Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ৬ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৮-২০১৩

ইউ আর এ ফরেইনার

কে এইচ এম নাজমুল হুসাইন নাজির



	ইউ আর এ ফরেইনার

উচ্চতর গবেষণার কাজে বিদেশে থাকি। বাংলাদেশে উচ্চতর গবেষণা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্খিত পর্যায়ে না থাকা বা আর্থিক প্রয়োজনে বিদেশে আসা। অর্জিত উচ্চতর গবেষণার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশে শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে- সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকার ইচ্ছে নেই। তারপরও বিগত ছয়-সাত বছরে বিভিন্ন দেশে থাকা বা ভ্রমনের অভিজ্ঞতার আলোকে যেটুকু উপলব্ধি হয়েছে তা সবার সাথে ভাগাভাগি করার ইচ্ছা থেকেই মূলত এ লেখা।

ভিনভূমে থাকলেও অন্যসব প্রবাসী বাংলাদেশীর মত আমারও মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। দূর্নীতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, গুমসহ নানাবিধ খারাপ কাজ বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটলেও নিজের দেশ বলে কথা। প্রতিদিনের রুটিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে বিনোদনের অংশ হিসেবে দেশে ফোন করি। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, কর্মক্ষেত্র সর্বোপরি দেশের খোঁজ-খবর নেই। আমার কুশলাদি জানাই। ঝাঁপসা বা অস্পষ্ট ছবি হলেও স্কাইপেতে কমপক্ষে নড়াচড়া দেখে বা কথা বলে কিছুটা শান্তি লাগে। কল্পনা করি দেশের মানুষ, আড্ডা, প্রকৃতি, হাট-বাজার, শহর আরো কত কি। দেশে থাকতে এক-দুইটা নিউজপেপার পড়লেও এখন প্রায় সবগুলোই কমবেশী পড়ি। খবরের কাগজে কোন ভালো কাজ দেখলে বা কারো কোন উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখলে মন আনন্দে নেঁচে ওঠে। অন্যদিকে খারাপ কিছু দেখলে ভীষন খারাপ লাগে। জাতি হিসেবে লজ্জাবোধ হয়।  
 
বিদেশে একা থাকি। দেশে রয়েছে স্ত্রী-কণ্যা। আমার স্ত্রী শানু তার এফসিপিএস এর পড়াশোনা নিয়ে ভীষন ব্যাস্ত। নিহাল আমার একমাত্র মেয়ে। বয়স এক বছরের একটু বেশী। বেশ কিছু শব্দ শিখেছে সে যেমন আম্মা, আব্বা, মামা, দাদা ইত্যাদি। তার বিভিন্ন ধরণের আজগুবি কর্মকান্ড আর দুষ্টামিগুলো আমাকে তীব্র বেগে টানে। নিহালের কর্মকান্ড দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় সে হয়ত তার বাবাকে খুঁজছে। এক অপরাধবোধ কাজ করে মনে। মনে হয় তার অধিকার বাবার আদর থেকে তাকে অনেক বেশী বঞ্চিত করা হচ্ছে কিনা। তারপরও নানাবিধ ব্যস্ততা ও ছুটি না থাকায় দেশে যেতে পারি না। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী যারা বিভিন্ন কারণে দেশ ছেড়ে বিদেশে রয়েছেন তাদের সবার একই অবস্থা হয় বলে আমার ধারণা। 
 
মায়ের সাথে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে মা কাঁদে তখন আমারও খুব কান্না পায়। পরিবার পরিজনের সাথে কথা বলার সময় কন্ঠস্বরের পাশাপাশি বাড়তি হিসেবে শুনি সুদূর বাংলাদেশ থেকে ভেসে আসা রিকশার অনবরত ক্রিং-ক্রিং আওয়াজ, ট্রেন ও গাড়ীর তীব্র হর্ণ, মানুষের হট্টগোল, বাদামওয়ালার চিল্লানি, ফেরিওয়ালার হাক, কাকের কর্কশ ডাক কা-কা ইত্যাদি। কখনও শুনি পথে ঝাঁলমুড়ি, দাউদের মলম বা ইঁদুর মারার বিরিয়ানি বিক্রেতার ব্যতিক্রমী কন্ঠস্বর। মালাই বা আইসক্রিম বিক্রেতার মাইকে চলমান জারিগান বা ওয়াজও শোনা যায় মাঝে মাঝে। দানবের মত শব্দ করে পাশ দিয়ে মালবাহী ট্রাক গেলে, চোখে না দেখলেও মনের পাতায় ভেসে ওঠে- নিশ্চয় তার পেছনে অনেক ধুলা ও কালো ধুয়া উড়ছে আর আশপাশের মানুষগুলো নাকে হাত বা কাপড় দিয়ে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। দেশে থাকতে এগুলো সবার মত আমার কাছেও ভীষন বিরক্তির মনে হলেও বিদেশের মাটিতে বসে এগুলো শুনতে বা ভাবতে খুব ভালো লাগে। ভালো-খারাপ যাইহোক তা একান্ত নিজের বলে মনে হয়। দেশীয় এ শব্দ বা দৃশ্যগুলো কল্পনা করার মাঝে মাতৃভূমি বাংলাদেশকে খুঁজে পাই। সেদিন আমার স্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় পাশ্ববর্তী মসজিদের মাইকে আযান শুরু হলো। আমার স্ত্রীকে বললাম- কথা বন্ধ করে একটু অপেক্ষা কর। মোবাইলটা অন রাখো। পুরা আযান মন দিয়ে শুনতে চাই। কতদিন হলো দেশীয় সুরে আযান শুনি না! সে তাই করলো। আযান শুনে মনে যে কি শান্তি লাগছিল তা লিখে বোঝাতে পারব না।
 
সারাদিন এসিরুমে কাজ করি। কর্মক্ষেত্র বা বাসা থেকে বের হলেই শুশৃংখল পথ-ঘাট, শপিং-মল, জানজটমুক্ত শহর। রাস্তায় নেই কোন রিকশা, ভ্যান বা টেম্পু। বিদেশে আসার পর শুরুর দিকে রিকশার প্রয়োজনীয়তা দারুণভাবে অনুভূত হয়। হাটতে হয় বেশী। রিকশা না থাকলেও কোন সমস্যা নেই। অল্প সময় পরপর নিয়ম মাফিক বিভিন্ন রুটে সিটি সার্ভিস বাস চলে। শহরের যেখানেই যাওয়া যাক ভাড়া একই। একবার বাস বা পাতালরেল (সাবওয়ে) থেকে নেমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবার অন্য বাস বা পাতালরেলে উঠতে পারলে এক ভাড়াতেই যাওয়া যায় ইচ্ছেমত যায়গায়। রয়েছে সহজলভ্য ন্যায্য মূল্যের ট্যাক্সি। ট্যাক্সিগুলোর শতভাগই চলে মিটারে। ভাড়া নিয়ে নেই দেন-দরবার। ট্যাক্সিতে ওঠার পর ড্রাইভার জানতে চায়- কোথায় যাবেন। যেখানে বলা হোক, ট্যাক্সিওয়ালা অনেকটা বাধ্য সেখানে যেতে। দারুণ সুবিধা। রাস্তায় যানবাহনের কমতি নেই। নির্দিষ্ট লেনে লাইন করে শা-শা শব্দে অবিরাম ছুটে চলেছে অগনিত গাড়ী। তারপরও বাস বা অন্য কোন যানবাহন থেকে কালো ধুঁয়া বের হচ্ছে এমন দেখা যায় না।
 
রাস্তাঘাটে চলার সময় গাড়ীর হর্ণ কদাচিৎ শোনা যায়। খুব বেশী ট্রাফিক আইন ভঙ্গ না হলে বা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা না থাকলে কোন ড্রাইভার হর্ণ বাজান না। পথ চলতে দিনে এক-দুইটা হর্ণ শোনা যায়। তাও আবার আস্তে করে। উদ্দেশ্য আইন ভঙ্গকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ। কোন কোন দিন হর্ণ শুনিই না। কেউ হর্ণ দিলে আশপাশের সবাই আড়চোখে বা কোন কোন সময বড় বড় চোখে তাঁকায়। কাকে বা কিজন্য হর্ণ দেওয়া হয়েছে তা জানার জন্য। কারো উদ্দেশ্যে হর্ণ দেওয়ার মানে অনেকটা অনেক পরিচিত লোকের সামনে আইন ভঙ্গকারীকে স্বজোরে চপেটাঘাত করার মত। 
খাদ্যে ভেজালের কথা মানুষ কল্পনাই করতে পারে না। কোন দোকানের খাবার খেয়ে কারো পেটে সমস্যা হয়েছে এমন অভিযোগ আসলে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষায় যদি তা প্রমাণিত হয় তাহলে নিশ্চিত সে দোকানের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রচুর জরিমানা হবে। ফল, শবজি, মাছ, দুধ ইত্যাদি শতভাগ আত্ববিশ্বাসের সাথে খাওয়া যায়। চকলেট খেয়ে তার খোসা বা কফির ক্যান পথের পাশে ফেলার কোন নিয়ম নেই। রাস্তাঘাট এত বেশী পরিস্কার যে সেখানে কিছু ফেলতে বিবেকে বাঁধে। তাই অপ্রয়োজনীয় অংশ সুন্দর করে ভাঁজ করে পকেটে রাখি। সবাই এটাই করে। পরবর্তীতে ডাস্টবিন পেলে তাতে ফেলে দেয়া হয়। এমনও হয়েছে সারাদিন ঘোরাঘুরির পর বাসায় ফিরে নিজের ডাস্টবিনে ফেলেছি। তবুও বাইরে ফেলতে পারিনি। বাংলাদেশের পথ বা পথের ধারকে আমরা ডাস্টবিন মনে করি। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ছাড়া এখানে-সেখানে ময়লা ফেলতে আমাদের বিবেকে বাঁধে না। অথচ এই আমরাই বিদেশে কত সুন্দর নিয়ম মানতে অভ্যস্ত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশীদের থেকেও বেশী। মনে মনে ভাবি- কেন বাংলাদেশে আমরা সবাই নিয়ম মানার চেয়ে না মানতে বেশী অভ্যস্ত। জাতি হিসেবে আমরা এমন কেন!  
 
কম সময়ের মধ্যে দারুণ উন্নতি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। আশির দশকেও উন্নতি বা জিডিপির বিচারে বাংলাদেশের কাছাকাছি ছিল দেশটি। ২০১৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশটির নমিনাল জিডিপি পার-ক্যাপিটা পঁচিশ হাজার ডলারেরও বেশী। যেখানে আমাদের এক হাজার বা একটু বেশী (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)। দক্ষিন কোরিয়ার উন্নতির রহস্য সম্পর্কে অন্য সময় বিস্তারিত লেখার আশা রইলো। দেশটির সিংহভাগ জায়গাজুড়ে ছোট-বড় পাহাড়। পাহাড়গুলো সবুজ বৃক্ষে ঠাসা। সবুজ মানে একদম সবুজ। আমাদের দেশের মত বিবর্ণ সবুজ নয়। যেখানে জনবসতি রয়েছে সেখানে একসাথে প্রচুর মানুষ বাস করে। গ্রাম, শহর, পাহাড়, বন-বনাণী সবকিছুকে মনে হয় কোন শিল্পী মনের মাধূরি মিশিয়ে সদ্য সাঁজিয়েছে। রাস্তা-ঘাট বা বিল্ডিংগুলো এত পরিচ্ছন্ন যে অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপ বা আমেরিকার মত উন্নত দেশের চেয়েও ঝকঝকে মনে হয়। ইউরোপ আমেরিকার মত পুরণো নয় তাই এরকম মনে হয়। যেমনটা বিভিন্ন ছবিতে ছোটবেলায় দেখেছি। 
 
রয়েছে উঁচু মানের সামাজিক নিরাপত্তা। ক্রাইম করে পার পাওয়ার কোন উপায় নেই। এত নিরাপত্তার মধ্যে থেকে উন্নত জীবন যাপন করলেও পথ দিয়ে যখন হেটে যাই কেন জানি মনে হয় আশপাশের প্রত্যেকটা ইট, পাথর, শুড়কি, গাছ, বিল্ডিং, মানুষ এমনকি ভাষা-সংস্কৃতি সবকিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে- রিমেম্বার, ইউ আর এ ফরেইনার। তার মানে- তুমি কিন্তু এদেশীয় নও। কোন কিছুই যেন নিজের নয়। দারুণ কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায়। নিজ দেশের শুন্যতা অনুভূত হয় তীব্রভাবে। অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস বুকে চাঁপা দিয়ে মনে মনে বলি- আমাদের দেশের পথ-ঘাট, ইট-বালু, গাছপালা ইত্যাদি দেখেও একদিন অন্য দেশের মানুষের এমন ভাবনা হয়ত হবে কোন একিদিন। দেশের গাছপালা, নদী, পথ বলবে- স্বাগতম, তুমি কিন্তু বিদেশী। মানে- ইউ আর এ ফরেইনার। সেই আশায় রইলাম।
 
ড. কেএইচএম নাজমুল হুসাইন নাজির
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
বর্তমান: গবেষক, ইয়াংনাম ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া।
ই-মেইল: [email protected]
 

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে