Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-০৩-২০১৯

‘ভূমি মিহির’ অফিস করেন ৩ হাজার টাকা ভাড়ার স্পিডবোটে

জাবেদ রহিম বিজন


‘ভূমি মিহির’ অফিস করেন ৩ হাজার টাকা ভাড়ার স্পিডবোটে

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৪ সেপ্টেম্বর- নিজের নানা কীর্তির কারণে সবার কাছে তিনি পরিচিত ‘ভূমি মিহির’। পুরো নাম মিহির কুমার ঘোষ। ভূমি অফিসের অফিস সহকারী। জেলা শহরে রয়েছে পাঁচতলা বাড়ি। তার থাকার ফ্ল্যাটে একাধিক এসি। গাড়িও আছে। ঢাকায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনারত ছেলে ব্যবহার করে সেই গাড়ি। ঢাকায় একটি হাসপাতালেরও মালিক।

তার বর্তমান কর্মস্থল নবীনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়। পদে পদে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নেয়ায় সিদ্ধহস্ত তিনি। নবীনগরের কর্মস্থলে যাতায়াতে রিজার্ভ স্পিডবোটও ব্যবহার করেন এই সরকারি কর্মচারী। যেতে আসতে মোট ৩ হাজার টাকা রিজার্ভের ভাড়া গুনেন তিনি।

জেলা প্রশাসকের কাছে তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি অভিযোগ দেয়া হয়। সোমবার জেলা প্রশাসনে তার বিষয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে জানা যায়, অভিযোগের কারণে তার চাকরির রেকর্ডপত্রের ফাইল জেলা প্রশাসকের টেবিলে রয়েছে। ১৯৯৬ সালে চাকরি হয় মিহিরের। প্রথম পোস্টিং জেলার বাঞ্ছারামপুরে। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পোস্টিং হয় তার।

সবখানেই ভূমি অফিসকে বেছে নেন তিনি। কিন্তু সব চাকরিস্থল থেকে বদলি হতে হয়েছে তাকে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ কাঁধে নিয়ে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে নবীনগরে কর্মরত মিহির। এই দু-বছরে সেখানকার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর অফিসকে বানিয়েছেন দুর্নীতির আখড়া। যেখানে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না। মোটকথা মিহিরকে এই ভূমি অফিসের হর্তাকর্তা হিসেবে জানেন সবাই।

নবীনগরে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে বড়িকান্দি ইউনিয়নের থোল্লাকান্দি গ্রামের মুছা মিয়ার কাছ থেকে মিসকেসের জন্যে ২ লাখ টাকা নেয়ার বিষয়টি অন্যতম। মুছা মিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি মিহিরকে ১ লাখ টাকা দেয়ার কথা স্বীকার করেন। জানান, থোল্লাকান্দি মৌজায় থাকা তার জমির দাগ নম্বর ২২৩৫, ২২৩৬ ও ২২৩৭ এর স্থলে ২২০৫, ২২০৬ ও ২২০৭ লিপিবদ্ধ হয়।

ওই দাগ নম্বর পরিবর্তনের জন্যে তিনি মিসকেস করেন। এরজন্যে কয়েক মাস ঘুরে হয়রান হন। একাধিকবার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে দেখা করেন। সর্বশেষ সহকারী কমিশনার তাকে এবিষয়ে মিহিরের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মিহিরের কাছে যাওয়ার পর মিহির তার কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। এই টাকা দেয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে কাজ হয়ে যায়। এর আগে ভূমি অফিসের আরেকজনকে ৩০ হাজার টাকা দেন তিনি। নামজারি ও জমা খারিজের সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে মিহিরের বিরুদ্ধে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নামজারি মোকদ্দমা নম্বর ১০৫২, ১০৮৭, ১০৫১, ১০৮৯, ১০৯০, ১১৯৭, ১২০২, ১০৩৩, ৭৩৯, ১১৫০, ১১৫৭, ১০৯৪, ৫২১, ১০৪৯, ৯১৪, ৯১২, ৩৮২, ৩৬৪, ৮১৪, ৮১৭, ৮১৩, ১০৩১, ৭৮২, ৮৬০, ১০০৭, ১০৭০, ৪২৭, ৬১৬, ১০৬০, ১০১২, ৩৮৫, ১২৩০, ১২৩১, ৩৬৩, ১২৬০, ১২৬১, ১৩৬১ এর বিপরীতে ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রসিদ) কাটা হয়নি।

প্রত্যেকটি নামজারির জন্যে ১১৫০ টাকার ডিসিআর কাটতে হয়। এই টাকা সবই আত্মসাৎ করেছেন মিহির। জেলা প্রশাসকের কাছে দেয়া অভিযোগে বলা হয়, নবীনগরের বেশিরভাগ নামজারি তার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়। নামজারিতে ত্রুটি থাকলে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ছোটখাটো রেকর্ড সংশোধনের জন্য ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় তাকে। আর ভিপি নামজারির জন্যে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

খাসজমি বন্দোবস্তেও নিজের নামে ১০ হাজার এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নামে আরো ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। বাজার ভিটি নবায়নের নামেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হয় তার বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে ৫০০ টাকার ডিসিআরের জন্যে ২ হাজার টাকা নেয়া হয়। ভিপি লিজের ফাইল নবায়নেও দিতে হয় তাকে মোটা অঙ্কের টাকা। নবীনগরের আগে আশুগঞ্জ, তার আগে বিজয়নগর উপজেলায় ছিলেন মিহির। কসবাতেও চাকরি করেছেন। সবখানেই উঠেছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ।

মিহিরের বাড়ি: জেলা শহরের টিএ রোডের পাশেই বনিকপাড়ায় পৌনে ৪ শতক জায়গার ওপর ৫তলা বাড়ি করেছেন মিহির কুমার ঘোষ। বাড়ির ফ্লোর ও সিড়িতে ব্যবহার করেছেন দামি পাথর। আর সেসব আনা হয় ঢাকা থেকে। তার থাকার ফ্ল্যাটে আছে একাধিক এসি। ৪টি সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে বাড়িটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে।

২০০৭ সালে এই বাড়ি করার সময়েই আলোচিত হন মিহির। মিহির যে জায়গায় বাড়ি করেছেন এর প্রতি শতক জায়গার মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। তার একটি গাড়ি আছে বলেও জানান তার এক প্রতিবেশী। গাড়িটি ঢাকায় তার ছেলে ব্যবহার করে। ঢাকায় একটি হাসপাতাল থাকার কথাও জানিয়েছেন তার প্রতিবেশীরা। তবে মিহির কুমার ঘোষ এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো কিছু জানেন না বলেই জানান। আর অভিযোগ হয়ে থাকলে সেটি শত্রুতামূলক বলেই তার দাবি। শহরের বাড়িটি তার নিজের বলে স্বীকার করেন।

অনিয়মে মত্ত ছিলেন সহকারী কমিশনারও (ভূমি): ১৪ই আগস্ট নবীনগর থেকে বিদায় নিয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) জেপি দেওয়ান। ইংল্যান্ডে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। দু-বছর কর্মকালে নানা কারণে আলোচিত ছিলেন এই কর্মকর্তা। মোবাইল কোর্ট দিয়ে লোকজনকে ধরে এনে নিজেই মারধর করেছেন। ব্যক্তি বিশেষের জায়গা কলেজের নামে নামজারি করে দেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ব্যাপক আলোচিত। জানা যায়, ১৯৯১ সালে উপজেলার সলিমগঞ্জ এলাকায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এলাকার লোকজন।

ওই সময় ৩৩৮ দাগে ২৮ এবং ৩৪১ দাগে ১৪ শতক মোট ৪২ শতক জায়গার ওপর কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে শর্তসাপেক্ষে অর্পণনামা দলিল করে দেন বাড়াইল গ্রামের কিতাব আলী ও ছিদ্দিকুর রহমান। ওই স্থানে কলেজ প্রতিষ্ঠা হলেই ওই জায়গা কলেজের সম্পত্তি বলে গণ্য হবে। কিন্তু কলেজ যদি অন্যত্র প্রতিষ্ঠা হয় তবে ওই জায়গা ব্যক্তি কিংবা ওয়ারিশগণ মালিক বলে গণ্য হবে। এই শর্ত রেখেই দলিল সম্পাদন হয়। কিন্তু ওই বছরই কলেজটি ওই জায়গা থেকে প্রায় আধাকিলোমিটার দূরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কলেজের জন্যে অর্পণ করা জায়গার দখল এবং খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করছেন দুই ভূমিদাতা।

গত ৮ই জুলাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জেপি দেওয়ান নামজারির কোনো প্রস্তাব ছাড়াই ওই জায়গা কলেজের নামে নামজারি করে দেন। এর আগে ২০১৫ সালেও জায়গাটি কলেজের নামে নেয়ার চেষ্টা করা হলে তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) কলেজের নামে নামজারি করা সমীচীন নয় মর্মে ওই প্রস্তাব বাতিল করে দেন।

ওই সময়ে ছলিমগঞ্জ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন এবিষয়ে সহকারী কমিশনারের কাছে যে তদন্ত প্রতিবেদন দেন তাতে বলা হয়- অর্পণনামা দলিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দীর্ঘকাল ধরে ওই জায়গায় কলেজ পরিচালিত না হলে অর্পণকৃত জমি ভূমিদাতা কিংবা ওয়ারিশগণ ফিরে পাবেন। সরজমিনে তদন্তকালে দেখা যায়, ওই জায়গায় কলেজের কোনো দখল নেই। সে কারণে জায়গাটি কলেজের নামে নামজারি করার প্রস্তাব দেয়া গেল না।

সলিমগঞ্জ ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা জাকির হোসেন সহকারী কমিশনারের এই নামজারির ঘটনায় নিজেই বিস্মিত। তিনি বলেন, আমিতো এই জায়গার নামজারির জন্য কোনো প্রস্তাবই দিইনি। কীভাবে নামজারি হলো তা আমার বোধগম্য নয়। তাছাড়া ওই জায়গা কলেজের দখলে নেই বলে জানান তিনি। এই নামজারি বাতিলের জন্যে আদালত এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার জেপি দেওয়ানের সঙ্গে গতকাল মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি যেটা করেছি সেটা নিয়মের মধ্যেই করেছি। ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে বলেন অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই।

সূত্র: মানবজমিন

আর/০৮:১৪/০৪ সেপ্টেম্বর

ব্রাক্ষ্রণবাড়িয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে