Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৬ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৩-২০১৩

যেমনটা দেখেছি প্রবাসে

জিনিয়া জাহিদ


আমার প্রবাস জীবন খুব বেশি দিনের নয়। এমএস করতে জীবনের প্রথম দেশের বাহিরে পা দিয়েছিলাম নরওয়ের উদ্দেশ্যে। নরওয়ের ২ বছরের ডিগ্রী শেষ করা মাত্রই অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। নরওয়ে থেকে তাই উড়াল দিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়ার পথে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন সেমিনার আর ভ্রমণের জন্য বেশ কিছু দেশ এবং সেই সাথে নানা দেশের নানা জাতের মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে তাদেরকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রবাসে থাকাকালীন সময় অনেক ভালো কিছু যেমন দেখেছি তেমনি অনেক কিছু দেখেই ধাক্কা খেয়েছিলাম। ধাক্কা খাবার ব্যাপারগুলো পাঠকদের সাথে শেয়ার করাই আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য। আগেই বলে নেই এগুলো সম্পূর্ণই আমার অভিজ্ঞতা, প্রবাসে অন্যরা যারা থাকেন তাদের দেখা-না দেখার সাথে ভিন্নতা থাকলেও থাকতে পারে। 

	যেমনটা দেখেছি প্রবাসে
নরওয়েতে পা দিয়ে জেনেছিলাম যে, পুলিশ অফিসারের কাছে পাসপোর্ট নিয়ে নিজেদের উপস্থিতি রিপোর্ট করতে হবে। সেই মোতাবেক আমরা বেশ কয়েকজন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট পুলিশ অফিসে গিয়েছিলাম। গিয়েই এত অবাক হয়েছিলাম যে কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কোথায় এসেছি। বেশ জোরেই রেডিওতে গান বাজছে। এক অফিসারকে দেখলাম থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর টি-শার্ট গায়ে নিজের পোষা কুকুরকে এনেছেন। সবাই ক্যাজুয়াল পোশাকে। দেখে কোন অফিস মনে হচ্ছিল না, সবাইকে এত আন্তরিক আর হাসিখুশি দেখেছিলাম যে, পুলিশ সম্পর্কে যে ধারণা জন্ম নিয়েছিল, তার ছিটেফোঁটা মিলও খুঁজে পাইনি।
 
নরওয়ে বরফের মধ্যেই সারা বছর ডুবে থাকে এ ভুল ধারণা অনেক আগেই ভেঙ্গে গিয়েছিল ওখানে পা দেয়া মাত্র। তখন আমাদের ওরিয়েন্টেশন উইক চলছিল। ডিপার্টমেন্টের সামনের খোলা মাঠে সবাই যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছি। আগস্ট মাসের দুপুরে বেশ চমত্কার আবহাওয়ায় ছিল। সূর্য মাথার উপর থাকলেও তাপের তীব্রতা মোটেও ছিল না। অথচ অবাক হয়ে সেই প্রথম দেখলাম সবার সামনেই আমার সদ্য পরিচিত পশ্চিমা সহপাঠীরা শুধু অন্তর্বাস ছাড়া সব কাপড় খুলেই দিব্যি গল্পে মেতে উঠেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা স্বল্পপোশাকে শুয়ে বসে যে যার মত আড্ডা মারছে।
 
প্রথম দিন জন্য অবাক লাগছিল হয়ত, কিন্তু পরবর্তিতে এ দৃশ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াতে এতই কমন যে স্বল্পবসনাদের দেখে কখনই কেন যেন আর বেমানান (অড) লাগত না। এমনকি মাঠে-সমুদ্র সৈকতে টপলেস মেয়েদের দেখেও একটুও অবাক লাগত না। সত্যি কথা বলতে কি এসব মেয়েদের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়েও আশেপাশে কাউকে তাকাতে দেখিনি। সবাই যে যার মত ব্যস্ত।
    
আমি একবার নরওয়েজিয়ান প্রফেসরের বাসায় ডিনারে গিয়েছিলাম। প্রফেসরের বাসায় গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন আগে থেকেই এসে গল্প গুজব করছেন। আমার প্রফেসর আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তার স্ত্রীর সঙ্গে। তার স্ত্রীর ডান পাশে যিনি বসে আছেন, জানলাম যে তিনি প্রফেসরের সাবেক স্ত্রী (এক্স-ওয়াইফ)। 
 
পরিচিত হলাম প্রফেসরের ২৪ বছরের বড় মেয়ে ও তার বয়ফ্রেন্ড এর সাথে। জানলাম যে, বড় মেয়েটি প্রেগন্যান্ট। পরিচিত হলাম ২২ বছরের ছোট মেয়ে ও তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে। জানলাম তারা লেসবিয়ান। এই দুই মেয়েই প্রফেসরের আগের স্ত্রীর। বর্তমান স্ত্রীর কোনো সন্তানাদি নেই। আরও জানলাম যে, মেয়েদের যে কোনো ওকেশন সেলিব্রেট করতে প্রফেসরের এক্স-ওয়াইফ সব সময়ই আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন।
 
বর্তমান স্ত্রীর সাথে তার এক্স-ওয়াইফের নাকি চমত্কার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক। তাদের মধ্যে চমত্কার সম্পর্ক দেখে সত্যি অবাক হয়েছিলাম। তবে পরবর্তিতে জেনেছিলাম সন্তান থাকলে এক্স পার্টনারের সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্ক নাকি এরকমই হয়ে থাকে।
 

পশ্চিমাদের পাবলিক প্লেসে জড়াজড়ি করে কিংবা বাসে-ট্রামে-ট্রেনে কোলের ওপর বসে চুম্বন করার দৃশ্য কেন জানি তেমন অস্বাভাবিক ঠেকেনি। হয়তো হলিউডের মুভি কিংবা প্রবাস নিয়ে লেখা গল্প উপন্যাস পড়ে ধারনা করেই নিয়েছিলাম এটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার এদের জন্য। তবে অবাক হয়েছিলাম যখন নিজের চোখে দেখেছি যে, এরা এইসব কাজ করে মানুষকে শো-অফ করার জন্য। খুব কাছ থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম এক কাপলকে। বাসায় যখন থাকে নিজেদের হাতটাও এরা ধরে না। অথচ কি এক বিচিত্র কারণে এরাই যখন বাহিরে বের হয়, লোকজন দেখা মাত্রই যেন নিজেদের রোমান্স উথলে ওঠে। নিজেদের মধ্যে গভীর ভালবাসা আছে, এটা বাহিরের লোকদের দেখিয়ে দিয়ে কি প্রমাণ করতে চায় এরা সেটা হয়ত তারাই ভালো বলতে পারবে।
 
আমার ধারণা ছিল যে, পশ্চিমা মেয়েদের গায়ের রং এত সাদা যে এরা বোধহয় মেকাপ ব্যবহার করে না। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম যে, এদের প্রায় সকলের সাদা চামড়ার ওপর ভারী মেকআপ। চোখের পাতার উপর সব মেয়েরাই মাশকারা ব্যবহার করে। সেই সাথে অবাক হয়েছিলাম যখন দেখেছি এরা ক্লাসে কিংবা পথেঘাটে বাসায় পরা স্লিপার পরেই বেরিয়ে পরে, যেটা আমাদের দেশে কলেজ, ভার্সিটিতে আমরা কল্পনাই করতে পারি না।   
 
নরওয়েতে ট্রেন স্টেশনে ও রাস্তায় প্রথমবারের মত ভিক্ষুক দেখে খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জীর্ণ-শীর্ণ পোশাকে কোকের কাপ হাতে নিয়ে এদের ভিক্ষা করতে দেখেছিলাম। ভাবছিলাম পৃথিবীর এত ধনী দেশেও ভিক্ষুক আছে! পরবর্তিতে জেনেছিলাম এরা সবাই মাদকাসক্ত।
 
তবে অবাক হয়েছিলাম যখন দেখেছি অসলোতে ব্যস্ত রাস্তায় হিরোইনের পুরিয়া কেনা-বেচা করতে। শপিং মলের কাঁচের ভিতর থেকে মাত্র হাত খানেক ব্যবধানে দেখেছি কিভাবে একজন মাদকাসক্ত পুরিয়া কিনে সেই পুরিয়া সিরিঞ্জ দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। অবাক হয়ে দেখেছি অল্প কিছু দুরেই পুলিশের সাদা গাড়িতে সানগ্লাস পরে একজন অফিসার টহল দিচ্ছেন! অবশ্য ভিক্ষুকের এই দৃশ্য ইউরোপের যে দেশেই গিয়েছি একই রকম দেখেছি। অস্ট্রেলিয়াতেও একই ব্যাপার।
 
গান গেয়ে, ম্যাজিক দেখিয়ে কিংবা বাদ্য বাজিয়ে ভিক্ষা করা এখানে খুবই সাধারণ একটি ব্যাপার। আমাদের দেশের রাস্তার ধারে সাপের খেলা বা মাজন বিক্রির মতই এখানেও বেশ কিছু লোক ভিড় করে এদের গান শুনে। গায়ক সামনেই গিটারের খোলসটা খুলে রাখে। কেউ কেউ কিছু সেন্টস সেই খোলসের মধ্যে ছুড়ে দিয়ে নিজেদের পথে পা বাড়ায়।
 
বাংলাদেশের সংসদ ভবনের রাস্তার পাশে যেমন ভদ্রলোকেরা একটু সন্ধ্যা হলেই হেঁটে যেতে বিব্রত বোধ করেন, ঠিক তেমনি এখানেও বেশ কিছু রাস্তার পাশ দিয়ে একটু অন্ধকার হলেই অনেক মানুষকেই হেঁটে যেতে বিব্রত বোধ করতে দেখেছি। কারণটা একই। ভ্রাম্যমাণ পতিতাদের উপদ্রব। অত্যন্ত উগ্র সাজে এদের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে যে কেউ বুঝবে এরা কারা। জীবিকার তাগিদে রাস্তায় এভাবে এদের খদ্দের ধরা দেখে সত্যি অবাক হয়েছিলাম। ভাবছিলাম অসহায় মেয়েরা সবখানেই অসহায়। সে আমাদের গরিব দেশেই হোক আর বিশ্বের সব থেকে ধনী দেশেই হোক।
 

শেষ করছি আরেকটি ঘটনা দিয়ে। অস্ট্রেলিয়াতে দেখেছি প্রতিটি বাড়ির জন্য সিটি কাউন্সিল থেকে আলাদা গার্বেজ বিন ও রিসাইক্লিং বিন দেয়া হয়ে থাকে। সপ্তাহের আবর্জনা ওখানে জমিয়ে রেখে নির্দিষ্ট দিন বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে রেখে দিতে হয়। আবর্জনা পরিষ্কারের গাড়ি এসে সেগুলো খালি করে দিয়ে যায়। কৌতুহলী হয়ে লক্ষ্য করেছি, শনি-রোববারে কিছু কিছু নারী-পুরুষকে বেশ বড় কালো পলিথিন ব্যাগ নিয়ে হাটতে। এই পলিথিন নিয়ে ঘোরা লোকগুলো সবার ‘রিসাইক্লিং বিন’ থেকে  বোতল ও কাগজের কিছু কার্টুন নিজেদের পলিথিনে পুরছে। কারণ, প্রতিটি বোতল নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দিলেই ১০ সেন্ট পাওয়া যায়। জানিনা দারিদ্রের কারণেই নাকি নেশার টাকা যোগাড় করতে এরা নোংরা ভাগাড়ে ঘাটাঘাটি করে, তবে এই দৃশ্য আমাকে আমার গরিব দেশের কিছু মানুষের কথা খুব মনে করিয়ে দেয়। যাদের জন্ম হয় রাস্তায়, যারা বেড়ে ওঠে রাস্তায়, যাদের আহার জোটে ভাগাড়ের নোংরা ঘেটে। বিশ্বের ধনী দেশের মানুষের ভাগাড়ের নোংরা ঘাটাঘাটি কিংবা ভিক্ষা করার দৃশ্য দেখে প্রথমে অবাক হলেও কেন জানি এখন আর কিছুই মনে হয় না।
 
 
জিনিয়া জাহিদ: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে