Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৩-২০১৯

মহামারী রূপ নিচ্ছে ডায়াবেটিস

মহামারী রূপ নিচ্ছে ডায়াবেটিস

ঢাকা, ১৪ নভেম্বর- সারাদেশে দিন দিন বাড়ছে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্রই সব বয়সের নারী-পুরুষ এখন এই নীরব ঘাতকের শিকার হচ্ছে। যে হারে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে ও শনাক্ত হচ্ছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এর শিকার। ইতোমধ্যেই চিকিৎসকরা একে মহামারি বলতে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) এক জরিপে এমন উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

গত বছরের নভেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম ও বাডাসের সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ শাখা যৌথভাবে দেশের কত শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসের শিকার তা খুঁজে বের করতে জরিপটি পরিচালনা করে। এ জন্য প্রায় চার মাস ধরে দেশের ৬৪ জেলার ৪০০ উপজেলায় এক লাখ মানুষের রক্তসহ শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে জরিপের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা দেখতে পান এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসের শিকার। আক্রান্তদের অর্ধেকেই জানতেন না তাদের ডায়াবেটিস আছে। এক দশকেরও কম সময় আগে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৮ ভাগেরও কম মানুষ।

জরিপে দেখা যায়, ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহ, বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে এর প্রকোপ দেখা যায়। তবে জরিপের তথ্য-উপাত্তগুলো এখনও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে থাকায় কোন বিভাগে কত শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত তা জানা যায়নি।

এর আগে ডায়াবেটিস সমিতি থেকে একটি জরিপ করে তারা দেখতে পান, ১৯৯৯ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০০৪ সালে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০০৯ সালে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর আর কোনো জরিপ হয়নি। এবারের জরিপে দেখা যায়, গত ৯ বছরের ব্যবধানে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।

আজ ১৪ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'আসুন, প্রতিটি পরিবারকে ডায়াবেটিস মুক্ত রাখি'।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন (আইডিএফ) বলছে, বাংলাদেশে ৭৩ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে বাডাস থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে স্বল্প পরিসরে জরিপ করে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে ১০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবে বর্তমানে বাডাস ও এর অধিভুক্ত সমিতিতে আক্রান্ত নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতি বছর আরও প্রায় ১৫ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী সমিতিতে নিবন্ধিত হচ্ছেন। এ চিত্র বিশ্নেষণ করে বলা যায়, দেশের প্রত্যেকটি পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবা দিতে ডায়াবেটিক সমিতি 'গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা প্রকল্প' নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালে সারাদেশে সাত হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীর ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত খুলনা বিভাগে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সিলেট বিভাগে ২১ দশমিক ১ শতাংশ।

ডায়াবেটিস মহামারী রূপ নিচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে পরিবর্তিত জীবনযাপনের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। আইডিএফের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৪২ কোটি। ১৯৮৫ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র তিন কোটি। গত আড়াই দশকে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ গুণ বেড়েছে।

সংস্থাটি দুই বছর পরপর আক্রান্ত মানুষের তথ্য প্রকাশ করে। সে অনুযায়ী আজ আক্রান্তদের সংখ্যার তথ্য প্রকাশ করবে। তাদের ধারণা- এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ কোটিতে উন্নীত হবে। এদিকে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান দশম স্থানে। বৃদ্ধির এ হার অব্যাহত থাকলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে পৌঁছবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসের কারণে প্রতি বছর পাঁচ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডায়াবেটিসের কারণে অর্থনৈতিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডায়াবেটিসের ওষুধ, ইনসুলিনসহ সব কিছুরই দাম দিন দিন বাড়ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, শুধু ডায়াবেটিসের হার কমাতে পারলে স্বাস্থ্য খাতেই ১১ শতাংশ ব্যয় কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনে ডায়াবেটিসের ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত এক বছরে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ ডায়াবেটিস আক্রান্ত কিংবা প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থায় রয়েছে। ডায়াবেটিসজনিত কারণে মৃত্যুর হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ বলে ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়।

ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। মানবদেহে ইনসুলিন নামের হরমোনের ঘাটতি হলে কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে শরীরে ব্যবহৃত না হলে অথবা শরীরের ইনসুলিন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ গ্লুকোজ পরে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এ অবস্থার নামই ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস দুই প্রকার। টাইপ-১ বা ইনসুলিন-নির্ভর ডায়াবেটিস এবং টাইপ-২ বা ইনসুলিন অনির্ভর ডায়াবেটিস। জন্মগত কিংবা পরিবেশগত কিছু কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রকোপ দেখা দেয়। ইনসুলিন নিয়েই এসব রোগীকে বেঁচে থাকতে হয়। অতিরিক্ত ওজন, মেদবাহুল্য, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ শর্করা ও কম আঁশযুক্ত খাদ্যাভ্যাস থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে। এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, জন্মের সময় ওজন কম থাকা ও প্রবীণদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস রোগী হৃদযন্ত্র ও রক্তনালি, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র, অন্ধত্বসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।

ডায়াবেটিস সারাজীবনের রোগ। একবার হলে সারাজীবন বহন করতে হয়। ডায়াবেটিস কোনোভাবেই ওষুধ দিয়ে কমানো সম্ভব নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে। দৈনিক কমপক্ষে আধা ঘণ্টা হাঁটতে হবে। খাদ্য তালিকা থেকে মিষ্টিজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। শর্করা ও মাংস জাতীয় খাবার পরিমিতভাবে খেতে হবে। শাকসবজিসহ আঁশযুক্ত খাবার খাদ্য তালিকায় বেশি পরিমাণে রাখতে হবে। সঠিক ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস শতকরা সত্তর ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সুষম খাবার গ্রহণ, অতিমাত্রায় কোমল পানীয় ও ফাস্টফুড পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চললে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

আর/০৮:১৪/১৪ নভেম্বর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে