Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৭ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.3/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-০৪-২০১৯

একজন সাইফুর রহমান এবং কিছু স্মৃতি 

আহবাব চৌধুরী খোকন


একজন সাইফুর রহমান এবং কিছু স্মৃতি 

আবারও ফিরে এসেছে ৫ই সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের বরণ্য রাজনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক সংস্কারক সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের শোকাবহ মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে পবিত্র রমজান মাসে মৌলভীবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আকস্মিক এক সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরন করেন তিনি।

বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘ সময়ের সফল অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করলে দেখা যায় তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যেমনি ছিলেন সৎ তেমনি মেধাবী এবং পরিশ্রমী। প্রতিভাবান এই মানুষটির জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ই অক্টোবর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রামে। বাবা মরহুম আব্দুল বাসিত ও মা তালেবুন নেছা দম্পতির প্রথম সন্তান সাইফুর রহমান ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারী স্কুল থেকে মেট্রিকোলেশন, ১৯৫১ সালে সিলেট এম সি কলেজ থেকে আই এস সি ও ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। তিনি ১৯৫৮ সালে লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড একাউন্টেন্ট থেকে কৃতিত্বের সাথে চাটার্ড একাউন্টেন্ট ডিগ্রী অর্জন করেন। 
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং  সলিমউল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ এক মাসেরও বেশী সময় কারাভোগ বরন করেন। 
তিনি ১৯৬২ সালে শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসে আত্নপ্রকাশ করেন একজন চৌকস পেশাজীবি হিসাবে। প্রতিষ্টা করেন ‘রহমান, রেহমান এন্ড হক‘ নামে একটি নিরিক্ষন ফার্ম। এই ফার্ম এখন ও বাংলাদেশে চাটার্ড একাউটেন্ট শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ ও প্রথম শ্রেনীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সাইফুর রহমানের কৃতিত্বের স্মারক হয়ে আছে। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে একজন অভিজ্ঞ একাউন্টেন্ট হিসাবে তেল, গ্যাস, কেমিক্যাল , ট্রান্সপোর্ট, ইনসুরেন্স, ব্যাংকিং  ইত্যাদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় পরামর্শক হিসাবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে দেশে বিদেশে প্রভূত সুনাম অর্জন করেন। 
সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যোগ দেন রাজনীতিতে। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে প্রাণে বিএনপির রাজনীতিকে লালন করে গেছেন। জনাব সাইফুর রহমান প্রথমে জিয়াউর রহমান সরকারের বানিজ্য উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রথমে শহীদ জিয়াউর রহমান ও পরে মরহুম বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের অর্থ ও বানিজ্য মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে ২৪শে মার্চ সামরিক শাসন জারী করে স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি নেতাকর্মীদের  উপর শুরু হয় নির্যাতন। এই সময় বিএনপির  শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সকল নেতার সাথে সাইফুর রহমানকেও গ্রেফতার করে সীমাহীন নির্যাতন করা হয়। এরশাদের এই জুলুম নির্যাতনের মুখে বিএনপির অনেক নেতা স্বৈরাচারী সরকারের সাথে আপোষ করে এরশাদের মন্ত্রী সভায় যোগদান করলেও তিনি নীতির প্রশ্নে আপোষ করেননি। এই সময় বিএনপি ভেঙ্গে গিয়ে চরম হুমকির সম্মুখিন হলে সাইফুর রহমান শহীদ জিয়ার বিধবা পত্নী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপি পুনঃগঠনে আত্ননিযোগ করেন। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় প্রায় পুরো নয় বছর তিনি রাজপথে থেকে সাহসীকতার সাথে সরকারের জুলুম নির্যাতনের মোকাবিলা করেন। ১৯৯০ সালে ছাত্র গনআন্দোলনের মুখে এরশাদের পতন হয় এবং সকল দলের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করলে সাইফুর রহমান আবারো দেশের অর্থ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দুই দফায় দশ বছর বেগম খালেদা জিয়া সরকারের অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ।

সাইফুর রহমান ছিলেন সৎ, মেধাবী, সাহসী, দেশপ্রেমিক ও স্পষ্টভাষী। যতটুকু মনে পড়ে মৃত্যুর বছর চারেক আগে তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল। ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে আমি দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তিনি ঈদের দিন সকালে সিলেট শাহী ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ে সিলেট শহর থেকে মৌলভীবাজার যাচ্ছিলেন। আমি উনার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব (এপিএস) কাইয়ুম চৌধুরীর সাথে তাঁকে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার পৌছে দিয়ে এসেছিলাম। তখন মন্ত্রী সাইফুর রহমানের সাথে ছিলেন সিলেট ও মৌলভীবাজারের দুই জেলা প্রশাসক, দুই জেলার পুলিশ সুপার, উনার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ ও তৎকালীন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এই দিন অন্যান্য ঈদের দিনের মতো মৌলভীবাজারস্থ উনার বাগানবাড়ীতে জনতার ঢল নেমেছিল। এর সপ্তাহ খানেক আগে তিনি আমেরিকা সফর করে গেছেন। আমি নিউইয়র্ক থেকে এসেছি শুনে আমাকে সিলেটি ভাষায় বললেন "তোমাদের আমেরিকায়তো দেখলাম বেশ ঠান্ডা পড়েছে। এত ঠান্ডা যে আমিতো এবার গিয়ে বেশ অসুস্থ ছিলাম।' আমি বললাম 'স্যার আমি জানি। জিল্লুভাই (যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক) আমাকে বলেছেন। আমি তখন দেশে চলে এসেছিলাম। তাই আপনার সাথে আমার দেখা হয়নি।' দেখলাম তিনি বেশ ক্লান্ত। তাই অন্যান্য দিনের মতো বেশীক্ষণ বাগান বাড়ীতে থাকতে চাননি। এক পর্যায়ে তিনি সবার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন তাঁর বাহারমর্দনের বাড়িতে। উল্লেখ্য বাহারমর্দন তাঁর পৈত্রিক বাড়ি। সিলেটে এলে তিনি তাঁর বাবার স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িতেই রাত্রি যাপন করতেন।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একজন অনুসারী হিসাবে আদর্শ এই মানুষটির সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ এই বিশ বছর অসংখ্যবার তাঁর সাথে বিভিন্ন সভা সমাবেশে মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জে সফর সঙ্গী হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক ও পরবর্তীতে সিলেট জেলা বিএনপির সাংস্কৃতিক ও আপ্যায়ন সম্পাদক হিসাবে ১৯৯৩ থেকে ২০০১ পর্যন্ত স্যারের সকল কর্মসূচীতে আমি থাকার সুযোগ পেয়েছি। 
মনে পড়ে ১৯৯১ সালের কথা, আমি তখন ফেঞ্চুগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সিনিয়ার যুগ্ম আহ্বায়ক। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানাকে কেন্দ্র করে সিলেটে তখন আন্দোলন সংগ্রাম তুঙ্গে। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম শ্রদ্ধেয় আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেবেরর নেতৃত্বে বৃহত্তর সিলেটের ১৮ জন বিরোধীদলীয় সাংসদগন ফেঞ্চুগঞ্জ সর কারখানায় বিশাল প্রতিবাদ সভা করে গেছেন। সরকারের শিল্প মন্ত্রনালয় ঝুকিপূর্ণ  অজুহাত দিয়ে একটি সার্কুলেশনের মাধ্যমে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধ করার সিন্ধান্ত নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে একটি বিজ্ঞাপন ও বিটিভিতে প্রচার হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা বন্ধের সিন্ধান্ত চুড়ান্ত। 
ফেঞ্চুগঞ্জে তখন দুটি ধারায় আন্দোলন চলছে। একটি ধারার নেতৃত্ব দিয়েছে গনদাবী পরিষদ। নেতৃত্বে ছিলেন সিলেট -৩ আসনের বর্তমান সাংসদ শ্রদ্ধেয় মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী ও ডাঃ মিনহাজ উদ্দিন, আর অন্য ধারা সর্বদলীয় সার কারখানা রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলনেতা কাইয়ুম চৌধুরী, উপজেলা বিএনপি নেতা আনোয়ারুল করিম চৌধুরী ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম প্রমুখ। ফেঞ্চুগঞ্জে প্রতিদিন মিছিল মিটিং হচ্ছে, আমরা তখন ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা রক্ষা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ফেঞ্চুগঞ্জে পৃথক ছাত্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। (আওয়ামী ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, আঞ্জুমানে তালামীয ও জাতীয় ছাত্র ঐক্য এই সংগঠন গুলোর সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছিলে এই ছাত্র ঐক্য)। আমরা ঘোষনা দিয়েছিলাম ফেঞ্চুগঞ্জে নতুন সার কারখানা নির্মান না করে পুরাতন সার কারখানা বন্ধ করা যাবে না। 
অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তখন  ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের একটি প্লান্ট উদ্বোধন করতে ফেঞ্চুগঞ্জে আসবেন। এই সময় আন্দোলনরত জনতার পক্ষ থেকে ঘোষনা দেওয়া হয়েছিলো সার কারখানা বন্ধের সিন্ধান্ত বাতিল করা না হলে মন্ত্রীকে ফেঞ্চুগঞ্জে নামতে দেওয়া হবে না। সাইফুর রহমান যেদিন ফেঞ্চুগঞ্জে আসবেন এই দিন লাঠি মিছিল করা হবে। মন্ত্রী সাইফুর রহমান খবর পেয়েতো খুবই ক্ষুব্ধ। আমার এলাকায় আমি আসবো দেখি আমাকে কারা বাধা দেয়? এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সিলেট থেকে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, জেলা বিএনপি ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ ফেঞ্চুগঞ্জে আসলেন, উপজেলা পরিষদের হল রুমে গভীর রাত অবধি সর্বদলীয় মিটিং হলো। অবশেষে সিন্ধান্ত হলো সাইফুর রহমানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে, লাঠি মিছিল বাতিল। তবে উপজেলা বিএনপি আহবায়ক আনোয়ারুল করিম চৌধুরী, আওয়ামীলীগ সভাপতি ডাঃ মিনহাজ উদ্দিন ও সার কারখানার সিবিএ সভাপতি এম এ রশিদ (উনারা কেউ এখন আর বেঁচে নেই ) সাহেবের নেতৃত্বে সারা কারখানা  রক্ষায় আন্দোলনরত নেতৃবৃন্দ সাইফুর রহমানের সাথে সাক্ষাত করে তাদের দাবী দাওয়া জানাবেন। অবশেষে সেদিন সারকারখানা রক্ষার দাবীতে আন্দোলনরত নেতৃবৃন্দের সাথে সাইফুর রহমানের সফল সভা হলো  এবং এম সাইফুর রহমানের নির্দেশে সেদিন সরকারের শিল্প মন্ত্রনালয় সার কারখানা বন্ধের হটকারী সিন্ধান্ত বাতিল করে।

সিলেট বিভাগ প্রতিষ্টায় সাইফুর রহমানের ভুমিকা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। তখন সিলেটে বিভাগ হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন চলছে,  এই দাবী গনদাবীতে পরিণত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ১৯৯৪ সালের ২৪শ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিলেটে আসবেন। আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভার আয়োজন চলছে। সাইফুর রহমান এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে নাকি বলেছিলেন আপনি যদি এখন এই জনসভা থেকে সিলেটকে দেশের নতুন বিভাগ হিসাবে ঘোষনা না দেন তাহলে আমি আপনার মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করবো। শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অর্থমন্ত্রীর কথামতো সিলেটের বিশাল জনসভায় সিলেটকে দেশের নতুন বিভাগ হিসাবে ঘোষনা দেন। এভাবে সাইফুর রহমান চাপ প্রয়োগ করে  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন ।

১৯৯৭ সালের কথা। আওয়ামীগ তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। আমার সুযোগ হয়েছিলো উনার সাথে ঢাকা থেকে সকালের পারাবত ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার। স্যারের সাথে সফর সঙ্গী  কাইয়ুমচাচা (কাইয়ুম চৌধুরী) ও আমি পারাবত ট্রেনের একটি ডাবল কেবিনে করে আমরা ঢাকা বিমান বন্দর স্টেশন থেকে এক সাথে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি। স্যার ট্রেনে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি ও কাইয়ুমচাচা উনার সামনের সিটে বসে  আস্তে আস্তে গল্প করছি। ট্রেন চলতে চলতে আখাউড়া স্টেশনে এসে থামলে লোকজনের চিৎকারে উনার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। উনি খুব বিরক্ত হলেন ও জানতে চাইলেন ট্রেন এখন কোথায় আছে। আমরা বললাম আখাউড়া। বেশ রাগাম্বিত হয়ে বললেন এই একটি স্টপেজ আমাদের লাইনে অযথা রাখা হয়েছে। এতে প্রতিটি যাত্রীর ক্ষতি হয় একঘন্টা আর লাভ হয় চোরাকারবারীদের। অথচ এখানে মাত্র অর্ধ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মান করতে পারলে ট্রেন সোজা  সিলেট চলে যেতে পারে। ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য এখানে থামতে হতো না। মনে রেখো আল্লাহ যদি কখনো আমাকে আবার সুযোগ দেন এখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর আর কোন সুযোগ রাখবো না। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় এলে সাইফুর রহমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হন এবং আখাউড়ায় সিলেটের মানুষের সুবিধার্থে এক কিলোমিটার রেল পথ নির্মান করে স্যারের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। ঢাকা থেকে  সিলেট এবং সিলেট থেকে ঢাকাগামী সকল ট্রেনের স্টপেজ আখাঊড়া থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয় যা আজও বহাল আছে। এখনো দেশে গেলে ট্রেনে করে ঢাকা যাওয়ার সময় স্যারের এই কথা মনে হয়।

সাইফুর রহমান মন্ত্রী থাকা কালে উন্নয়নের ব্যাপারে পালন করেছেন বিস্ময়কর কৃতিত্ব। একবার মনে আছে ১৯৯১ সালে সরকারের সময় আমরা স্যারের সাথে রাজনগরে জনাব রাগীব আলী সাহেরের চা বাগানে দুপুরের লাঞ্চ করে রওনা হলাম ফতেহপুর বাজারে। ফতেহপুর সিলেট এবং মোলভীবাজারের বর্ডার। ফতেহপুরের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন জামীভাই। আমরা স্যারের সাথে বিশাল গাড়ীর বহর নিয়ে যখন ফতেহপুর যাচ্ছিলাম তখন কাঁচা এই রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হয়েছিলো রাস্তা নয় আমরা যাচ্ছি যেন হাওয়ের উপর দিয়ে, তিনি স্পট পরিদর্শনে করলেন, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শ  করলেন, জনসভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় জনগনের দাবীর মুখে এই রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি তখন টেকনোক্রেট মন্ত্রী। আওয়ামীলীগের আজিজুর রহমান মৌলভীবাজার সদরের এম পি ছিলেন। মৌলভীবাজারবাসীর প্রতি স্যারের তখন একটু ক্ষোভ ছিলো। এই মিটিংয়ের প্রায় এক বছর পর সাইফুর রহমান আবারো ফতেহপুর গেলেন এই রাস্তা উদ্বোধন করতে। কি সুন্দর রাস্তা এক বছরে নির্মিত হয়েছে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

মরহুম সাইফুর রহমানকে নিয়ে আমার এমন অনেক স্মৃতি রয়েছে যা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন একজন সিলেট দরদী মানুষ। সিলেট বিভাগে যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে তার সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবীদার এই সাইফুর রহমান। তিনি তাঁর কর্মের জন্য সিলেটবাসীর অন্তরে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

লেখক: সংগঠক ও কলামিষ্ট, সাধারণ সম্পাদক, সাইফুর রহমান স্মৃতি ফোরাম, নিউইয়র্ক।

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে