Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৮-২০১৯

খালিদী এবং তার আন্তর্জাল সাংবাদিকতা

মাসকাওয়াথ আহসান


খালিদী এবং তার আন্তর্জাল সাংবাদিকতা

বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত একটি সংবাদ আমাকে বিস্মিত ও আহত করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ওই অনলাইন সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে আয়ের চেয়ে অসঙ্গতিপূর্ণ জীবন যাপনের একটি আকাশ-কুসুম অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে।

বিবিসির একসময়ের ডাকসাইটে সাংবাদিক খালিদী বাংলাদেশে ফিরেছিলেন দেশেই একটি আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে। বিবিসিতে ভারত-পাকিস্তান সংকটকে 'নতুন দিল্লী-ইসলামাবাদে'র দেড়-ঘণ্টা দূরত্বের অনতিক্রম্য ট্র্যাজেডি বলে বর্ণনা করেছিলেন তিনি; কিলোমিটারের দূরত্বের হিসাবে না গিয়ে আকাশ পথে বিমানে দিল্লি থেকে ইসলামাবাদের দূরত্বের ঘণ্টার হিসাবের এই রূপক ব্যবহার অভিনব ছিলো বাংলা সাংবাদিকতার জগতে। এমন আরও নতুনত্ব আর ঋজু সাংবাদিকতা নৈতিকতার ঠাস বুননে বাংলাদেশে ইংরেজি পত্রিকায় রিপোর্টিং; তারপর বিবিসির ব্রডকাস্ট জার্নালিজমে খালিদী তার সম্ভাবনার সূচনা করেছিলেন অনেক আগে।

বিবিসিতে কাজ করার সময় লন্ডনের জীবন নিশ্চিত হলেও; খালিদী খুঁজছিলেন চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে আমি কাজ করছিলাম জার্মানির ডয়চেভেলেতে। থাকতাম বন শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অগ্রজপ্রতিম খালিদীর সঙ্গে টেলিফোনে একটা যোগাযোগ ছিলো।

উনি প্রায়ই বলতেন, আমি দেশে গিয়ে কিছু করবো; তুমিও চলে এসো। বুঝতে পারতাম; খালিদী উদ্যোক্তা ঘরানার মানুষ। যে সময়ে সবাই হুড়মুড় করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে রাজ-কর্মকর্তা হবার জন্য শশব্যস্ত; খালিদী তখন একটা ইংরেজি পত্রিকায় ঢুকে পড়লেন। রিপোর্টিং-এর নেশা তাকে পেয়ে বসলো। ফলে বিবিসির জীবনে থিতু হয়ে বসে থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না।

২০০৭ সালের আগস্টে জার্মানি থেকে দেশে ফিরে বিকেলেই চলে গেলাম খালিদী ভাইয়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ধানমন্ডি অফিসে। ঢাকার কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক পরামর্শ রেখেছেন, কটাদিন বিশ্রাম নাও; তোমার জন্য স্যুটেবল পজিশন দেখছি। কিন্তু খালিদী ভাই যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রজপ্রতিম; প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক আয়োজনে উপস্থিত থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন; লেখালেখিকে প্রণোদিত করেছেন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মাতাল সময়ে অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছেন; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিকাশের কাজে অংশগ্রহণ আমার কাছে কর্তব্য মনে হয়েছিলো।

এই অনলাইন সংবাদপত্রের নিউজরুম ছিলো আকর্ষণীয়-প্রাণবন্ত। যে টিম কাজ করছিলো তাদের একটি নিজস্ব ধারা ছিলো। আর আমার কাজের ধারা ছিলো ডয়চেভেলের অনলাইন প্রশিক্ষণ অনুযায়ী; ডয়চেভেলে বাংলার অনলাইন পোর্টালটি শুরুর পর; বিভাগীয় প্রধান ও অন্য সহকর্মীরা মিলে সেটি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে খালিদী ভাই যে এডিটোরিয়াল টিম তৈরি করেছিলেন; তারা অনেক জানতো; আমার জ্ঞান সেখানে তুচ্ছ বলে মনে হতো। তবু খালিদী ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজপ্রতিম হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিভিন্ন শাখায় অনেকটা কনসালটেন্টের মতো কাজ করতে থাকলাম।

আমার কাছে সবসময়ই জীবনটা খানিকটা আনন্দময় ফিকশানের মতো। কিন্তু হোঁচট খেলাম, যখন দেখলাম নিউজরুমের সবার বেতন নিয়মিত দেয়া যাচ্ছে না। খালিদী ভাই বললেন, দেশে সেনাসমর্থিত সরকার, ব্যবসা বাণিজ্য থমকে গেছে; এখন বিজ্ঞাপন পাওয়া কঠিন।

নেমে পড়লাম মার্কেটিং টিমের কনসালটেন্ট হিসেবে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ অভিযানে। ২০০৭ সালের ঢাকা; উদ্যোক্তাদের বোঝানো কঠিন, এই যে টিভি, কাগজের সংবাদপত্র এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনাময় অনলাইন সংবাদপত্র। এটাই মিডিয়ার আগামী। এইখানে বিজ্ঞাপন দিলে মুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ তা দেখে।

খালিদী ভাই একদিন বললেন, ইনভেস্টর অত্যন্ত ভদ্রলোক; চাইলেই টাকা পাঠিয়ে দেবেন; কিন্তু একজন মানুষকে কোন মুনাফা দিতে পারছিনা; টাকা নিই কীভাবে। ইনভেস্টর আরেকজন তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি সম্ভব হলেই টাকা পাঠান। তখন বেতন হয়। তরুণেরা জীবন দিয়ে কাজ করে। অনেকে কাজ শেখার আনন্দে কাজ করে। নির্ভুল সাংবাদিকতার নেশায় কাজ করে। খালিদী ভাই মাঝে মাঝে নিউজ রুমে এসে প্রতিবেদনে উদ্ধৃতি বা কোটের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন। অনেক রিপোর্টার মজা করে আমাকে বলতেন, আপনার খালিদী ভাই কোট পরতে পছন্দ করেন বলে খালি কোট-কোট করেন। অনেক রিপোর্টে যিনি তথ্য দিচ্ছেন তিনি পরিচয় প্রকাশে ভয় পান। কী মুশকিল!

কিন্তু খালিদী ভাই, সূত্রে প্রকাশ বা বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে টাইপের অপেশাদার সাংবাদিকতার প্রবণতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। সংবাদ-কর্মীদের বেতন নিয়মিত না হলেও; সাংবাদিকতা নৈতিকতার ক্ষেত্রে কড়া-অনুশাসনের ব্যাপারে খালিদী ছিলেন অনড়। নিরাপোষ সম্পাদক বলে আমরা যা বুঝি; তিনি তাই।

সাংবাদিকতা আর সংবাদ ব্যবস্থাপনার কাজে ২৪/৭ ব্যস্ততায় আমার লেখালেখি প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জন্য বোর্ড-রুমে বসে কিছু লিখতাম। তাছাড়া এমনিতেই লন্ডন ফেরত খালিদী ভাইয়ের দীর্ঘদিন বিলেতে থাকার অভ্যাস জনিত শৃঙ্খলার যে চাহিদা তাতে নিউজরুমের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেইখানে বোঝার ওপরে শাকের আঁটির মতো আমার জার্মান অনলাইন বিদ্যার চাপে অনেকে বেশ তিক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। আমি নিজেকে সরিয়ে নিলাম; চলে গেলাম নতুন আরেকটি অনলাইন সংবাদপত্র দ্য-এডিটরডটনেট-এ। এরপর আবার দেশ ছাড়লাম; পেশাগত কাজের ফাঁকে লেখার অবসর বের করতে।

কিন্তু খালিদী ভাই আর তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য তীব্র মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা রয়ে গেলো। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি সঞ্চার হওয়ায় বিডিনিউজের বেতন নিয়মিত হয়ে গেলো। সাবেক সহকর্মীদের অনেকের কাছে এই সুখবর শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। খালিদী ভাইয়ের এই সৎ প্রচেষ্টার মূল্যায়ন হচ্ছে; এ ছিলো খুব আনন্দের খবর।

খালিদী ভাইয়ের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে; উনি নিরাপোষ; কাউকে প্রচলিত তেল দিয়ে চলতে পারেন না। সোজা-সাপটা কথা বলেন। সাদাকালো যুগের জেদি সাংবাদিকদের মতো আচরণ তার। আর রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে 'হু ইজ হু' সেসব দেখতে যাননা। কোন প্রতিবেদন দেশের ডাকসাইটে ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে গেলে; ডাকসাইটে সামরিক-বেসামরিক আমলা বা ব্যাংক উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে গেলেও খালিদী প্রতিবেদককে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন রিপোর্ট করতে। কারণ সাংবাদিকতার গোড়ার কথাই হলো, সিক দ্য ট্রুথ এন্ড রিপোর্ট ইট। সঙ্গে সেই কোট বা উদ্ধৃতি।

খালিদী ভাই, আর কিছু নয়; একটি নির্ভরযোগ্য বার্তা সংস্থা ও অনলাইন সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করার কালে, খালিদী ভাই বলতেন, সবার বেতন হয়ে গেলো আমাকে কিছু দিও। উনার ব্যাংক স্টেটমেন্টে এই ছবি দুদক পাবে; দেখবে মাসের পর মাস উনি বেতন পাননি। সেই বিবিসির সময়ের সঞ্চয় আর অত্যন্ত সৎ বাবা-মা'র স্নেহের ছায়ায় উনি টিকে থেকেছেন স্বপ্ন পূরণের লড়াইয়ে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্ষুব্ধ প্রভাবশালী মহল নিরাপোষ খালিদীকে তাদের ক্ষমতা দেখাতে যে দুদকের এই প্রহসনের আয়োজন করেছেন; এটা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু প্রভাবশালী মহলকে এটা মনে রাখতে হবে; এটা ২০১৯ সালের নতুন মিডিয়ার যুগ। এইখানে সাংবাদিক খালিদীর বিরুদ্ধে আকাশ-কুসুম অভিযোগ এনে; তাকে হয়রানি করে বিরাট একটা বিজয়ের ঝাণ্ডা ওড়াবেন; তেমনটা হওয়া কঠিন। বরং কেন খালিদীর ওপর প্রভাবশালী ক্ষিপ্ত হলো; কোন প্রতিবেদনগুলো হ্যাঁচকা টানে প্রভাবশালীদের মুখোশ উন্মোচন করেছে; সেটাই এখন গবেষণার বিষয় হবে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে খালিদী ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এরিমাঝে জায়গা করে নিয়েছে। সে জায়গাটা এতো দুর্বল নয় যে কোন প্রভাবশালী সে সাফল্যের ঔজ্জ্বল্য কেড়ে নিতে পারবে। বরং প্রভাবশালীদের গ্রাম্য-মাতবরি আর পেশী দেখানোর হীন প্রবণতা ধিকৃত হবে পাঠক সমাজে। জনমানুষ চিনে নেবে জাতির শত্রুদের; যারা মিডিয়ার স্বাধীনতাহরণ করতে চায়; সাংবাদিকের টুটি চেপে ধরতে চায়।

মাসকাওয়াথ আহসান : সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক।

এন এ/ ০৯ নভেম্বর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে