Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৮-২০১৯

শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে একটু ধৈর্য ধরুন

আবদুল গাফফার চৌধুরী


শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে একটু ধৈর্য ধরুন

সম্প্রতি একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকে আমার কলামে হাসিনা সরকারের বর্তমান দুর্নীতিবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানকে অভিনন্দন জানিয়েছি। তাতে লিখেছি, শেখ হাসিনা নিজের দল ও সহযোগী দলগুলোর রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধেও এতটা কঠোর হতে পারবেন, তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। তিনি এবার আমার সন্দেহ ভঞ্জন করেছেন।

আমার এই লেখাটি পাঠ করে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক আমাকে একটি চিঠি লিখেছেন। নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, 'মহারথীদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হলেই তাদের যথার্থ বিচার ও শাস্তি হবে, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। অতীতের স্বৈরাচারী ও সামরিক সরকারগুলোর আমলেও লোক দেখানো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হয়েছে। নিজেদের দু-একজন মানুষকেও গ্রেপ্তার  করা হয়েছে। কারও কারও জেলও হয়েছে। তারপর সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি থেকে এসব  দুর্নীতি ও অপরাধের কথা মুছে যেতেই তারা ছাড়া পেয়েছে। তাদের অনেকেই আবার ক্ষমতার উচ্চাসনে এসে বসেছে।'

অধ্যাপক মহোদয় উদাহরণ দেখিয়েছেন, 'আইয়ুবের মতো মহাপ্রতাপশালী সামরিক শাসকের আমলে কঠোর দুর্নীতি দমন অভিযান শুরু হয়েছিল। এটাও ছিল লোক দেখানো। তবে সামরিক শাসকের ভয়ে লোকজন প্রথমে ভয় পেয়েছিল। এ সময় করাচির বিরাট ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কাসেম ভাট্টিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার গোল্ড বার বা স্বর্ণদণ্ড উদ্ধার করা হয়। সেগুলো রাখা হয় পুলিশের সুরক্ষিত পাহারায়।

এক বছর না যেতেই শোনা গেল, গোল্ড বারগুলো স্বর্ণ নয়, ওগুলো লোহা। কী করে পুলিশের কঠোর তদারকিতেও স্বর্ণগুলো লোহা হয়ে গেল, তার রহস্য জানা যায়নি। কাসেম ভাট্টির কোনো শাস্তি হয়নি। তিনি বুক ফুলিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। আইয়ুব যেসব বড় বড় রাজনৈতিক নেতাকে দুর্নীতির দায়ে দণ্ড দিয়েছিলেন, যেমন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং খুলনার আবদুস সবুর খান- তাদের পরে ডেকে এনে তার মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের বটতলার উকিল মোনায়েম খানকে করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর।

আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ। এরশাদ তো ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে গুরুতর দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু তাকেই ক'দিন পরে ডেকে এনে তার মন্ত্রী, এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভা তো ভর্তি ছিল দুর্নীতিতে দণ্ডিত এবং হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের দ্বারা। পুলিশের খাতায় ওয়ানটেড স্মাগলারকে করা হয়েছিল অ্যাকটিং হোম মিনিস্টার।

অধ্যাপক লিখেছেন, ঢাকার ক্যাসিনো ক্লাবগুলোতে ক্র্যাকডাউন করা হয়েছে এবং যুবলীগের ৭২ বছর বয়স্ক চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে ওই পদ থেকে সরানো হয়েছে। শেখ পরিবারের তিনি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। তার বিচার হবে কি? নাকি প্রভাব ও আত্মীয়তার জোরে তিনি বিচার এড়িয়ে যাবেন? যদি বর্তমান শুদ্ধি অভিযানে এ ধরনের রাঘববোয়ালদেরও ধরা হয় এবং বিচার ও শাস্তি হয়, তাহলেই শুদ্ধি অভিযানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানানো যাবে, তার আগে নয়।

অধ্যাপক মহোদয়ের দীর্ঘ চিঠির সবটা আমি উদ্ৃব্দত করিনি। কিন্তু তার মূল বক্তব্য উদ্ৃব্দত করেছি। তার অধিকাংশ বক্তব্যের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। কিন্তু হাসিনা সরকারের বর্তমান শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে সহমত পোষণ করি না। প্রথম কথা, আইয়ুব, জিয়া, এরশাদ, এমনকি খালেদা জিয়ার সরকারও আমার মতে, গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না। তারা নিজেরাই ছিলেন দুর্নীতিবাজ।

আইয়ুবের পতনের কিছুদিন আগে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা একটি কার্টুন ছেপেছিল। তাতে দেখানো হয়েছিল- আইয়ুবপুত্র গওহর আইয়ুব জনতার ধাওয়া খেয়ে পালাচ্ছে। আর জনতা তাকে চোর চোর বলে ধাওয়া করছে। জিয়ার মৃত্যুর পর তার ছেঁড়া শার্ট আর ভাঙা সুটকেস থেকে কী পরিমাণ সম্পদ বেরিয়েছিল, পুত্র তারেক রহমান তার প্রমাণ রেখেছেন। এরশাদের দুর্নীতিকে তো মার্কোসের দুর্নীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে জেলও খেটেছেন। বিএনপির 'দেশনেত্রী' তো দুর্নীতির দায়ে এখনও জেল খাটছেন।

শেখ হাসিনা চার-চারবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি গণতান্ত্রিক একটি দলের নেতা এবং তার বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে কখনও দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠেনি। এই অভিযোগ উঠেছিল এরশাদ ও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে, তারা ক্ষমতায় থাকাকালেই। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তার শত্রুরাও এই অভিযোগ তোলেনি। তার দলীয় লোকদের বিরুদ্ধে উঠেছে। তার মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে উঠেছে; কিন্তু তার বিরুদ্ধে নয়।

শেখ হাসিনা তার দলে যে দুর্নীতিবাজ রয়েছে এ কথা কখনও অস্বীকার করেননি। তিনি নিজে তার দল, মন্ত্রী, এমপিদের এই ব্যাপারে কঠোরভাবে যেমন সতর্ক করেছেন, তেমনি তার দলের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদেরও বারবার তার নেত্রীর সতর্কবাণী সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জিয়া, এরশাদ বা খালেদার দল এটা করেনি।

ডেনমার্ক থেকে খালেদা জিয়ার এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুস্পষ্ট অভিযোগ করা সত্ত্বেও তাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরানো হয়নি বা তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তার মন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ অসত্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছিলেন। মন্ত্রী ও এমপি অপসারণের এ রকম উদাহরণ আরও আছে।

হাসিনার বর্তমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যে অতীতের মতো লোক দেখানো নয়, তা বিশ্বাস করার কারণ আছে। তিনি জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও '৭১-এর ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দেবেন। মানবতার শত্রুরা তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এতই শক্তিশালী ছিল যে, এদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া যাবে- এ কথা অনেকেই বিশ্বাস করেনি, আমিও করিনি। শেখ হাসিনা নিজের জীবন বাজি রেখে, তাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলার মতো হামলা উপেক্ষা করে আমাদের বিশ্বাস ভেঙেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং '৭১-এর মানবতার শত্রুদের বিচার করে চরম শাস্তি দিয়েছেন।

অবশ্য এই বিচার ও দণ্ডদানে একটু দেরি হয়েছে। সে জন্য শেখ হাসিনা দায়ী নন। স্বাধীনতার শত্রুরা দীর্ঘকাল ক্ষমতা দখল করে রেখে এই বিচারকে বিলম্বিত করার, এমনকি বানচাল করার চেষ্টা করেছে। হাসিনা ক্ষমতায় এসেই এই বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। তখনকার ঘুণে ধরা পুলিশ প্রশাসন, একশ্রেণির বিচারকের বিচার চালাতে বিব্রত হওয়া, ৪০ বছর ধরে বিচার না হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপাট করা, কোটি কোটি টাকা খরচ করে অপরাধীদের সহযোগী ও সমর্থকদের দেশ-বিদেশে বিচারবিরোধী প্রপাগান্ডা চালানোর ফলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যও বিলম্বিত হয়েছে। তাতে হাসিনা সরকারের করার কিছু ছিল না; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হয়েছেই।

অধ্যাপক সাহেব একটু অপেক্ষা করুন। দেখবেন বর্তমান শুদ্ধি অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ধৃত ব্যক্তিদের দলীয় অবস্থান যা-ই হোক, এমনকি তারা যুবলীগ চেয়ারম্যানের মতো শেখ পরিবারের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজন হলেও বিচার ও শাস্তি থেকে রেহাই পাবেন না। কিন্তু আমাদের বিচার বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসন এখন অনেক পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হলেও অতীতের অনেক অনিয়ম ও লালফিতার দৌরাত্ম্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি। সুতরাং বিচারে বিলম্ব হতে পারে। অভিযুক্ত ও ধৃতদের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত সারা হলে তারা বিচারে সোপর্দ হবেন এবং অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তি পাবেন- এ বিশ্বাস আমার আছে।

এ বিশ্বাসের কারণ, ফেনীর হতভাগ্য মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকারী হিসেবে আদালতের বিচারে ১৬ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। এটা অবশ্যই হাসিনা সরকারের আমলে নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষকদের কঠোরভাবে দমনের একটি উদাহরণ হবে। দেশের দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা, শেখ পরিবারের আত্মীয়-স্বজন বা আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনগুলোর রাঘববোয়াল নেতা হলেও হাসিনা সরকারের এবারের অভিযানে যে বিচার ও শাস্তি এড়াতে পারবেন না, এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। শুধু অধ্যাপক সাহেবের মতো ব্যক্তিরা একটু ধৈর্য ধরুন।

লন্ডন, ২৫ অক্টোবর শুক্রবার, ২০১৯

এন কে / ২৮ অক্টোবর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে