Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (44 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১৪-২০১১

আমরা আমাদের শেষ বোধিবৃক্ষও হারালাম

আবদুল গাফফার চৌধুরী


আমরা আমাদের শেষ বোধিবৃক্ষও হারালাম
আমাদের শেষ বোধিবৃক্ষ চলে গেলেন। তেরো ডিসেম্বরের সকালেই (লন্ডন সময়) যখন এই খবরটা পেলাম, তখন মনে হলো আমরা একটি বিরাট বটের ছায়া থেকে আশ্রয়চ্যুত হলাম। আমাদের হাজার বছরের শাশ্বত বাংলার বিপন্ন সংস্কৃতি আরেকটি রৰা প্রাচীর হারাল। ১৯২৩ সালে তাঁর জন্ম। ৮৮ বছর বয়সে এই মহাপ্রয়াণকে পরিণত বয়সের মৃতু্যই বলা চলে। কিন্তু আমার শোক ও দুঃখ এইখানে যে, যাকে আজ হারালাম, তাঁকে আর পাব না এবং আমাদের জাতীয় জীবনের এই চরম আপতকালে তাঁকে আমাদের আরও কিছুকাল বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। আমাদের বোধিবৃৰগুলো এক এক করে শূন্য হচ্ছে। সেই শূন্য স্থানগুলো দূর ভবিষ্যতেও পূর্ণ হবে সে আশা মনে জাগছে না।

কবীর চৌধুরী একটি ব্যক্তি নন, একটি ইনস্টিটিউশন। তাঁর গোটা পরিবারটিকেই বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির একটি ইনস্টিটিউশন বলা চলে। তার ছোট ভাই মুনীর চৌধুরী একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী। এককালে বাম রাজনীতিতে ছিলেন উজ্জ্বল তারকা। একাধারে নাট্যকার, শিৰাবিদ এবং মুক্ত চিন্তার অগ্রপথিক। আমি গর্বিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে তাঁকে শিৰক হিসেবে পেয়েছিলাম। '৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের কোলাবরেটর আলবদর ও রাজাকারেরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর ছেলে মিশুক মুনীরও ছিলেন এক প্রতিভাবান তরুণ। এই সেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃতু্য হয়েছে। অশীতিপর বছর বয়সে এই শোকের ধাক্কাও কবীর চৌধুরীকে সহ্য করতে হয়েছে। ছোট ভাই মুনীর চৌধুরীর অকাল মৃতু্যর শোকভার দীর্ঘ চলিস্নশ বছর ধরে বহন করার পর তিনিও এখন বিদায় নিলেন।

আমি কবীর চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরী দু'জনেরই অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালবাসা পেয়েছিলাম। তাঁরা চলে গেছেন। তাঁদের ভালবাসার সঞ্চয় কোনদিন আমার জীবনে ফুরাবে না। তাঁদের দু'জনকেই আমি ভাই ডাকতাম। কবীর ভাই ও মুনীর ভাই। কবির ভাইয়ের গত জন্মদিনেও আমি তাঁকে লন্ডন থেকে টেলিফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। বলেছি, 'আপনি অমিতায়ু হোন। আপনাকে দেশ এবং জাতির বড় দরকার।' তিনি বলেছেন, 'তোমরা আছ কি জন্যে?' বলেছি, সূর্যের সাৰাতে গ্রহের আলো বিতরণের স্পর্ধা নেই। জন্মদিনে আমার টেলিফোন পেয়ে তিনি কি যে খুশি হয়েছিলেন, তা টেলিফোনে তাঁর গলার আওয়াজ থেকেই বুঝতে পারছিলাম।'

আমি গত দু'তিন বছর ধরে যখনই ঢাকায় গিয়েছি, তখনই তাঁর সঙ্গে আমার একাধিকবার দেখা হয়েছে। কয়েক বছর আগে আমি যখন বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের দ্বারা আয়োজিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ওপর স্মারক বক্তৃতা দিতে ঢাকায় যাই, তখন সেই সভায় কবীর ভাই সভাপতিত্ব করেন। বয়সের ভারে তাঁর তখন চলাফেরা করতে কষ্ট হয়, এক জায়গায় দীর্ঘৰণ বসে থাকতে পারেন না। তবু আমি বঙ্গবন্ধুর ওপর স্মারক বক্তৃতা দেব শুনে তিনি এক বাক্যে রাজি হয়েছেন সভায় এসে সভাপতির আসনে বসতে।

ঢাকার কয়েকজন সাহিত্যিকের পাঁচটি বাংলা বইয়ের তিনি ইংরেজী অনুবাদ করেছেন। গ্রন্থাকারে তা প্রকাশ হয়েছে। সেই বইগুলোর মোড়ক উন্মোচন হবে। আমি তখন ঢাকায়। তার ইচ্ছে, আমি তাঁর বইগুলোর মোড়ক উন্মোচন করি। তাঁর ইচ্ছের কথা জেনে আমি সানন্দে রাজি হয়েছি। এই মোড়ক উন্মোচন করা ছিল আমার জীবনে এক পরম সম্মান লাভ।

এরপর আরেকটি ঘটনার কথা বলি। বছর দুই কি তিন আগে আমি ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত যুব লীগ সম্মেলনে দাবি জানিয়েছিলাম, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টকে দলীয় রাজনীতি মুক্ত করার জন্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উচিত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছেড়ে দেয়া। তাঁকে অবৈধভাবে বাড়িটি দেয়া হয়েছে। তিনি বাড়িটি ছাড়তে না চাইলে, সরকারের উচিত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁকে বাড়িটি ছাড়তে বাধ্য করা। (বেগম জিয়া তখনও ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।)

আমার এই দাবিটি সংবাদপত্রে ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ও ছাত্রদলের ক্যাডারেরা আমার ওপর রেগে ওঠে। তারা হুমকি দেয় আমার ওপর হামলা চালাবে এবং আমি যেন অবিলম্বে ঢাকা ছেড়ে চলে যাই। আমার বিরম্নদ্ধে ঢাকা শহরে তারা বিৰোভ মিছিল করে এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সেস্নাগান দেয়। এই সময় আমাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে যখন কেউ এগিয়ে আসেননি, তখন একা এগিয়ে এসেছেন জাতির বিবেক এবং জাতীয় অধ্যাপক এই কবীর চৌধুরী। তিনি সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে আমার দাবি সমর্থন করেছেন এবং আমার ওপর হামলা চালানোর হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

তিনি সরাসরি কখনও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শে ছিলেন প্রগতিশীল। কিন্তু পৰপাতদুষ্ট প্রগতিশীল নন। তিনি বরিস পাসত্মারনাকের 'ড. জিভাগো' যেমন অনুবাদ করেছেন, তেমনি পাকিসত্মান আমলে তিনি যখন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক, তখন সদ্য 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' থেকে মুক্ত হওয়া বঙ্গবন্ধুকে একাডেমীর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি করে নিয়ে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেকু্যলার বাঙালী জাতীয়তাবাদের মধ্যে তিনি বাঙালীর কালচারাল নেশনহুডের যে ভিত্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি আমাদের অদ্বিতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁকে এতটাই সম্মান করতেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে কবীর ভাইকে তিনি প্রথম শিৰা সচিব পদে নিয়োগ করেন এবং দেশের শিৰা ব্যবস্থা পুনর্গঠনে গুরম্নদায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু আমলাতন্ত্রের ঘেরাটোপে তিনি বেশিদিন বন্দী থাকতে পারেননি এবং বন্দী থাকতে চাননি। শিৰা সচিবের পদ থেকে সরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালেও তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। ২৬ মার্চ ('৭১) রাতে তাঁকে এবং ড. নীলিমা ইব্রাহিমকে গ্রেফতার করে জেলে রাখা হয়। তাঁদের হত্যা না করার একটা উদ্দেশ্য ছিল, তাঁদের দিয়ে হানাদারদের সমর্থনে বিবৃতি প্রচার। এই ধরনের একটা বিবৃতিতে দু'জনেরই নাম যুক্ত করে তা প্রচার করা হয়। তাঁরা তখন জেলে। তাঁরা বিবৃতিতে সই দেননি এবং জেলে থাকায় তার প্রতিবাদ করারও সুযোগ পাননি। তাঁরা যদি জেলের বাইরে থাকতেন এবং প্রতিবাদ জানাতেন, তাহলে তাঁদের নামও আজ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকায় যুক্ত হতো।

কবীর ভাই নিষ্ক্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। ছিলেন সক্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে এমন কোন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক, এমনকি গণরাজনীতির পৰের আন্দোলন নেই যাতে তিনি যুক্ত ছিলেন না। বাংলা ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতির লোকায়ত ঐতিহ্য রৰার আন্দোলনে তো যুক্ত ছিলেনই, একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার এবং আর আন্দোলনে ছিলেন সামনের কাতারে।

একাধারে প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাহিত্য সমালোচক, সাহিত্য ও রাজনীতির প্রগতিশীল বিশেস্নষক, শিৰাবিদ ও বুদ্ধিজীবী এই মানুষটি ছিলেন চেহারা চরিত্রে নিখুঁত এক জীবনত্ম সংস্কৃতি। সৈয়দ মুজতবা আলী বলতেন, 'বাঙালী ও বাংলা সংস্কৃতির কথা মনে হলেই আমি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ছবির দিকে তাকাই।' এই কথাটি অনুসরণ করে আমিও আজ বলতে পারি, বাংলাদেশে বাঙালী ও বাংলা সংস্কৃতির কথা ভাবতে গেলে তার প্রতিরূপ হিসেবে যে ক'জন মুষ্টিমেয় মানুষের ছবি চোখে ভাসবে, কবীর ভাই তাঁদের একজন।

আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে তিনি অত্যনত্ম স্নেহ করতেন। শেখ হাসিনা কখনও ভুল করছেন বুঝতে পারলে বা তাঁর কাছে দেশের মানুষের কোন দাবি দাওয়া জানাতে হলে তিনি একা বা আরও স্বমতের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে হাসিনার কাছে ছুটে যেতে দ্বিধা করতেন না। সবসময় শেখ হাসিনা তাঁর সব কথা শুনতেন তা নয়। আমরা তাতে ব্যথিত হতাম এবং বিরক্ত হতাম। কিন্তু তিনি হতেন না, আমি একবার তাঁকে বলেছিলাম, শেখ হাসিনা যখন আপনার কথা শোনেন না, তখন তাঁর কাছে কেন যান? তাতে আপনার মান থাকে কি? তিনি হেসে বলেছেন, "ছেলে বার বার মায়ের কাছে ছুটে যায়, মা সব সময় তার সব কথা শোনেন না। তাই বলে অভিমান করা কি ছেলের সাজে?"

তিনি অভিমান করেননি। কিন্তু স্বমতে দৃঢ় রয়েছেন। ব্যক্তিগত অভিমানকে কখনও জাতীয় স্বার্থের উর্ধে স্থান দেননি। তাই তিনি শত্রম্নমিত্র সকলের কাছেই ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয়। 'জনকণ্ঠের' উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খানের কাছে শুনেছি, কিছুকাল আগে ঢাকায় একটি টিভি চ্যানেল (সম্ভবত চ্যানেল আই) তাঁর একটি সাৰাতকার প্রচার করেছে। তাতে তিনি রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কলি গেয়েছেন_ 'তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে' রবীন্দ্রনাথ যে অর্থেই গানটি লিখে থাকুন, জীবন সায়াহ্নে কবীর ভাই যে অন্য অর্থে গানটি গেয়েছেন_ তাতো বোঝাই যায়। এছাড়াও ঘরে বসে গুনগুন করে গাইতেন_ 'জীবন যখন শুকায়ে যায়।' তাঁর জীবন শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর পরিপূর্ণতা শুকায়নি। সেই পরিপূর্ণতার সম্পদ তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন।

আমৃতু্য তিনি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের সভাপতি ছিলেন। বন্ধুবর মোনায়েম সরকার এই ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক। তাঁর কাছেও কবীর ভাইয়ের শেষ বয়সের নিত্য কর্মকাণ্ডের খবর পেতাম। তিনি একদিন চলে যাবেন জানতাম। কিন্তু এমন সময় গেলেন, যখন 'চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।' এই দানব প্রতিহত করার সংগ্রামে তাঁকে দেশ ও জাতির এই সময় বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে