Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৯ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-১৭-২০১৯

কথায় কথায় ‘বহিষ্কার’ করে যে বিশ্ববিদ্যালয়

উদিসা ইসলাম


কথায় কথায় ‘বহিষ্কার’ করে যে বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর- যেন রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটকের ‘মহাপঞ্চকের পাঠশালা’! সেখানে জানালার বদ্ধ কপাট খুললেই মহাপঞ্চক ও তার শিষ্যরা দিতেন অভিশাপ আর প্রায়শ্চিত্তের ফতোয়া। আর গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পান থেকে চুন খসালেই তাদের সংশোধন বা সাজার নামে দেওয়া হচ্ছে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের নোটিশ! কেবল গত এক বছরেই অন্তত ২৭ শিক্ষার্থীকে এ ধরনের বহিষ্কারের নোটিশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদিও নোটিশপ্রাপ্ত সবার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ শেষ পর্যন্ত বহাল থাকেনি, তবে এসব নোটিশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ভীতি সৃষ্টি করেছে যে বাকি শিক্ষাজীবনটা পারলে একদিনে শেষ করতে পারলে বাঁচেন তারা।

কথায় কথায় বহিষ্কার করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অপরাধগুলোও কৌতূহল সৃষ্টি করার মতো। বেশিরভাগই মানববন্ধন করে বা ফেসবুকে নিজের পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে পেয়েছেন এই শাস্তি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সাধারণ অধিকার হিসেবে বিবেচিত এই ঘটনাগুলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা জানতে গিয়ে পাওয়া গেছে চমকপ্রদ তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত পরিবেশে এসে শিক্ষার্থীরা যাতে ভিন্নপথে চলে না যায় সেজন্য শাসন করা ও সেশনজট এড়াতেই এ ধরনের কঠোর ‘শাস্তি’ দিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সেশনজটমুক্ত ক্যাম্পাস রাখতে কিছু কড়াকড়ি করা হয়। তবে বহিষ্কারের নোটিশ যে পরিমাণে দেওয়া হয় সে পরিমাণ কার্যকর হয় না।

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর আশীকুজ্জামান ভূইয়া বলেন, ‘সব জায়গা থেকে ফেল করে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা এসে ছোট ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। তাদের একটু শাসনের মধ্যে না রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত পরিবেশে এসে এরা ভিন্নপথে চলে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। তাই এ ধরনের কড়াকড়ি করা হয়।’

আর ছাত্রনেতা ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রত্ব হারানোর ভয় কার না থাকে! এ কারণেই সবকিছু জেনেও এখানে কেউ কোনও কথা বলতে চান না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে দেওয়া দেওয়া সাময়িক বহিষ্কারের চিঠি।

উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য হওয়ায় সুযোগ পেলেই এ বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজে খুলেছেন বলে দাবি করেন। ছাত্রছাত্রীদের শাসন করতে গিয়েও এ ধরনের কথা বলেন তিনি। সম্প্রতি ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া নামে এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় তাকে সাময়িক বহিষ্কার করার আগে নিজ কক্ষে ডেকে তুই তোকারি করে উপাচার্য তাকে বলেছিলেন, ‘আমি খুলছি বলেই তো তোর চান্স হইছে। না হলে তো তুই রাস্তা দিয়া ঘুরে বেড়াতি। বেয়াদব ছেলেমেয়ে।' তার এমন অহমিকা ভরা অশিক্ষকসুলভ মন্তব্য এবং অদ্ভুতুড়ে দৃষ্টিভঙ্গির কারণেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হুট-হাট দেওয়া হচ্ছে কারণ দর্শাও ও বহিষ্কারের নোটিশ। তবে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন এ প্রতিবেদকের ফোন ধরেননি।সরকারবিরোধী প্ল্যাকার্ড বহন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থীকে দেওয়া কারণ দর্শাও নোটিশ।

হিসাব বলছে, এক বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কারের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে এদের মধ্যে সবার বহিষ্কার কার্যকর হয়নি। মুচলেকা দিয়ে বা ক্ষমা চেয়ে অনেকে টিকে গেছেন। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মানববন্ধনে সরকার ও প্রশাসনবিরোধী বক্তব্য, ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন বক্তব্য প্রদান ও র‌্যাগিং।

আরেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া সাময়িক বহিষ্কারের নোটিশ।

জানা গেছে, চলতি বছর জুন মাসে ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মানববন্ধন করায় ১৪ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করার অভিপ্রায়ে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সরকার ও প্রশাসনবিরোধী প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন বহন ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করা এবং অত্যুৎসাহী হয়ে অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন করার আগেই আপনাদের আন্দোলন করার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিপন্থী একটি গর্হিত কাজ।’

একসঙ্গে পাঁচ শিক্ষার্থীকে দেওয়া করাণ দর্শানোর নোটিশ।

ছাত্রত্ব হারানোর ভয়ে সবাই কথা বলতে ভয় পায় উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রথিন্দ্রনাথ বাপ্পি বলেন, এখানে শিক্ষার্থীরা মত প্রকাশ করবে এমন পরিস্থিতি নেই। রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বললে তাদের বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব নিয়ে ছাত্ররা কথা বলবে এটাই তো হওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ায় বহিষ্কার, ফেসবুকে লেখালেখিকে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হিসেবে চিহ্নিত করা, উপাচার্যের আইডি হ্যাক এসব বলা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এসব নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো কথা বলে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা এটা নিয়ে কথা বলিনি এখন পর্যন্ত। ক্যাম্পাসে কথা বলার পরিবেশ নেই।

মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পাওয়া এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এরা ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। কথা বললেই ছাত্রত্ব যায় এটা স্ট্যাবলিশ করা গেলে আর কেউ কিছু নিয়ে প্রশ্ন করবে না। যেমন ধরেন আমি আর কখনোই প্রতিবাদ করবো না। কারণ, আমি পড়াটা শেষ করতে চাই।

পাঁচ শিক্ষার্থীকে দেওয়া বিভিন্ন মেয়াদের বহিষ্কারাদেশ।

এদিকে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের নোটিশ দেওয়াকে ‘একটু কড়াকড়ি’ বলে উল্লেখ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আশীকুজ্জামান ভূইয়া। তিনি বলেন, একবার শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমের ময়লাকে কেন্দ্র করে প্রফেসর বিলাসকান্তি বালার বহিষ্কার চেয়ে স্লোগান দিলো। ১৩ হাজার শিক্ষার্থী, ময়লা জমতেই পারে। সেটার অন্য কোনও উপায় ছিল না? ওই ঘটনায় আমরা তদন্ত করে তিনজনকে মওকুফ করেছি। আর ৩ জনের অপরাধ ক্ষমাযোগ্য ছিল না। ফলে তাদের ৬ মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ধরনের অন্যায়ের পর শাস্তি না দিলে এসব চলতেই থাকবে।

কেন কথায় কথায় বহিষ্কার সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে কয়টা বিশ্ববিদ্যালয় তার মধ্যে আমরা ব্যতিক্রম। আমাদের কোনও সেশনজট নেই। একদিনের জন্যও ক্লাস বাদ যায় না, বেশি কড়াকড়ি করি, বেশি শাসন করি। তা না করলে বিভিন্ন দিকে তারা চলে যায়। তবে বহিষ্কার খুব বেশি হয় না। যারা অন্যায় অপরাধ করে তাদের করি, ক্ষমাও করি। একটা সেমিস্টার বহিষ্কার করি।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
এন কে / ১৭ সেপ্টেম্বর

শিক্ষা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে