Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-১৬-২০১৯

রিকশাচালক থেকে যেভাবে টাকার কুমির আ’লীগ নেতা সেলিম

রিকশাচালক থেকে যেভাবে টাকার কুমির আ’লীগ নেতা সেলিম

চাঁদপুর, ১৭ অক্টোবর- চাঁদপুর সদরের ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম খান। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। এক সময় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন প্রাডো ও র‌্যাভ-৪ জিপে চলাফেরা করেন। যাপন করেন বিলাসী জীবন। আছে বিশাল ‘হুন্ডা বাহিনী’।

শুধু চাঁদপুর নয়, ক্যাসিনোর গডফাদার ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সহযোগী হিসেবে ঢাকায়ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর কয়েক দিন ছিলেন আত্মগোপনে। থানায় জমা দেন নিজের লাইসেন্স করা দুটি আগ্নেয়াস্ত্র।

চাঁদপুর সদর থানার ইন্সপেক্টর হারুনুর রশিদ অস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, কয়েকদিন আগে অস্ত্র জমা দিয়েছেন। কী জন্য দিয়েছেন সে ব্যাপারে কোনো কিছু উল্লেখ করেননি তিনি।

জানা গেছে, সেলিম খান আত্মগোপন থেকে ফের প্রকাশ্যে এসেছেন। তার দাপটে চাঁদপুরের মানুষ তটস্থ। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ফলে তার সব অপকর্ম ঢাকা পড়ে আছে। তবে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ কৌশলে তার ফুলেফেঁপে ওঠার গল্প গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন।

দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করলে তিনি একটি জাতীয় দৈনিক এর বিরুদ্ধেও মামলার হুমকি দিয়েছেন একাধিকবার। তার দুর্নীতি ও অপকর্মের বিষয়ে বক্তব্য নিতে ফোন করলে তিনি এ প্রতিবেদককেও একাধিকবার হুমকি দেন।

গত দশ বছরে রিকশাচালক থেকে কীভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হলেন- এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বুধবার তিনি বলেন, আমি চাঁদপুরের একটি স্থানীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রকাশক। ‘আমি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি’। ৯ বছর একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। পত্রিকার সম্পাদক- প্রকাশক হতে হলে লেখাপড়া থাকতে হয়- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে মামলা করার হুমকি দেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেলিম খানের অস্বাভাবিক সম্পদ এলাকাবাসীর কাছে রূপকথার গল্পের মতো।

সরেজমিন তার সম্পদ অর্জনের অনেক অজানা কাহিনী জানা গেছে। এলাকার লোকজন জানান তিনি ফসলি জমি ভরাটের মাধ্যমে নষ্ট করছেন কৃষিজমি। মেঘনা নদী থেকে বছরের পর বছর বালু উত্তোলন করে চলেছেন। নদীতে শত শত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তুলে বিক্রি করছেন।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কাজটি করছেন। এসব কাজে তার বিশাল বাহিনী ব্যবহার করে থাকেন। ফলে চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী এলাকা ভাঙনের মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ খাল দখল করে মাছ চাষ করছেন।

শাপলা মাল্টি মিডিয়া নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে সিনেমায় কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ঢাকার ক্যাসিনো ব্যবসাসহ তদবির বাণিজ্য করে তিনি এখন টাকার কুমির। সংশ্লিষ্টদের এ বক্তব্যের ডকুমেন্টও যুগান্তরের কাছে রয়েছে।

তবে তিনি অবৈধভাবে ব্যবসার কথা অস্বীকার করে এ প্রতিবেদককে বলেন, সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে অনুমতি নিয়ে বালু উত্তলন করি। তবে এলাকার একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, সবাইকে ম্যানেজ করে সেলিম খান বিভিন্ন রকমের কাগজপত্র বানিয়ে নদী থেকে বছরের পর বছর বালু তুলে বিক্রি করছেন। এর ফলে নদীভাঙন বাড়ছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে চাঁদপুর-হাইমচর রক্ষাবাঁধ।

সরেজমিন অনুসন্ধানকালে তার ইউনিয়নের অনেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেছেন, তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। যে জমির শতাংশ এক লাখ টাকা সে জমি তিনি ৫-১০ হাজার টাকায় নিচ্ছেন।

এলাকাবাসী বলেন, চেয়ারম্যানের নিজের ইউনিয়নটি নদীর পাড়ে। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে গরিব দুঃখীদের ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি নামমাত্র মূল্যে গ্রাস করে নিচ্ছেন। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে যাদের জমি নিয়েছেন তাদের মধ্যে স্থানীয় সুকা কবিরাজের বাড়িসহ প্রায় ২৫টি বাড়ির শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

সুলতান খান, শাহালম খান, জাহাঙ্গীর, মুরাদ উকিলসহ অনেকের সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে কিনে তাদের উচ্ছেদ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলেন, তিনি চাইলে জমি দিতেই হবে। না দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। চেয়ারম্যানের অত্যাচারের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের এক বাসিন্দা।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, সাত-আট মাস আগে নামাজরত অবস্থায় আমার দুই ছেলেকে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল চেয়ারম্যানের ছেলে ও তার লোকজন। ঘটনার সময় সে (চেয়ারম্যান) উপস্থিত ছিল। বিষয়টি চাঁদপুরের এমন কোনো নেতা নেই যাকে আমি জানাইনি। কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি। বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছি।

তিনি বলেন, আমার ৫৬ শতাংশ জমি জোর করে নিয়ে গেছে। এভাবে সে বহু মানুষের জমি দখল করছে। কিছু বলতে গেলে চলে নির্যাতন।

অপরদিকে সম্রাটের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঢাকা এবং আশপাশে নামে-বেনামে বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সম্রাট ছাড়াও যুবলীগের খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আরমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদসহ এ চক্রটির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেকে অন্য প্রভাবশালীদের তালিকায় নিয়ে যান। তার সম্পদের ফিরিস্তিও বিশাল। নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন কাকরাইলে তার চার তলা আলিশান বাড়ি রয়েছে।

এ ছাড়া ডেমরায় তার ৬ তলা বাড়ি, নারায়ণগঞ্জের ভুইগড়, রাজধানীর হাতিরপুলসহ বিভিন্ন স্থানে বেনামি সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে। সিনেমায় বিনিয়োগ রয়েছে কয়েক কোটি টাকা। চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ির কাছে লাভলী স্টোরের জমি ২১ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঢাকায় নিজের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে সম্রাট, খালেদ, আরমান ও সাঈদ কমিশনারের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিনেমার ব্যবসায় টাকা লগ্নি করেন। তার নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম শাপলা মিডিয়া।

আমি নেতা হব, চিটাগাইঙ্গা পোলা নোয়া খাইল্যা মাইয়া, ক্যাপ্টেন খান, শাহেনশাহ, প্রেম চোর, একটা প্রেম দরকার ও বিক্ষোভ ছবি তার টাকায় বানানো। এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি ৭টি ছবির পেছনে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। তবে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের মতে, টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তিনি বলেন, সিনেমা বানানোর পেছনে তিনি কোনো টাকা বিনিয়োগ করেননি।

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিপুল সম্পদের বর্ণনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, চেয়ারম্যান সেলিমের সম্পদের বিবরণ শুনে মনে হয়েছে বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ আহরণের একটি দৃষ্টান্ত। এটা পরিষ্কারভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি। তদন্তের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ার হয়ে যায়। কাজেই আমরা আশা করব, তার ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেলিম খানের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন ও সাবেক সাখুয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান খান ওরফে মনা খাঁ এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি যতটুকু জানি তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সঠিক। তিনি এক সময় রিকশা চালাতেন। তার বিশাল বিত্তবৈভব নিয়ে আমাদের সবার মাঝে প্রশ্ন আছে। কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা এলাকার মানুষের কাছে বিস্ময়।

শত শত কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী- জানতে চাইলে ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সেলিম খান উত্তেজিত হয়ে পড়েন। গত কয়েক দিন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি মোবাইল ফোনে বারবার মামলার হুমকি দেন। এর একপর্যায়ে তিনি কথা বলেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান এ প্রতিবেদককে বলেন, সম্পদ বলতে কাকরাইলে ঈশা খাঁ হোটেলের পাশে চার তলা একটি বাড়ি ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। অন্য যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

কীভাবে রিকশাচালক থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রিকশা চালানোর তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর অস্ত্র থানায় জমা দেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় অস্ত্র জমা দিয়েছি। কথার এক পর্যায়ে ক্যাসিনো তালিকায় নাম রয়েছে জানালে তিনি ভড়কে যান। তিনি সম্রাটের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি সম্রাটকে চিনি না।

সূত্র: যুগান্তর

আর/০৮:১৪/১৭ অক্টোবর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে