Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ , ৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৫-২০১৯

এমসি কলেজ: বিস্মৃত কাপ্তান

সৈয়দ আতাউর রহমান


এমসি কলেজ: বিস্মৃত কাপ্তান

চলতি বছরের ২৭ জুন ১২৮ বছর পূর্ণ করল সিলেট তথা বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য এমসি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। এ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের খবর একটি পত্রিকায় এসেছে। সেখানে এমসি কলেজের ইতিহাস নিয়ে কথা এসেছে। এমসি কলেজের প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠাতার পরেই যার অবদান সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন হওয়ার কথা ছিল, তা অজানা কারণে আজ পর্যন্ত হয়নি। তিনি হলেন সিলেটের কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, শিক্ষানুরাগী আসামের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ সিআইই। তিনি কাপ্তান মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন।

ফ্লাওয়ার অব ইস্ট (Flower of East) নামে খ্যাত রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় তাঁর মাতামহ মুরারি চাঁদ রায়ের নামে এমসি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যার সাবেক নাম ছিল নবাব তালাব স্কুল। দুটি কামরায় কলেজ ক্লাস খুলে এফ এ পড়ার ব্যবস্থা করেন। মাত্র তিনজন অধ্যাপক ছিলেন, তাদের সংলগ্ন স্কুলের ছাত্রদেরও পড়াতে হতো। সুতরাং প্রিপারেটরি ইন্সটিটিউট হিসেবে কলেজটি যে প্রাথমিক স্তরের তা বলাই বাহুল্য। এখানে উচ্চশিক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল কল্পনাতীত। রেকর্ড পত্রে দেখা যায়, It origin may be characterized as an appendix to a high school to which 2 junior college classes under the old regulations of the Calcutta university were introduced.

এই প্রতিষ্ঠানের করুন অবস্থা সম্পর্কে আরও মন্তব্য করা হয়েছিল—Since its foundation it was languishing in a wretched condition. Its instructional staff was burdened with school work. It was insufficient second grade Institution. ১৯০৬ সালে নতুন ইউনিভার্সিটি রেগুলেশন্স আমলে আসায় এই জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠান বেশি সমস্যায় পড়ে। নতুন বিধান মতে, কলেজের সংস্কার করতে গেলে এটি পরিচালনার জন্য বিপুল ব্যয় ভার বহন করতে হবেম নতুবা নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হবে। রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় দোটানায় পড়ে সরকারের শরণাপন্ন হন। এই কারণে সরকারি সাহায্য লাভ হয় এবং কলেজটি ধ্বংসের হাত রক্ষা পায়।

১৯০৮ ইংরেজিতে রাজা গিরিশ চন্দ্র মারা যাওয়ার পর কলেজ সরকারের হাতে ন্যস্ত করা ছাড়া উপায়ান্তর ছিল না। সেই সময় বঙ্গভঙ্গ হওয়ায় কলেজের পক্ষে সুযোগ সৃষ্টি হয়। নয়া সরকারের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার বামফিল্ড ফুলার শিক্ষা প্রসারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব তার সরকার এগিয়ে এসেছিল। সরকারের তত্ত্বাবধানে কলেজের বেশ উন্নতি হল। বর্তমান হাসান মার্কেট ত্রিকোণ মাঠে মাচানের ওপর কলেজের জন্য ঘর নির্মিত হয়, লাইব্রেরি হোস্টেল স্থাপন করে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অস্তিত্বের সংকটে থাকা কলেজটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ রূপে প্রতিষ্ঠায় কাপ্তান মিয়ার উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা ছিল।

১৯১২ সালের আসাম সরকারের অধিকৃত দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ প্রথম শ্রেণির আসাম বঙ্গের অন্যতম মর্যাদাশীল শ্রেষ্ঠ কলেজ রূপে গড়ে তোলার মূল নায়ক ছিলেন সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া)। ১৯১৬ সালে সিলেটের জনগণকে নিয়ে এমসি কলেজকে প্রথম শ্রেণির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কাপ্তান মিয়া। আন্দোলনের মুখে সরকার দাবি মেনে শর্ত জুড়ে দিল, কলেজকে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি ক্লাস খুলে ডিগ্রি ক্লাসের প্রথম দুবছরের মোট খরচের অর্ধেক দিতে হবে। এই অর্থ যাঁরা দান করেছিলেন তাঁরা হলেন—খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া), খান বাহাদুর হাজি মুহাম্মদ বখত মজুমদার, রায় বাহাদুর নলিনী কান্ত দস্তিদার, রায় বাহাদুর বৈকুণ্ঠ নাথ শর্মা, বাবু সারদাচরন শ্যাম, বাবু রাধা বিনোদ রায়, রায় বাহাদুর সুখময় চৌধুরী, রায় বাহাদুর প্রমোদ চন্দ্র দত্ত, বাবু হরেন্দ্র চন্দ্র সিনহা।

কাপ্তান মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন আর দুবছরের মোট খরচের অর্ধেক দেওয়ায় ১৯১৬ সালের জুলাই মাস হতে এমসি কলেজ প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক এন সি সিল তাঁর হিস্ট্রি অব মুরারি চাঁদ কলেজ বইয়ে উল্লেখ করেন—It was run of luck for the M.C college to have Khan Bahadur Syed Abdul Majid C.I. E. One of its generous patrons Who led the public movement in Sylhet for securing its B. A. affiliation in 1916.

কাপ্তান মিয়া ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে আসাম সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভায় যোগদানের পেছনে তার শর্ত ছিল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁকে দিতে হবে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি তাঁর স্বপ্নের এমসি কলেজে উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ১৯২১ সালের ১৯ আগস্ট নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন অনুষ্ঠানে আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিসকে আনা হয়। গভর্নর তার বক্তব্য বলেন—Now that more funds are available, my govt have not been slow to give attention towards your wishes and taken the earliest opportunity possible to provide funds. How for this result is due to the energy and enthusiasm of my honorable colleague the Khan Bahadur, I think you all appreciate. The project is indeed his and I think he must be well satisfied at seeing it carried forward by todays ceremony.

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খান বাহাদুর নির্মাণকাজ তদারকি অব্যাহত রাখেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ভবন নির্মাণকাজ শেষ ও বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের আগেই ১৯২২ সালের ২৯ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯২৫ সালের জুলাই মাসে এমসি কলেজের স্থানান্তর ও উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসামের গভর্নর স্যার বিটসন বেল শ্রদ্ধাভরে বর্তমান এমসি কলেজের রূপকার কাপ্তান মিয়ার অবদান স্মরণ করে বলেন—The good and brave Khan Bahadur has gone before seeing the completion of the new college at Sylhet and the other boons and reforms for which he worked so hard.

উল্লেখ্য, এমসি কলেজের স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল চৌহাট্টায়। কাপ্তান মিয়ার দূরদর্শিতার কারণে ও মন্ত্রী থাকার সুবাদে তিনি বর্তমান টিলাগড়ে (যা অতীতে থেকারে টিলা নামে পরিচিত ছিল) স্থানান্তর করেন। বর্তমান স্থানে এমসি কলেজ প্রতিষ্ঠায় রাজা গিরিশ চন্দ্রের বা তার কোন উত্তরসূরির সামান্যতম অবদান না থাকলেও খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ কলেজের সঙ্গে নিজের নাম বা অন্য কোন নাম সংযুক্ত না করে পুরোনো নাম এমসি কলেজ বজায় রাখার মাধ্যমে মহানুভবতার পরিচয় দেন।

এসব ঐতিহাসিক তথ্যর ভিত্তিতে এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট, বর্তমান এমসি কলেজ আসামের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজীদের (কাপ্তান মিয়া) শ্রম ও সাধনার কীর্তি। মুরারি চাঁদ কলেজের সঙ্গে এর প্রতিষ্ঠাতা রাজা গিরিশ চন্দ্রের নাম যেমনি জড়িত, তেমনি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও জীর্ণ দশা থেকে একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি ডিগ্রি কলেজে রূপান্তর করার ব্যাপারে কাপ্তান মিয়ার নামও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কলেজের প্রকৃত ইতিহাস জেনেও তার অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন না করলেও আধুনিক এমসি কলেজের অন্যতম স্থপতি যে কাপ্তান মিয়া, সে সাক্ষ্য দেওয়ার মত বহু ইট পাথর এখনো বিদ্যমান।

বর্তমান এমসি কলেজের রূপকার সৈয়দ আবদুল মজিদ কাপ্তান মিয়ার স্মৃতি ধরে রাখতে তাঁর নামে একটি স্থাপনা বা ভবনের নামকরণের বহুদিনের পুরোনো দাবি কেন আজ অবধি বাস্তবায়ন হল না, সেটা এক বিস্ময়! আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, এই কলেজের অনেক সাবেক ছাত্র বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, প্রায় পাঁচজন মন্ত্রী ছিলেন। তাদের তো এমসি কলেজের বর্তমান অবস্থানে আনার পেছনে আসামের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজীদের (কাপ্তান মিয়া) অবদানের কথা অজানা থাকার কথা ছিল না। এমসি
কলেজের উন্নয়নে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি না দেওয়া হলে অকৃতজ্ঞতার দায় ভার সিলেটবাসীর থেকেই যাবে।

আর/০৮:১৪/৫ অক্টোবর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে