Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ , ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.2/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৬-২০১৯

গুলশানে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা

গুলশানে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা

ঢাকা, ২৬ অক্টোবর- ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেখিয়ে গুলশানে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন আলী আসকার কোরেশী নামের এক চিকিৎসক। তিনি সেখানে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। তবে ওই জমির প্রকৃত মালিকপক্ষ বলছে, এই চিকিৎসক তাদের কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাস বাড়িভাড়া দিলেও এর পর থেকে তিনি বাড়িটিকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে মালিক হয়েছেন বলে দাবি করে আসছেন। এ অবস্থায় প্রকৃত মালিক দাবিকারীরা ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত ভাড়াটিয়াপক্ষকে আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে প্রকৃত মালিককে জমি ও বাড়ি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আলী আসকার কোরেশী এখনো বাড়ি ছেড়ে যাননি।

যে বাড়িটির কথা বলা হচ্ছে সেটি রাজধানীর গুলশান-২-এর ৪৯ নম্বর রোডের ২ নম্বর বাড়ি। বাড়িটিতে ‘মুক্তি’ নামের মানসিক ও মাদকাসক্তি নিরাময়ের সেন্টার খোলা হয়েছে। মুক্তির মালিক ডা. আলী আসকার কোরেশীর দাবি, তাঁকে জমির মালিক তাঁর ভাবী শাহিন কোরেশী ও তাঁর দুই সন্তান পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে গেছেন। সেই দলিলের ভিত্তিতেই তিনি বাড়িটিতে আছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়িটি করা হয়েছে ২২.২ কাঠার প্লটে। আদালতের রায় অমান্য করে এই প্লট জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন ডা. কোরেশী। তিনি ৩০ বছর আগে ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন মুক্তি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। পরে ভুয়া দলিলে লন্ডনপ্রবাসী মালিক ডা. আলী হায়দার কোরেশীর পুরো প্লটটি ভোগদখল করতে থাকেন। তবে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে মূল মালিক জমির মালিকানা ফিরে পেলেও দখলকারীর হুমকির কারণে বাড়িটিতে যেতে পারছেন না।

আলী হায়দার কোরেশীর ভাই আলী আসলাম কোরেশী জানিয়েছেন, মুক্তি নিরাময় কেন্দ্র নামক প্রতিষ্ঠানের মালিক আলী আসকার কোরেশী ৩০ বছর আগে বাড়িটি ভাড়া নেন এর মালিক, তাঁর বড় ভাই ডা. আলী হায়দার কোরেশী ও তাঁর স্ত্রী শাহিন কোরেশীর কাছ থেকে। ভাড়া নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় আলী আসকার কোরেশী পুরো বাড়ি জোর করে দখলে নিয়ে নেন। এরপর নিজের বাড়ি ফিরে পেতে মালিক আলী হায়দার কোরেশী ১৯৯৯ সালে আদালতে মামলা করেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে গত ৭ অক্টোবর রায়ে দখলকারীকে ৭৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে ৩০ দিনের মধ্যে পুরো বাড়ি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।

কিন্তু রায় হলেও বাড়ি না ছেড়ে প্রকৃত মালিকদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন আলী আসকার কোরেশী। অভিযোগের সত্যতা জানতে চাইলে তিনি বাড়িটির মালিক নয়, এটা স্বীকার করলেও আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য করেন।

আলী আসকার কোরেশী বলেন, ‘পয়সা দিয়ে এই রায় কেনা হয়েছে।’ সম্পদটির পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজপত্র দেখাতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো কাগজ নিয়ে বসে নেই। যেখানে দেখানোর সেখানে দেখানো হবে।’

আলী হায়দার কোরেশীর ভাই আলী আসলাম কোরেশী অভিযোগ করেন, আলী আসকার কোরেশী তাঁর আইনজীবী স্ত্রী (বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক) ফাহিমা নাসরিন মুন্নীর সহায়তায় প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বাড়িটি গ্রাস করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘১৯৬৯ সালের দিকে আলী হায়দার গুলশানের এই জমিটা কেনেন ৎার স্ত্রী শাহিন কোরেশীর (কনভার্টেড মুসলিম। আগে নাম ছিল কমলা রানী রায়) নামে। তাঁর ভাই লোন নিয়ে বাড়ি করেন। আলী হায়দার ১৯৭০ সালে স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডন চলে যান। তারপর তাঁরা একটি ওষুধ কম্পানির কাছে বাড়িটি ভাড়া দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাহিন কোরেশীও লন্ডনে স্বামীর কাছে চলে যান। এরপর ১৯৯৩ সালে মুক্তি লরেন্স ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিওর কাছে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়। লন্ডনে থেকে আলী হায়দার আমাকে বাড়িটি দেখাশোনা করার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন।’

আলী আসলাম কোরেশী আরো বলেন, ‘১৯৭৯ সালে বাড়িটি যাতে কেউ বিক্রি করে দিতে না পারে সে জন্য আদালতে একটি মামলা করা হয়। আদালত ইনজাংশন জারি করেন। ৪০ বছর ধরে সেই মামলা চলে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন বাড়ির মালিক আলী হায়দার কোরেশী। ১৯৯৩ সালে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয় মুক্তি লরেন্সের কাছে। তারা ছয় মাস ভাড়া দেয়। একসময় ভাড়া বন্ধ করে দিয়ে ফলস কাগজ তৈরি করে মালিকানা দাবি করে। আমরা তখন বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদের মামলা করি। আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমাদের বাড়িতে যেতে দিচ্ছে না। ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। কোর্টের আদেশ আছে। ৩০ বছর ধরে যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে। দখল করে আছে। আলী আসকারের স্ত্রী এর সঙ্গে জড়িত। আমাদের সব সময় হুমকির মুখে রেখেছে। এখন সে ভদ্রভাবে চলে গেলেই হয়। কিন্তু সে যেতে চায় না।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হুমকির বিষয়ে অনেক জিডি করা হয়েছে। বহুবার হুমকি দিয়েছে। পুলিশ কোনো ভূমিকা রাখেনি।’

মামলায় যা রয়েছে : মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজ দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করে বসেন আলী আসকার কোরেশীর স্ত্রী অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী। তবে গত ৭ অক্টোবর ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া রায়ে এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। রায়ে বিচারক উৎপল ভট্টাচার্য্য উল্লেখ করেছেন, ‘নথিদৃষ্টে আরো দেখা যায় যে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নং ৮১৩/৯৮, যেখানে শাহিন কোরেশী মিসেস ফাহিমা নাসরিন অর্থাৎ ২ নং বিবাদীর স্ত্রীকে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তাহা ভেরিফিকেশনের জন্য বাদীপক্ষ পত্র প্রেরণ করিলে বাদী বরাবরে পত্রের মাধ্যমে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রথমে গত ৬/৮/২০১৩ তারিখের পত্রে, পরবর্তীতে ১৬/১/২০১৫ তারিখের দুটি পত্রের মাধ্যমে ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সঠিক ছিল না বলে উল্লেখ করে।’ রায়ে আরো বলা হয়, হাইকমিশনের এই চিঠি দুটির বিষয়ে ২ নম্বর বিবাদী মৌখিক আপত্তি দেন।

যেহেতু লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের পত্র দুটি স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত, সে কারণে ওই পত্র দুটি অবিশ্বাসের আইনগত কোনো সুযোগ নেই, যা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বিবাদীপক্ষ তাদের দাবির সমর্থনে কাগজপত্র দাখিল না করে ১৯৯৯ সাল থেকে বিভিন্নভাবে মোকদ্দমাটিকে দীর্ঘায়িত করে।

এসংক্রান্ত আরো কয়েকটি মামলার নথি ঘেঁটে জানা যায়, আলী হায়দার কোরেশীর সঙ্গে ১৯৭৫ সালে শাহিন কোরেশীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর জমির মালিকানা ফিরে পেতে ১৯৭৯ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বেনামি সম্পত্তির মামলা দায়ের করেন আলী হায়দার। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার অষ্টম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায়ে জমিতে ষোলো আনা মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয় আলী হায়দার কোরেশীর।

এরপর ওই বছরই ওই রায়ের বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করে পক্ষে রায় পান তাঁর সাবেক স্ত্রী শাহিন কোরেশী। এরপর ২০১৪ সালে জজকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আলী হায়দার। শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট বিচারপতি মো. মইনুল ইসলাম চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ শাহিন কোরেশীর পক্ষে জজকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে যুগ্ম জেলা জজ আদালতের রায় বহাল রাখেন। ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর লন্ডনে মারা যান শাহিন কোরেশী। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি সিভিল আপিল (২০৫/২০১৮) দায়ের করা হয়, যেখানে আবেদনকারী হিসেবে রয়েছে মৃত শাহিন কোরেশীর নাম। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ওই আপিল আবেদন খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।

সূত্র: কালের কন্ঠ

আর/০৮:১৪/২৬ অক্টোবর

অপরাধ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে