Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ , ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-০৯-২০১১

একটি ছবির ভ্রমণকাহিনী

মীজান রহমান


একটি ছবির ভ্রমণকাহিনী
আজকাল আমি টেলিভিশন দেখিনা খুব একটা। বেশির ভাগ প্রোগ্রামই খুনখরাবি, নয় হাসপাতালের অস্ত্রোপচার, তানাহলে বড়দের ভাঁড়ামি দ্বারা ছোট সাজবার অপচেষ্টা। টেলিভিশনের বোতাম টেপার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চোখে ঘুম পেয়ে যায়। এরকমটি হত আমার এক ভারতীয় বন্ধুর। এ নিয়ে খুব ঠাট্টা করতাম আমি। ঘুমের ওষুধের বদলে সে টেলিভিশন খুলে বসত---তাতেই কাজ হয়ে যেত। এখন আমারও প্রায় একই অবস্থা। গতকাল রাতে চ্যানেল টিপে টিপে ?ডেইটলাইন? খুলে বসলাম। সাধারণত আমরা ?ডেইটলাইন? দেখি না। কালকে অন্যকিছু না পেয়ে অগত্যা ওটাই দেখতে শুরু করলাম। কয়েক মিনিট যেতে-না-যেতেই আমি সোজা হয়ে বসলাম। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভিন্নরকম একটা ভাবাবেগ আশ্রয় নিল মনে। মনে হল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটি নাটকের পটোন্মোচন হতে যাচ্ছে পর্দায়। একঘন্টার এই প্রোগ্রামটি হয়ত অনেকেই দেখেছেন এবং দেখে আমারই মত মুগ্ধ হয়েছেন। আরো অনেকে হয়ত দেখবার সুযোগ পাননি। গল্পটি শেষ হবার পর পাশে-বসা স্ত্রীর অগোচরে চোখ মুছে নিলাম। ইচ্ছে হচ্ছিল তক্ষুণি গল্পটা লিখে আমার বঙ্গালি পাঠকের কাছে পাঠিয়ে দিই।
  গল্পটির মূল নায়ককে মঞ্চে দেখা যায়নি অনেকক্ষণ। মূল নায়ক যে কোনও রক্তমাংস আর অস্থিমজ্জার মানুষ তা?ও বোঝার উপায় ছিল না। শুধু একটা ছবি, পাঁচ ছ?বছরের একটা কৃশকায় বিষণ্ণ মেয়ের ছবি। তার বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। হয়ত কোনও বন্ধু বা আত্মীয়ের সস্তা বিশ- ডলারের-ক্যামেরায়-তোলা ছবি। কিন্তু ওই গাঢ়, অতলান্ত দুটি চোখ, ওই নির্বাক নির্বোধ প্রশ্ন, অবোধ বালিকার সেই নীরব অভিমান---ওতে কোনও সস্তা বাজারি উপাদান ছিল না। গল্পটির শুরু ঠিক ওই ছবি দিয়ে নয়, শুরু তার বাবাকে দিয়ে। ষাটের দশকের শেষভাগে তুমুল যুদ্ধ চলছে ভিয়েতনামের বনেজঙ্গলে। মেয়েটির বাবা ছিলেন ভিয়েতকং সেনাবাহিনীর সদস্য। অসাধারণ সাহসিকতা ও বিক্রমের সাথে লড়াই করে করে তার বাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল শত্রুশিবিরের দিকে। হঠাত্‌ করে চারদিক থেকে পালটা আক্রমন চালাতে শুরু করে মার্কিন আর দক্ষিণ ভিয়েতনামের সৈন্যরা। গোলাবারুদ, কামানমোর্টার, বোমা মেশিনগান ছোঁড়াছুড়ি চলতে থাকে অনেকক্ষণ। আঠারো বছরের আমেরিকান যুবক রিচ ল্যাটো তার হাতের বন্দুক থেকে সমানে গুলি ছুড়ে যাচ্ছে। এমন সময় চোখে পড়ল একটি ভিয়েতকং সৈন্য ঠিক তার মাথা তাক করে বন্দুক উঁচিয়েছে। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে রিচ মেশিনগান চালিয়ে সৈন্যটিকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর একসময় গোলাগুলি বন্ধ হয়ে সব শান্ত হয়ে গেল। ভি্যেতকংরা সব এদিক ওদিক পালিয়ে গেছে। চতুর্দিকে মরা মানুষের লাশ। রিচ ল্যাটো কি মনে করে ওই সৈন্যটার কাছে গিয়ে দেখতে চাইল বেঁচে আছে কিনা। না, বেঁচে ছিল না। বুকের পেশিতে ওঠানামা নেই, শিরায় নেই জীবনের লক্ষণ। কেমন একটা স্তব্ধতার ভাব এসে গেল ওর মনে----যেন বোধশক্তি হারিয়ে ফেলছে। গুলি করে আর বোমা মেরে অনেক শত্রুসৈন্যেরই তো প্রাণ নিয়েছে রিচ, কিন্তু কোনও নিহত সৈন্য এমন করে ব্যক্তিগত হয়ে ওঠেনি আগে। হাঁটু গেড়ে বসে ভিয়েতকংটির পকেট ঘেঁটে ওর ওয়ালেট বের করল। খুলে দেখল বিশেষ কিছু নয়। সৈন্যদের পকেটে যা থাকে সচরাচর তার বাইরে কিছু না। দুয়েকটা চিঠি, কিছু খুচরো পয়সা, মিলিটারির কাগজপত্র। একটা কি দুটো ছবি। কখনো মায়ের ছবি, কখনো প্রেয়সীর, কখনোবা স্ত্রীর। কিন্তু এই লোকটার পকেটে তার নামধাম পরিচয় কিছুই ছিল না, কেবল ওই ছবিটা। ছবিতে সৈন্যটি নিজে, এবং পাশে সেই মেয়েটি। হয়ত তার আপন মেয়ে, অথবা তার ভাই বা বোনের মেয়ে যাকে সে খুব ভালোবাসত। ছবিশুদ্ধ ওয়ালেটটা হয়ত লোকটার পকেটেই রেখে আসা উচিত ছিল তার। ওয়ালেট রেখেছিল সে ঠিকই, কিন্তু কি মনে করে ছবিটাকে ঢুকিয়ে নিয়েছিল তার নিজের ওয়ালেটে। ঐ মুহূর্তে যদি তার ভবিষ্যত্‌ জানবার ক্ষমতা থাকত তাহলে কক্ষণও ওই ভুলটি সে করত না। সেই ছোট্ট একরত্তি মেয়েটা যে কালে কালে এক দৈত্যাকার মূর্তিতে তার সমস্ত জীবনকে গ্রাস করে ফেলবে সেটা জানার কোনও উপায়ই ছিল না তার।
  তার দু?বছর পর। ১৯৬৯ সাল। কোমরে গুলি খেয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়ে রিচ ল্যাটোকে অনেকদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়। তারপর মিলিটারির সমস্ত দায়দায়িত্ব চুকিয়ে তিনি দেশে ফিরে যান। কলেজে ভর্তি হন, ডিগ্রি করেন, এবং ভেটেরান দপ্তরের চাকরিতে যোগ দেন। ইতোমধ্যে স্কুলের সহপাঠিনী প্রেয়সীকে বিয়ে করে সংসারধর্ম শুরু করেন। নতুন জীবন, নতুন পেশা, নতুন স্বপ্ন। ভিয়েতনামের গভীর অরণ্যের সেই বন্দুকধারী যুবকটি আর নয়। রিচ ল্যাটো এখন আমেরিকার এক বড় শহরের বড় অফিসের বড় অফিসার। তাঁর সেক্রেটারি আছে, দারোয়ান আছে, পেয়াদা আছে। শহরতলীতে তাঁর বাগানঘেরা বাড়ি, দুই গাড়ির গ্যারাজ, দুটি সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী কন্যা প্রাইভেট স্কুলে যায়, প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পিয়ানো শেখে। এর নাম যদি নিরবচ্ছিন্ন সুখ না হয় তাহলে নিরবচ্ছিন্ন সুখ কাকে বলে? কিন্তু সংসারের সব গোলাপেই কাঁটা থাকে। এই গোলাপেরও কাঁটা ছিল যা বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না। একাঁটা দেখবার একমাত্র উপায় ছিল রিচ ল্যাটোর পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করে সেই অপয়া ছবিটা খুলে দেখা। কতবার ভেবেছেন তিনি ওটা ফেলে দেবেন। পারেননি। যতবার চেয়েছেন ছিঁড়ে ফেলতে ততবারই মনে হয়েছে, মেয়েটির করুণ কাতর মুখটি যেন অনুনয় করে কি বলতে চাইছে তাঁকে। ততই জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেই অন্তহীন কষ্টে ভরা ক্ষুদে ক্ষুদে চোখদুটি। যেন আঙ্গুল উঁচিয়ে দাবি করছেঃ তুমি আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও। ঘুম থেকে মাঝে মাঝে চিত্‌কার করে উঠে যেতেন রিচ ল্যাটো। যেন সেই ভিয়েতকং সৈন্যটি সামনে দাঁড়িয়ে আছে বন্দুক তুলে। তিনি গুলি করলেন। সমস্ত বন কেঁপে উঠল থর থর করে। লোকটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। তাঁর হাতে একটি মানুষের প্রাণ গেল। একটি পিতার চোখ বুঁজে গেল চিরতরে। একটি আদরিনী কন্যার বুক খালি হয়ে গেল। সেই কন্যা তাঁর পকেটের ছবি থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। জানতে চাইছে তার অপরাধ। সে কি ক্ষতি করেছিল তাঁর যেকারণে এত বড় শাস্তির বোঝা চাপিয়ে দিলেন তার ঘাড়ে।
  প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রিচ কাজে চলে যান। সারাদিন কাজে ডুবে থাকেন। সহকর্মীরা তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে, বড়কর্তারা তাঁর কাজের প্রশংসা করে। বাড়িতে এসে তিনি বাগানের কাজ করেন, কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোন, স্ত্রীর হাত ধরে পার্কে যান। কেবল বিছানায় যেতেই যত ভয় তাঁর। ভিয়েতনাম ফিরে আসে তাঁর ঘুমের অন্ধকারে, তার সমস্ত বীভত্‌সতা নিয়ে। ওই চোখ-বুঁজে-থাকা মৃত সৈন্যটি জীবিত হয়। সেই একরত্তি মেয়েটা দৈত্যাকার হয়ে ওঠে। ওই ছবিটা নিশীথের অপয়া পাখির মত পাখা ঝাপটাতে শুরু করে। কম্বলের নিচে তিনি ঘামতে শুরু করেন। হাতপা অবশ হয়ে আসে। আবোলতাবোল বকতে থাকেন। স্ত্রীর ঘুম ভেঙ্গে যায় তাতে। স্বামীকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে দেন। কতদিন তিনি আকুতি করেছেন স্বামীকে ছবিটা আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিতে। কিম্বা দেশলাই ঠুকে পুড়িয়ে ফেলতে। বা নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিতে। যাক, যাক, দূর হোক এই আপদ। স্বামী বলেন দেব। তারপর আর দেওয়া হয় না। স্ত্রী নিজেও চেষ্টা করেছেন কয়েকবার ফেলতে। কিন্তু কি আশ্চর্য জাদুবল সেই ছবিটার, তিনিও পারেননি। কিসে যেন তাঁর হাত চেপে রেখেছে বারবার। মনে হয়েছে কাজটা করতে যেয়ে যেন তার স্বামীকেই ছুঁড়ে ফেলছেন। সেই ছবি থেকে আলাদা করে লোকটাকে যেন আর ভাবা যাচ্ছেনা। অলক্ষ্যে যেন দুটিতে একাত্মা হয়ে গেছে।
  একদিন রিচ নিজেই উপলব্ধি করলেন যে ছবিটা তাঁর পারিবারিক জীবনেও অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার সাথে থেকেও যেন কারো সাথে নেই। গাড়িতে করে কোথাও বেড়াতে গেলেও যেন অন্য কোথাও চলে যান। স্ত্রীর সঙ্গে ঘন ঘন মনোমালিন্য হচ্ছে যা আগে হত না। মেয়েদের সঙ্গে মেজাজ করছেন যা আগে করতেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন এভাবে জীবন চলতে পারেনা, একটা কিছু করা দরকার। হঠাত্‌ একটা বুদ্ধি এল মাথায়। স্ত্রীকে সঙ্গে করে রওয়ানা হলেন ওয়াশিংটনের পথে। চলে গেলেন সোজা ওয়ার মেমোরিয়েলে। যেখানে ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রাণহারানো আটান্ন হাজার সৈন্যের খোদাই করা নাম মার্বেল পাথরের গায়ে। সেখানে তিনি আগেও গিয়েছিলেন কয়েকবার। কিন্তু এবারের যাওয়া অন্যরকম। সেই স্মৃতিপ্রস্তরের পাদদেশে তিনি আস্তে করে ওই ছবিটা স্থাপন করে চলে এলেন। ভাবলেন এবার যদি একটু শান্তি আসে মনে। ছবির সেই মেয়েটা জানবে তার বাবাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছে অন্যান্য বীর যোদ্ধাদের সাথে। হলেনই বা তিনি শত্রুপক্ষের যোদ্ধা, তিনিও তো বীরের মত যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন। রিচ আর তাঁর স্ত্রী বাড়ি ফিরে এসে ভাবলেন প্রকাণ্ড এক বোঝা নেমে গেল তাঁদের জীবন থেকে। এবার তাঁদের নিজেদের সংসার নিয়ে সামনে এগুনো সম্ভব হবে।
   কিন্তু তাঁদের শান্তি বেশিদিন টেকেনি। ছবিটাকে তিনি মেমোরিয়েলের পাদদেশে রেখে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা সেখানে বসে থাকেনি। ওটাকে তুলে এনেছিলেন তাঁরই মত আরেক যুদ্ধফেরত প্রবীন আমেরিকান। ছবিটা দেখেই ভদ্রলোক তার তাত্‌পর্য বুঝতে পারলেন। ভিয়েতনামের সমস্ত বিভীষিকা ভেসে উঠল তাঁর মনে। নীরব জিজ্ঞাসায় ভরা দুটি জ্বলন্ত চোখ দিয়ে ছবির সেই মেয়েটি যেন তাঁকেও জড়িয়ে ধরল যেমন করে জড়িয়ে রেখেছিল রিচ ল্যাটোকে। যুদ্ধের সমস্ত ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে যেন এই একটি মানবসন্তান দিশেহারা হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার হারিয়ে যাওয়া পিতাকে। এক আশ্চর্য উপায়ে ছবিটা রিচের ওয়ালেট থেকে বের হয়ে প্রবেশ করল এক আগন্তুকের হৃদয়ে।
   টেলিভিশন দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এখানেই বুঝি শেষ হয়ে গেল গল্পটা। স্মিত হেসে গল্পকার বললেন, না শেষ হয়নি। মাত্র শুরু হল বলে। রিচ ল্যাটো ভেবেছিলেন ছবিটাকে ছেড়ে এসে শান্তি পেলেন অবশেষে। কিন্তু তাঁর জানার উপায় ছিল না তখন যে এতদিনে ছবিটা একটা নিজস্ব জীবন পেয়ে গেছে। সে তার নিজেরই ভাগ্যবিধাতা। তিনি জানতেন না যে তিনি ছেড়ে দিলেও ছবি তাঁকে ছাড়েনি।
  দৈবের এমনই অদ্ভুত লীলা যে একদিন এই দ্বিতীয় ভদ্রলোকের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত রিচ ল্যাটোরই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু যাকে তিনি কয়েকবারই দেখিয়েছিলেন ছবিটা। তাই ওটা দেখামাত্র বুঝে ফেললেন এর উত্‌সটা কোথায়। ঘটনা শোনার পর সেই ভদ্রলোক খুশি হয়েই ফিরিয়ে দিলেন ওটা। অর্থাত্‌ শেষ পর্যন্ত ?ঘরের ছেলে? ঘরেই ফিরে এল। যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু সেখানেই তার শেষ। শেষ যাত্রা হয়ত বলা ঠিক হল না, কারণ তার পরের যাত্রাটি ছিল আরো বিচিত্র, আরো অবিশ্বাস্য।
  ছবি ফিরে পেয়ে রিচ ভাবলেন এবার কি করা যেতে পারে। এই যে এতদিন ধরে দুটো মানুষের ছবি বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন সর্বত্র, বিবেকের কামড়ে জর্জরিত হলেন এতগুলো বছর, কখনো তিনি চেষ্টা করেননি জানতে এরা কারা। এদের নাম কি, ঠিকানা কোথায়। লোকটি যে বেঁচে নেই তার সাক্ষী তো তিনি নিজেই, কিন্তু মেয়েটি? সে কি বেঁচে আছে এখনো? থাকলে কি এখনো ভিয়েতনামে, না অন্য কোথাও চলে গেছে বিয়েশাদী করে? কে জানে, হয়ত খোদ আমেরিকাতে এসেই বসবাস স্থাপন করেছে। ত্রিশ বছর পর কে দেবে তার খবর? ভেবে দেখলেন একমাত্র উপায় ভিয়েতনাম দূতাবাসের শরণাপন্ন হওয়া। তাই তিনি আবার বেরিয়ে গেলেন ওয়াশিংটনের পথে। এবার কোনও স্মৃতিস্তম্ভ নয়, সোজা ভিয়েতনাম দূতাবাস। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে আন্তরিক আলাপ হল। রাষ্ট্রদূত সাহেব খুব আগ্রহের সাথে শুনলেন তাঁর বক্তব্য। সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। তবে ত্রিশ লক্ষ মৃত সৈনিকের মাঝে একজন নাম-না-জানা সৈন্যের সন্ধান পাওয়া যে কত দুঃসাধ্য ব্যাপার সেটাও বুঝিয়ে দিলেন তাঁকে। তবুও রিচ ওয়াশিংটন থেকে ফিরে এলেন এইটুকু ক্ষীণ আশা নিয়ে যে হয়ত, হয়ত আচম্বিতে কোনও অলৌকিক যোগাযোগ ঘটেও যেতে পারে। দশ লক্ষ বা ত্রিশ লক্ষের একভাগ সম্ভাবনাও তো সম্ভাবনা। আগে তো তা?ও ছিল না।
  এর পরের ঘটনাগুলি আরব্যোপন্যাসের সব আজগুবি গল্পের সঙ্গেই তুলনা চলে কেবল। ওয়াশিংটন থেকে ফেরার কয়েক অপ্তাহ পর ডাকবাক্সে ভিয়েতনাম দূতাবাসের শীলমারা একটা খাম দেখে তাঁর বুক ধুক ধুক করতে শুরু করল। খুলে দেখলেন রাষ্ট্রদূতের সইকরা লম্বা চিঠি। চিঠি পড়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এ কি স্বপ্ন না বাস্তব? গল্পটির সারমর্ম এই। দূতাবাস থেকে পাঠানো ছবিটা প্রথমে হ্যানয়ের বড় বড় দুতিনটে পত্রিকায় ছাপা হয়। তার সাথে রিচ ল্যাটোর একটি ব্যক্তিগত আবেদন। প্রথমেই তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁর গুলিতেই ছবির এই পুরুষটির প্রাণহানি হয়েছিল ত্রিশ বছর আগে। তাঁর কারণেই এই শিশুটির বাবা কোনদিন ফিরে যেতে পারেনি তাঁর কন্যার কাছে। সেই অপরাধের গ্লানিতে তিনি জ্বলে পুড়ে মরছেন দীর্ঘ ত্রিশ বছর। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি যদি ছবি থেকে এদের শনাক্ত করে তাঁকে খবর দিতে পারেন তাহলে তিনি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকবেন। মেয়েটির পরিচয় জানতে পারলে তিনি ক্ষমা চাইবেন তার কাছে।
  ইংরেজীতে লেখা চিঠি। ভিয়েতনাম ভাষায় তরজমা হয়েছিল স্থানীয় পত্রিকায়। সেটা কজন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল জানার উপায় নেই। মানুষ তার নিজের জীবন নিয়েই ব্যস্ত। তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ লোকই তো পত্রিকা পড়ে না। যারা পড়ে তারাও শুধু বাছাইকরা সংবাদগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখে। বাকিগুলো পড়ে না বা হালকাভাবে চোখ বুলিয়ে যায়। তবে উন্নততর বিশ্বের পাঠকরা যেমন পড়ার পর পত্রিকাগুলো রিসাইকেল বিনে ফেলে দেয় তৃতীয় বিশ্বের মানুষ সাধারণত তা করে না। রিসাইকেল বিন বলে কোন জিনিস নেই সেখানে। সেসব দেশে অনেকেই পত্রিকাগুলো মুদিদোকানে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। সেগুলো দিয়ে ঠোঙ্গা বানিয়ে মুদিরা মুড়ি-বাদাম-চানাচুর বেচে। এমনি এক ঠোঙ্গা একদিন এক অজ পাড়াগাঁয়ের বুড়ির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। ঠোঙ্গার ছবিটা দেখে বুড়ির মনে হল ছেলেটাকে দেখেছেন কোথাও। সমবয়সী আরো কজন গ্রামবাসীর সঙ্গে আলাপ করার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে হুই কিম ফাট নামক সেই যে ছেলেটা যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেনি এটা তারই ছবি। বিরাট এক হৈ চৈ পড়ে গেল গ্রামে। সেই ছোট্ট মেয়েটা যার বয়স তখন ত্রিশ পেরিয়ে প্রায় মাঝবয়সে এসে গেছে, তার ভাইবোন সবাইকে নিয়ে দৌড়ে এল বুড়ির বাড়িতে। তার বাবার ছবি দেখার জন্যে। বাবার সাথে দাঁড়ানো তার নিজের ছবি। খবর রাষ্ট্র হয়ে গেল সমস্ত পরগনাতে। সমস্ত দেশে। আমেরিকান সাহেবের হারানো সৈন্যের খোঁজ পাওয়া গেছে। ঐ ঘটনাটাই সবিস্তারে বর্ণনা করা ছিল রাষ্ট্রদূতের সেই চিঠিতে। শুধু তা?ই নয়। কদিন পর আরো একটা চিঠি এসে পৌঁছালো ভিয়েতনাম থেকে। ভিয়েতনামিজ ভাষায়। লিখেছে সেই মেয়েটি যার ছবি এতকাল ধরে তাঁকে যাতনা দিয়েছে। অনেক হৃদয়স্পর্শী বর্ণনার পর সে আশ্বাস দিয়েছে রিচ ল্যাটোকে যে তার মনে আর কোনও রাগ অভিমান দ্বেষ বিদ্বেষ নেই। সে তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছে সর্বান্তকরণে। ঈশ্বর তাঁকে শান্তি দিন, তাঁর মঙ্গল করুণ।
  রিচ তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন কিছুক্ষণ। স্বস্তির কান্না, ভারমুক্তির কান্না। যে-কান্না কেবল চুল-পেকে-যাওয়া বয়স্ক লোকেরাই কাঁদতে পারে। ভাবলেন, একটা মর্মভেদী কাব্যের শেষ পাতাটি লেখা হয়ে গেল। এবার হয়ত রাস্তায় গিয়ে সূর্যের তাপ আর আলো পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব হবে। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা তখন কোনায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিলেন।
  একসপ্তাহ পর দূতাবাস থেকে আরো একখানা চিঠি এসে উপস্থিত। অত্যন্ত দুঃখিত, বলে শুরু চিঠির প্রথম লাইন। ভিয়েতনাম সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ থেকে জরুরি খবর এসেছে যে রিচ ল্যাটো যে সময় এবং যে স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর আবেদনপত্রে, সে সময় এবং সে স্থানে হুই কিম ফাট নামক কোনও ভিয়েতনামিজ সৈন্য ছিল না, এবং ওই গ্রামের কোন যুবক সেই যুদ্ধে প্রাণ হারায়নি। তার অর্থ দাঁড়ালো এই যে রিচ বেচারার সারাজীবনব্যাপী সেই অন্তহীন মনোযন্ত্রনার কবল থেকে মুক্তি নেই। স্বস্তির শিখর থেকে হতাশার পাতালে পতন। ওঁর মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাবেন।
   তবে চরম হতাশাতেও মাঝে মাঝে ছোট আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে। গ্রামের সেই বুড়ির শনাক্তকরণ ভ্রান্ত প্রমানিত হলেও ঘটনাটি এমন ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়ে যায় সারা দেশব্যাপী যে অনেক ওয়াকেফহাল মহলই বেশ তত্‌পর হয়ে ওঠেন রিচ ল্যাটোর এই নিহত সৈন্যকে আবিষ্কার করার জন্য। চারপাঁচটি পরিবার পত্রিকায় দাবি করলেন সৈন্যটি তাঁদেরই হারানো সন্তান। কিন্তু সেনাবাহিনীর খুঁটিনাটি তদন্ততে এর কোনটাই টিকল না। শেষ পর্যন্ত অন্য এক গ্রাম থেকে এক ভদ্রলোক লিখলেন যে ছেলেটিকে তিনি ভালো করেই চিনতেন, কারণ তাঁরা একসাথেই যুদ্ধ করেছেন, এবং ওঁর নাম অঙ্গুয়ান। তারপর ঘটনাসমূহের এমন আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিলেন যে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পত্রপাঠ সেটা নাকচ করতে পারলেন না। অনেক খোঁজখবর নিয়ে তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে ভদ্রলোকের দাবি মিথ্যা নয়---রিচ ল্যাটো যাকে গুলি করেছিলেন তার নাম আসলেই অঙ্গুয়ান। তার মেয়ে এখনও জীবিত। একটা ছোট ভাই আছে তার। এবং সবাই মিলে তারা একই গ্রামে বাস করে।
  খবর পেয়ে ল্যাটো পরিবার উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আবারো যাতে হতাশ না হতে হয় তাঁরা ঠিক করলেন এবার সশরীরেই যাবেন ভিয়েতনামে, স্বচক্ষে দেখবেন সেই গ্রাম, সেই মেয়ে আর তার পরিবারকে। হাত ধরে ক্ষমা চাইবেন। এর আগে তাঁর মনের সংশয়, শঙ্কা সঙ্কোচ কিছুতেই দূর হবে না। তার আগে তাঁর ভিয়েতকংবধ নাটকের ওপর যবনিকা টানা যাবে না।
   দুদিকেই তুমুল প্রস্তুতি। একদিকে ল্যাটো দম্পতি। উদগ্রীব অপেক্ষায় দিন গুণছেন। অজানার আশঙ্কা, তীক্ষ্ণ প্রত্যাশা। যত দিন যায় ততই বুক কাঁপে। এক ভিয়েতনাম ছেড়ে এসেছিলেন ত্রিশ বছর আগে। এখন যাচ্ছেন আরেক ভিয়েতনামে। ভাবেননি যে এই বয়সে তিনি এতটা ঘাবড়াবেন মনে মনে। ওদিকে ওয়াই অঙ্গুয়ানের পুত্রকন্যা, তাদের ছেলেমেয়েরা, সমস্ত গ্রামের কৌতূহলী মানুষ, সমস্ত দেশের কৌতূহলী জনতা। ত্রিশ বছর পর পুরনো দুই শত্রুর সাক্ষাত্‌। এখন আর শত্রু নয় তারা। একে অন্যের বন্ধু, সম্মানিত অতিথি, প্রীতি আর শুভেচ্ছার বন্ধনে আবদ্ধ। সমস্ত গ্রাম মেতে উঠেছে উত্‌সবের আয়োজনে। চারদিকে সাজ সাজ রব। অঙ্গুয়ান পরিবারে বিরাট ভোজের ব্যবস্থা। নানান জায়গা থেকে আত্মীয়স্বজন এসে বাড়ি ভরে ফেলেছে। দূর আমেরিকা থেকে ল্যাটোসাহেব আসবে মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে। এর চেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা আর কি হতে পারে।
  অবশেষে সেই বহুঅপেক্ষিত দিন এসেই গেল। বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয়ে গেল অতিথি আপ্যায়ন। এরাইভেল্ লাউঞ্জে এসে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানালেন সাদর অভ্যর্থনা। ছোট বাচ্চারা পরালো ফুলের মালা। উর্দিপরা ড্রাইভার তাদের লিমোজিনে তুলে রওয়ানা হল সেই গ্রামের পথে। হাইওয়ে ছাড়িয়ে দীর্ঘ মেটোপথ। ধূলায় বালিতে একাকার। পথের দুধারে নতুন ভিয়েতনামের নতুন ছেলেমেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়ে জানালো তাদের সাদর স্বাগতম। যাত্রাশেষে স্বামীস্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে কাঁচা রাস্তার ওপর আগন্তুকের বিমূঢ় দৃষ্টিতে দাঁড়ালেন। চারদিকে কৌতূহলী জনতার ভিড়। গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ, সাংবাদিক, রেডিও আর টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যানেরা। যেন কোনও রাষ্ট্রপতি এসেছেন আরেক রাষ্ট্রের অতিথি হয়ে। আস্তে আস্তে তাঁরা এগুলেন একটা উঠানের দিকে। একঝাঁক মানুষ গোল করে দাঁড়ানো সারা উঠানব্যাপী। তাদের সামনে রঙ্গচঙ্গে কাপড় পরা সাদামাঠা চেহারার এক ভিয়েতনামিজ মহিলা। বুঝতে বাকি রইল না তিনি কে। তার চোখ তো সেই একই চোখ যার পীড়নে এতটা কাল তিনি দগ্ধ হয়েছেন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। সেই নির্বাক চাহনি, সেই দুর্বার দুঃসহ অভিমান অভিযোগ। অবশেষে সেই চোখের সম্মুখে সশরীরে উপস্থিতঁ হয়েছেন রিচ ল্যাটো। এতদিনের এত প্রস্তুতি, এত মহড়া সব গোল পাকিয়ে গেল রিচের মনে। পা কাঁপতে লাগলো থরথর করে। পকেট থেকে একটা কাগজ খুলে তিনি পড়তে শুরু করলেন। ভিয়েতনামিজ ভাষায়, ভাঙ্গা গলায়, যেটুকু বলার ছিল বলে ফেললেন গড়গড় করে। সেটা বেতার আর দূরদর্শনীতে প্রচার হল সমস্ত দেশে। ভিডিওতে রেকর্ড করা হল ?ডেইটলাইন? অনুষ্ঠানের জন্যে।
 ?তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে??
 বলে তাঁর বলা শেষ। আর কোনও শব্দ বেরুতে পারল না তাঁর মুখ থেকে। কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে, পা কাঁপছে, বুক কাঁপছে। সারাটি সময় ভাবলেশহীন স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। তাঁর বক্তব্য শেষ হবার পরও যেন সে বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। যেন কেউ তার সমস্ত শরীরটাকে অবশ করে দিয়েছে। এ কি লজ্জা, সঙ্কোচ? নিজের আবেগের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই? তারপর হঠাত্‌ কোথা থেকে কি হল তার মুখের সবগুলো পেশি যেন প্রবল ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠল প্রমত্ত আবেগের তাড়নাতে। টেলিভিশিনের পর্দায় আমরা সেই দৃশ্য দেখলাম---মানুষের হৃদয় তুমুল শক্তিতে ফেটে পড়ার সেই অসাধারণ দৃশ্য। ত্রিশ বছরের জমাট আবেগ হিমবাহের প্রপাত হয়ে ছুটল অবিরাম ধারায়। সমস্ত লজ্জা আর দ্বিধার বাঁধ ভেঙ্গে মেয়েটি লুটিয়ে পড়ল রিচ ল্যাটোর প্রশস্ত বুকের ওপর।  যেন তার নিজের বাবাই ফিরে এসেছে তার কাছে। এই বুকটা যেন বাবারই বুক, বাবার হন্তার বুক নয়। কতক্ষণ ব্যাপী কাঁদল দুজন বলার উপায় ছিল না। ফুলে ফুলে, কেঁপে কেঁপে। নির্লজ্জ, নিঃশঙ্ক, নির্বিকারে। চারদিকে ক্যামেরার চোখ, শত শত দর্শকের চোখ, সাংবাদিকদের চোখ। কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ ছিল না তাদের। আজ তাদের দুজনেরই বর্ষার কল্যানদায়ী প্লাবনধারাতে ভেসে যাবার দিন। আজ তারা কাঁদবে, কাঁদবে, কেঁদে কেঁদে পরস্পরের বুক ভাসাবে। আজ তাদের মুক্তির দিন। একজনের কান্না তার গ্লানি ঘোচাবে, আরেকজনের কান্না ঘোচাবে তার সারাজীবনের হাহাকার।
 রিচ ল্যাটো বাড়ি ফিরে এসেছেন। ভারমুক্ত, দায়মুক্ত। তাঁর হৃদয়ভরা মুক্তির প্রশান্তি।

অটোয়া

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে