Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-০১-২০১৯

লক্কর-ঝক্কর গাড়ি নিয়ে আধুনিক ঢাকা সম্ভব?

নাজমুল হাসান সাগর


লক্কর-ঝক্কর গাড়ি নিয়ে আধুনিক ঢাকা সম্ভব?

যখন আধুনিক নগর ও যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য সরকার আন্তরিক এবং এই খাতে মুক্তহস্তে বিনিয়োগ করেই যাচ্ছে তখন সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। বিআরটিএ’র চলতি মাসের ২১ তারিখের হিসেব অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কর পরিবহন আছে পাঁচ লাখ সাতত্রিশ হাজার ২৫৬ টি। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে এক লাখ সত্তর হাজারের মতো। এইসব ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারনে সড়কে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ যাত্রীদের। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে এসব আনফিট গাড়িও একটি প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করছেন দুর্ঘটণা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষকগণ। এসব লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি নিয়ে কি সরকার ঘোষিত আধুনিক ঢাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব?

আনফিট গাড়িগুলোর কারণে যাত্রীরা যেসব সমস্যা মোকাবেলা করে থাকেন সেগুলো নিয়ে কথা হয় যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যান সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সাথে। তিনি বলেন, প্রথমত সাধারণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত গণ পরিবহন আমাদের দেশে ও ঢাকা শহরে নেই। দিনে দিনে যত বেশি প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে সে তুলনায় গণপরিবহন বাড়ছে না। আর এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে এক ধরনের অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতীক ব্যক্তিবর্গ। তারা চাহিদা বিবেচনা করে ঢাকার রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছেন লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি। আনফিট গাড়িগুলো সময়ের সাথে চলতে অপারগ এবং এগুলো মাঝ পথেই বিকল হয়ে পরে থাকে বেশিরভাগ সময়। যখন একটি গাড়ি মাঝ পথে বিকল হয়ে পড়ে থাকবে তখন সেই গাড়ির যাত্রীরা সময় মতো অফিসে পৌছাতে পারবে না, একজন ব্যাবসায়ী তাঁর কাঁচামাল সময় মতো আড়তে পৌঁছাতে পারবে না কিংবা একটা ফিটনেসবিহীন এ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী বহনের সময় সেটা বিকল হয়ে গেলো তখন ওই রোগীটির প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে। আধুনিক ঢাকার আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান অন্তরায় হিসেবে এসব আনফিট গাড়িগুলোকে দায়ী বলে মনে করছেন তিনি। যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির প্রধান এই ব্যাক্তি আরও বলেন। এসব আনফিট গাড়ি যদি রাস্তা থেকে সরানো যায় তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ৮০ ভাগ ভোগান্তিমুক্ত ও সুন্দর হবে। তিনি এটাও বলেন, এই গাড়িগুলো খুব সহজেই সরানো যাবে না রাস্তা থেকে । এর পেছনে অনেক প্রভাবশালী মানুষজন জড়িত এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি আরো বলেন, এই গাড়িগুলো যে রাস্তায় চলে সেখানে তো আইনের লোক থাকে তারা মনিটরিং করলেই তো সেগুলো আর রাস্তায় চলবে না কিন্তু তারপরেও চলে। কারণ দিনে বিশাল অঙ্কের টাকা অনেকের পকেটে ঠোকে এই ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামলে।

দেশের মোট দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে পঁয়তাল্লিশ ভাগ ঘটে থাকে বাস ও ট্রাকের মাধ্যমে। এছাড়া সড়ক ও পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে, বেপরোয়া গতি ও অদক্ষ্য চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে দূর্ঘটণার জন্য অন্যতম দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার জন্য ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো কতটা দায়ী এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে কোন ধরণের দুর্ঘটনা বেশি ঘটে? এমন প্রশ্ন করা হয় বুয়েট পরিচালিত দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজের কাছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সিংহভাগই ঘটে অতিরিক্ত গতি আর বেপরোয়া চালনার কারণে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারনে কতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ডেটা আমাদের কাছে নেই তবে ফিটনেস না থাকার কারনে যে ধরণের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে সেসব নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, একটা গাড়ির ব্যাসিক সেফটি ফিটনেস হচ্ছে সেই গাড়ির ব্রেক, ইন্ডিকেটর, সবল টায়ার এবং ওয়াইপার। খুব সহজভাবে বলতে গেলে ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোতে এসব জিনিসের কমতি থাকলে ব্রেক ফেল হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আবার ওয়াইপার দূর্বল থাকলে সেই গাড়ি উলটে যেতে পারে। যদি ছোট্ট একটা লাইট ইন্ডিকেটর না থাকে তাহলে সে গড়িটি তাঁর পেছনে আসা গাড়িকে সঠিক বার্তা দিতে পারে না। একারনেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সবল কাঠামো না থাকার কারনে চলন্ত অবস্থায় গাড়ি ভেঙে যেতে পারে। ফিটনেস না থাকার কারনে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে গাড়ি। আধুনিক ঢাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যে ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো কতটা অন্তরায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেখুন ফিটনেস বলতে এক্ষেত্রে আমি শুধু ইন্টেরিয়র সুন্দর হবে এমনটা মানি না। ঢাকা একটা রাজধানী এটাকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়তে প্রত্যেকটি গাড়িকে কাঠামোগত ও বাহ্যিকভাবে সুন্দর হতে তো হবেই। সেই সাথে প্রত্যেকটি গাড়ির অভ্যন্তরীণ ফিটিং ঠিক থাকতে হবে। ইন্ডিকেটর ও ওয়াইফার যায়গা মতো থাকতে হবে। আর রাজধানীর মতো একটা জায়গায় এমন লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি তো কোন ভাবেই মানানসই না। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে বানিজ্যিকভাবে যে গাড়িগুলো আমদানী করা হয় তাঁর বেশির ভাগ গাড়িই হচ্ছে রিকন্ডিশন। চায়না, জাপানশ বেশ কিছু দেশ থেকে যে গাড়িগুলো আমাদের দেশে বানিজ্যিকভাবে নিয়ে আসা হয় তাঁর বেশির ভাগই সেকেন্ড হ্যান্ড। সেক্ষেত্রে খুব অল্প দিনেই এদেশের রাস্তায় চলা গাড়িগুলো ফিটনেস হারায় এবং নানা ধরনের ভোগান্তি পেতে হয় যাত্রীদের। দেশে যেসব গাড়ি আমদানী করা হয় তাঁর শতকরা ৮০ ভাগ গাড়ি সেকেন্ড হ্যান্ড এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন বারভিডা নামে একটি গাড়ি রিকন্ডশন ও আমদানী কারক প্রতিষ্ঠান।

কেনো রাস্তা থেকে আনফিট এই লক্কড়-ঝক্কর গাড়িগুলো সরানো যাচ্ছে না জানতে কথা বলার চেষ্টা করা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহর সাথে। সরাসরি ও মোবাইলফোনে কোনভাবেই সে কথা বলতে রাজী হননি প্রতিবেদকের সাথে।

এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ও নগরবীদ কে এম আনসার হোসেনের সাথে। তিনি মনে করেন, এত ঝুঁকি, প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবহন জনিত অনিরাপত্তা নিয়ে কোন ভাবেই আধুনিক ঢাকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব না। দুনিয়ার কোথাও অন্য কোন শহরে এত আনফিট গাড়ি চলে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এই গড়িগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে না হলে আধুনিক ঢাকা আর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বপ্নই থেকে যাবে। আনফিট গাড়িগুলো কেনো সরানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে আধুনিক রংপুর শহরের ডিজাইনার এই নগরবিদ বলেন, এটা খুবই পলেটিক্যাল একটা আলাপ। এটা নিয়ে আমার বেশি কিছু বলার নাই আসলে। আমি তো একজন প্ল্যানার। এখানে প্ল্যানার হিসেবে বলার কিছু নাই তবে, সাধারণ জনগন হিসেবে আমি যেটা উপলব্ধি করি সেটা হলো, এই ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো যারা রাস্তায় নামায় তাদের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাপক। যারা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকা লোক। এই জন্যেই রাস্তা থেকে এই গাড়িগুলো সরানো যাচ্ছে না। এসব সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আসার কোন রাস্তা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশে রাস্তার থেকে যাত্রী ও গাড়ি বেশি। রাস্তায় যে গাড়িগুলো আছে তাঁর মধ্যে কিছু ফিট আর কিছু আনফিট। ধরলাম সবগুলো গাড়িই ফিট কিন্তু তাতেও কি কোন লাভ আছে? ফিট গাড়ি থাকার কারণে সেফটি বাড়লেও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে না কোন অংশেই। এর জন্য রাস্তা বাড়াতে হবে এবং নিতে হবে পর্যাপ্ত সময় উপযোগী পরিকল্পনা। বুয়েটের সাবেক এই শিক্ষক মনে করেন, ফিটনেসের সাথে যাত্রীদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা জড়িত কিন্তু যানজট ও জন দুর্ভোগ কমাতে নিতে হবে অন্য পদক্ষেপ। তাহলে কি পদক্ষেপ নিলে একটি আধুনিক ঢাকা ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে সেটার সমাধানও পরিকল্পনার মাঝে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগরে গণ পরিবহণের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং কমাতে হবে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। অথচ আমাদের পলেসি চলছে উল্টো পথে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েই চলেছে আর কমছে গণ পরিবহনের সংখ্যা। একারনেই রাস্তায় সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ ও ভোগান্তির হার বেড়েই চলেছে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে কোন ভাবেই আধুনিক ঢাকা বলেন আর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বলেন কোনটাই সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, বর্তমান বাজেটের পুর্বের বাজেটে সব থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিলো পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। তৎকালীন ও বর্তমান সরকারের সব ধরনের চেষ্টা ও আন্তরিকতা থাকা সত্বেও কেন এই সেক্টরের এমন বেহাল অবস্থা সেসব প্রশ্ন ঘুরপাক করছে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মনে।

সুত্র : বাংলা ইনসাইডার

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে