Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২১-২০১৯

আলফ্রেড নোবেল: ডিনামাইট থেকে নোবেল পুরস্কার

আলফ্রেড নোবেল: ডিনামাইট থেকে নোবেল পুরস্কার

নোবেল পুরস্কার যেন একটি সার্বজনীন স্বপ্নের নাম। আর এই নামটি, এই পুরস্কারটি আজ এত সম্মানিত, এত জনপ্রিয় যার জন্য, তিনি আলফ্রেড নোবেল। এই নোবেল পুরস্কার নিয়ে আমরা প্রতিবছরই কতকিছুই তো জানতে পারি। কিন্তু এই নোবেল পুরস্কারের জনক আলফ্রেড নোবেল সম্পর্কে তো আমাদের জানাশোনা একটু কমই। আজ ২১ অক্টোবর, তার জন্মদিনে অশেষ শ্রদ্ধা আর তাকে নিয়ে জানার চেষ্টা।

জন্ম ও শৈশব
আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল, ১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে এক গরীব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং উদ্যোক্তা যিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা খুব একটা করতে পারেননি। তার মা অ্যান্ড্রিয়েট আলসেল ছিলেন গৃহিণী।

নোবেলের বাবা ইমানুয়েল এর ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। পরপর কয়েকটি মন্দায় পড়ে তিনি ঋণখেলাপী হন। চতুর্থ সন্তান নোবেলের জন্মের পরই বাবার ব্যবসায় এই আকাল হওয়ায় ঠিকমতো আদরযত্নও পেতেন না। তার ভাগ্যের চূড়ান্ত পরিহাসে তাদের বাড়িটা আগুনে পুড়ে যায়।

আলফ্রেডের বয়স যখন ৪ বছর, তখন তার বাবা ইমানুয়েল নতুন ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফিনল্যান্ড পাড়ি জমানোর আগে তিনি আলফ্রেডের মাকে একটি মুদি দোকান খুলে দেন।

৭ বছর বয়সে আলফ্রেড ‘জ্যাকব’স প্যারিশ অ্যাপলজিস্ট স্কুল’ নামে একটি দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক সবাই ছিল বেশ রুক্ষ মেজাজের অধিকারী। তার উপর শৃঙ্খলাজনিত কারণে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের পেটাতেন শিক্ষকরা। কিন্তু আলফ্রেড এই পরিবেশে মানিয়ে নেন।

১৬ বছর বয়সে আলফ্রেড নোবেল একজন লেখক হবেন বলে ঠিক করেন। গৃহশিক্ষকের নিকট শেক্সপিয়ার পড়ে তিনি সাহিত্যের প্রেমে পড়েন। অন্যদিকে শেলীর কবিতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি কবিতা লেখাও শুরু করেন। এর মাঝে নোবেল তার বাবার ব্যবসায়ের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। ভ্রমণে গিয়ে তিনি নিউইয়র্ক, প্যারিস ঘোরার সুযোগ পেলেন। বেশিরভাগ সময়ই কাটাতেন রাসায়নিক গবেষণাগার আর ফ্যাক্টরিতে। ১৮৫২ সালে যখন তিনি রাশিয়া ফিরে আসেন। স্বাস্থ্য সমস্যা এবং আর্থিক সঙ্কটে রাশিয়া ফিরে নোবেল পুরোদমে বাবার ব্যবসায় মন দেন। কিন্তু তার স্বাস্থ্য ততদিনে বেশ খারাপ। ঘন ঘন রোগে ভুগতেন কিশোর নোবেল। সেই সঙ্গে ব্যবসা খারাপ।

আলফ্রেডের বয়স যখন ২৫, তখন বাবা ব্যবসা খারাপ। এর মূল কারণ ছিল রাশিয়ান সরকারের ক্রিমিয়ার যুদ্ধে হেরে যাওয়া। ক্রিমিয়া যুদ্ধ হেরে সরকার অস্ত্রের অর্থমূল্য পরিশোধ করেনি। তাছাড়া ইমানুয়েল তখনকার সময়ে ব্যবহৃত গানপাউডারের চেয়ে অনেক শক্তিশালী একপ্রকার বিস্ফোরক ‘নাইট্রোগ্লিসারিন’ আবিষ্কারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতাও তার ব্যবসায় আর্থিক ক্ষতির কারণ হিসেবে কাজ করে।

১৮৬৩ সালে রাশিয়া ফিরে এসে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন নোবেল। নোবেল একটি ছোট শিল্প কারখানায় নিজের ল্যাবরেটরি স্থাপন করেন। এখানে তিনি হাড়ভাঙা পরিশ্রম শুরু করেন। সুস্থ্য না থাকলেও দৈনিক ১৮ ঘন্টা ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নাইট্রোগ্লিসারিন এর বিস্ফোরণ ঘটাতে শিখে যান।

১৮৬৪ সালে ঘটে একটি মর্মান্তিক ঘটনা। তার ছোটভাই এমিলও গবেষণাগারে কাজ করতো। দুর্ঘটনার দিন এমিল, আরও একজন সহকর্মী এবং ঝাড়ুদারসহ ৫ জন পুড়ে মারা যায়। আলফ্রেড এতে করে প্রাথমিকভাবে কিছুদিন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তবে কর্মঠ মানসিকতার নোবেল বেশিদিন কাজের বাইরে বসে থাকতে পারেননি। খুব দ্রুতই তিনি অধিক পরিমাণ নাইট্রোগ্লিসারিনের বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য গবেষণা শুরু করেন এবং সফলও হন।

ল্যাবরেটরিতে আগুন লেগে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু হবার পর থেকেই নোবেল কিভাবে অধিক পরিমাণ বিস্ফোরক সহজে এবং অব্যর্থভাবে বিস্ফোরিত করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। অবশেষে তিনি আবিষ্কার করলেন তার বিখ্যাত ব্লাস্টিং ক্যাপ ডেটোনেটোর। তার এই ক্যাপ আবিষ্কারের পর প্রায় ৫০ বছর কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়াই ব্যবহৃত হয়। এমনকি এখনো কোনো কোনো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৮৬৩ সালে আলফ্রেড নোবেল নাইট্রোগ্লিসারিনের সাথে কাঠ কয়লার মতো আরও কিছু গুড়ো পদার্থ মিশিয়ে একপ্রকার অধিক শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল বিস্ফোরক তৈরী করেন। ১৮৬৪ সালে তিনি তার এই নতুন বিস্ফোরক এর জন্য সুইডিশ প্যাটেন্ট অফিসে প্যাটেন্ট এর জন্য আবেদন করেন। তবে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তার আবেদন মঞ্জুর হচ্ছিল না। এরপর তিনি আবার গবেষণায় ফিরে যান। তিনি নাইট্রোগ্লিসারিনকে এক প্রকার শোষক পদার্থ দিয়ে শোষণ করিয়ে নেন। পদার্থগুলো হচ্ছে কিসেলগার, করাতের কাঠের গুড়ো, সিলিকেট ইত্যাদি। এরপর এই বিস্ফোরককে কাগজে মুড়ে তৈরী করেন ডিনামাইট। তিনি গ্রীক শব্দ ‘ডিনামিস’ থেকে ইংরেজি প্রতিশব্দ ডিনামাইট শব্দটি নেন যার অর্থ শক্তি। এই ডিনামাইটকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হবে বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন।

১৮৭৩ সালে আলফ্রেড নোবেল প্যারিসে চিরস্থায়ীভাবে থিতু হবার বাসনা প্রকাশ করেন। দু’বছর পর তিনি ‘গ্যালিগনাইট’ নামক একপ্রকার বিষ্ফোরক তৈরী করেন। এই গ্যালিগনাইট ছিল ডিনামাইটের চেয়ে অধিক শক্তিশালী, স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং পানির নিচেও বিষ্ফোরণযোগ্য।

১৮৮৭ সালে নোবেল নাইট্রোসেলুলোজ এবং নাইট্রোগ্লিসারিনের মিশ্রণে তৈরী করেন বুলেট এবং কামানের শেলে ব্যবহারের জন্য একপ্রকার প্রোপ্যালেন্ট, যার নাম ‘ব্যালিস্টিট’। ফরাসী মিলিটারি এই ব্যালিস্টিট এর প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখালে তিনি ইতালির মিলিটারির কাছে লাইসেন্স করিয়ে নেন। এতে করে ফরাসী সরকার তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালায়, তার গবেষণাগারে অভিযান চালায় এবং অনেক সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করে। এই ঘটনায় দুঃখ পেয়ে নোবেল চিরতরে ফ্রান্স ত্যাগ করে ইতালিতে বসবাস শুরু করেন।

নোবেল তার বিষ্ফোরক তথা ডিনামাইট থেকে যতই উপার্জন করছিলেন ততই মর্মপীড়ায় ভুগতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন তার মৃত্যুর পর মানুষ তাকে চিরজীবন ঘৃণাভরে স্মরণ করবে। বিশেষ করে ভাইয়ের মৃত্যুর তিনি একথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন। তিনি দেখেন যে একটি পত্রিকা ভুলক্রমে তার ভাইয়ের বদলে তার মৃত্যুর শোক সংবাদ ছেপেছে। সংবাদটির শিরোনাম ছিল এরূপ- ‘মৃত্যু ব্যবসায়ীর মৃত্যু!’

তাই সবকিছু ভেবে এবং ডিনামাইট আবিষ্কারকে নিজের পাপ হিসেবে মনে করে এর প্রায়শ্চিত্ত করতে, ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সুন্দর করতে তিনি এক অভাবনীয় কাজ করে রেখে যান। তিনি তার বিশাল পরিমাণ বিত্তবৈভব সব মানবকল্যাণে কাজ করা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদানের জন্য রেখে যান। তিনি নিজের ৯৪ ভাগ সম্পত্তি দিয়ে পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তি এই ৫টি বিষয়ে বৈশ্বিকভাবে সেরা ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদানের জন্য ফান্ড গঠন করেন। ১৯০১ সালে তার মৃত্যুর ৫ বছর পর প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবন এবং মহাপ্রয়াণ
ব্যক্তিগত জীবনে নোবেল ছিলেন বেশ সৌখিন। আর্থিকভাবে যখন স্বচ্ছল হতে শুরু করেন তখন থেকেই তিনি মোটামুটি বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করেন। তিনি খুবই দানশীল ছিলেন এবং নিজের অতীতের কথা স্মরণ করে সর্বদাই দান করতেন।

ছিলেন ঠিক বিপরীত। তিনি ভাবতেন নারীরা তাকে ভালবাসে না অথবা নারীদের নিকট তিনি খুবই অপ্রিয়। অন্যদিকে তিনি খুবই লাজুক এবং নিঃসঙ্গ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। কথা কম বলতেন এবং খুব সহজে কারো বন্ধু হতে পারতেন না।

দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন আলেক্সান্দ্রা নামক এক নারীর সাথে যার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন নোবেল। ১৮৭৬ সালে বার্থা কিনস্কি নামে এক মহিলাকে নিজের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন এবং প্রেমে পড়েন। কিন্তু বার্থার আগেই বিয়ে ঠিক হয়েছিল এবং সে কয়েকবছর পর প্যারিস ছেড়ে চলে যায়। তবে নোবেল তার পরবর্তী জীবনে সবসময় চিঠি আদান প্রদানের মাধ্যমে বার্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ঘটনাক্রমে ১৯০৫ সালে বার্থা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

নোবেলের অসমাপ্ত প্রেম কাহিনির এখানেই শেষ নয়। তিনি বার্থার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সোফি নামের আরেক অস্ট্রিয়ান নারীর প্রেমে পড়েন যার আগের প্রেমিকের ঘরে একটি সন্তান ছিল! তথাপি নোবেল নিয়মিত সোফির সাথে দেখা করতে অস্ট্রিয়া যেতেন এবং টাকা পাঠাতেন।

জীবনের অন্তিম সময়ে নোবেল হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগেছেন। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ৬৩ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন। স্টকহোমের উত্তরাঞ্চলীয় সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

আর/০৮:১৪/২১ অক্টোবর

জানা-অজানা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে