Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৩-২০১৯

ফজলে হাসান আবেদ এক আলোকবর্তিকা

ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদ


ফজলে হাসান আবেদ এক আলোকবর্তিকা

আবার আরেকটা সম্মান পেলেন বাংলাদেশের কৃতী সন্তান আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব স্যার ফজলে হাসান আবেদ। শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনবদ্য অবদানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্মান ইয়াইদান পুরস্কার ও সোনার মেডেল পেয়েছেন। একে শিক্ষাক্ষেত্রের নোবেল পুরস্কার বলা হয়। সঙ্গে ৩৩ কোটি টাকাও পাবেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। সব সময়ের মতো দাতাদের ধন্যবাদ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি ঘোষণা দিলেন, এর পুরো টাকাই শিশুদের প্রাক্‌–প্রাথমিক শিক্ষায় কাজে লাগাবেন।

জ্ঞানের আলো জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে অতিক্রম করে ছড়িয়ে যায়, শিক্ষার ছোঁয়ায় পূর্ণ হয় মানবসত্তা। স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সমাজ, পরিবেশ, মূল্যবোধ এবং সামগ্রিক জীবনকে সুন্দর করে তোলে। হংকং থেকে সম্মাননা কমিটি জানায়, বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও মানুষ জানবে, বাংলাদেশের ব্র্যাকের গবেষণার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শিক্ষার আলো উন্নতি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে সক্ষম।

স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেন, শিশুদের ছোট্ট বয়স থেকে খেলার মাধ্যমে শিক্ষার আনন্দ বোঝানো সম্ভব। তাতে তারা বড় হয়ে আরও আগ্রহী হবে। ব্র্যাক বাস্তুভিটাপরিত্যক্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ৩ থেকে ৫ বছরের রোহিঙ্গা শিশুদের খেলার মাধ্যমে শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আনছে। শরণার্থীশিবিরে অনেক স্কুল করে তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে এক কোটি ২০ লাখ শিশু ব্র্যাকের প্রাক্‌–প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্কুল থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ, উগান্ডা ও তানজিনিয়ায় ব্র্যাক ৬৫৬টি প্লে ল্যাব বা খেলার মাধ্যমে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে রোজ ১১ হাজার ৫০০ শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছে।

ব্র্যাক আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সম্মানিত এনজিও। ভাবতে অবাক লাগে, এক লাখ কর্মী নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর ১১টি দেশে ১২০ মিলিয়ন মানুষকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে চলেছে ব্র্যাক।

বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানিদের শোষণের বিরুদ্ধে জাতি সংগঠিত হয়েছিল। শুরু করেছিল মুক্তিসংগ্রাম। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও সব মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ ধারণ করে জাতি মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অসহায় লোকজন নিয়ের শুরু হয়েছিল আরেকটা বাঁচার সংগ্রাম। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাণপুরুষ স্যার ফজলে হাসান আবেদ তাঁর লন্ডনের চাকরি ছেড়ে বাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পরে এই বৃহৎ যুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে।

ভারত থেকে নিজ ভস্মীভূত গ্রামে ফেরা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে যার শুরু। নীরবে সাধারণ মানুষের দুঃখের সঙ্গী হয়ে ধীরে ধীরে বহু বছর ধরে বিরল নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মপন্থার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের জন্য গড়ে তোলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। নিজের কর্মদক্ষতা ও দূরদর্শিতায় তিনি অনেক ত্যাগী ও বিবেকবান কর্মী নিয়ে ব্র্যাককে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছেন। শুধু শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন অথবা ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নয়, ব্র্যাক সমাজ গঠনের জন্য প্রতিটি খাতে কাজ করে যাচ্ছে।

পৃথিবী দেখছে, বাংলাদেশের মতো ছোট দেশও আজ পৃথিবীর ১১টি দেশের দুঃখী মানুষের জীবনের উন্নতির কাজ করে যাচ্ছে।

সমাজ আর দেশ যখন দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী মানুষের দাপটে বিভ্রান্ত, তখন স্যার ফজলে হাসান আবেদকে কাছ থেকে জানার একান্ত প্রয়োজন। তাঁর জ্ঞান, সাহস, মানবতা ও বিচক্ষণতার জন্য পৃথিবীর অনেক সম্মানিত মানুষ ও রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২০০৬ সালে জাতিসংঘের ডেভেলপমেন্টের প্রধান তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদক দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘ফজলে হাসান আবেদের মতো মাত্র ছয়জন রাষ্ট্রপ্রধান যদি পেতাম, তাহলে পৃথিবীতে আমি খাদ্যের অভাব চিরতরে দূর করে দিতে পারতাম।’

তিনি আরও বলেন, যখন আফগানিস্তানের ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে তাদের কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য পৃথিবীর সব দেশের প্রতিনিধিদের অনুরোধ জানালাম, তখন সবাই চুপ করে থাকলেন, কিন্তু শুধু একজন মানুষ তাঁর ছোট্ট একটা হাত তুললেন এবং বিরাট হৃদয় নিয়ে স্যার ফজলে হাসান আবেদ এই দুর্দিনে এগিয়ে আসেন। সেই থেকে ব্র্যাক আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবার গুরুদায়িত্ব ভয়ানক বিপদের মধ্যেও বহন করে চলেছে।

পৃথিবীর বহু সম্মাননা পেয়ে, বহু ভালোবাসা পেয়েও স্যার ফজলে হাসান আবেদ রয়ে গেছেন মাটির কাছাকাছি। অত্যন্ত বিনম্র হৃদয়, ছায়া দেওয়ার জন্য এক বিশাল মহিরুহ।

স্যার ফজলে হাসান আবেদের ইতিহাস আমাদের গর্বের ইতিহাস। তিনি জাতির কাছে নিজের জন্য কোনো দিন কিছুই প্রত্যাশা করেন না। তবে তাঁর জীবনের আদর্শ ও আত্মত্যাগ তরুণসমাজকে মূল্যবোধ ধারণ করা এবং সবাইকে নিজ ভালোবাসা দিয়ে দুঃখী মানুষের কাছাকাছি থাকার জন্য অনুপ্রাণিত করতে সাহায্য করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। দীর্ঘ ৪৭ বছর অক্লান্ত কর্মতৎপরতার পর ব্র্যাক থেকে তিনি অবসরে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান বাংলাদেশে আরেকটি সংগ্রামের সূচনা করেছে।

আমরা প্রার্থনা করি, স্যার ফজলে হাসান আবেদের উত্তরসূরিরা শুধু সংগঠনের কার্যক্রম নয়, তাঁরা যেন মানুষের জন্য ভালোবাসা ও তাঁর অপূর্ব ভাবমূর্তি ধারণ করতে পারেন। বাংলার মানুষকে পৃথিবীর সম্মানজনক আসনে বসানোর জন্য আমরা আপনাকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই।

লেখক: ডা. জিয়া উদ্দিন আহমেদ, ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

আর/০৮:১৪/৩ অক্টোবর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে