Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ৭ জুন, ২০২০ , ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.6/5 (42 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-০৫-২০১৩

যুদ্ধাপরাধের বিচারই সরকারের প্রধান নির্বাচনী হাতিয়ার

জাহিদ হাসান



	যুদ্ধাপরাধের বিচারই সরকারের প্রধান নির্বাচনী হাতিয়ার
বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার ও এর মদদ গোষ্টি এখন তাদের একমাত্র নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিষয়টাকেই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের নির্বাচনী প্রচারনায় এখন উন্নয়নের কথিত জোয়ারের কথার চেয়ে যুদ্ধাপরাধের বিষয়টাকেই বি,এন,পি জোটকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। 
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশের ৫টা গুরুত্বপূর্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার দলের ও জোটের সবাই বলে বেড়াচ্ছে দেশ ও জনগনের জন্য সরকার এত উন্নয়ন করা সত্ত্বেও জনগন তাদের প্রার্থীদের ভোট দেয়নি। তাদের সবার বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভাষায় দেশে এমন উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাওয়ার পরেও তা নির্বাচেনে জনগনের বিবেচনায় আসেনি। হয়ত তাই এখন  শেখ হাসিনা ও তার সমর্থিত মহল আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য সরকারের কথিত উন্নয়নের গলাবাজি করার হাতিয়ারটা ভোতা হয়ে গেছে মনে করে জনগনের সামনে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধীদের বিচারের বিষয়টাকে নিয়ে বেশী হৈ চৈ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন দেশের ভেতরে ও দেশের বাহিরে যেখানে যে অনুষ্ঠানেই বক্তব্য / ভাষণ দেওয়ার জন্য যাচ্ছে বা সুযোগ পাচ্ছে সেখানেই যুদ্ধাপরাধের বিষয়টাকেই বেশী জোরালোভাবে ও ফলাও করে প্রচার করছে এবং এ বিষয়ে বি,এন,পি জোটকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চাচ্ছে। শেখ হাসিনা এখন দেশে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করার আগেই সরকারী সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী জনসভার মত যেখানেই ভাষণ দিচ্ছে সেখানেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে তাকে আবারও ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য জনতা ও দর্শক/শ্রোতাদের আহ্বান জানাচ্ছে। শেখ হাসিনা জনগনকে বলছে সে যদি আবার ক্ষমতায় যেতে না পারে তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তথা জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করার কাজটা শেষ করতে পারবেনা। সাথে সাথে সে বলছে বি,এন,পি জোট ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধের বিচারতো শেষ করবেনা বরং তা বন্ধ করে দিবে। আওয়ামীপন্থি সকল মহল এখন টিভি চ্যানেলসহ যে কোন ফোরামে এ ব্যাপারে বি,এন,পি’র অবস্থান কি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের পর বি,এন,পি’র কোন প্রতিক্রিয়া নাই কেন, বি,এন,পি জোট ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রাখবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্নবানে বি,এন,পি ও ১৮-দলীয় নেতাদের বিব্রত করার চেষ্টা করছে। এর আগে সরকারের বিরুদ্ধে যে কোন বিষয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনকে বলা হত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ বন্ধ করার জন্য তারা আন্দোলন করছে, আর এখন নির্বাচনের আগে বলছে যুদ্ধাপরাধের বিচার শেষ করার জন্য আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আসার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ আবার ক্ষমতায় আসার জন্য একমাত্র যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টা ছাড়া সরকার তাদের আর কোন কথিত ভাল কাজের উপর নির্ভর করতে পারছেনা। দেশে যদি এতই উন্নয়নের কাজ করে থাকে তবে জনগনতো আওয়ামী লীগকে এমনিতেই ভোট দিবে, এজন্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়টাকে বড় করে তুলে ধরতে হবে কেন ? অর্থাৎ বর্তমান হাসিনা সরকার বিগত ৪.৫ বছরের কথিত উন্ন্য়নের চেয়ে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটাই তার কাছে আগামী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মনে করছে। এজন্য মেয়াদের শেষ সময়ে ( নির্বাচনের প্রাক্কালে ) নিজেদের পছন্দানুযায়ী গঠিত ট্রাইবুনালের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারাধীন কথিত অভিযুক্তদের রায় ঘোষণা করে সারা দেশে অপ্রত্যাশিত তোলপাড় সৃষ্টির মাধ্যমে জনমত তাদের পক্ষে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে। 
কিস্তু প্রকৃত অর্থে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার বিষয়টা তাদের কোন নৈতিক বা আদর্শিক বিষয় নয়, তাদের নিজের ও দলীয় স্বার্থে বি,এন,পি জোটকে দূর্বল করার জন্য এটা তাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহি:প্রকাশ মাত্র। এর কারণ হিসেবে প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে আওয়ামী লীগ এখন কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের নেতাদের বিচার করছে সেই আওয়ামী লীগ এরশাদ সরকারের ৯ বছরের শাসনকালে ( ১৯৮২-৯০ ) তাদের কারো বিচার করাতো দূরের কথা বরং জামায়াতকে সাথে নিয়ে এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে স্বৈরশাসককে সহায়তা করেছে। এমনকি তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ হাসিনার নির্দেশে জামায়াতের তৎকালীন আমীর গোলাম আযমকে পায়ে ধরে সালাম করে তার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪-৯৫ সালে বি,এন,পি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক দাবী আদায়ের অন্দোলনে জামায়াতকে সহযোগী সংগঠন ও শক্তি হিসেবে সাথে নিয়ে যুগপদ আন্দোলন করেছিল, হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তখন জামায়াতের মতিউর রহমান নিজামী ও মুজাহিদের পাশাপাশি চেয়ারে বসে আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে বৈঠক করেছে, পরবর্তিতে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকারও গঠন করেছিল এবং বিনিময়ে সংসদে জামায়াতকে একটা মহিলা আসন উপহার দিয়েছিল। সুতরাং স্বাধীনতা পরবর্তি একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যেহেতু জামায়াতের তথা যুদ্ধাপরাধের বিচার না করে বরং জামায়াতকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে সেহেতু ৪০ বছর পর এখন যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী কথিত অপরাধের দায়ে জামায়াত বা এর নেতাদের বিচার করার উদ্যোগকে আওয়ামী লীগের নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান হিসেবে মনে করার কোন কারণ নাই এবং তাদের বিচার করার কোন নৈতিক অধিকারও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের থাকতে পারেনা। 
জামায়াত ২০০১ সালের নির্বাচনে বি,এন,পি’র সাথে নির্বাচনী জোট বেঁধে নির্বাচন করায় ঐ নির্বাচনে বি,এন,পি জয়লাভ করে এবং জামায়াতও সংসদের ১৮ আসনে জয়ী হয়। ঐ নির্বাচনে বি,এন,পি জোটের কাছে হেরে যাওয়ার পর থেকেই হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা কেবলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বি,এন,পি জোটকে দূর্বল করার উদ্দেশ্যে ৪০ বছর আগের নিষ্পত্তি বা সমাপ্ত হয়ে যাওয়া যুদ্ধাপরাধের বিষয়টাকে টেনে এনে জামায়াতকে ধ্বংশ করার জন্য্য ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টাকে জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছিল এবং ঐ নির্বাচনের ফলাফলকে মাথায় রেখে ভাবছে ২০১৩-২০১৪ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনের আগেও এই একই বিষয়ের উপর ভর করে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়া যাবে। 
যে কারণে কথিত মানবতাবিরোধী আপরাধের বিচার করার নৈতিক অধিকার আওয়ামী লীগের নাই এবং ৪০ বছর পর এ বিচার করার কোন যৌক্তিকতা বা বাধ্যবাধকতা থাকতে পারেনা তার মধ্যে অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো : যুদ্ধাপরাধ বিষয়টার নিষ্পত্তি হয়ে যায় ১৯৭২ সালেই। শেখ মুজিবের শাসনামলে শিমলা চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে “সুন্দর ভবিষ্যতের” স্বপ্নে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যকে হাতে পেয়েও ছেড়ে এবং মাফ করে দেওয়া হয়। যে পাকিস্তানী সৈন্যরা নয় মাসের যুদ্ধের সময় বাংগালী মা-বোনদের উপর প্রত্যক্ষভাবে জুলুম নির্যাতন চালিয়ে মানবতাবিরোধী তথা যুদ্ধাপরাধ করেছিল এবং তাদেরকে এ কাজে সহায়তার জন্য জোরপূর্বক, বন্দুকের গুলির মূখে রাজাকার, আলবদর বাহিনী তৈরী করতে বাংগালীদের বাধ্য করেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা স্বাধীনতার জনক তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব সেই পাকিস্তানীদের বাংলাদেশের মাটিতে অর্থাৎ হাতের মুঠে পেয়েও মাফ করে  ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে তৃপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীসহ ৯০ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যকে “পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কের” আশায় ( কেন ?) মাফ করে ও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঐ চুক্তিতে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল “ঋড়মরাব ধহফ ভড়ৎমবঃ” অর্থাৎ ক্ষমা করে দিলাম এবং ভুলে (অতীত) গেলাম। জঘন্য পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদেরকে মাফ করে দিয়ে এবং অতীত ভুলে যাওয়ার লিখিত চুক্তি করে শেখ মুিজব তখন মহানুভবতা দেখিয়েছিলেন। পাকিস্তানী সৈন্যদের মাফ করে দিয়ে শেখ মুজিব তখন বিশ্ববাসীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “তোমরা দেখ বাংগালীরা ক্ষমা করতেও জানে।” যে পাকিস্তানী সৈন্যরা সরাসরি আমাদের বাবা-ভাইদের গুলি করে মেরেছিল, মা-বোনদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েয়েছিল, বাংগালীদের বাড়ি-ঘর আগুনে পুড়িয়েছিল সেই পাকিস্তানীদেরকে যদি হাতের মুঠে পেয়েও “পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কের” আশায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাদের অপরাধকে ভুলে যেতে বলা হয় তবে তাদেরকে যারা শুধু সহায়তা করেছিল ( অনেকটা বাধ্য হয়ে) সেই স্বজাতীয়দের কেন ৪০ বছর পর কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার করা হবে ? শেখ মুজিব তখন শুধু বাংগালীরা যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদেরকে মাফ করেন নাই। কিন্তু পরবর্তিতে সায়েম / জিয়া সরকার (৬ বছর), এরশাদ সরকার (৯ বছর), খালেদা সরকার ( ৫ বছর) , হাসিনা সরকার ( ৫ বছর), আবার খালেদা সরকার ( ৫ বছর) মোট ৩০ বছর যাবত কোন সরকারের আমলেই তাদের ( যাদেরকে আজ কথিত অপরাধে বিচার করা হচ্ছে ) কাউকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি, বরং তাদেরকে জোটে ও সঙ্গে টেনে একত্রে আন্দোলন ও ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করা হয়েছে। এমনকি এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ কোন পরিবারের কেউ কোথাও তাদের বিরুদ্ধে একটা মামলাও করেনি। এখন ৪০ বছর পর একটা মিমাংশিত বিষয়কে কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য মানবতাবিরোধীদের (যাদের অনেকের নাম ১৯৭২/৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত নাই) বিচারের তামাসা সৃষ্টি করে দেশটাকে অশান্ত করা হয়েছে। অথচ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশীদের দ্বারা প্রতিদিন গড়ে ১০০টারও বেশী জঘন্য ( ধর্ষণ, খুন করে লাশ টুকরা টুকরা করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা - যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীরাও করেনি ) মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে। নিজ দেশে নিজেরা যখন প্রতিনিয়ত জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত এবং এ কলংক থেকে জাতিকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়না অথবা এসব অপরাধের বিচার না করে বরং বিভিন্নভাবে দেশে এই মানবতাবিরোধী আপরাধকে উৎসাহিত করা হয় তখন কি ৪০ বছর আগের মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত অভিযোগে বিচার করার নৈতিক অধিকার থাকে ?
শেখ মুজিব তার জীবদ্দশায় দালাল আইণ বাতিল করে পাকিস্তানীদের সহায়তাকারী বাংগালী দালালদেরকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন ( বিশেষ কিছু অপরাধের সাথে জড়িতদের ছাড়া )। এমনকি শেখ মুজিবের জীবদ্দশায় ঐ বিচার প্রক্রিয়াকে কার্যত হিমাগারে ফেলে রাখা হয়েছিল এবং ঐ সময় মনে করা হয়েছিল শেখ মুজিব জীবিত থাকলে তিনি নিজেই পরবর্তিতে বাকী সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন। উল্লেখ্য ঐ ৪টা বিশেষ অপরাধের দায়ে তখন আটক যে ৮০০ জনকে বিভিন্ন দন্ডে সাজা দেওয়া হয়েছিল শেখ মুজিবের শাসনামলেই সেই ৮০০ জনকে কোন বিধি-বিধান বা নিয়ম-নীতি অনুসরন না করে ছেড়ে দেওয়া হয়োছল ( এখন যেভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে ) । শেখ মুজিব তখন বহুবার বহু জনকে বহু জায়গায় বলেছিলেন তিনি চান সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটাকে গড়ে তুলতে, অতীতকে ভুলে গিয়ে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগ দিতে, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আর বিভাজন ও হানাহানি চাননা। তার এ মনোভাবের প্রথম প্রকাশ ঘটে স্বাধীনতার পর দেশে এসেইে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানের অখন্ডতার সমর্থক খান এ সবুর ও শাহ আজিজুর রহমানকে মাফ করে জেল ধেকে বের করে দিয়েছিলেন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর স্বাধীনতাযুদ্ধে তারই অনুগত সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধী তথা মানবতাবিরোধী বাংগালী অপরাধীদের ব্যাপারে মরহুম শেখ মুজিবের ইচ্ছা ও মনোভাবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার পদাঙ্ক অনুসরন করেছিলেন, তিনিও মৃত ও অকার্যকর দালাল আইণ বাতিল করে শেখ মুজিবের মহৎ উদ্দেশ্যকে ( অতীতকে ভুলে গিয়ে ) বুকে ধারন করে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। এহেন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করলে যুদ্ধাপরাধী তথা তৎকালীন মানবতাবিরোধীদের  বিচার পর্বটারও সমাপ্তি তখনই ( ৪০ বছর আগে ) হয়ে গিয়েছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
সংগত কারণেই এখন প্রশ্ন তোলা যায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর কেন তাদের বিচার শেষ করা হলোনা যখন সকল অপরাধী, স্বাক্ষী ও ঘটনা জীবিত ও তরতাজা ছিল ? ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর পরেই নুরেনবার্গ ট্রায়ালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছিল এবং ১ বছরের মধ্যে বিচার শেষ করা হয়েছিল, বিচারের রায় পরবর্তি ১০০ বছর পর্যন্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলতে পারে, সেটাতে কোন আপত্তি থাকতে পারেনা। বাংলায় একটা কথা আছে সময়ের এক ফোড় অসময়ের দশ ফোড়। যুদ্ধাপরাধী তথা ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধীদের বিচার যদি ১৯৭২ সালেই করা হত তবে তা হত অনেক সহজ, সর্বত্র ও সর্বমহলে গ্রহনযোগ্য ও যথার্থ এবং তখন কোন প্রতিরোধ, বিরোধীতা ও সমালোচনা থাকতনা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের কথিত পক্ষের শক্তি ( আজকের সুবিধাবাদী ও গলাবাজ ) আওয়ামী লীগই রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল এবং স্বাধীনতার স্থপতি ও স্বাধীনতার অন্যতম সেরা সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিব ছিলেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার / রাষ্ট্র প্রধান। তখন যারা এ অপরাধ করেছিল তাদের রাজনৈতক শক্তি বলতে গেলে কিছুই ছিলনা। তখন তাদের কোন ছাত্র সংগঠনও ছিলনা। কিন্তু বিগত ৪০ বছরে তাদের রাজনৈতিক ও অর্খনৈতিক শক্তি জোরদার হয়েছে, শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন গড়ে উঠেছে, তাদের ছেলে-মেয়ে নাতি-পুতি বড় হয়ে উঠেছে। কাজেই এখন যদি যৌক্তিক বা অযৌক্তিকভাবে তাদের শীর্ষ নেতাদের উপর ও তাদের অস্তিত্বের উপর আঘাত আসে তবে জীবন বাজি রেখে তারা তা  প্রতিহত বা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হাসিল করার উদ্দেশ্য না নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যদি জোর-জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা বা শাস্তির মাধ্যমে জামায়াত শিবিরকে মোকাবেলা না করে তাদেরকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পরাজিত করার পথ অনুসরন করত তবে তার কোন রেশ বা প্রতিক্রিয়া থাকতনা, জনগনের দ্বারাই তাদেরকে জনবিচ্ছিন্নœ করার রাজনৈতিক কৌশল অনুসরন করাই ছিল ঝুকিমুক্ত।
মুক্তিযুদ্ধের কথিত স্বপক্ষের বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তাদের ভাষায় “আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল” গঠন করেছে। অথচ এই ট্রাইবুনালের কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা লেবেল নাই, কোন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নাই, কোন পক্ষ কোন আন্তর্জাতিক আইণজীবি নিয়োগ করতে পারবেনা, বিদেশ থেকে ২/১ জন এ ধরনরে আদালতের বিচারকও আনা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পছন্দের ও দলীয় আনুগত্য আছে এমন প্রসিকিউটার ও বিচারক নিয়োগ দিয়েছে, যে কারণে প্রথম থেকেই এ আদালতের ব্যাপারে দেশের অভ্যন্তর থেকে ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ বহু বিদেশী প্রতিষ্ঠান ও গনমাধ্যমের তরফ থেকে এর নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার ব্যাপারে প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়েছে। তাছাড়া কথিত অভিযুক্তদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ, আসামী পক্ষের আইণজীবিদের যুক্তি ও আবেদন অগ্রাহ্য করা, জামিন ও সাক্ষ্য গ্রহন নিয়েও এ আদালতের বিচার কার্য পরিচালনায় চরম অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিয়োগ রয়েছে। বিচার চলাকালীন অবস্থায় কিছু কিছু বিচারকের কার্যকলাপ ও আচরনও মারাত্মকভাবে বিতর্কিত ও অনৈতিক হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে, যে কারণে একজন বিচারক পদত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
এ বিচার শুরু হওয়ার লগ্ন থেকেই আওয়ামী জোট সরকারের প্রধানসহ বিভিন্ন মন্ত্রীরা বিচারের রায় কি হবে, কাদেরকে ফাঁসি দেওয়া হবে, কখন বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে এসব  বিষয়ে সব সময় বিভিন্ন উক্তি ও মন্তব্য করে চলেছে, যা আদালত তথা বিচার কার্যকে স্পষ্টতই প্রভাবিত করার সামিল। তাছাড়া এতে এটাও প্রমানিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই ৪০ বছর পর তার নিজস্ব লোকদের সমন্বয়ে এ আদালত গঠন করেছে, ন্যায় বিচার করার জন্য নয়, প্রকৃতভাবে দোষী হউক বা না হউক বি,এন,পি জোটকে দূর্বল করার লক্ষ্যে জামায়াতকে ধ্বংশ করার জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলানোই আওয়ামী জোট সরকারের আসল উদ্দেশ্য - নৈতিক ও আদর্শগত দিক থেকে যুব্ধাপরাধের বিচার তাদের মূল লক্ষ্য নয়।
আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের লোক দিয়ে সাজিয়ে যে আদালতের মাধ্যমে কথিত মানবতাবিরোধী আপরাধীদের বিচার করছে কাদের মোল্লার রায়ের পর তারা নিজেরাই সে আদালতের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে, আদালত কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ায় আওয়ামী লীগ নেপথ্যে কিছু নাস্তিক ব্লগারকে উস্কানী, উৎসাহ ও সকল প্রকার সাহায্য সমর্থন দিয়ে শাহবাগে কথিত গনজাগরন নামে একটা আন্দোলন তথা সমাবেশ সৃষ্টি করে আদালতের রায়কে প্রত্যাখ্যান করে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবী জানায়, শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের সকল মন্ত্রী ও এমপিরা তখন এদেরকে সমর্থন দিয়েছিল। কিছুদিন পর দেখা গেল আদালত কর্তৃক রায় ঘোষণার পর নজীরবিহিনভাবে সংসদের অনুমোদন নিয়ে আইণ পরিবর্তন করে রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করার জন্য বাদী ( সরকার ) পক্ষকে সুযোগ করে দেওয়া হল। বিচার কাজ প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় এমনকি রায় ঘোষণার পর আইণও বাদী পক্ষের (সরকারের / আন্দোলনকারীদের) সুবিধামত সংশোধন করা হচ্ছে, তা সত্ত্বেও এটাকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল বলা হচ্ছে। শুধু তাই নয় শেখ হাসিনা তখন সংসদে দাড়িয়ে স্বয়ং উচ্চারন  করেছিল বিচারকরা যাতে রায় দেওয়ার সময় জনগনের (শাহবাগের তরন-তরুনীদের) আবেগের বিষয়টাকে বিবেচনা করেন, যা পরোক্ষভাকে আদালত তথা বিচারকদের নির্দেশ দেওয়ার সামিল।
উচ্চ আদালতে যখন বিষয়টা আপীলের জন্য গেল তখন সরকার পক্ষ কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের আবেদন করল এবং আসামীপক্ষ তাকে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে খালাস দেওয়ার আবেদন করল। দেখা গেল আপীল শুনানীর আগে সরকার তড়িঘড়ি করে তার নিজস্ব আনুগত্যের বিচারকদের দ্বারা আপীল বিভাগের বেঞ্চ গঠন করে নিল। সুতরাং যা হবার তাই হলো, আপীল বিভাগ সরকার পক্ষের ইচ্ছা বা আবেদনের প্রেক্ষিতে কথিত আন্তর্জাতিক আপরাধ ট্রাইবুনাল কর্তৃক প্রদত্ত কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজাকে বড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দিল। অর্থাৎ আসামী পক্ষ তাদের সাজার মেয়াদ কমানোর আবেদন করায় তা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হল ( যা সহসা বা সাধারনত দেখা যায়না ) । উল্লেখ্য, বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবনও সর্বোচ্চ সাজার মধ্যেই পড়ে, কিন্তু হাসিনা সরকার যেহেতু চাচ্ছে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের জীবিত রাখবেনা , তাই আপীল বিভাগের কাছ থেকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডের আদেশই আদায় করে নিল। বিচার কাজ প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় এমনকি রায় ঘোষণার পর আইণ বাদী পক্ষের ( সরকারের) সুবিধামত সংশোধন করা হবে, এমন নজীর বাংলাদেশ ছাড়া আর দুনিয়ার কোথায় আছে বলে  জানা নেই। অর্থাৎ বিচারকদের এখন রায় দিতে হবে রাস্তার দাবীর আলোকে, তাহলে আর ট্রাইবুনাল কেন, এটা বাতিল করে দিলেই হয়। ট্রাইবুনাল বাতিল করে অভিযুক্তদের ধরে এনে শাহবাগের চত্ত্বরে গুলি করে মেরে ফেলে বা ফাঁসি দিলেই ভাল হয়। তাহলেই হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার, তাহলেই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে আইণের শাসন । 
বিচারালয়ে বিচারকরা কোন অপরাধীকে সাজা দেন যুক্তি-তর্ক, তথ্য-উপাত্ত , সাক্ষ্য-প্রমান এবং পরিস্থিতি-পরিবেশ এর নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লে¬ষণ ও পর্যালোচনা করে। যদি কোন রায় ঘোষণার পর কোন পক্ষ রায় মানতে না চায় বা সন্তুষ্ট না হয় তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ্ আদালতে আপীল করে থাকে, এটাই আইণের স্বাভাবিক নিয়ম, এভাবেই আইণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু এখন দেশে এটা কি হচ্ছে, এখন মনে হয় আইণ-আদালত শাসকদের ইংগিতে এবং রাস্তার আন্দোলন আর আবেগের দ্বারা পরিচালিত হবে। 
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যারা ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী আপরাধ করেছিল তাদের অধিকাংশই ৯ মাসের বিশেষ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানী বাহিনীর অস্ত্রের মূখে ভয়ে এ কাজে তাদেরকে সহায়তা করতে বাধ্য হয়েছিল, স্বতস্ফুর্তভাবে এ কাজে সহায়তাকারীর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এখন স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ও অবস্থাতেই নিজ দেশের জনগন স্বতস্ফুর্তভাবে মানবতাবিরোধী  নৃশংস, লোমহর্ষক ও জঘন্য আপরাধে লিপ্ত। জাতিকে এ কলংকের দায় থেকে কে এবং কিভাবে মুক্ত করবে ? যারা সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের উপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘঠিত করেছে সেই পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে হাতের মুঠে পেয়েও ভারতের চাপে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক শেখ মুজিব ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং মাফ করে মহান হয়েছিলেন। ৪০ বছর পর তার কন্যা ও কথিত অনুসারীরা যারা পাকিস্তানী সৈন্যদের এ কাজে সহায়তা করেছিল তাদের (?) এখন বিচার করে মহান হতে চাচ্ছেন। 
জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে কথিত অপরাধে এখন ফাঁসি দিলেই দেশে আর স্থায়ীভাবে বিভক্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবেনা, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত  হওয়ার প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে এবং  প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ সোনার বাংলা হয়ে যাবে নির্বাচনের আগে এর কোন গ্যারেন্টী কি বর্তমান সরকার দিতে পারবে ? যদি দিতে পারে তবেত ষোলআনাই ভাল, যদি না পারে তবে এ “মহান দায়িত্ব” পালনের  ব্যর্থতার দায়ভার কে নিবে ? 
এখন বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, শেখ মুজিব ৪টা অপরাধে ( খুন, ধর্ষন, অগ্নি-সংযোগ ও লুট-তরাজ) যারা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত তারা ছাড়া বাকীদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাহলে পাকিস্তানী সৈন্যরা ( যারা ক্ষমা পেল ) কি এই ৪টা অপরাধ করেনি ? শেখ মুজিব কি তখন ঐ ৪টা অপরাধকে ক্ষমা করে যাননি নাকি ঐ ৪টা অপরাধের জন্য যারা তখন সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী তাদেরকে ক্ষমা করেননি ? যদি ঐ ৪টা মানবতাবিরোধী আপরাধকে ক্ষমা না করে থাকেন তবে এমন অপরাধতো বিগত ৪১ বছর যাবতই বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছে, তাহলে এ অপরাধ থেকে জাতিকে দায়মুক্ত করার দায়িত্ব কে নিবে ? ঐ সময়ে ( ৪০ বছর আগে ) যদি উল্লেখিত ৪ অপরাধের জন্য মামলা করা হয়ে থাকে তবে ঐ মামলায় আজ ৪০ বছর পর যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের কারো নাম কি ছিল ? অথবা শেখ মুজিব ৪ অপরাধ ব্যতীত অন্যদেরকে যে সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন তার মধ্যেও কি তাদের নাম ছিল ? যদি না থাকে তবে আজ ৪০ বছর পর তাদেরকে কেন হীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ফাঁসি দেওয়ার ব্যবস্থা ( বিচার নয়) করা হচ্ছে ? আর যদি থেকে থাকে তবে কেন ১৯৭২-৭৫ সময়ের মধ্যে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার শেষ করা হয়নি ? 
এখন অভিযোগ করা হয় জিয়াউর রহমানের সময় রাজাকর আইণ বাতিল করে সব রাজাকারদের ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং তাদেরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার করা হয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ( মুক্তিযুদ্ধের পর পর ) কেন তাদের বিচার শেষ করা হলোনা ? মুজিবের মৃত্যুর পর জিয়ার শাসনও ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় আসে এবং ১৯৮২ - ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর সে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, এরশাদ ও তার সরকারের সাথে আজকের কথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক ছিল। তখন কেন আওয়ামী লীগ এরশাদ সরকারের কাছে তাদের বিচরের দাবী তুল্লনা ? 
অর্থাৎ আমাদের মত সাধারন মানুষের কাছে নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে দেখলে যে সমীকরনটা দাড়ায় তা হলো : জামায়াত বি,এন,পি’র সাথে আছে বলেই আজ যুদ্ধাপরাধের বিচারের সম্মূখীন হয়েছে, যদি জামায়াত ১৯৯১ - ১৯৯৬ সালের মত আওয়ামী লীগের সাথে থাকত বা মহাজোটে থাকত তবে তাদের বিচার করা হত কিনা আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে এ নিয়ে সন্দেহ বা বিশ্বাস না করার মত যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান।
তদুপরি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধী বা তাদের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত মানবতাবিরোধীদের বিচার পর্ব আওয়ামী জোট সরকার যে পদ্ধতি, কৌশল ও গতিতে শুরু করেছিল তাদের বর্তমান মেয়াদের ৫ বছরের মধ্যে তা শেষ করার কোন লক্ষনই ছিলনা। বরং বাচ্চু রাজাকার ও কাদের মোল্লার রায়ের পর জনমনে যখন বর্তমান ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা এবং সরকার ও জামায়াতের মধ্যে কোন গোপন সমঝোতার সন্দেহ দেখা দিল তখন এর সমালোচনা ও বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়। নির্বাচনী প্রচারনার কৌশল হিসেবেই আওয়ামী লীগ তখন এ বিষয়টা তাদের ইশতেহারে অন্তর্ভূক্ত করেছিল, এখনও একই উদ্দেশ্যে আগামী নির্বানকে সামনে রেখে এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছে। 
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর পর যদি প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানের ৯০ হাজার সৈন্যকে জিম্মি হিসেবে রাখা হত পাকিস্তানের কাছ থেকে আমাদের ( তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের) হাজার হাজার কোটি টাকার ন্যায্য হিস্যা অনায়াসে আদায় করা যেত, পাকিস্তানী সৈন্যদের ছেড়ে দেওয়ায় স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও আমরা তা আদায় করতে পারিনি, এজন্য যারা দায়ী তাদের কেন আজ বিচার করা বা বিচার চাওয়া হচ্ছেনা ? তাছাড়া অবাঙ্গালীদের সমস্যাটা আজো বাংলাদেশে বিদ্যমান, কয়েক লাখ অবাঙ্গালী মুসলমান আজ ৪২ বছর যাবত বাংলাদেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে, আমাদেরও এটা একটা বোঝা, আন্তর্জাতিকভাবে শত চেষ্টা করেও অবাঙ্গালী পাকিস্তানীদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি বা পাকিস্তান তাদেরকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেনা। তাই ঐ সময় যদি ৯০ হাজার পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দিকে জিম্মি করে রাখা হত তবে পাকিস্তান ঐ সময়েই তাদেরকে নিয়ে যেতে বাধ্য হত। এ দায়ভার কার ?
মানবতাবিরোধীদের যারা বিচার করছে বা বিচার চাচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জাতিকে ’৭১ এর কলংক থেকে দায়মুক্ত করা হলে এদেশে আর কোন ভেদাভেদ ও বিভাজন থাকবেনা। তাত্ত্বিকভাবে কথাটা শুনতে মন্দ নয়, কিন্তু তাত্ত্বিকতা ও বাস্তবতা এক নয় বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। যারা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে নীতিগতভাবে সকল সচেতন মানুষই তার বা তাদের বিচার চাইবে। কিন্তু যারা এ অপরাধে মূল অপরাধী তাদের বিচার না করে এবং তাদেরকে যখন হাতে পেয়ে মাফ করে ছেড়ে দেওয়া হয় তখন একই অপরাধের সহযোগী হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অন্যদের বিচার করার কি নৈতিক অধিকার থাকে ? বলা হচ্ছে এখনত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে - যুদ্ধাপরাধীদের নয়। অর্থাৎ পাকিস্তানীরা যুদ্ধাপরাধ করেছে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেনি, তাই হয়ত তখন বা এখন ( অনুপস্থিতিতে ) তাদের বিচার করা হয়নি বা হচ্ছেনা। যুদ্ধের সময় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করা হয় এটাইতো যুদ্ধাপরাধ। যদি বাংগালী যুদ্ধাপরাধীরা / মানবতাবিরোধীরা মাফ পাওয়ার যোগ্য না হয়ে থাকে তবে তাদের বিচার কেন ৪০ বছর আগে হয়নি ? পরবর্তিতে কারা তাদেরকে নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলেছে ? এ প্রশ্নের যদি জবাব না পাওয়া যায় বা জবাব খোজে ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তবে ৪০ বছর পর কথিত মানবতাবিরোধীদের বিচার করে জাতি যেমন কলংকমুক্ত হবেনা জাতীয় ঐক্যও প্রতিষ্ঠিত হবেনা। দেশের আজকের পরিস্থিতিই জাতির বিভাজন ও বিভক্তিকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা এখন সারা দেশে যে জিঘাংসা ও প্রতিশোধের বীজ এখন বপন করা হচ্ছে তার রেশ কি আগামী দিনেও থাকবেনা ?
স্বাধীনতার কথিত স্বপক্ষের শক্তির দাবীদাররা এখন আরো অভিযোগ করছে জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ এর পর স্বাধীনতাবিরোধীদের জাতীয় রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছিলেন। শেখ মুজিব যখন বৃহত্তর আঞ্চলিক সম্পর্কের স্বার্থে  ১৯৭২/৭৩ সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের মাফ করে ছেড়ে দিয়েছিলেন ( যা তখন কারোরই প্রত্যাশিত ছিলনা) এবং জাতীয় ঐক্য ও অগ্রগতির স্বার্থে  দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের মাফ করে দিয়েছিলেন  জিয়াউর রহমানও হয়ত একই উদ্দেশ্যে দেশ গড়ার স্বার্থে জাতীয় ঐক্যের কথা বিবেচনা করে সবাইকে একসাথে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তাদেরকে সাথে নিয়ে সরকার গঠন করায় বা রাজনীতি করায় জিয়াউর রহমানের যদি অপরাধ হয়ে থাকে তবে এ অপরাধে আরো অনেকেই অপরাধী। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারেও একজন রাজাকার প্রতিমন্ত্রী হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এমনকি বর্তমান মন্ত্রীসভাতেও একজন রাজাকার মন্ত্রী আছে এবং একজন রাজাকারের ছেলে মন্ত্রী হিসেবে আছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের  অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির প্রধান এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে একজন চিহ্নিত রাজাকারকে ধর্মমন্ত্রী করা হয়েছিল, সে ছিল ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা আব্দুল মান্নান, স্বাধীনতার পর পর দৈনিক ইত্তেফাকে তার ছবি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল এই রাজাকারকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। অথচ এই মাওলানা মান্নানের ছেলে বাহাউদ্দীন ( ইনকিলাবের বর্তমান মালিক) এখন শেখ হাসিনার অন্যতম প্রিয়ভাজন ব্যক্তি, যাকে মাঝে মধ্যে শেখ হাসিনার এখন বিদেশ যাওয়ার সময় সফরসঙ্গি করা হয় বা তাকে পাশে বসিয়ে শেখ হাসিনা জামিায়াতুল মোর্দারেসিনের উদ্দেশ্যে ছবক দেন। কাজেই যাদের মধ্যে চারিত্রিক ও আদর্শিক বৈপরিত্য রয়েছে তারা কিভাবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও সকল পক্ষের কাছে গ্রহনযোগ্য একটা বিচার করবে ? যে কারণে আজ কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, ফলশ্র“তিতে দেশে শুরু হয়েছে ভয়াবহ সহিংস সংঘাত যার ফলে জীবন দিতে হচ্ছে অসংখ্য নীরিহ যুবক ও নিরাপরাধ দেশবাসীকে। এর দায়ভার কে নিবে ? 
আমাদের দূর্ভাগ্য ও দু:খজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের সাধারন মানুষ সব সময়েই দেখেছে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, সংকীর্ন দলীয় আদর্শে বিভক্ত কথিত বুদ্ধিজীবি, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞ, আইণজ্ঞ , সমাজবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক প্রভৃতি শ্রেনীর বর্নচোরা লোকেরা যে কোন পরিবর্তন , আন্দোলন বা রাজনৈতিক জোয়ারের সময় নিজেদের সুবিধা ও স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে যে দিকে মেঘ সেদিকে ছাতা ধরার মত কৌশল অবলম্বন করে, ক্ষমতাসীনদের খুশী বা সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের পক্ষে মতামত দেয়, তাদের কর্মকান্ডকে সমর্থন করে বক্তব্য-বিবৃতি দেয়, গোল টেবিল বৈঠক ও টেলিভিশনের সংলাপ ও টক-শোতে আলোচনা করে, ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নিজেদের ইচ্ছামত ঘটনা ও আইণের ব্যাখ্যা দেয়। যে কারণে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার দম্ভে স্বৈরাচারী ও অন্ধ হয়ে যায় এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বিরোধী দল বা জনমতকে সহ্য না করে অসহনীয় ও বেপরোয়া হয়ে উঠে। কিন্তু শেষ ও দু:খজনক পরিনতি এড়াতে পারেনা।
লেখক : জাহিদ হাসান , রিয়াদ, সউদী আরব

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে