Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ , ৪ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-১৬-২০১৯

শোভন-রাব্বানী হঠাৎ তৈরি হয় না

ড. জিয়া রহমান


শোভন-রাব্বানী হঠাৎ তৈরি হয় না

ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের নানারকম দুস্কর্মের খতিয়ান সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত-প্রকাশিত হচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমেই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার কঠোর মনোভাবের কথাও জেনেছিলাম। অবশ্যই সাধুবাদ জানাব, ধন্যবাদ দেব দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে এ জন্য যে, তিনি শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছেন সময়ক্ষেপণ না করে এবং একই সঙ্গে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফের কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কর্মের মধ্য দিয়ে অনেক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি আত্মসমালোচনার এবং নেতৃত্বে থেকে নির্মোহতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তাও অনুসরণযোগ্য হয়েই থাকবে। তিনি তার সার্বিক কর্মকাণ্ডের জন্যই আমাদের জাতির পিতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধমনিতিও বইছে বঙ্গবন্ধুর রক্ত। কাজেই তার কাছে তো এমন দৃঢ়তাই জাতির প্রত্যাশিত।

চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিও সচেতন সবার প্রত্যাশিতই ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সার্থকতা-জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে যারা ক্ষমতার অপরাজনীতির জোরে অর্থবিত্তের মোহে অন্ধ হয়ে পড়েছেন তাদের এমন শাস্তিই প্রাপ্য। অপরাধের যদি যথাযথ প্রতিকার না হয় তাহলে অপরাধের পরিধি বিস্তৃত হয়। অপরাধের প্রেক্ষাপট তৈরির নানাবিধ কারণ থাকে। যদি রাজনৈতিক কারণে এ প্রেক্ষাপট তৈরি হয় তাহলে এর ক্ষত রাষ্ট্রে গভীর হয়। কারণ রাজনীতি সমাজ নিয়ন্ত্রিত করে, পরিচালিত করে। রাষ্ট্রের ক্ষত সমাজে বিস্তার লাভ করে। আওয়ামী লীগ যেমন এ দেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজনৈতিক দল তেমনি ছাত্রলীগও এরই উত্তরাধিকার বহনকারী আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন। এই ছাত্রলীগ অনেক প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতার জন্ম দিয়েছে, যারা জাতীয় রাজনীতিতে পরবর্তী ধাপে বিশেষ অবদান রেখেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর পূর্ব অধ্যায়ে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস সমুজ্জ্বল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য, এই সমুজ্জ্বলতায় কখনও কখনও কারও কারও হীনস্বার্থবাদিতার কারণে কলঙ্কের দাগ পড়েছে। শোভন-রাব্বানীর দাগটা একটু বেশি মোটা হয়ে উঠেছিল। সব বাড়াবাড়ির সীমা আছে, দম্ভেরও পতন আছে, পাপেরও শাস্তি আছে। তারা তাদের প্রাপ্যটুকু পেয়েছে। তবে এ ব্যাপারে পুরোপুরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলারও অবকাশ নেই। কারণ এ রকম শোভন-রাব্বানী এমনি এমনি তৈরি হয় না।

তবে শোভন-রাব্বানীর পরিণতি দেখে যদি বিপথগামীরা নিজেদের শোধরে নেন তবেই মঙ্গল। আগেই বলেছি, এ দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস গৌরব ও ঐতিহ্যের। ছাত্রলীগ এর ধারক-বাহক। স্বাধীন দেশের ইতিহাসে ঐতিহ্যের ছাত্রলীগের কোনো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অতীতে এভাবে কেলেঙ্কারি, অনিয়ম, চাঁদাবাজির অভিযোগে বরখাস্ত হতে হয়নি। শোভন-রাব্বানীর স্থলাভিষিক্ত যারা হলেন তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। তারা তাদের কর্মের মধ্য দিয়েই সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে পারেন। বক্রপথে পা বাড়ালে পরিণতি যে ভালো হয় না এমন ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। নতুন নেতৃত্ব সেটা মনে রেখে এগোলে তাদের চ্যাঞ্জেলের পথটা প্রশস্ত হতে পারে। যে সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা নিলেন তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দৃষ্টান্তমূলক। এমন দৃষ্টান্ত ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন ছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কিংবা শুদ্ধি অভিযানের যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো। অগণতান্ত্রিক শাসকরা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের জন্য অনেক অপ্রীতিকর কাণ্ডকীর্তিই করেছেন। এরই কুফল নানা ক্ষেত্রে আমরা ধারাবাহিকভাবে ভোগ করছি। ছাত্ররাজনীতিও এর বাইরে থাকতে পারেনি। শেখ হাসিনা বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হয়েই সুযোগসন্ধানী সমালোচকদের কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে নিজ পার্টির মধ্যে সংস্কারের মধ্য দিয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বন করেছেন, যে পন্থা নির্ধারণ করা খুব সহজ নয়। বঙ্গবন্ধু যেভাবে সাধারণ মানুষের অনুভূতি উপলব্ধি করতেন শেখ হাসিনাও তাই করেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি শুধু ছাত্রলীগের ব্যাপারেই কথা বলেননি। অঙ্গ সংগঠনসহ মূল দলের ব্যাপারেও কথা বলেছেন। যারা ক্যাডার রাজনীতি তোষণ করেন তাদের জন্যও কড়া বার্তা রয়েছে।

আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা উপসর্গ রয়েছে। এই উপসর্গগুলোর ভিত্তিতেই সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক কর্মকাণ্ড নির্ণিতও হয়। আধুনিক সমাজ নির্মাণে এখনও অনেক বাধা বিদ্যমান। কাজেই সংস্কার, শুদ্ধি অভিযান দুই-ই জরুরি। আমার কাছে মনে হয়, এর বাইরে আরও যে বিষয় নিয়ে চিন্তা করা দরকার তা হলো, রাষ্ট্রের প্রতি স্তরে গণতন্ত্রায়নের ব্যাপারে আরও জোর দেওয়া। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার কারণে অনেক অপছায়া বিস্তৃত হয়েছে। দুর্নীতির বীজ সেখানেও প্রোথিত। সনাতনী সমাজের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার দরকার।

নতুন নেতৃত্বের অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। আমি বিপথগামীদের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করি না; আমি চিন্তিত রাষ্ট্র ও সমাজে অগণতান্ত্রিক শাসকদের আমলে দুর্নীতিসহ নানারকম যে অসঙ্গতি সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে। শোভন-রাব্বানীরা তো এমনি এমনিই এই সমাজে জন্মাচ্ছেন না, তাদের জন্মের পেছনে, বেড়ে  উঠার পেছনে ওই যে বললাম উপসর্গের কথা এর যোগসূত্র রয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও এর প্রত্যেকটি অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মকে অতীত ঐতিহ্যের পথ অনুসরণ করতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনে রাখা উচিত, আধুনিক যে রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার প্রচেষ্টা চলছে এর পূর্ণ বিকাশে সবারই সে রকম অঙ্গীকারও প্রয়োজন। পশ্চিমা বিশ্বে আমরা দেখতে পাই নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নেতারা উঠে আসেন। তাদের দেশে গণতন্ত্র বিকাশে এই নেতাদের ভূমিকা রয়েছে ব্যাপক। আমরা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম না। এখন যেহেতু এই অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে শেখ হাসিনা নতুনভাবে অনুধাবন করছেন সেহেতু সবাইকে এ ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা করতে হবে। আওয়ামী লীগ বড় দল কিন্তু দলের থিংকট্যাংক সে রকম সবল নয়। তাই দলনেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সব ব্যাপারে সজাগ থাকতে হয়। জাতীয় সংসদে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাধান্য বাড়ছে। এ নিয়ে আমরা চিহ্নিত। এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। তাই বের করে আনতে হবে নতুন নতুন মুখ। আর এই মুখ বেরিয়ে আসবে ছাত্ররাজনীতির অঙ্গন থেকেই। কাজেই এখানে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই।

যারা প্রকৃত অর্থেই দেশকে ভালোবাসেন তাদের উচিত হবে এ ধরনের কাজে ব্যাপক সহায়তা দেওয়া। আমরা যেসব দুর্নীতির কথা শুনছি তা রোধ করতে হলে দৃষ্টি দিতে হবে উৎসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় কাজ হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। তার ওপর জনগণের আস্থা আছে বিধায় জনরায় ব্যাপকভাবে দলের পক্ষে পরিলক্ষিত হয়েছে। এককভাবে শেখ হাসিনার সব কাজ করা সম্ভব নয়। তাই নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতাকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। দক্ষতা-স্বচ্ছতা-যোগ্যতা এই তিনের মানদণ্ডে গড়ে তুলতে হবে আগামীর কর্ণধারদের। যে জায়গায় যিনি যোগ্য তাকেই সেখানে বসাতে হবে। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ করতে চলেছি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপন করার প্রস্তুতি চলছে। দেশ বিনির্মাণের চিন্তার দিগন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। এমতাবস্থায় একজন রাব্বানী কিংবা শোভনের মতোরা দলের বোঝা, এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা। সমাজবিজ্ঞানীরা এরও ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ ইতিমধ্যে নানাভাবে করেছেন। বৃহৎ স্বার্থে এসব বিষয় পর্যালোচনায় রাখতে হবে।

রাজনীতির দোষ-ত্রুটি সারতে হবে রাজনীতি দিয়েই। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার যে কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে তা বাস্তবায়নে দুর্নীতিপরায়ণরা বড় বাধা। এদের শিকড় উপড়ে ফেলার যে দৃষ্টান্ত নতুন করে স্থাপিত হলো এটাই হলো শুদ্ধতার শ্রেয়তম পথ। ধারাবাহিক তৃতীয় মেয়াদে এই সরকারের অর্জন কম নয়। বিপুল ভোটে নির্বাচিত সরকারের ভাবমূর্তি দুস্কর্মকারীদের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা স্থাপনই যথেষ্ট নয়, প্রশাসনিক কাঠামোতেও স্বচ্ছতার খুব দরকার। কাজেই আমলাতন্ত্রের সংস্কারেও সরকারকে সেভাবেই মনোযোগী হতে হবে। আর দুর্নীতির ব্যাপারে 'শূন্য সহিষ্ণুতা'র অঙ্গীকারে দৃঢ়  থাকা চাই।

সমাজবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, অপরাধ বিজ্ঞান
বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এন এ/ ১৬ সেপ্টেম্বর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে