Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৭-২০১৯

মিনা কামালের ত্রাসের রাজত্ব রূপসায়

হায়দার আলী


মিনা কামালের ত্রাসের রাজত্ব রূপসায়

খুলনা, ১৮ নভেম্বর- খুলনার রূপসা উপজেলার ভয়ংকর এক খুনি-সন্ত্রাসী মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল (৫২)। তাঁর ভয়ংকর কর্মকাণ্ড খুলনার এরশাদ শিকদারকেও হার মানিয়েছে। জেলা পুলিশের শীর্ষ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকায় রয়েছে তাঁর নাম। আবার দলীয় পদ-পদবি না থাকলেও নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করেন মিনা কামাল। ২৫টির বেশি (৯টি খুন) মামলা, শতাধিক জিডি থাকা মিনা কামালের কাছে প্রশাসন অসহায়। নিজ বাড়িতে বিচারালয়ের নামে বসিয়েছেন টর্চার সেল। সেখানে বিচার-সালিসের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে চালানো হয় অবর্ণনীয় শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। বিচারের নামে হাতুড়িপেটা করে হাত-পা ও পাঁজরের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়।

থেঁতলে দেওয়া হয় শরীরের স্পর্শকাতর স্থান। এসব অপকর্মে লিপ্ত তাঁর সহযোগী ২০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। মিনা কামাল ও তাঁর বাহিনীর হাতে গত ১০ বছরে দুই শতাধিক মানুষ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খুন হয়েছেন ৯ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১০ জন। ভয়ে-আতঙ্কে সহায়-সম্বল রেখে পরিবার নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছে কয়েক শ পরিবার। মিনা কামালের সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জিম্মি রূপসার ৫০ হাজার মানুষ। দখল, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক বাণিজ্য করে গড়ে তুলেছেন বিপুল অবৈধ সম্পদ।

চোখের পলকে খুন করেন : মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে সর্বশেষ খুন হন রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবিনা আক্তার মিলির একমাত্র ছেলে সারজিল ইসলাম। গত ২৬ অক্টোবর ওই গ্রামের হিমালয় বরফকলের সামনে থেকে তুলে নিয়ে সারজিলকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। খুনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত চারজন গ্রেপ্তারের পর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, মিনা কামালের নির্দেশে তাঁরা সারজিলকে খুন করেন। সারজিলকে খুন করেই ক্ষান্ত হননি মিনা কামাল। বর্তমানে সারজিলের মা সাবিনা আক্তার মিলিকে মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। এসব হুমকির ঘটনায় মিলি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সারজিলের মা সাবিনা আক্তার মিলি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মিনা কামালের সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করায় আমার ছেলেকে খুন করে মিনা কামাল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রভাবশালী মহলের মদদ পেয়ে উল্টো আমাকেও খুন করে লাশ গুম করার হুমকি দিচ্ছে। ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। ভয়ংকর খুনি মিনা কামাল কত মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, খুন করেছে, তার হিসাব মেলানো কষ্টকর। আমি বেঁচে থাকতে ওর বিচার দেখে যেতে চাই।’

২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর রূপসার দিনমজুর জলিলকে খুন করার পর রূপসা মডার্ন সি ফুডসের সামনে ফেলে রাখা হয়। ওই ঘটনায় জলিলের স্ত্রী আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে মিনা কামালকে প্রধান আসামি করে খুলনা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলা করার পর এখন উল্টো আকলিমা খাতুনই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর রাতে রূপসায় দিনমজুর ইয়াছিন মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে মামলা করা হয় মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর গ্রামবাসী মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করলেও তাঁর টিকিটি ছুঁতে পারেনি পুলিশ প্রশাসন।

২০১১ সালে মিনা কামালের দেহরক্ষী বাগমারা গ্রামের শ্রমিক নেতা লিয়াকতের ছেলে সোহাগকে পরিকল্পিতভাবে আরেক দেহরক্ষী বাপ্পীকে দিয়ে খুন করানোর অভিযোগ রয়েছে মিনা কামালের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভয়ে-আতঙ্কে সোহাগের পরিবার মামলা করেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে খুলনা নগরীর টুটপাড়া এলাকার জাকির হোসেন ও নওমুসলিম আব্দুল্লাকে খুন করেন মিনা কামাল। এই জোড়া খুনের মামলায় মিনা কামালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। কিন্তু বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন।

১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শুভয়া গ্রামের মো. শহিদ মাস্টারের হাতের কবজি কেটে নেয় মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী।

একই বছর রূপসা উপজেলার মো. জহির, বটতলার কালাম মিয়া, নূর ইসলাম ও জাকিরকে জাবুসার শুকোরমারী খালের স্লুুইস গেটের চরে নিয়ে জবাই করে খুন করে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। আর রূপসা-বাগেরহাট আন্ত জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি আখতার হোসেন খানকে খুন করার চেষ্টা করা হয়। ওই ঘটনায় মিনা কামালের পালিত ছেলে দেহরক্ষী হারুন মোল্লাকে আসামি করা হয়।

ভয়ংকর শ্যুটার বাহিনী : মিনা কামালের সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে কাজ করছে বডিগার্ড শ্যুটার আদম, নতুন বাজারের চিহ্নিত সন্ত্রাসী সাইদ, বাবলা ওরফে দুঃখ, জালাল গাজী, লিয়াকত, সাগর, রবি শেখ, নয়ন, হুমায়ূন, রনিসহ ২০ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত খুনি-সন্ত্রাসী, সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যুদের প্রকাশ্যে আশ্রয় দিয়ে মিনা কামাল গ্রামবাসীকে আতঙ্কিত করে রাখেন।

টর্চার সেলে নির্যাতিত যাঁরা : ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে বাগমারা গ্রামের হাবিব শেখের ছেলে হাফিজ শেখকে পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়া হয়। একই গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে মো. জসিমের হাত ভেঙে দেওয়া হয় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে। ছোট ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে রক্ষা পাননি বড় ভাই রাজ্জাকও। মিনা কামালের টর্চার সেলে নির্মম নির্যাতন নেমে আসে তাঁর ওপরও। রূপসার নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পল্টু মিয়ার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। একই পরিষদের মহিলা মেম্বার মমতা হেনাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। গরু জবাইয়ে দেরি হওয়ায় ঈদুল ফিতরের আগের রাতে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী রূপসা বাজারের কসাই বাবু, আলী আশরাফ, বাদশা, দেলো, রাজ্জাক, কেরামত, লতিফ ওরফে কালা মিয়াকে নির্মমভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।

নিজের দোকানঘরের জমি দখলের প্রতিবাদ করায় চিংড়ি ব্যবসায়ী ইসরাইল হোসেন, চাঁদা না দেওয়ায় বাগমারা গ্রামের সিঅ্যান্ডবি কলোনির বাসিন্দা মো. হোসেন, একই গ্রামের মুজিবর রহমান মুজিকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন মিনা কামাল।

তাঁর নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনও। বাগমারা গ্রামের সিগমা জামে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমকে প্রকাশ্যে মারধর করে তাড়িয়ে দেন মিনা কামাল। এ ঘটনার পর তিন দিন ওই মসজিদে কেউ নামাজ পড়তে পারেনি।

একই সময় রূপসা পুলিশ ফাঁড়ির পেছনের বাসিন্দা হাফিজুর রহমানের ছেলে মাহতাবকে (২৫) মিনা কামালের সন্ত্রাসী বাহিনী পিটিয়ে বুকের হাড় ভেঙে দেয়।

চলতি বছরের গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে রূপসা উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেখা বেগমকে তাঁর বাড়িতে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী বিবস্ত্র করে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে আইসিইউতে রেখে রেখা বেগমকে চিকিৎসা দিতে হয়। গত বছর ২২ মার্চ রূপসা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদকে পিটিয়ে আহত করে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী।

কে এই মিনা কামাল : খুলনার রূপসা উপজেলার ৩ নম্বর নৈহাটি ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের পীর হুজুর খ্যাত মিনহাজ উদ্দিন ওরফে মিনা মৌলভির দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ছেলে মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল। ছোটবেলায়ই তিনি জুয়া ও গাঁজায় আসক্ত হয়ে অপরাধ জগতে পা রাখেন। একপর্যায়ে সর্বহারা পার্টির অন্যতম ভয়ংকর ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি পান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ফয়লাহাট বাজারের কাছে বাস ডাকাতির ঘটনায় পাঁচজন চিংড়ির পোনা ব্যবসায়ীকে খুন করে লুটে নেওয়া হয় আট লাখ টাকা। ওই ডাকাতি পরিকল্পনার মূল হোতা মিনা কামাল।

ওই ডাকাতির পর থেকে ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মিনা কামাল। গড়ে তোলেন ভয়ংকর সন্ত্রাসী বাহিনী। একটি হত্যা মামলায় প্রায় আট বছর কারাভোগ করে ২০০৯ সালে জামিনে বেরিয়ে এসে নৈহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে জোর করে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাঁর ভয়ংকর রূপ আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

ভয়ংকর মিনা কামাল সম্পর্কে জানতে চাইলে খুলনার পুলিশ সুপার এস এম শফি উল্লাহ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘মিনা কামালের বিরুদ্ধে ২৫টির বেশি মামলা আছে। সারজিল হত্যাসহ একাধিক খুনের আসামি তিনি। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযানও চালিয়েছে। তাঁর টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হয়েও ভয়ে কেউ মামলা করার সাহস পায় না। মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর চাঁদাবাজির কারণে মৎস্য খামারিরা ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। অনেক ঘের মালিকের কাছ থেকে মাছ কিনে টাকা দেন না মিনা কামাল। খুলনা জেলার ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী এই মিনা কামাল।

গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় ফোনে যোগাযোগ করা হয় মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামালের সঙ্গে। বিভিন্ন মামলায় কয়েক বছর জেল খাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর না ভাই, এক যুগ মানে ১২ বছরের বেশি জেল খাটছি। ভুয়া মার্ডার কেস, রেপ কেস, নির্যাতন, মারামারির কেস, ডাকাতিসহ অনেক মামলাই ছিল। এসব ছোটবেলার ঘটনা, সেই সময় তো একটু দুষ্টু ছিলাম, কিছু মামলা এমননিতেই খেয়েছিলাম। তবে বেশির ভাগই মিথ্যা মামলা।’

সারজিল হত্যা, ইয়াসিন হত্যাসহ ১৫টির বেশি হত্যা মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ র্ডের মালিক আমি, কোনো কিছু ঘটলেই আমার নামে মামলা হয়, এখন আমি কী করব? সবই মিথ্যা অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়।’ নদীর জমি দখল করে  র্ড বানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নদীর জমি তো বেশির ভাগই দখলে থাকে। শুধু আমি নই, সবার দখলেই আছে। আমার বাবার ৫০০ বিঘা জমি আছে।’

সারজিল হত্যা মামলায় আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রসঙ্গে মিনা কামাল বলেন, ‘সারজিলের মা-বাবাকে দিয়েই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করাচ্ছে একটি মহল। এখন আসামিরা যদি স্বীকারোক্তি দিয়ে থাকে, তাহলে আদালতেই সেটা ফেস করব।’

আওয়ামী লীগের নেত্রী রেখা বেগমকে পেটানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে মিনা কামাল বলেন, ‘হ্যাঁ আমি মারছি, উপরের নির্দেশ পেয়েই আমি মারছি।’

কোন দলের রাজনীতি করেন জানতে চাইলে মিনা কামাল বলেন, ‘আমার ভাইয়েরা বিএনপির রাজনীতি করেন, আমি কোনো পার্টি করি না। আওয়ামী লীগ কইরে লাভ কী? পার্টি কইরেও এত মামলা খাইলাম।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আর/০৮:১৪/১৮ নভেম্বর

খুলনা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে