Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (16 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-১৬-২০১৯

আশুরা ও কারবালার ১০টি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা

আশুরা ও কারবালার ১০টি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। আর এ মাসের দশম তারিখকে বলা হয় আশুরা। ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঐতিহাসিক শত শত ঘটনা। কোরআন, হাদিস ও ইসলামের ইতিহাসের তথ্যানুসারে, আসমান-জমিন সৃষ্টি হয়েছে মহররম মাসের দশ তারিখে

মহররম মাসে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্তবৃন্দের কাছ থেকে একটা আবেদন আসতে থাকে। সেটা হচ্ছে জুমআয়, তালিমী হালকায়, বয়ানের মঞ্চে বা ওয়াজ মাহফিলে আশুরা ও কারবালার ইতিহাসটা যেন বলি।

যে কোনো কাহিনী পাঠে আমার কাছে সব সময়ই শিক্ষাটা প্রাধান্য পায়। তাই শিক্ষাটা বলার উদ্দেশ্যে কাহিনী বলা শুরু করি। সেই সুযোগে শিক্ষাটা উপস্থাপন করি। আজ আমরা আশুরা থেকে তিনটি ও কারবালা থেকে সাতটি শিক্ষা উপস্থাপন করব।

এক: যে কোনো সাফল্য ও বিজয় পালন হবে রোজা রাখার মাধ্যমে।

হজরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস প্রমাণ করে নবীজি মক্কায় থাকতে কোরাইশদের অনুসরণে আশুরার রোজা রেখেছেন। যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন সেখানকার বনু কুরাইজা বনু নযীর ও বনু কায়নুকার ঈহুদীদের রোজা রাখতে দেখেন।

তিনি তাদের প্রশ্ন করলেন, তোমরা কেন রোজা রাখ? তারা বলল, আশুরার এই দিনে আল্লাহ তাআলা ফেরাউন বাহিনীকে মিশরের নীলনদের লোনা পানিতে চুবিয়ে পরাজিত করে, আমাদের নবী মুসা (আ.) তার জাতিকে বিজয় দান করেছিলেন। এর শুকরিয়া স্বরূপ তিনি রোজা রাখতেন। আমরাও তাই করি।

তিনি বললেন, আমরা মুসাকে (আ.) তোমাদের চেয়ে বেশি অনুসরণ করি। তোমরা করও অর্ধেক অনুসরণ। কারণ তিনি বলে গেছেন, তোমরা আমাকে অনুসরণ করও। শেষ নবী আসলে তাকেও অনুসরণ করবে। তোমরা তার কথার অর্ধেকটা মানো এবং অর্ধেকটা মানো না।

পক্ষান্তরে আমরা তার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করি। কারণ আমাদের ধর্মগ্রন্থ বলছে, আমাদের বিধান মানব এবং মুসা আ. সালামকেও নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেব। আমরা আমাদের ধর্মের বিধিবিধান মানার সঙ্গে সঙ্গে মুসা (আ.).কে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান করি।

সুতরাং মুসা (আ.) ও তার জাতির এই বিজয়ে আমিও রোজা রাখব। আমার উম্মতকেও রোজা রাখতে নির্দেশ দেব। তিনি তাই করেছেন।

হজরত মুসা ও তার বংশধরের বিজয়ে, রোজার মাধ্যমে বিজয় পালন করেছেন তিনি। আমাদের নবীও তা গ্রহণ করেছেন। আশুরার এই অংশ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আল্লাহর দেয়া যে কোনো বিজয়কে রোজার মাধ্যমে উদযাপন করতে পারি।

দুই : অন্য ধর্মের কোনো সংস্কৃতির অনুসরণ করা যাবে না।

নবীজি যখন সাহাবায়ে কেরামকে রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন, তারা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, নবীজি, ঐদিন তো ইহুদীরা রোজা রাখে? আমরাও কি তাই করব?

নবীজি বললেন, আমরা তাদের মতো করব না। আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি তাহলে ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ যোগ করে দু'দিন রোজা রাখব। যাতে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বিধর্মী সংস্কৃতির সম্মেলন না ঘটে। ইসলাম এমন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডীত ধর্ম যে, স্বয়ং এবাদতে পর্যন্ত অন্য ধর্মের সাদৃশ্যের অবকাশ রাখে না।

সেখানে বিধর্মীদের অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, বেহায়াপনা অবলম্বন কতটা গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত তা সহজেই অনুমেয়। আশুরা থেকে কেউ যদি শিক্ষা নিতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে বিধর্মী-বিদেশি কৃষ্টি-কালচার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

তিন : অন্য ধর্মালম্বীদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক থাকলেও আন্তরিক বন্ধু বানানো যাবে না।

নবীজি বিধর্মীদের অনুসরণ-অনুকরণ থেকে উম্মতকে যেখানে কঠোর হস্তে নিবৃত্ত করেছেন। সেখানে তাদের সঙ্গে উঠা-বসা, ঘেঁষাঘেঁষি, অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রাখার সুযোগ থাকে না। উপরন্তু কোরআনে কারিম বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ট করে দেয়।

কোরআন বলছে,হে ঈমানদারগণ, তোমরা বিধর্মীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বানাবে না। কারণ তারা তোমাদের অকল্যাণ কামনা করে থাকে। তারা মনে-প্রাণে চায় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হও। মাঝে মধ্যে এটা তাদের মুখ ফঁসকে বেরিয়েও আসে। তোমাদের বিনাশ সাধনে তাদের হৃদয়ে আঁকা চক্রান্তের চক আরও ভয়ঙ্কর। আমি তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে দিলাম। বুদ্ধিমান হলে তোমরা বুঝবে। (সূরা আলে ইমরান আয়াত নম্বর ১১৮)

চার : সত্য-ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে।

পৃথিবীর আদিকাল থেকে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্যের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। চলমান পেক্ষাপটে সব পদক্ষপে যেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু সত্য-ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানকে বেছে নিয়েছিলেন। কোন একটা পক্ষকে সমর্থন করে বসে থাকলে চলবে না। হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সেদিন প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলেন। যে যাত্রা আজও ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।

পাঁচ : সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে। দমে যাওয়া যাবে না।

হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পেরেছিলেন শত্রুরা তাকে বাঁচতে দেবে না। ভালোভাবে জেনেও তিনি নীরব হননি। তার প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি জালিমের রক্তচক্ষু। দমিয়ে রাখতে পারেনি তার খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্পৃহা।

ছয়: ভাঙবো, তবু মচকাবো না।

যে কোনো অন্যায়ের প্রতিরোধে কোনো কণ্ঠ বলিষ্ঠ হলে, সেই কণ্ঠ চেপে ধরার জন্য যেমন চলে ভীতিপ্রদর্শন, তেমন চলে লোভ প্রদর্শন ও প্রলোভন। এ সবের সামনে মাথানত করা যাবে না। ভীতি উপেক্ষা করে, লোভ-প্রলোভনকে পদদলিত করে সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে হবে হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর মতো।

সাত : আন্দোলন-সংগ্রামের সহযোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মিতা ও উদারতা।

হজরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু সুরাহার জন্য ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে তিনটি প্রস্তাব রেখে যখন কোনো সুফল পাননি, তখন সঙ্গীদের জড়ো করে বললেন, সংগ্রামী সঙ্গী ও বন্ধুরা আমার, শত্রুরা একমাত্র আমার ছিন্ন মস্তক চায়। তোমাদের কারও মাথা নয়। তারা একমাত্র আমার রক্ত চায়। তোমাদের কারও রক্ত নয়। সুতরাং এই যাত্রাপথে আমাকে একা যেতে দাও। রাতের আঁধারে তোমরা যে যার মতো করে আত্মরক্ষা করও। সংকট মুহূর্তে সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা ও উদারতা প্রদর্শনের এমন নজীর তাবৎ দুনিয়ার বিশ্বনেতাদের কারও অর্জনে আছে কি?

আট : পেশি শক্তির জয় সাময়িক, আদর্শিক শক্তির বিজয় চিরন্তন।

রাষ্ট্রীয় অস্ত্রবল‌ ও জনবলে বলিষ্ঠ ইয়াজিদী বাহিনী কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনার মাধ্যমে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে শহীদ করে ক্ষণিকের জন্য আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললেও কারবালার ইতিহাস লেখা হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে।

ইয়াজিদ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ইয়াজিদ নামটা এত ধিকৃত হয়েছে যে, পৃথিবীজুড়ে মুসলিমতো নয়ই, ইহুদি-খ্রিস্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ পর্যন্ত এই নামে কেউ কারও সন্তানের নাম রাখে না। পক্ষান্তরে এক হুসাইন লোকান্তরে,লাখো হোসাইন ঘরে ঘরে, এই সত্য আজ সুবিদিত।

নয়: সুযোগসন্ধানী না হওয়া।

পরিস্থিতি আঁচ করে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সঙ্গীদের আত্মরক্ষার জন্য সুযোগ দিলেও জানবাজ ৭২ জন সহযোদ্ধা সত্যের এই পতাকাবাহীকে ছেড়ে শাহাদাতের সৌভাগ্যের পরশ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাননি। ইতিহাসে আজও তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তারা যদি সুযোগসন্ধানী হতেন ইতিহাসে তাদের নাম খুঁজে পাওয়া যেত না।

দশ : ইতিহাসের প্রতিশোধ বড়ই নির্মম।

ইবনে আমির কুফি। কুফা নগরীর এক বয়স্ক নাগরিক।কুফার দারুল খেলাফত বা গণভবনে বসা ছিলেন। তৎকালীন গণভবনের অধিপতি খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান-এর কাছে। এমন সময় খলিফার প্রতিপক্ষ মুসআব বিন জুবায়েরের ছিন্ন মস্তক খলিফার টেবিলে রাখা হয়। এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হন কেঁপে ওঠে তার গোটা শরীর।

খলিফা তাকে ধমক দিয়ে বললেন, একটামাত্র ছিন্ন মস্তক দেখে প্রকম্পিত হচ্ছো? তাহলে কুফাবাসীরা বীরত্বের বাহাদুরি করে কিসের বলে? তদুত্তরে ইবনে আমির বললেন, জাহাপনা একটিমাত্র ছিন্ন মস্তক দেখে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইনি।

আমাকে আল্লাহ বয়স দিয়েছেন। এই দারুল খেলাফতে দীর্ঘদিন ধরে আসা-যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। এই দারুল খেলাফতে ইতিপূর্বে আমি বহু ছিন্ন মস্তক দেখেছি। বলব আপনাকে সেই দাস্তান? খলিফা : সেটা কি?

ক. আমি একদিন এই চেয়ারে বসে ছিলাম। তখন এই দারুল খেলাফতের অধিপতি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। আমার চোখের সামনেই তার টেবিলে হোসাইন রাদিআল্লাহু তা'আলা আনহুর ছিন্ন মস্তক রাখা হয়েছিল।

খ. এরপর এই দারুল খিলাফতের অধিপতি হলেন মুখতার সাকাফি। তার সঙ্গে আমি এই চেয়ারে বসা ছিলাম। দেখলাম উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের ছিন্নমস্তক এই টেবিলে রাখা হচ্ছে।

গ. এরপর এই ভবনের অধিপতি হলেন মুসআব বিন জুবায়ের। আমি এই কক্ষে বসে ছিলাম। দেখতে পেলাম মুখতার সাকাফির ছিন্নমস্তক উপস্থাপন করা হচ্ছে এই টেবিলে।

ঘ. এরপর আপনি হলেন এই ভবনের অধিপতি। দেখতে পাচ্ছি মুসআব বিন জুবায়েরের ছিন্নমস্তক আপনার টেবিলে রাখা হচ্ছে।

আমি এই ভেবে শঙ্কিত-প্রকম্পিত হচ্ছি যে, আপনার পরে কে হবে এই ভবনের অধিপতি? কার সঙ্গে আমি এই ভবনে বসব? আর দেখব তার সামনে আপনার ছিন্ন মস্তক এখানে রাখা হচ্ছে?

খলিফা বললেন, ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাসের প্রতিশোধ বড়ই নির্মম। আমি এই ভবন ভেঙ্গে ফেলব। কিন্তু ভবন ভেঙে ফেলাই কি সমাধান? যদি না ভবন মালিকের আজীবন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার স্বপ্ন ভাঙ্গা না হয়?

এন এইচ, ১৬ সেপ্টেম্বর

ইসলাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে