Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ , ৩ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-২৯-২০১৯

বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে চাই আত্মিক উন্নতি

সৈয়দ আবুল মকসুদ


বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে চাই আত্মিক উন্নতি

পৃথিবী গ্রহটির প্রতিটি দিনই নতুন দিন। পূর্ববর্তী দিনটির সঙ্গে পরবর্তী দিনটির কোনো মিল নেই। মানুষের সহজাত স্বভাব হলো পূর্ববর্তী দিনগুলোর চেয়ে বর্তমান ও অনাগত দিনের কাছে অপেক্ষাকৃত ভালো কিছু আশা করে। দেশের সাধারণ মানুষ কখনোই অবাস্তব কোনো স্বপ্ন দেখে না। রাষ্ট্র যা দিতে পারবে না, তেমন কিছুই প্রত্যাশা করে না মানুষ। রাষ্ট্রের সাধ্যের মধ্যেই নূ্ন্যতম প্রত্যাশা জনগণের।

কোনো জনগোষ্ঠীরই অতীতের সবকিছু খারাপ নয়, সব বর্তমানও সুন্দর ও সুখের নয়। মানুষ স্বপ্ন দেখে ভালোর ও সুন্দরের। ব্রিটিশ পরাধীন আমলে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে স্বাধীনতার। সেই স্বপ্ন আংশিক পূরণ হয়। পাকিস্তান আমলে এ দেশে মানুষের মধ্যে স্বশাসনের স্পৃহা জাগে। তার জন্য জীবনপণ লড়াই করে মুক্তিযুদ্ধ করে। প্রত্যাশা ছিল ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এমন একটি সমাজের, যেখানে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার থেকে মানুষ বঞ্চিত হবে না। বাংলাদেশের সংবিধানেই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছে।

স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার অসামান্য অগ্রগতি হয়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩০-৩৫ বছর আগের চেয়ে অনেক কম। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। মান নিচে নেমে গেলেও শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। নারী শিক্ষার অগ্রগতি বিপুল। সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি যথেষ্ট। নারীর ক্ষমতায়নও অল্প নয়। কৃষি ও শিল্পে অগ্রগতি অসামান্য। এই অগ্রগতিতে সব সরকারেরই অবদান আছে; কিন্তু ব্যক্তিগত ও বেসরকারি খাতের অবদান বিপুল। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা যেখানে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ও লোকসান দিচ্ছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে খুবই ভালো করছে। সরকারের দিক থেকে উপযুক্ত সহযোগিতা থাকলে বেসরকারি খাত আরও ভালো করত। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ দরিদ্র কম বয়সী নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এই শিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন বিপুল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শিল্পও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা আমাদের শিল্প-মালিকদের রয়েছে; তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের বলিষ্ঠ নীতির প্রয়োজন।

উন্নতমানের আধুনিক শিক্ষা ছাড়া বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষার মান ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার অবস্থা শোচনীয়। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অরাজকতা বিরাজ করছে, সুযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু পড়ে যাচ্ছে শিক্ষার মান। দুর্নীতি গ্রাস করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। সরকার যতই ব্যয় বরাদ্দ বাড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে দুর্নীতি। এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে মানুষের নতুন দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না।

নির্বিচারে যেখানে-সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় নামক সার্টিফিকেট বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় দেশে অস্বাভাবিক হারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সব শিক্ষিত যুবক-যুবতীকে চাকরি দেওয়া সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। যতটুকু পদ খালি হবে, সেটুকু যোগ্য প্রার্থীদের দ্বারা পূরণ করবে সরকারি কর্ম কমিশন। সবাইকে চাকরি দেওয়া নয়, কিন্তু সবাই যাতে তাদের পছন্দমতো উপজীবিকা বেছে নিতে পারে, সে পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে যারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায়, রাষ্ট্রের দিক থেকে তাদের আনুকূল্য প্রাপ্য। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে অনেকেই তাদের পরিকল্পনা নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারেন না। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না- তা এখন প্রতিটি মানুষ জানে। নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঘুষ দিতে অপারগ হওয়ায় তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন না।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিটি রাষ্ট্রই অপ্রত্যাশিত বিপদের ঝুঁকিতে রয়েছে। সে ঝুঁকির মাত্রা বাংলাদেশেও কম নয়। অন্যদিকে তা মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয় অন্যান্য দেশের তুলনায়। কোনো রাষ্ট্রই এখন আর একা তার খুশিমতো চলতে পারে না। জাতিসংঘের ১৭টি স্থায়িত্বমূলক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও তার সহযোগী বিষয়গুলোকে বিশ্ববাসীর উন্নত জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সেসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের প্রস্তুতি যে পর্যাপ্ত, তা বলা যাবে না। যে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবচেয়ে আগে দরকার দক্ষ জনবল। আমাদের সাধারণ জনগণ পরিশ্রমী। তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য যে দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন, তার অভাব।

ভিন্নমত ছাড়া এক চিন্তাধারার মানুষ দ্বারা যে সমাজ গঠিত, তার সঙ্গে ক্রীতদাসের সমাজের কোনো তফাত নেই। যে সমাজে নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ নেই, সেই সমাজ খেয়ে-পরে থাকতে পারে, তার অগ্রগতি নেই। সেই সমাজ ভবিষ্যতে নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারবে না। সে সমাজ স্রোতস্বিনী নদী না হয়ে বদ্ধ জলাশয় হয়ে থাকবে। সেখানে শ্যাওলা ও আবর্জনা জমবে। আমরা অবকাঠামো উন্নয়নকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, আত্মিক উন্নয়নের উদ্যোগ নেই। বৈষয়িক উন্নতির সঙ্গে আত্মিক উন্নতি যোগ হলেই যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই স্বপ্ন পূরণ হবে :প্রতিষ্ঠিত হবে উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।

এন কে / ২৯ সেপ্টেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে