Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-১৩-২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলের ‘গেস্টরুমে’ কী হয়?

সিরাজুল ইসলাম রুবেল


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলের ‘গেস্টরুমে’ কী হয়?

ঢাকা, ১৩ অক্টোবর- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে অতিথিদের জন্য রয়েছে ‘গেস্টরুম’। তবে অভিযোগ আছে, রাতে এসব গেস্টরুমে হলের শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতার কারণেই বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চলে আসছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে চলে আসছে এই ‘গেস্টরুম কালচার’।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সব সময় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিকভাবে হলের আসন বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর এর বিনিময়ে হলের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যেতে হয়। তবে হল প্রশাসনের দাবি, হলের সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যেতে বাধ্য করা হয় তাদের। না গেলে জবাবদিহির জন্য ডাকা হয় গেস্টরুমে। গভীর রাতে হল থেকে বের করে দেওয়াসহ মারধরও করা হয়। গেস্টরুমে যেতে কেউ অনিচ্ছা প্রকাশ করলে ‘শিবির অপবাদ’ দিয়ে হল ছাড়তেও বাধ্য করা হয়। কোনও শিক্ষার্থীর ফেসবুকে প্রকাশিত মতও যদি বিপক্ষে যায়, তাহলেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এছাড়া জুনিয়রদের প্রতি বিভিন্ন অসদাচরণ ও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহারও করা হয় গেস্টরুমে।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রেজাউল আলম বলেন, ‘প্রথম বর্ষে থাকতে সপ্তাহে তিন-চার দিন রাতে গেস্টরুমে যেতে হতো। হলের বড় ভাইয়েরা বাধ্য করতেন। না গেলে অন্যদের দিয়ে ধরে নিয়ে যেতেন।’ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ না দেওয়ায় তার কয়েকজন বন্ধুকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কী হয় গেস্টরুমে: কয়েকটি হলের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেস্টরুম দিনের বেলা অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হলেও রাতে ব্যবহৃত হয় ‘রাজনৈতিক শিষ্টাচার’ শেখানোর কাজে। হলে ওঠা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘রাজনৈতিক আচরণ’ শেখানোর হাতেখড়ি হয় এখানে। কীভাবে হলের বড় ভাইদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, সালাম দিতে হবে, তাদের কথায় সায় দিতে হবে ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত সবাই এই গেস্টরুমে আসা-যাওয়া করেন। তবে সবাইকে ‘চেইন অব কমান্ড’ মেনে চলতে হয়। এখানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের কথাই চূড়ান্ত।

প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে ডাকেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। তাদের (দ্বিতীয় বর্ষের) গেস্টরুমে ডাকেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এভাবেই চলে গেস্টরুমের কার্যক্রম। অর্থাৎ প্রথম বর্ষে থাকার সময় যিনি গেস্টরুম নির্যাতনের শিকার হন, সিনিয়র হওয়ার পর তাকেই দেখা যায় জুনিয়রদের নির্যাতন করতে। এভাবে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে এই ‘গেস্টরুম কালচার’। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় হল রাজনীতিও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গেস্টরুম দুইভাগে বিভক্ত—বড় গেস্টরুম এবং মিনি গেস্টরুম। বড় গেস্টরুমে সব বর্ষের শিক্ষার্থীরা যান। এটি সপ্তাহে এক বা দুইবার হয়। আর মিনি গেস্টরুম সপ্তাহে তিন বা চারদিন হয়। সাধারণত রাত ১০টা-সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত সচল থাকে গেস্টরুম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্যার এ এফ রহমান হলের এক শিক্ষার্থী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হলে ওঠার কিছুদিন পর গেস্টরুমে ডাকে বড় ভাইরা। প্রায় সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন এভাবে গেস্টরুমে যেতে হতো।’


গণরুম থেকে গেস্টরুম নির্যাতন: বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বৈধভাবে থাকার জায়গা না পেয়ে রাজনৈতিকভাবে যারা হলে ওঠেন, তাদের রাখা হয় ‘গণরুম’-এ। সেখানে গাদাগাদি করে থাকেন ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী। তাদেরই মূলত গেস্টরুমে ডাকা হয়। এর বাইরেও অনেক শিক্ষার্থী ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঝামেলা এড়িয়ে নিরাপদে হলে থাকার জন্যও গেস্টরুমে যেতে বাধ্য হন।

দলীয় কর্মী বানায় গেস্টরুম: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যেদিন কেউ হলে ওঠেন, সেদিনই তিনি ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের ‘কর্মী’ হয়ে যান। তাদের মধ্যেই পরে কেউ কেউ নেতা হয়ে ওঠেন। অনেকে মনে করেন, এই সংস্কৃতিই ছাত্র রাজনীতিতে অনুপ্রবেশকারীদের সুযোগ করে দেয়।

ছাত্রনেতাদের বক্তব্য: ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোকে অলিখিতভাবে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে তুলে দেয় প্রশাসন। এর মধ্যে দিয়ে ছাত্র সংগঠনকে অপকর্ম করার সুযোগ দেওয়া হয়।’  

তার অভিযোগ, সব জেনেও প্রশাসন নীরব থাকে।

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করলে হলে থাকতে দেয়, অন্যথায় শিবির ব্লেম দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে হলগুলোতে ক্ষমতাসীনদের নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা আমরা দেখেছি। বুয়েটের আবরারের মতো ২০১০ সালে ঢাবিতে প্রাণ হারিয়েছেন আবু বকর।’

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘গেস্টরুমে আমরা সবার সঙ্গে মতবিনিময় করি। এখানে কাউকে জোর করে আনা হয় না।’

গেস্টরুমে নির্যাতনের যে অভিযোগগুলো রয়েছে তা বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘গেস্টরুম অবশ্যই থাকবে। এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ। গেস্টরুমে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যাবে। আমরা কাউকে জোর করবো না।’

তবে মাঝে মধ্যে দুয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে বলেও স্বীকার করেন তিনি। বলেন, ‘যারা অতি উৎসাহী, তারা গেস্টরুমকে ভিন্নখাতে নিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের হুঁশিয়ারি রয়েছে।’

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘গেস্টরুমে ম্যানার শেখানোর নামে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন সবসময় শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তি হয়, তাদের আচরণ শেখানোর প্রয়োজন আছে কিনা তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মুক্ত চিন্তা করার প্রবণতাকে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নেতাদের কথা না শুনলে শিক্ষার্থীদের শিবির অপবাদ দিয়ে হলছাড়া করা হয়।’

এই ছাত্রনেতার অভিযোগ, কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের তিন শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী।

হল প্রশাসনের বক্তব্য: সেই সময় ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান তিন শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়ার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই ঘটনার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে আবাসিক শিক্ষকদের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তারা তখন ওই ছাত্রদের আবার হলে তুলেছেন বলে আমি জানি।’

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ‘গেস্টরুম কালচার’-এর অভিযোগ সম্পর্কে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘হলে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের কোনও খবর আমার কাছে আসেনি।’ হলের আসন বণ্টন থেকে শুরু করে সবকিছু প্রশাসনই দেখভাল করে।’

উপাচার্যের বক্তব্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের হলগুলোতে গেস্টরুম রয়েছে। হলে যে অতিথিরা আসেন, তাদের বিশ্রামের জন্য তা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে নির্যাতন হয় কিনা তা আমার জানা নেই।’

তবে কেউ যদি কোনও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়, তাহলে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান খুবই কঠিন বলেও উল্লেখ করেন উপাচার্য।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

আর/০৮:১৪/১৩ অক্টোবর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে