Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৫-২০১৯

রাজনীতি থেকে দূরে, কেন দূরে?

সালমান তারেক শাকিল


রাজনীতি থেকে দূরে, কেন দূরে?

ঢাকা, ১৫ নভেম্বর - দেশে নির্বাচনের ডামাডোল বেজে উঠলে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো প্রবীণ রাজনীতিকরাও সচল হয়ে ওঠেন। রাত-দিন একাকার করে ব্যস্ত  হয়ে পড়েন দলের রাজনৈতিক স্বার্থ-কৌশল নিয়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নবীন-প্রবীণের দল মিলিয়ে প্রায় ডজনখানেক জোট নির্বাচনের আগে সক্রিয় ছিল। তবে, গত কয়েকমাসে এসব জোটের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বাম গণতান্ত্রিক জোট ছাড়া বাকিরা উধাও। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে নেতাদের অনীহা, দল ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।

সার্বক্ষণিক রাজনীতিকদের ভাষ্য, দেশে রাজনীতি নেই, একটি অস্বাভাবিক ‘ভীতিজনক’ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই কারণে কেউ-কেউ নিষ্ক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিএনপির দুই-একজন চিঠি দিয়ে পদত্যাগের কথা জানালেও কেউ কেউ নীরবতার পক্ষেই।  এই রেশ এখন পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী জাতীয় পার্টিতেও। দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা দলে ও রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনীতিতে রহস্যজনক পরিবেশ বিরাজ করার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোয় ‘একনায়কতন্ত্র’ থাকায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে দলের সর্বস্তরে। দল বা সংগঠনের প্রতিটি শাখার প্রধানরা হয়ে উঠেছেন একনায়ক। যে কারণে দলীয় প্রধানের বাইরে সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হতাশা।  আর রাজনীতির প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন নেতারা। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিরাজমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে। আর এর পরিণতিও অনিশ্চিত।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, কল্যাণ পার্টি, এলডিপির মধ্যে অস্থিরতা ও ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। দলের প্রধান নেতার ওপর দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে দলত্যাগ ও দলভাগের।

বিএনপির নেতা মাহবুবুর রহমান, এম মোরশেদ খান পদত্যাগ করেছেন। দলের আরও কয়েকজন নেতা রয়েছেন, যারা দলের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। আপাতত দল পরিত্যাগ না করলেও দলের কোনও কাজে যুক্ত না থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকজন নেতা। পদত্যাগী নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপিতে রাজনীতি করার পরিবেশ নেই। মাহবুবুর রহমানের দাবি, রাজনীতির প্রতি  বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশে রাজনীতি নেই। এখানে কোনও আদর্শও নেই। এখানে রাজনীতির নামে একটা এক্সপ্লয়টেশন চলছে।  

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, তারা দেশের বর্তমান রাষ্ট্রের পরিচালনা-নীতি ও কৌশল নিয়ে পরিষ্কার নন। তারা মনে করছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই রহস্যজনকভাবে নিয়ন্ত্রিত। এর পেছনের রাজনীতি সম্পর্কে তারা জানেন না।

গত মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) রাতে জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘনিষ্ঠ একজন নেতা খোলামেলা অভিমত তুলে ধরেন। বর্তমানে নিজ দলে নিষ্ক্রিয় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি দেখে আপনার কী মনে হয়? রাজনীতির কোনও পরিবেশ আছে? নেই। আমি দলের মিটিং বা বৈঠকে যাই না, খুব একটা আগ্রহী না। নিজেই রাজনীতি করবো কিনা, ভাবছি। বাংলাদেশের যে রাজনীতি, তাতে থাকার কিছু নেই। সার্বিকভাবেই আমি চিন্তা-করছি।’

কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে আ স ম আবদুর রব নেতৃত্বাধীন জেএসডি। দলটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাউন্সিলবিরোধী অংশটির। তার মন্তব্য, ‘গণতন্ত্রকে জনগণের গণতন্ত্রে পরিণত করার জন্য সব শ্রেণিপেশার লোকদের গণতন্ত্রে পরিণত করার জন্য যে চেষ্টা করছি, তা আরও জোরদার হবে। কারণ, শুধু একদলের হাত থেকে আরেক দলের হাতে ক্ষমতা গেলেই গণতন্ত্র আসে না। বহুবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু গণতন্ত্র আসেনি।’

সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, ‘রাজনীতিতে একটি হতাশা বিরাজ করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পারায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটার পর একটা জাদু দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু জাদুর সমস্যা হলো, জাদু যতক্ষণ আছে, মানুষ ততক্ষণ মোহমুগ্ধ, শেষ হলে কিন্তু মোহ কেটে যায়। শুদ্ধি অভিযান একটি জাদু, এটি শেষ হলে আসল চরিত্র বেরুবে।’

বিরোধী দলগুলোয় অস্থিরতার বিষয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণভাবে বিরোধী দলগুলোয় সমস্যা থাকার কারণ হচ্ছে, কারও কোনও অ্যাচিভমেন্ট নেই। দলের পদে অনন্তকাল ধরে থাকছে। যেমন, বিএনপির কথা ধরা যাক। দলটির সিনিয়র নেতারা কী করেন স্থায়ী কমিটির বৈঠকে? তাদের তো সবার আগে পদত্যাগ করা উচিত।’

অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার অবশ্যই ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে রাজনীতি বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক দলগুলোয় স্বার্থজনিত সমস্যা বেড়েছে, সে কারণে দলগুলোয় ভাঙনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতিতে নিয়মিত রাজনীতিকদের অবস্থান কোথায়। সবই বাণিজ্যিক, সবই ব্যবসানির্ভর। সে কারণে স্বার্থদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর এই সম্পাদক মনে করেন, ‘রাজনীতিতে ফায়দাভিত্তিকচর্চা চলছে। সব দলের নেতাকর্মীদের ধারণা ক্ষমতায় থাকলেই লাভবান হওয়া যায়।’

অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এই যে জি কে শামীম, সম্রাটরা তৈরি হলেন কীভাবে? তারা তো রাজনীতি করেননি। কিন্তু ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ লুটপাট করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে সুযোগবঞ্চিত হওয়ার কারণে।’

বদিউল আলম মজুমদারের আশঙ্কা, ‘এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী হওয়া দুরূহ, একটা অনিশ্চিত গন্তব্য আমাদের সামনে।’

বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যখন অস্থিরতা, ওই সময়ে নানা ইস্যুতে কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় বাম গণতান্ত্রিক জোট। এ প্রসঙ্গে জোটের অন্যতম শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে। রাজনৈতিক পরিবেশ তো নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ব্ক্ষণিক নজরদারি, ঘেরাও-অবস্থা ও উসকানির ভেতর দিয়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতার মধ্যে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগছে, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে পুরোপুরি সংগঠিত করতে সক্ষম হয়নি।’

জোনায়েদ সাকি দাবি করেন, ‘রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে সরকার পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে। একমাত্র ভয় দেখিয়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।’  তার প্রত্যাশা, এই ভয় দ্রুত কেটে যাবে।

জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা রাজপথে নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছি। অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকেও আমরা বলি আসতে। কিন্তু বিএনপি তো আসতে পারছে না। তাদের রাজনৈতিক নানা দুর্বলতা আছে। নিঃসন্দেহে গুম-খুনের পরিবেশ বিরাজমান। কিন্তু সেটা মোকাবিলা করতেই দলগুলোকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বেসিক্যালি প্রবলেম অব পলিটিশিয়ানস। রাজনীতিতে বুঝতে পারলে এসব সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। লাফ দিয়ে রাজনীতিতে সমাধান আসে না। স্বৈরশাসনও একধরনের রাজনীতি, এটাকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। রাজনীতি করছে না বলেই দলগুলোতে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এখন সবকিছু অস্বাভাবিক। গত ২৯ ডিসেম্বর রাত থেকে বাংলাদেশে চরম অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্থিরতা থাকবেই এবং এটা তখন ছড়িয়ে পড়ে। আমরা গা ভাসিয়ে না দিয়ে এই বিরাজমান অস্থিরতা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকার চেষ্টা করছি।’

বিএনপির এই নেতার  অভিযোগ, ‘সরকারে-বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-বিভাগেসহ সর্বত্র অস্থিরতা। ফলে, কিছু অস্থিরতার ছোঁয়া তো বিরোধী দলগুলোয়ও পড়েছে।’

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দায়-দায়িত্ব নিয়েছি।  আমাদের দায়-দায়িত্ব আছে।’ আগে যেভাবে বিএনপি নেতৃত্ব দিয়েছে, এখন যেভাবে দিচ্ছে, আগামী দিনেও সেভাবে দেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এন এইচ, ১৫ নভেম্বর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে