Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৬ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.1/5 (58 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-১৪-২০১৩

ওদের পেছনে মিলিয়ন ডলার আর আমাদের পেছনে ৩০ লাখ স্বজন

নিঝুম মজুমদার



	ওদের পেছনে মিলিয়ন ডলার আর আমাদের পেছনে ৩০ লাখ স্বজন
গত বুধবার  নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে অনুষ্ঠিত স্টেইটস পার্টির একটি সম্মেলনে আমরা আই সি এস এফ (ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম) এর কয়েজন সদস্য আমন্ত্রিত অতিথি ও বক্তা হিসেবে যোগ দেই। লন্ডন থেকে আমি, রায়হান রশীদ ভাই, আরিফুর রহমান ভাই এবং নেদারল্যান্ডস থেকে যোগ দেন খান মুহম্মদ ভাই। এই অনুষ্ঠানটির মূল আলোচনার বিষয় ছিলো ছিলো বাংলাদেশে চলমান বর্তমানের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ও তার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়। অনুষ্ঠানটির মূল আয়োজক ছিলো নো পিস উইদাউট জাস্টিস নামের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।
 
এই অনুষ্ঠনাটির গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা হয়ত ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে লিখে বোঝানো সম্ভব না। তবে কয়েকটা কথা অবশ্যই বলতে চাই আজকে। ভিসা নিয়ে প্রথমেই আমার আর রায়হান ভাইয়ের উপর খড়গ নেমে আসে এবং ডাচ এম্বেসি মূলত পুরো ব্যাপারটিকে এক ধরনের তামাশায় নিয়ে যায়। তবে এই ব্যাপারে বাংলাদেশের হাইকমিশন, লন্ডন আমাদের যে পরিমাণ সাহায্য করেছেন স্পেশালি হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার রাশেদ চৌধুরী, পলিটিকাল কাউন্সেলর মনজুরুল খান এবং জিরু ভাই তাতে করে একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারলাম যে আসলে বাংলাদেশের প্রশাসনে এমন দেশপ্রেমিক কিছু মানুষ থাকলে দেশের চেহারা পালটে যেতে সময় লাগবে না। এই পুরো ব্যাপারটিকে তাঁরা বিবেচনা করেছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে, আমি তাদের কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ।
 
ডাচ এম্বেসি একবার বলে এই কাগজ লাগবে, আরেক বার বলে অমুক কাগজ, একবার বলে কাগজ পাইনি, আবার বলে পেয়েছি। এ এক অদ্ভুত লুপে পড়ে গিয়েছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত কচ্ছপের কামড়ের মত সকলেই লেগে ছিলেন বলে সময়মতো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরেছিলাম। ডাচ এম্বেসি আমাদের ভিসা দিয়েছিলো অনুষ্ঠানের আগের দিন দুপুর ৩ টায়।
 
অনুষ্ঠানে প্রসিকিউশনের প্রতিনিধি হয়ে উপস্থিত ছিলেন আমাদের বিজ্ঞ প্রসিকিউটর সাইফুল ইসলাম তারেক, যিনি এই মুহূর্তে অভিযুক্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়ছেন। ডিফেন্সের পক্ষে ছিলেন টবি ক্যাডম্যান। এই অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল আইনের বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিন। এছাড়াও রোম স্ট্যাটিউটের প্রণেতাদের একজন, রুয়ান্ডা, ইয়াগোস্লাভিয়া, ট্রায়ালের কয়েকজন প্রসিকিউটর, বিভিন্ন এম্বেসির সদস্য, এনজিও’র সদস্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সাথে জড়িত প্রায় অর্ধ শতাধিক ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন নিকোলো ফিগা তালামানকার।
 
এই অনুষ্ঠানে একটা ব্যাপার খুব ভালো করে টের পেলাম। সেটি হচ্ছে বাংলা ব্লগ, ফেসবুক, বাংলা পত্রিকা কিংবা বাংলাদেশ বেইস বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে আমরা এই বিচারের বিরুদ্ধে প্রচারণাকারীদের ঠেঁসে ধরতে পারলেও আন্তর্জাতিক লেভেলে এই অপশক্তি আমাদের বিরুদ্ধে গত ৩ বছরে মনের মাধুরী মিশিয়ে যা ইচ্ছা তাই বলেছে। এই তিন বছরে ঠিক এই রকম অনেক সম্মেলনে এরা এদের ইচ্ছেমতো এই ট্রাইবুনাল নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে অনেক কথাই বলেছে, যা শুনলে গোয়েবলস পর্যন্ত এদের কাছে বাচ্চা শিশু হয়ে যাবে। বুধবারের ওই সভাতে ডিফেন্স কাউন্সিল স্বপ্নেও কল্পনা করেনি যে এই রকম ভাবে তারা ধরা খাবে, এত গুলো মানুষের সামনে। আমাদের মুহুর্মুহু যুক্তি তর্ক আর এভিডেন্সের সামনে এরা ছিলো অসহায় আর একটা সময়তো ক্যাডম্যানকে দেখে আমার করুণাই লাগছিলো।
 
কয়েকটা উদাহরণ দেই-
 
ক্যাডম্যান বলছিলো যে এই বিচার হতে হবে রোম স্ট্যাটিউটের মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে, তাকে বাংলাদেশে যেতে দেয়া হচ্ছে না, সুখরঞ্জন বালিকে অপহরণ করা হয়েছে, এই বিচারে কাউকে জামিন দেয়া হয় না, হয়নি ইত্যাদি। ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মতো সে বলেই চলছিলো তার কথা। এতদিন আন্তর্জাতিক এই জাতীয় সভাতে তার এইসব কথা সবাই শুনে গিয়েছে, কেননা সেখানে তাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ কেউ করেনি, ছিলোও না। কিন্তু তার এই প্রত্যেকটি এলিগেশন লাইন বাই লাইন আমরা প্রমাণসহ দেখিয়েছি যে এগুলো কি পরিমাণ মিথ্যা কথা।
 
যেমন রায়হান ভাই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এই বলে যে, রোম স্ট্যাটিউটের কোথায় লেখা আছে যে এই বিচার এই আইনেই হতে হবে? এই স্ট্যাটিউটে বরং উল্টো বলা আছে যে কোনো দেশ তাদের নিজস্ব আইনে বিচার করতে চাইলে তাদের মোস্ট ওয়েলকাম। এটি নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। আর তাছাড়া সবচাইতে বড় সমস্যা হচ্ছে রোম স্ট্যাটিউট ১৯৯৮ সালের আগে সংঘটিত কোনো বিচারই করবার এখতিয়ার রাখে না।
 
আমি প্রশ্ন উত্তর পর্বে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে তিনি (টবি) যে বাংলাদেশে ৫ বার এসেছিলেন এর আগে, এটা কেন তিনি এখন সবার সামনে বলছেন না। কেন তিনি বলতে চাইছেন যে একবার তাকে ইমিগ্রেশন তাদের ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল না হবার কারণে ডিপোর্ট করেছে সে কথা? ৫ বার ঢুকতে দেবার ঘটনা এড়িয়ে যাবার পেছনে কারন কী?
 
এছাড়াও তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি নিখোঁজ রয়েছেন- এই মর্মে একটা জিডি থাকলেও ডিফেন্স আইনজীবীরা তাকে কেন লুকিয়ে রেখেছেন? কেন পুলিশে জানান নি যে তিনি তাদের কাস্টডিতে রয়েছেন? এই সাক্ষী ছিলো প্রসিকিউশনের। তাহলে মূল দোষী কে? কে আসলে সাক্ষীকে গুম করে রেখেছে? আব্দুল আলীমকে জামিন দেয়া হয়েছে, এই কথা কেন চেপে যাচ্ছেন টবি? কেন সবার সামনে এই তথ্য দিলেন না তিনি? বিচারপতি জহির অসুস্থ থাকাতে রিজাইন করেছিলেন এবং তখনই ডিফেন্সের সবাই বলা শুরু করলেন যে এই বিচারপতি ভালো ছিলেন, নিরপেক্ষ ছিলেন ইত্যাদি। অথচ এতদিন আপনারা প্রত্যেকটি বিচারপতির সমালোচনা করেছিলেন। কেন তাহলে করেছিলেন? আর কেনই বা পদত্যাগের পর এখন অন্য সুরে বলছেন?
 
রায়হান ভাই টবিকে বুঝিয়ে দেন যে ৪২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ফরেন কাউন্সিল নিয়োগ করা গেলেও এটার অনুমতির এখতিয়ার বার কাউন্সিলের এবং বিদেশি আইনজীবী প্র্যাকটিস করতে পারবেন কি পারবেন না এটা সম্পূর্ণ ভাবে দেশের আইনের ব্যাপার। আরিফ ভাই এ সময় অসাধারণ কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, এই বিচারের ক্ষেত্রে সবাই শুধু যারা অভিযুক্ত তাদের কথা বলছেন। অথচ মূল ভিকটিম হচ্ছে এদেশের ৩০ লক্ষ নিহত মানুষ আর ৪ লক্ষ নির্যাতিত মা বোন। সেই কথা আপনারা কেউ বলেন না কেন?
 
এছাড়াও তিনি সরাসরি টবিকে প্রশ্ন করেন যে, আপনি বার বার বলছেন যে আপনি সব কথা ডিসক্লোজ করছেন, বলছেন। অথচ এই মাত্র জানতে পারলাম আপনি ৫ বার বাংলাদেশে গিয়েছেন এবং একবার যেতে পারেন নি বলে এইটাই প্রচার করছেন। এই আনফেয়ার মেকানিজমের, প্রপাগান্ডার মানে কি? কেন করছেন এমন?
 
এসব প্রশ্নের অধিকাংশই টোবি খুবই চতুরতার সাথে এড়িয়ে গিয়েছেন কৌশলে। তবে উপস্থিত সকলেই যা বুঝবার বুঝে নিয়েছেন এবং এটা আমরা টের পেয়েছি সভার পরে সবার সাথে যখন ইনফরমালি কথা বলছিলাম।
 
এছাড়াও নানান দেশের নানান বিজ্ঞ জনেরা আমাদের প্রসিকিউটরকে নানাবিধ প্রশ্ন করেন এবং প্রসিকিউটর অসাধারণভাবে সে সকল প্রশ্নের জবাব দেন এবং সকলের সামনেই প্রমাণিত হয় যে আসলে এই এতদিনের যে প্রপাগান্ডা চলে আসছিলো তা পুরোটাই মিথ্যা এবং বানানো।
 
ডক্টর এন্ডারসন তো বলেই বসেন যে, এই বিচার ডোমেস্টিক ভাবে করছে একটি সার্বভৌম দেশ, এতে সমস্যা কোথায়? কেন আপনি এই বিচারের বিরুদ্ধে?
 
আমরা যেই টবি ক্যাডম্যানকে এত প্রশ্ন করলাম আর চ্যালেঞ্জ করলাম, এগুলোর তোড়ে বেচারার অবস্থা আসলেই দেখার মতো হয়েছিলো। এমনিতেই অনুষ্ঠান হলে ঢোকার সময় দরজার সাথে বাড়ি খেয়ে প্রপাৎ ধরণীতল আর অনুষ্ঠানে প্রশ্ন আর চ্যালেঞ্জের মিসাইল আক্রমণে লোকটার প্রাণ দফা রফা হয়ে যাচ্ছিলো। সে কল্পনাও করেনি এই ঘটনা ঘটবে।
 
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ডক্টর আহমেদ জিয়া উদ্দিন খুব চমৎকার কিছু কথা বলেন। তিনি সবাইকে জানান যে আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে তারা বার বার বলেছিলেন পাকিস্তানি সেই ১৯৫ জনের বিচারের কথা, এই ব্যাপারে ইনিশিয়েটিভ নেবার কথা। তিনি আরো বলেন যে এই বিচারের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যশনাল বিভিন্ন সংস্থার উদাসীনতা আমাকে অবাক করেছে এবং আমি চাই যে তারা এই বিচারে নিজেদের ইনভলভড করুক। তারা বার বার নিজেদের কনসার্নের কথা উল্লেখ করছে অথচ সাহায্য করবার বা এটিতে যুক্ত হবার কোনো ইচ্ছাই তারা দেখায়নি এখন পর্যন্ত। ইউনাইটেড নেশন্সের বিভিন্ন আচরণেরও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন।
 
তবে এই সভাতে লন্ডনের একজন জামাত শিবির কর্মী পুরা দেশের মান ইজ্জত আসলে ডুবিয়ে দিয়েছিলো। কত বড় গাধার গাধা সে ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটরকে জিজ্ঞেস করছিলো সভাতে যে লর্ড কার্লাইল এবং টবি ক্যাডম্যানের ভিসার নিশ্চয়তা দিতে পারবে কি-না। প্রসিকিউটর খুব আশ্চর্য হয়ে বলেন যে- আমি কি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা নাকি যে আমি এখানে ভিসার গ্যারান্টি দিব? তার এই কথা শুনে সকলেই হেসে দেন।
 
সবচেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এই লোক এই হাই ভোল্টেজ সভাতে বসে বসে নাক খুঁটছিলো সবার সামনে আর নাকের লোম ছিড়ছিলো। সভাতে প্রত্যকটা মানুষ তার দিকে স্টেয়ার করছিলো। কি নোংরা!!!
 
এই পুরো ব্যাপার থেকে একটা ব্যাপার খুব সুস্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জামাত-শিবির এবং তাদের লবিইস্ট রা এতদিন মনের মাধুরী মিশিয়ে মিথ্যা কথা বলে এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটা নেগেটিভ চিত্র স্ট্যাবলিশ করতে সক্ষম হয়েছে এবং যেটাতে এই প্রথম বারের মতো একটা বড়সরো ধাক্কা লাগলো। এরা বুঝলো ঘুঘু বার বার ধান খেয়ে গেলেও একবার ফাঁদে পড়লে কী হয়। তবে সরকার যদি এই ব্যাপারটাতে একটু কনসার্ন হতো এবং এই আন্তর্জাতিক প্রচারণাগুলো যে বন্ধ করা দরকার এই ব্যাপারে সচেষ্ট হতো তাহলে এদের গুঁড়িয়ে দেয়া শুধু সময়ের ব্যাপার হতো। আফসোস, এক অদ্ভুত বুরোক্রেসির লুপে চলতে থাকা দেশের সরকার তা বোঝেও না, শুনেও না।
 
এইসব বুনো মোষ তাই তাড়াতে হয় আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের। যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে।
 
লেখক: ব্লগার ও আইনজীবী

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে