Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৬ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-০৯-২০১৯

সুপ্রভাত সড়ক দাপাচ্ছে নাম-রঙ বদলে

হাসান আল জাভেদ


সুপ্রভাত সড়ক দাপাচ্ছে নাম-রঙ বদলে

ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর- চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সামনের সড়কে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। এর পর ৮ দফা দাবি আদায়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ঘটনার পর সুপ্রভাত বাসটির রুট পারমিট বাতিল করে দেয় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। কিন্তু বিআরটিএর এ ঘোষণার আগেই অবস্থা বেগতিক দেখে বদলে ফেলা হয় সুপ্রভাত পরিবহন নামটি, বদলে ফেলা হয় এর রঙও।

এর পর ভিক্টর ক্ল্যাসিক, আকাশ, সম্রাট ট্রান্সলাইন নাম ধারণ করে একই রুটে দিব্যি চলাচল শুরু হয় প্রাণঘাতী সুপ্রভাতের। গায়ের রঙ আর নাম পাল্টালেও চরিত্র থেকে যায় আগের মতোই। গত বৃহস্পতিবার ভিক্টর নামধারী সেই সুপ্রভাতেরই একটি বাসের চাপায় নিহত হন সংগীত পরিচালক পারভেজ রব। তাকে হত্যা করার জেরে মামলা করে এই সংগীতশিল্পীর পরিবার। দুদিন পর গত শনিবার সেই ভিক্টর অর্থাৎ সুপ্রভাতেরই চাকায় পিষ্ট করে হত্যার চেষ্টা করা হয় সদ্যনিহত পারভেজ রবের ছেলে ইয়ামিন আলভী ও তার বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটনকে। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি ছোটনকে। সেদিনই মারা যান তিনি। আর গুরুতর আহত আলভীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক; হাসপাতালের বেডে কাঁতরাচ্ছেন তিনি।

গাড়িচালকদের ভাষ্য, বাস মালিকদের সঙ্গে দৈনিক চুক্তি এবং কোম্পানির চাঁদাবাজিসহ সংসারের খরচ তুলতেই তারা বাধ্য হয়ে বেপরোয়াভাবে বাস চালাচ্ছেন, পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামছেন এবং মরিয়া হয়ে ওভারটেকের ঝুঁকি নিচ্ছেন। এতে করে ঘটছে একের পর এক হত্যাকান্ড। অভিযোগ রয়েছে, নাম আর রঙ পাল্টালেও সেই সুপ্রভাতই যে চলছে রাজধানী দাপিয়ে, তা দেখেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না রাজধানী সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (আরটিএ) ও বিআরটিএ।

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) লোকমান হোসেন মোল্লা এ প্রতিবেদককে বলেন, সুপ্রভাত পরিবহন এখন ভিক্টর ক্ল্যাসিক নামে চলছে কিনা, তা আমার জানা নেই। এটি দেখার দায়িত্ব আরটিএর। তবে বিআরটিএ সূত্র বলছে, ভিক্টর পরিবহনের নামে ৪৩৬টি বাস পরিচালনার অনুমতি আছে। সেই নামেই সুপ্রভাতের বাসগুলো চালানো হচ্ছে।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, সদরঘাট-গাজীপুর রুটে যাত্রী বহনে ‘সুপ্রভাত প্রাইভেট লিমিটেড’ কোম্পানির নামে বিআরটিএর রুট পারমিট ইস্যু ছিল ১৮৭টি বাসের। কিন্তু বাসপ্রতি এককালীন এক লাখ টাকা ও দৈনিক হারে চাঁদা আদায়ের সুবিধায় ওই রুটে চলছিল ৩শ বাস-মিনিবাস। অতিরিক্ত বাসের ভিড়ে কোম্পানি ও পরিবহন নেতাদের চাঁদাবাজির অর্থ মেটানোসহ দৈনিক হারে চুক্তিভিত্তিক খরচ মেটাতে প্রতি ট্রিপেই ওভারটেকিংয়ের বেপরোয়া রেষারেষিতে জড়িয়ে পড়েন সুপ্রভাতের চালকরা।

পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপ্রভাত স্পেশাল সার্ভিস থেকে ভিক্টর ক্ল্যাসিকসহ নতুন ব্যানারে এসব বাস নামানোর নেপথ্যে রয়েছেন এক প্রভাবশালী পরিবহন নেতা। জাবালে নূর পরিবহনের বাসের ধাক্কায় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শহীদ রমিজউদ্দীন স্কুল-কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সুপ্রভাত বাস কোম্পানিতে একচেটিয়া হস্তক্ষেপ করেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্যাডে তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সুপ্রভাত পরিবহনকে ‘অধিগ্রহণ’ করা হয়।

এ বছরের ১৯ মার্চ আবরার হত্যাকান্ডের পর তার ইন্ধনে রাতারাতি নাম বদল করে সেই একই রুটে ‘ভিক্টর ক্ল্যাসিক’ বাস নামায় আগেরকার সুপ্রভাত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। ঠিক আগের মতোই চাঁদাবাজি, জুলুম চালক-কন্ট্রাক্টরদের ওপর চাপিয়ে দেয় বাস মালিকরা। এতে রাস্তায় নেমে সেই আগের মতোই বেপরোয়া অবস্থানে থাকে বাসচালকরা।

তবে চাঁদাবাজির অর্থ গ্রহণকে ভিত্তিহীন দাবি করে খন্দকার এনায়েত উল্যাহ এ প্রতিবেদককে বলেন, ভিক্টর ক্ল্যাসিক অনেক পুরনো রুট। এর সঙ্গে সুপ্রভাতের মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদ আলাদা। এ রুটে চাঁদাবাজির বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।

ভিক্টর ক্ল্যাসিকের কয়েক বাসচালক জানান, গাজীপুর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনে সুপারভাইজার রয়েছে। তারা প্রতিদিন বাসপ্রতি কোম্পানি খরচ হিসেবে ১০৩০ টাকা এবং লাইনম্যানের মাধ্যমে হাতখরচ আরও ২২০ টাকা চাঁদা তোলেন।

বিইউপির শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে হত্যা করা ছাড়াও একই দিন ভোরে আগের ট্রিপে বাড্ডার শাহজাদপুরের বাঁশতলায় সুপ্রভাতের ওই বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব ১১-৪১৩৫) স্কুলছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে (১৬) ধাক্কা দিয়ে গুরুতর আহত করে। ওই ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ২৩ এপ্রিল ডিবির পক্ষ থেকে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক) কাজী শরীফুল ইসলাম।

চার্জশিটে বলা হয়, আবরারের ঘাতক বাসটি মহাখালী-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটের হলেও সুপ্রভাত পরিবহন কোম্পানির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম আশরাফকে ম্যানেজ করে সদরঘাটের ভিক্টোরিয়া পার্ক-গাজীপুর রুটে চালানো হতো। এ জন্য দৈনিক সুপ্রভাতের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের লাইনম্যানকে ১০ হাজার ৩০ টাকা করে জমা দিতে হতো বাস মালিক ননী গোপালকে। আবার চালক-কন্ট্রাক্টরকে দিনে ৩ হাজার টাকায় চুক্তিতে দেওয়া হতো। চুক্তির টাকা উঠানোর পর গাড়ির তেল খরচ, নিজেদের ব্যয় তুলতে চালক পাল্লাপাল্লি করে গাড়ি চালাতেন। এ ছাড়া ওই বাসটি ৪৫ সিটের অনুমতি থাকলেও ৪৯ সিট বানানো হয়। চার্জশিটে পরিবহন কোম্পানির নেতাদের নাম এলেও অজ্ঞাত কারণে তাদের আসামি করা হয়নি।

সুপ্রভাতকে ভিক্টর ক্ল্যাসিকে রূপান্তর এবং সংগীতশিল্পী পারভেজ রব ও তার ছেলের বন্ধুকে হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে আশরাফুল ইসলাম আশরাফ গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি ভিক্টর ক্ল্যাসিকের সঙ্গে নেই। তবে সুপ্রভাতে ছিলাম।

ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনের পরিচালনা পর্ষদে থাকার কথা অস্বীকার করলেও গত ৩ সেপ্টেম্বর ভিক্টরের প্যাডে প্রতিটি বাস মালিক বরাবর চিঠিও পাঠান কোম্পানির সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশরাফুল ইসলাম আশরাফ। প্রতিবেদকের কাছে ওই চিঠি আছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও আশরাফুল ইসলাম আশরাফ বলেন, হয়তো ভুল করে আমার নাম চলে এসেছে। স্বাক্ষর কীভাবে এসেছে জানি না।

আর/০৮:১৪/১০ সেপ্টেম্বর

ঢাকা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে