 'জনবল সংকটের কারণে জমিসংক্রান্ত হাজার হাজার মামলা ঝুলে আছে, মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।' তিনি সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার আরিফুর রহমানসহ ওই বিভাগের কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, 'কাজ করতে গিয়ে পক্ষে-বিপক্ষের লোকরা অভিযোগ করে থাকে। সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে চলতি বছরেই তিনটি বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। সেগুলোর শুনানি চলছে।

সূত্র: সমকাল

আর/০৮:১৪/৩০ নভেম্বর

অপরাধ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে