Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 1.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-২০-২০১৯

ক্যাসিনোর মধু অনেকের মুখে

হাসান আল জাভেদ


ক্যাসিনোর মধু অনেকের মুখে

ঢাকা, ২০ সেপ্টেম্বর - রাজধানীতে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্যাসিনোতে প্রতিদিন উড়ত কোটি কোটি টাকা। ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব ক্যাসিনো পরিচালিত হতো। তাদের কাছে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে পৌঁছে যেত এই জুয়ার আসরের টাকার প্যাকেট। দেশের আইনে ক্যাসিনো অবৈধ হলেও তা চলত পুলিশসহ প্রশাসনের বাধা ছাড়াই।

অভিযোগ উঠেছে, ক্যাসিনোর টাকার ভাগ পেতেন বলেই সবাই চোখ বুজে ছিলেন। পুলিশের যেসব কর্মকর্তা, সদস্য ক্যাসিনোর টাকার ভাগ পেতেন তাদের তালিকা করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন ওসি ও ডিসি রয়েছেন। তারা এখন রয়েছেন আতঙ্কে।

রাজধানীর ব্যাংক-বাণিজ্যপাড়া হিসেবে খ্যাত মতিঝিল ও দিলকুশা। মতিঝিলে অপরাধ দমন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা প্রদানের মূল দায়িত্ব মতিঝিল থানার। এ থানার পেছনেই ৯টি ক্লাবে রাতদিন বসত জুয়ার আসর।

সিঙ্গাপুর-নেপালের মতো ক্যাসিনো নামক প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার আসরে প্রতিদিন লেনদেন হতো অন্তত ২০ কোটি টাকা। আর কমিশন হিসেবে ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদ বা দখলদারেরা দৈনিক আয় করত এক কোটি টাকারও বেশি।

গত বুধবার রাতে র‌্যাবের অভিযানে ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের জব্দ করা কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর ওই ক্যাসিনোর জুয়ার আসর থেকে ক্লাবের সভাপতি যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁঁইয়ার লাভ হয়েছে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। আটক জুয়াড়িরা বলেছেন, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে জুয়াড়ির ভিড় ৪ গুণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া শুক্রবার ছুটির দিন ভিড় দ্বিগুণ হয়। এতে স্পষ্ট, মতিঝিলের শুধু এই একটি ক্লাবেই জুয়ার আসর থেকে লাভের অঙ্ক দাঁড়ায় মাসে কমবেশি ৫ কোটি টাকা। আর ৯টি ক্লাব মিলিয়ে এ অঙ্ক প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, ক্যাসিনো-জুয়ার আসর পরিচালনাকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এবং মতিঝিলের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ এসব অবৈধ আয়ের একটি অংশ থানা পুলিশসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করতেন। এ কারণে প্রায় ৫ বছর ধরে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগায় চলেছে অবৈধ এ কার্যকলাপ।

মতিঝিলের স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কয়েক দশক আগে মতিঝিলের আরামবাগ, ফকিরাপুলে গড়ে ওঠে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়াচক্র, ভিক্টোরিয়া ক্লাব, দিলকুশা ক্রীড়াচক্র, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ইয়ংমেন্স ক্লাব, সোনালী অতীত ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দলীয় ক্যাডার দিয়ে এসব ক্লাব পরিচালনা হতো। ক্ষমতার পালাবদলে ক্লাবের নিয়ন্ত্রণও বদলে যায়।

২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার নিয়ন্ত্রণ নেন তখনকার মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুল আলম আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক মিল্কী ও যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী তারেক। ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই গুলশানে গুলিতে নিহত হন মিল্কী। পরে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন মিল্কী হত্যা মামলার আসামি তারেক।

চঞ্চল নামে এক নেতা পালিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে আর আরিফ হন মামলার আসামি। এর পর যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগ মহানগর কমিটির একটি অংশকে ম্যানেজ করে দৃশ্যপটে হাজির হন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এ ছাড়া মতিঝিল, দিলকুশা, আরামবাগ, কমলাপুর, খিলগাঁওয়ে একচ্ছত্র টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির রাজত্ব করেন তিনি। দলীয় সূত্র বলছে, মিল্কী হত্যা ও তারেক নিহত হওয়ার পরই এক সময়ের যুবদল কর্মী খালেদের ‘ভাগ্যের চাকা’ ঘুরে যায়।

খালেদের নেতৃত্বে আরামবাগ ক্রীড়াচক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ভিক্টোরিয়া ক্লাব, দিলকুশা ক্রীড়াচক্র, সোনালী অতীত ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবে জুয়া-ক্যাসিনো থেকে আসা টাকা তুলতেন স্থানীয় কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সাঈদের মাধ্যমে চালাতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার। আর গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদের জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ করতেন ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতন।

ইয়ংমেন্স ক্লাব সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ। তার সঙ্গে ছিলেন মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন। খালেদ আর সাব্বির ছিলেন টেন্ডারবাজির অংশীদার। খালেদ তার ‘ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেলওয়ে, রাজউক, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে একচেটিয়া টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ‘সূচনা ট্রেডিংয়ের’ নামে সাব্বির হোসেনের প্রতিষ্ঠান খালেদের সহযোগী হয়ে রাজউক, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে টেন্ডারবাজি করত।

শান্তিনগরের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের ছাত্র খালেদ মাহমুদ ভূঁঁইয়া কমলাপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের অস্ত্রের পাহারাদার ছিলেন। তার বন্ধু ছিল গোপীবাগের সন্ত্রাসী নাসির। ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিনহার্ট শুরু হলে মানিক ভারতে পালিয়ে যায়। নাসির চলে যায় ইতালিতে। এর পর খালেদ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সোহেল শাহরিয়ার মানিকের হয়ে কাজ করেন।

স্থানীয় সূত্র বলছে, মিল্কী হত্যাকা-ের পর আরিফ-টিপু-চঞ্চল গ্রুপের লোকজন বাগিয়ে খালেদ বাহিনী গড়ে তোলেন। যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একজন প্রভাবশালী নেতার ‘আশীর্বাদে’ খিলগাঁওয়ের কাওসার হত্যা মামলার আসামি হয়েও চার্জশিট থেকে বাদ পড়েন খালেদ। খালেদের প্রতিপক্ষ হওয়ায় কাওসার হত্যা মামলার অপর আসামি মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার সোহেল কানাডায় পলাতক। আরেক আসামি রিপনও দেশছাড়া।

খালেদের হেলমেট বাহিনী

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মতিঝিল, দিলকুশা, কমলাপুর, খিলগাঁও এলাকার আতঙ্ক খালেদ তরুণ-কিশোরদের নিয়ে গঠন করেন হেলমেট বাহিনী। মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসম্পাদক শাহজাহানপুরের অঙ্কুর ও রিজভী হোসেন রিবির নেতৃত্বে হেলমেট বাহিনী খালেদের টেন্ডারবাজিসহ অপরাধমূলক কাজগুলো করত। যারা বাধা হয়ে দাঁড়াত তাদের ওপর মোটরসাইকেল নিয়ে হামলা করত তারা। এদের মাধ্যমেই মেরাদিয়া, কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ। খিলগাঁওয়ে শাহাদাত হোসেন সাধু ও টেম্পো কবিরের মাধ্যমে তালতলা সি-ব্লকে ক্লাব বসিয়ে ইয়াবার হাট বসাতেন গ্রেপ্তার হওয়া এই যুবলীগ নেতা। শান্তিনগর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের সভাপতি পদ দখল করে খালেদ বাহিনীর লোকজন সেখানে রাতের আঁধারে ইয়াবা বাণিজ্য করত বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুত্র : আমাদের সময়
এন এ/ ২০ সেপ্টেম্বর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে