Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ , ৪ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৪-২০১৯

সেকেন্ড হোমধারীদের নাগরিকত্ব দেবে না মালয়েশিয়া

আহমাদুল কবির


সেকেন্ড হোমধারীদের নাগরিকত্ব দেবে না মালয়েশিয়া

কুয়ালালামপুর, ০৪ অক্টোবর- মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমধারীদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। বললেন, দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ওয়ান আজিজাহ। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে চালু হওয়া সেকেন্ড হোম আবেদনকারীদের শুধু ১০ বছরের ভিসা দেয়া হবে। মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব দেয়া হবে না।

সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’-এ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের আমলা, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে নানা পেশার চার হাজারের বেশি নাগরিক ইতোমধ্যে নাম লিখিয়েছেন মাই সেকেন্ড হোমে। এর মধ্যে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে সপরিবারে বসবাস করছেন । কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ করেছেন তা বাস্তবায়নের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান মাহাথির মোহাম্মদের সরকার।

মালয়েশিয়ার মিনিস্ট্রি অ্যান্ড ট্যুরিজম আর্টস অ্যান্ড কালচারের ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্য (২০১৮ সালের জুন) অনুযায়ী, পৃথিবীর ১৩০টি দেশের ৪০ হাজার নাগরিক ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম (এমএম২এইচ)’র বাসিন্দা হয়েছেন। যারা দেশটিতে সেকেন্ড হোমের বাসিন্দা হয়েছেন তার মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে চীনা ও দ্বিতীয় জাপানিরা। আর তালিকার তৃতীয় স্থানেই রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোমে’ চীনা ১১ হাজার ৮২০ জন, জাপানিজ চার হাজার ১৮ জন আর বাংলাদেশিন সংখ্যা চার হাজার ১৮ জন। এরপর যথাক্রমে ব্রিটেন দুই হাজার ৬০৮ জন, দক্ষিণ কোরিয়া দুই হাজার ৬৯ জন, সিঙ্গাপুর এক হাজার ৪২১ জন, ইরান এক হাজার ৩৮১ জন, তাইওয়ান এক হাজার ৩৪৭ জন, পাকিস্তান এক হাজার ১৭ এবং ভারতের এক হাজার আটজন।

মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম (এমএম২এইচ) প্রকল্পের বেনিফিশিয়ারি হিসেবে বাংলাদেশিদের অংশ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে ‘মাই এক্সপার্ট’ নামের একটি ওয়েবসাইট।

মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোমে আবেদনের ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বয়স ৫০ প্লাস (বেশি) তাদের জন্য লিকুইড এসেটের (রেডি ক্যাশ) পরিমাণ থাকতে হবে সাড়ে তিন লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত। বাংলাদেশি টাকায় ৭৩ লাখ টাকা। সঙ্গে মাসিক আয় দেখাতে হবে ১০ হাজার মালয়েশিয়ান রিংগিত।

অপরদিকে, আবেদনকারী যাদের বয়স ৫০-এর নিচে তাদের জন্য লিকুইড এসেট থাকতে হবে পাঁট লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত। ভিসা পারমিট পাওয়ার আগে যাদের বয়স ৫০-এর নিচে তাদের জন্য মালয়েশিয়ান ব্যাংকে তিন লাখ রিংগিত ফিক্সড ডিপোজিট জমা করতে হবে। আবেদনকারী এক বছর পর সেখান থেকে দেড় লাখ রিংগিত উত্তোলন করতে পারবে। তবে দ্বিতীয় বছরে অবশ্যই একই পরিমাণ ব্যালেন্স লেনদেনের পর জমা থাকতে হবে মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম প্রোগ্রাম পর্যন্ত। আবেদনকারী ৫০-এর ওপরে হলে দেড় লাখ রিংগিত দিয়ে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে একবছর পর আবেদনকারী তার জমা রিংগিত থেকে ৫০ হাজার রিংগিত উত্তোলন করতে পারবে। এই তালিকার আবেদনকারীকে অবশ্যই এক লাখ রিংগিত ব্যাংকে ব্যালান্স টাকা জমা রাখতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে নানা সমস্যার মুখে পড়তে পারেন-এমন আশঙ্কায় অনেকে সেকেন্ড হোম নিচ্ছেন মালয়েশিয়ায়। দেশটির শিক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের থেকে অনেক উন্নত, এ কারণে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম প্রোগ্রামে আবেদনের হিড়িক পড়ে যায়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেকেন্ড হোম করতে যে টাকার প্রয়োজন হয়, তা বাংলাদেশ থেকে কেউই বৈধ পথে নেননি।

এদিকে মালয়েশিয়ায় নিরাপত্তার অজুহাতে চলছে অবৈধভাবে অর্থপাচার। দেশটিতে সেকেন্ড হোমে বসবাসকারী অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট এটি। বিষয়টি জানে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও। তবুও থামছে না এ অর্থপাচার। তবে কী পরিমাণ অর্থ মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব জানা যায়নি। তবে গড়ে ২০ লাখ টাকা ব্যয় ধরে দেখা গেছে, বাংলাদেশিরা নিয়ে গেছেন প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই টাকা কেবল সরকারকে দিতে হয়েছে। তবে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জনপ্রতি ১২ কোটি টাকা করে প্রায় ৪২ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা সেকেন্ড হোমধারীরা মালয়েশিয়ায় অবৈধ পথে নিয়ে গেছেন।

সেকেন্ড হোমধারীদের অর্থপাচার ও করফাঁকির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় যোগাযোগ অব্যাহত রাখলেও সঠিক কোনো সুরাহা হয়নি এখনও। ২০১৫ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল নিয়ে একটি কমিটিও করা হয়েছিল। ওই কমিটির কার্যপরিধি সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়েছিল, আয়কর না দিয়ে যারা অবৈধভাবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিদেশে পাচার বা সেকেন্ড হোম নির্মাণ করেছেন তাদের তালিকা প্রস্তুত ও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া তিন সদস্যের বিশেষ টিম সেকেন্ড হোম নেয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনুসন্ধানও চালিয়েছিল।

জানা গেছে, এ ধরনের সুবিধা পেতে মালয়েশিয়ার ব্যাংকে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা রাখতে হলেও এদেশের সুযোগ গ্রহণকারীদের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।

এখন বিভিন্ন অনলাইনে ও সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। অনেক বাংলাদেশিও ব্যক্তিগতভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। এরা ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের টার্গেট করে সেকেন্ড হোমে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছেন।

মালয়েশিয়ার সরকারি হিসাব মতে, দেশটিতে সেকেন্ড হোম গড়েছেন চার হাজার ১৮ জন বাংলাদেশি। অবশ্য সেকেন্ড হোমের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়েছেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি।

দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলারা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমের বাসিন্দা হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ১০-১৫ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন। আরও প্রায় পাঁচ হাজার ব্যক্তি সেকেন্ড হোমের আবেদন করে অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেকেই বলছেন, মালয়েশিয়া টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন না করায় বাংলাদেশিরা এই সুযোগ নিচ্ছেন।

এদিকে মালয়েশিয়াতে কয়েক হাজার বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর ব্যবসা গড়েছেন। ওই দেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পাঁচতারকা হোটেল ব্যবসা, গার্মেন্ট কারখানা, ওষুধ শিল্পসহ নানা খাতে বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। অনেকে রাজধানী কুয়ালালামপুরসহ বড় বড় শপিংমলে দোকানও কিনেছেন।

এছাড়া অনেকে স্বর্ণ, খেলনা, তৈরি পোশাকের ব্যবসা করছেন। এদের কেউই বৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর করেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই তারা মালয়েশিয়াতে টাকা নিয়ে গেছেন। অনেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন কৃষি খাতসহ বিভিন্ন খাতে।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার (আইআইইউএম) প্রফেসর এস এম আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, বাংলাদেশের সরকারকে এই বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে-কেন নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করতে যাচ্ছে মানুষ। আর মালয়েশিয়া আমাদের জন্য যা করতে পারছে, আমরা কেন তা পারছি না। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ কবে অন্য দেশের মানুষের সেকেন্ড হোম হবে, সেদিকে নজর দেয়া উচিত।

সেকেন্ড হোমের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ প্রবাসী কমিউনিটি নেতা বলেন, জীবনের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা ছাড়াও মালয়েশিয়ার শিক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও বাংলাদেশিদের সেকেন্ড হোম বানানোর অন্যতম কারণ। ওই দেশে বাংলাদেশি রাজনীতিবিদরাই বেশি সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন। এর পরেই আছেন ব্যবসায়ীরা। তবে সেকেন্ড হোম করতে যে টাকার প্রয়োজন হয়, তা বাংলাদেশ থেকে কেউই বৈধ পথে নেননি।

আর/০৮:১৪/৪ অক্টোবর

এশিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে