Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২ পৌষ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-১৬-২০১৯

জাবির গণরুম: ম্যানার শেখানোর নামে নবীন শিক্ষার্থী নির্যাতন

রাহুল এম ইউসুফ


জাবির গণরুম: ম্যানার শেখানোর নামে নবীন শিক্ষার্থী নির্যাতন

ঢাকা, ১৬ অক্টোবর- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) হলে হলে ম্যানার (আচার-আচরণ) শেখানোর নামে নবীন শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

নির্যাতনে শিক্ষার্থীরা মানসিক ভারসাম্যহীন ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ছাত্রলীগের ক্যাডারদের চড়-থাপ্পড়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর কান ফেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গণরুম নামে পরিচিত ‘টর্চার সেলে’ নবীন শিক্ষার্থীদের টর্চার করা হয়।

তবে গণরুমকে ‘টর্চার সেল’ বলতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জাবি শাখা ছাত্রলীগ। বর্তমানে গণরুমে নির্যাতনের মাত্রা কমেছে বলে দাবি প্রশাসন ও ছাত্রলীগের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের প্রথমে হলের গণরুমে উঠতে হয়। এখানে ওঠার পরপরই তারা নানা ধরনের টর্চারের শিকার হন। ছাত্রীহলে র‌্যাগিং বা টর্চার কম হলেও ছাত্রদের হলে মাত্রাতিরিক্ত টর্চার করা হয়। এর মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে টর্চারের ঘটনা বেশি ঘটে।

নবীনদের নির্যাতন ছাড়াও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে হলছাড়া করা, ছিনতাই, শিক্ষক ও ছাত্রী লাঞ্ছনা, ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, তুচ্ছ ঘটনায় অস্ত্রের মহড়া এবং ভর্তি পরীক্ষায় বাধা সৃষ্টি করার মতো মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

শতভাগ আবাসিকের তকমা লাগানো এ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলভেদে গণরুমে ২৫ থেকে ১৫০ নবীন শিক্ষার্থীকে থাকতে হয়। ম্যানার (আচার-আচরণ) শেখানোর নামে গভীর রাতে এসব শিক্ষার্থীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। নির্যাতনের ফলে মানসিক ভারসাম্যহীন ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

ছাত্রদের হলে গণরুমে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। পাঁচ বছরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী হল ছেড়েছেন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ও ছেড়েছেন। ছাত্রীদের হলে নির্যাতনের মাত্রা কম। তবে নবীনদের নির্যাতনের দায়ে আজীবন বহিষ্কারের কালিমা লেগেছে ছাত্রীদের গায়ে।

মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী মমতাজ বেগম অন্তরাকে টর্চার করার অভিযোগে ২০১৪ সালের জুলাই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের সাবরিনা আক্তার মিতু, রাজিয়া ও সামি রেজওয়ানা নামের তিন ছাত্রীকে আজীবন বহিষ্কার করে প্রশাসন। এ ঘটনার পর ছাত্রীদের হলগুলোতে র‌্যাগিংয়ের তীব্রতা কমতে শুরু করে।

মীর মশাররফ হোসেন হলের গণরুমে এ বছরের ২৫ মার্চ সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ছাত্র রাজন মিয়াকে থাপ্পড় মেরে তার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের রাকিব হাসান সুমন ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সাকিব জামান। এর আগে রসায়ন বিভাগের ছাত্র শরিফুল ইসলামকে ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

২০১৬ সালে প্রথম বর্ষের নবীন ছাত্রকে শারীরিক নির্যাতন করে রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে সবচেয়ে বড় গণরুম রয়েছে। এখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন নবীন শিক্ষার্থী থাকেন। এ গণরুমে এ বছরের জুলাইয়ে গণিত বিভাগের ছাত্র ফয়সাল আলমকে থাপ্পড় দিয়ে কান ফাটিয়ে দেন মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র শিহাব। এছাড়া র‌্যাগিংয়ের হুমকি দেয়ায় হল ছেড়ে এক রাত খোলা আকাশের নিচে কাটান শিক্ষার্থীরা।

এ হলের ৩৪৮নং রুম দীর্ঘদিন ধরে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখানে ছাত্রলীগ নেতা সৌরভ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন করতেন। ৭ মে জাবি শাখা ছাত্রলীগের শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম সম্পাদক কৌশিক রহমান শিমুলকে মোবাইল ফোন ‘চোর’ তকমা দিয়ে মারধর করে হল থেকে বের করে দেয় একই সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

এছাড়া নেতাদের বিরুদ্ধে তুচ্ছ ঘটনায় জুনিয়রদের ব্যবহার করে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। ১৮ এপ্রিল মওলানা ভাসানী হলের ১১৪নং রুমে মোশাররফ হোসেনকে মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে হাসপাতালে পাঠায় বাংলা বিভাগের জাহিদ হাসান তুহিন ও মো. নজরুল ইসলাম। মোটরসাইকেলের চাবি না দেয়ায় এক ছাত্রকে বেধড়ক মারধর করে ছাত্রলীগের ছয় কর্মী।

নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যেন কেউ দেখা করতে না পারে সেজন্য রাতে ছাত্রলীগের জুনিয়র কর্মীরা গণরুম পাহারা দেয়। ছাত্রলীগের অনুমতি না নিয়ে ২০১৮-১৯ সেশনের রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থী এক সিনিয়রের রুমে গেলে ওই বিভাগের সব জুনিয়রকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এছাড়া এ হলের ১১৪নং রুমকে বিচারালয় (টর্চার সেল) হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।

গত বছর শহীদ সালাম-বরকত হলের র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মিজানুর রহমান।

এর আগের বছর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের রাশেদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পেটানোর অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এছাড়া আফম কামালউদ্দিন হল, শহীদ রফিক-জব্বার হল, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল এবং আল-বেরুনী হল শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

আল বেরুনী হল ও রফিক-জব্বার হলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সিট বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। হলে হলে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেশি হলে তদন্ত করে প্রশাসন। দু’একটি ঘটনায় শাস্তি হলেও ‘খোঁড়া’ অজুহাতে অধিকাংশ ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়।

জাবির গেস্টরুম সংস্কৃতিকে টর্চার সেল বলে উল্লেখ করে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা এ প্রতিবেদককে বলেন, নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর খবরদারি করতে ছাত্রলীগ হলে হলে টর্চার সেল তৈরি করেছে।

ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টি এমনকি ভর্তি পরীক্ষায় ছাত্রলীগ বাধা দিলেও প্রশাসন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রে কর্মরত মনোবিজ্ঞানী ইফরাত জাহান যুগান্তরকে বলেন, গণরুমে একসঙ্গে অগোছালো ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের ফলে অনেকের মধ্যে মেন্টাল ডিজঅর্ডার তৈরি হয়।

এর ফলে মানসিক যন্ত্রণা বেড়ে যায়। অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষার গালি শোনার পর অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এর প্রভাব দীর্ঘদিন থাকে। ফলে হতাশা, ক্ষোভ ও প্রতিকূল পরিবেশে অনেকে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

ছাত্র ইউনিয়নের জাবি সংসদের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম অনিক এ প্রতিবেদককে বলেন, জাবির একেকটি গণরুম শারীরিক ও মানসিক টর্চার সেল। টর্চার কমাতে ও নবীন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন লোক দেখানো কর্মসূচি ছাড়া কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে কখনও চলতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, জাবিতে টর্চার সেল বলতে কিছু নেই। তবে গণরুম আছে। সেখানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগকে ঢালাওভাবে দোষ দেয়া যাবে না। ছাত্রলীগের পদধারী কেউ গণরুমে যান না। কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র এসব কাণ্ড ঘটায়। র‌্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আগের চেয়ে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা কমেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, র‌্যাগিং দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। তাই এটি নির্মূল করতে আমাদের একটু সময় লেগেছে। এখন র‌্যাগিং নেই বললেই চলে। এ বছর আমরা আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছি। হলে হলে শিক্ষকরা তদারকি করছেন। আশা করি, এ বছরই ক্যাম্পাস থেকে র‌্যাগিং নির্মূল হবে।

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের মন্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

সূত্র: যুগান্তর

আর/০৮:১৪/১৬ অক্টোবর

শিক্ষা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে