Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (23 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-০৯-২০১১

বাঙালি ভিক্ষুক দেখিনি : মমতাজউদদীন আহমদ

বাঙালি ভিক্ষুক দেখিনি : মমতাজউদদীন আহমদ
অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ আমাদের কাল ও শিল্প-সংস্কৃতির প্রাজ্ঞ অভিভাবক। মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনার বিরামহীন ধারক, মানুষের জাগতিক ও আত্মিক মুক্তির লাগাতার সংগ্রামে নিয়োজিত শৈল্পিক সৈনিক এবং সাহসের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তিনি। এখন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে কর্মরত আছেন। তাঁর সংগে আন্তরিক আলাপ হয়েছে। সে আলোচনায় কয়েকটি বিষয়ে তার তাৎক্ষণিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিমত প্রকাশ পেয়েছে। সেই অভিমতগুলো প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী ?

উত্তর : বলে রাখি আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার অন্ধ আবেগ আছে। মায়ের মতো জানি আমার দেশকে। বাংলা সাহিত্যের রচনার ইতিহাস হাজার বছরের দীর্ঘ। বিচিত্র বিষয়ে ও অনুভবের সাহিত্য বাংলা। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর আধুনিক শিল্পবোধ ও মানবিক চেতনাবোধ আমাকে বিস্মিত করে। বাংলার সংস্কৃতি ও দীর্ঘ আচরণের ফসল। নানাভাবে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বরূপ বিকশিত ও প্রকাশিত হয়ে উঠে। এর সংগে প্রতিদিনের খাদ্য, জলবায়ু, প্রকৃতি, রাজনীতি ধর্ম এবং অর্থনৈতিক উত্থান ও পতনের নিবিড় যোগাযোগ। এতদিনের আচরণ ও লোকাচারেবদ্ধ বাঙালি জাতি। নিত্য প্রবাহমান সঞ্চরণশীল জাতির মধ্যেই প্রাণের সঞ্চার। তাতেই জীবনের বেঁচে থাকার লক্ষণ

বাঙালি ভোগবাদী, ত্যাগবাদী, নৈরাশ্যবাদী আবার প্রচন্ডভাবে আশাবাদী। এমন স্বভাবের জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতি কি অনড় অচল হতে পারে?

প্রশ্ন : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে - আপনারার অভিমত ?

উত্তর : কেবল যুদ্ধকালীন অপরাধ নয়, সকল অপরাধের বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। যুদ্ধ তো মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের রক্তপাত আর লাঞ্ছনার মধ্যে বাঙালি পুনরায় তার শক্তিকে খুঁজে পেয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন এ তো সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। পাকিরা তো তাদের মোহের আর ক্ষমতার লালসা সহজে ছেড়ে দিতে চায়নি। মরিয়া হয়ে বাঙালি নিধন করেছে। কিন্তু অবশেষে পরাজিত হয়ে মাথা নিচু করে পালিয়ে বেঁচেছে। পাকিরা তো এদেশের আঁতিপাঁতি কিছুই জানতো না। তারা যে ঘরে ঘরে ঢুকে মানুষ হত্যা করেছে, নারী নির্যাতন করেছে আর তাদেরকে যেসব কুলাঙ্গার স্বদেশী উপযাজক হয়ে বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাহায্য করেছে বা তাদের নৃশংসতার কাজে সহায়ক হয়েছে তারাই যুদ্ধাপরাধী

এমন সব অপরাধ করেছিল জার্মানের কিছু নাগরিক। তারা নির্বিচারে ইহুদি হত্যা করেছে বা ইহুদি নিধনের আয়োজন করেছিল। সুবিবেচনায় তারাই পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যত দূরেই পালিয়ে যাক, যত দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাক, তাদের ধরে আনা হয়েছে, দরকারে তাদের ফাঁসি হয়েছে বা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এমন হয়েছে কম্বোডিয়ায়, হয়েছে বুয়াবায়।

বাংলাদেশেও এরকম বহু নরখাদক আছে। তাদের কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার নিরীহ নিরপরাধ মানুষ হত্যার কাজে সহায়তা করা। তারা নারী নির্যাতনের সহায়ক, অগ্নি সংযোগে ও সম্পত্তি বিনাশ করার কাজে তারা ছিল উদ্যোগী। এতদিন তাদের বিচার হয়নি। যেহেতু তাদের সহমর্মীরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কারণে ক্ষমতায় ছিল, তাই তারা নিরাপদে বাস করেছে। এখন গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। বিচারের জন্য তথ্য এবং সাক্ষী সাবুদ সংগ্রহ করা হয়েছে বা তার প্রক্রিয়া চলছে। অতএব এদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। যদি নিরাপধ প্রমাণিত হতে পারে তবে মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু দোষী প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। তা যদি মৃত্যুদন্ড হয়, তাও সই। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে।

প্রশ্ন : আমেরিকা আপনার কাছে নতুন দেশ। আমেরিকার প্রবাসী বাঙালিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা বলুন ।

উত্তর : আমেরিকা আমার কাছে মোটেও নতুন ক্ষেত্র নয়। এবার না হয় একটা কর্মোদ্যগ নিয়ে এসেছি, কিন্তু এর আগে এসেছি নাট্যকলা বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য, এসেছি আমাদের সন্তানদের সংগে মিলিত হবার জন্য অথবা বেড়াবার জন্য। তাই বলি, আমেরিকা বিশেষ করে নিউইয়র্ক আমার অপরিচিত ক্ষেত্র নয়। তবে হাঁ, আমেরিকার জনগণের পরিচয় আমার সম্যক জানা নেই। তাদের জীবনাচরণও আমার অনুধাবনে শতভাগ প্রকাশিত নয়। এদের খাদ্য, পোশাক-আশাক, এদের সময়নিষ্ঠা বা প্রাত্যহিক ও দাম্পত্যজীবন বিষয়ে আমি সামান্য ধারণা রাখি। তাছাড়া আমেরিকায় নিজের মানুষ কোথায়। সবাই তো বাইরের মানুষ। এদেশ তো ল্যান্ড অফ ইমিগ্রান্টস। দুনিয়ার প্রায় সব দেশ মহাদেশ থেকে দলে দলে মানুষ আমেরিকায় এসেছে। পাশের দেশের মানুষও প্রতিদিন প্রতিমাসে তরঙ্গের মতো আসছে। কারণ হলো আমেরিকা একটা নিয়মের দেশ, শাসন শৃঙ্খলার দেশ। আর বসবাসের জন্য সার্বজনীন দেশ। এখানে কালো সাদা নারী পুরুষ অক্ষম সবলে ভেদ নাই। এখানে সুদ্ধ খাদ্য সুলভে ও সহজে পাওয়া যায়। এখানে স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বিবিধ সুযোগ সুবিধা আছে। আর খেয়ে পরে থাকার মতো ব্যবস্থাও আছে। এদেশে অনেক বিত্তবান কিন্তু লাখ লাখ মধ্যবিত্ত আর হাজার হাজার গৃহহীন খাদ্যহীন মানুষও আছে। এখানে আমোদ আছে, আহলাদ আছে তার সংগে আছে নিত্য জীবন সংগ্রাম আর উৎকন্ঠা। তবু একটা শান্তি আছে যাকে বলে সামাজিক নিরাপত্তা। গভীর নিশীথেও আপনি নারী বা পুরুষ একা একা নগরের পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারবেন।

এরকম অবস্থার মধ্যে বাঙালিরা এখানে বাস করছে। এক এই বৃহত্তর নিউইয়র্ক নগরের পাঁচ প্রান্তে প্রায় দেড় লাখ বাঙালি বসবাস করছে। এদের সকলেই বৈধ বা সিদ্ধ পরিচয়ের তা হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু তবুও আছে। সংখ্যা বাঙালির ক্রমেই বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাড়বে আর নতুন নতুন করে বাংলাদেশের মানুষ আসবে। সকলেই সুখে আছে, তেমন নয়। এই তো সেদিন জ্যাকসন হাইটসে একজন স্বচ্ছল বাঙালি নৈরাজ্যের বেদনায় ক্লান্ত হয়ে আত্মাহুতি দিল। তবু বলি প্রবাসে বাঙালিরা ভালো আছে। আমি তো একজনও বাঙালি ভিক্ষুক দেখিনি। অন্যান্য শহরেও বিস্তর বাঙালি। ছোট বড় প্রত্যেক শহরে। নানা কাজে, নানা রকম ক্ষুদ্র বৃহৎ ব্যবসা বাণিজ্যে সবাই জড়িয়ে আছে।

এখানে এসে কেউ অবশ্য জন্মভূমি বাংলাকে ভুলে যায়নি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখি বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তর চর্চা হচ্ছে। বাঙালির বিভিন্ন উৎসবের দিনে বাংলার মানুষ বাংলা কবিতা, গান ও নৃত্য পরিবেশন করছে। জন্মভূমির কথা বারে বারে বলছে। দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল আহবান আছে তাদের। কিন্তু ফিরতে পারছে না। আর বোধহয় ফেরা হবে না। মাত্র দ্বিতীয় প্রজন্ম চলছে, তাতেই বাংলার শিশু কিশোররা বাংলা ভুলে ইংরেজী ভাষায় দক্ষ ও সচল হয়ে ওঠেছে। তৃতীয় চতুর্থ প্রজন্মে হয়তো বা বাংলার কোন নিশানা আর থাকবে না। ভাষা থাকবে না, সংস্কৃতি চর্চা থাকবে না, বাংলার খাদ্য থাকবে না। হয়তো বাঙালির সংগে বাঙালির দাম্পত্যজীবনও গড়ে উঠবেনা। তখন কী হবে!

তবে কি প্রবাসের বাঙালিরা মেল্টিংপটে গলে গিয়ে মন্ড পাকিয়ে অন্যরকম হয়ে যাবে। যেমন আফ্রিকানরা হয়েছে, ইউরোপীয় স্পানিসরা হয়েছে। চীনারা, কোরিয়ানরা হয়ে যাচ্ছে। তেমনি কি বাঙালিরা হয়ে যাবে। বাঙালি কি জানবে না ঈদ কী, একুশে ফেবব্্রুয়ারী কী, বিজয় দিবস কী ? রবীন্দ্রনাথ নজরুল কি অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে! কী হবে পঞ্চাশ বছর পরে এই সর্বগ্রাসী আমেরিকায়?

আমি বলি, যাবে না। বাংলার জীবনবোধ, বাংলার দেহগঠন, বাংলার স্বভাব আচরণের সংগে বাঙালির নিজের যে চিরকালীন সংযোগ আছে তা কি হারিয়ে যেতে পারে? ব্যক্তি মানুষ হয়তো হারাবে কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাঙালি মানসের চেতনার স্বরূপ হারাবে না। জন্মভূমির যে মৃত্তিকা সম্পৃক্ত সম্পর্ক সেই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না অভিবাসী বাঙালি। একটা ধারা, তা ক্ষীণ হোক বা প্রবল হোক - তা বইতেই থাকবে।

বাঙালি হয়তো সর্বতোভাবে বাঙালি হয়ে জেগে থাকবে না কিন্তু বাঙালির স্বরূপ একেবারে হারিয়ে যাবে না। আজকের বাঙালি আর আগামীর বাঙালির মধ্যে ব্যবধান হবে কিন্তু তখনো বাংলার হাসিকান্না মান অভিমান নিয়ে আমেরিকান বাঙালির ঘরে বাংলার স্বাধীনতা দিবস উপযাপিত হবে। তখনো রবীন্দ্র সংগীতের সুরধ্বনি বাঙালির কোনো কোনো ঘরে ঘরে শোনা যাবে। বহতা স্রোতে কি জীবনের শূন্যতা কাঁদে? না, তা হয় না। স্থির হলেই পচন ধরে কিন্তু যে জীবন চলমান, নিত্য সঞ্চরণশীল সে জীবনেই জীবন জেগে থাকে। তাই বাঙালি থাকবে। অবশ্যই থাকবে। মার্কিন বাঙালিও থাকবে।

প্রশ্ন : দার্শনিক মননের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে গেছি। চিন্তার রাজ্যে নানা আলোড়ন চলছে। এমন কোলাহল কালে আপনার অবস্থান কী?

উত্তর : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ হয়ে গেল। দশবছরে কয়েক কোটি মানুষের জীবন গেল। আরো কিছু আঞ্চলিক যুদ্ধ কলহে প্রতিদিন মানুষ মরছে। এইতো আফগানিস্তান পাকিস্তানে কি কম মানুষ মারা যাচ্ছে। ইরাকের যুদ্ধে কত মানুষ আর শিশু মরেছে তার হিসাব তো হয়নি।

এই মৃত্যু, মৃত্যু আর মৃত্যুর পাহাড়ের মধ্যে ক্ষমতা দখলের ও সম্পদ লুন্ঠনের নানা ফিকির আছে কিন্তু কোথাও মননের চাষ নাই। এখন শান্তির কথা, বিশ্রামের কথা বা আনন্দের কথার কোনো মূল্য নাই। খালি নৈরাচার, নৈরাশ্য আর ক্লেদ। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যভিচার, হত্যা, লুন্ঠনের কাহিনী। কে কাকে মারবে, কে কাকে পিছনে ফেলে ছুটে সামনে যাবে তারই নগ্ন প্রতিযোগিতা চলছে সবখানে।

এসবের মধ্যে দর্শনের নীরব চর্চা কোথা হতে হবে? কে হোমার, কে হবে বেদব্যাস? এখন তো অস্থিরতা আর আস্ফালন। এই যে আমেরিকা - এদেশের শাসকরা তো শান্তির কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলছে, কিন্তু গোপনে বানাচ্ছে মারণাস্ত্র। খালি ষড়যন্ত্র আর দখলদারির পাঁয়তারা। এর মধ্যে আর কোথায় সক্রেটিস প্লেটো আসবে? কে সকাল বিকাল অনুগত শিক্ষার্থীদের জীবনের স্নিগ্ধ দিক নিয়ে কথা শেখাবে? আর শিক্ষার্থীরাই বা তা শিখবে কেন? শান্তির কথা, আনন্দের কথা বা বিশ্রামের কথা শোনার সময় কোথায়? দেখছি তো, এই নিউইয়র্ক শহরেই সবাই কেবল ছুটছে। কারো বিশ্রাম নাই। কেবল ছুটে চলা। এই অস্থিরতা কেন?

তা কেবল কোনো রকমে বেঁচে থাকার জন্য। এদের জিজ্ঞেস করে দেখেন কেউ সুখের কথা বলতে পারবে না, কেউ শান্তির নীড়ের সন্ধান দিতে পারবে না। সব অনিশ্চয়তা। সবখানেই সংকট ও সংহার।

এমন সময়ে কি মননের চাষ সম্ভব? এমন দুর্দিনে কি পৃথিবীকে আলিঙ্গন করা যায়? যেখানেই নিশ্বাস নেই, কেবল বারুদের গন্ধ পাই, সবখানে। এখন দর্শন আর মনন নির্বাসিত। আমি তেমনি নির্বাসিত একজন এই অভিশপ্ত পৃথিবীর নাগরিক। বড় দুঃখ আমার, বড় যন্ত্রণা আমার। বাঁচব কেমন করে। এই তো আমার দর্শনের সন্ধান। আর কী?

পশ্ন : বাংলাদেশের এখনকার টেলিভিশন নাটক সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

উত্তর: কিছু বলতে চাই না। যত কম বলা যায়, ততই ভালো। আমরা তো বাংলার শুদ্ধ জীবনের কথা, সংগ্রামের কথা, জীবনবোধের কথা শুনতে চাই, শোনাতে চাই। তেমন কিছু কি পাওয়া যাচ্ছে? সবই তো কেবল আনন্দ ফূর্তি, আনন্দ রসিকতা। ফাজলামি আর ফিতলামি। এসব তো বাংলার জীবন নয়। না, আর বেশি কথা বলব না।

প্রশ্ন : এই মিশনে আপনার কর্মোদ্যগ নিয়ে কিছু বলুন।

উত্তর: হাঁ আমি বাংলার সংস্কৃতি সঞ্চারের জন্য বিশেষভাবে আহূত হয়ে মিশনে এসেছি। বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, গান, শিল্প বিদেশের কাছে উদ্ভাসিত করার কাজ আমার। মোট কথা আমার দেশকে বিদেশের কাছে স্বরূপ উদ্ভাসিত করা আমার লক্ষ্য। সরকারী মিশনের অনুশাসনের একটা সীমারেখা আছে। এই সীমারেখার মধ্যে কাজ করার সুবিধা আবার অসুবিধাও আছে। যা করতে বলা হয়, তা নির্বিচারে করা যায় না। আবার যা করতে চাই, তা করার জন্য সম্পদ ও সুযোগ পাওয়া যায় না। যেমন, বাংলার একটি লোকনাট্যকে মঞ্চে আনতে চাই। তারজন্য বিপুল আয়োজন দরকার। শিল্পী চাই, মঞ্চ চাই অন্যান্য অপরিহার্য উপকরণ চাই। এতসব তো মিশন দিতে পারবে না। অথবা থাইল্যান্ডের লোকসংগীতের আয়োজন করতে চাই। তার ব্যবস্থা কি সীমাবদ্ধ সুযোগে করা যাবে।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলার আন্দোলন, বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারী। কেবল বাংলা ভাষা নয় বিশ্বের অন্তত আরো দশটি ভাষা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার জন্য আয়োজন করতে ইচ্ছা আছে। যেমন কাজে যে পরিমাণ জোগাড় থাকা দরকার তা হয়তো পাব না। কিন্তু তবু চেষ্টা করে যাব। নজরুল গীতির বৈচিত্র্য ও সম্পদ নিয়ে বিদেশিদের কাছে হাজির হওয়ার ইচ্ছা আছে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য শ্যামাকে মঞ্চে তোলার বাসনা আছে। এজন্য বিপুল আয়োজন দরকার।

এতসব বড় কাজ মিশনের মূল কাজের সংগে সংযুক্ত করে জাতিসংঘের আয়োজনের মধ্যে সম্পাদন করা যাবে না - এজন্য একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র দরকার। বাংলার সংস্কৃতি কেন্দ্র। তেমন একটা উদ্যোগ সরকার নিয়েছেন। হয়তো অল্পদিনের মধ্যেই দিল্লী, লন্ডন এবং নিউইয়র্কে বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হবে। সেই কেন্দ্রের মাধ্যমে বড় কাজ সহজে হবে।

প্রশ্ন : . বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডার এবং বৈশিষ্ট্য নিয়ে আপনার অভিমত কী?

উত্তর : বাংলার শব্দ ভান্ডারের আয়তন সামান্য নয়। দেশি, সংস্কৃত, বিদেশি আর আধুনিক বহু ভাষা ও শব্দের সমন্বয় বাংলা ভাষায়। প্রতিদিন চলমান পৃথিবীতে প্রয়োজনে নতুন নতুন শব্দ সংযোজিত হচ্ছে। তেমন শব্দ আমাদের ভাষাতেই ঢুকছে। ক্ষতি নেই, সেটা যদি আমাদের ভাষা গ্রহণ করতে পারে। আমাদের ভাষা আরো সমৃদ্ধ হবে।

এই যে মার্কিন দেশের শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধির জন্য এত উদারতা তাতো কেবল দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারাই সম্ভব। আমি চলমান জীবনের অনেক কিছু বহন করতে চাই। তেমন উদার নিরঙ্কুশ মন থাকলে, প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ ও ধ্বনি এসে আমাকে সমৃদ্ধ করবে। এই যে মেইন স্ট্রীমে বাঙালিরা ক্রমেই ঢুকে পড়ছে মার্কিন দেশে, তাতো আর সামান্য আয়োজনে হবে না। আমাদের তৈরি হতে হবে।

উদারভাবে মার্কিন শব্দ নিতে হবে, আমাদের বোয়াল মাছ, শিঙ মাছ আর কদু খাদ্যকেও মেইন স্ট্রীমে ঢোকাতে হবে। ওদের আমরা চিনব, আমাদের ওরা চিনবে। আমরা যেমন হুইটম্যানকে চিনব, আমাদের নজরুলকে ওরা চিনবে। মার্ক টয়েনকে যেমন আত্মীয় করব তেমন মুজতবা আলীকে ওরা চিনবে।

এভাবে দেয়া-নেয়াতে আত্মীয়তা গাঢ় হবে। আমরা আন্তর্জাতিক হব। এমনি করেই বিশ্ব নাগরিক হব। চার্লি চ্যাপলিন আর আইনস্টাইন তো এমনি করেই বিশ্বের কাছে চিহ্নিত হয়েছেন। বিশ্বের লাভ হয়েছে।

আমার কথা হলো এখন আর আমি একটা ছোট্ট ভূখন্ডের অচেনা নাগরিক নই। আমিও বিশ্ব নাগরিক হয়ে বেঁচে থাকব। তবে মূলভূমি বাংলাকে কখনো অস্বীকার করব না। বাংলার হয়েই, বাংলার থেকেই আমি বিশ্ব সভায় আমার ভাষা, শব্দ, সংস্কৃতিকে উদ্ভাসিত করতে চাই। এরজন্য উদার মন আর সংস্কারহীন আবেগ ও গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। এ সাধনা কেবল একদিনের বলাতে বা অভ্যাসে হবে না। সময় লাগবে, এক এক করে দীর্ঘ দিন।

যদি নিষ্ঠা থাকে, ঐকান্তিকতা থাকে, তবে আমি আমার ভাষা সংস্কৃতি সম্পদ নিয়ে বিশ্বের ভান্ডারে হাজির হব, সেই ভান্ডার থেকে প্রাণভরে আহরণ করব। আমি বিশ্বকে সমৃদ্ধ করব, বিশ্ব আমাকে সমৃদ্ধ করবে। তাতেই আমার জনম সার্থক, জীবন সফল।

যূক্তরাষ্ট্র

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে