Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-০৭-২০১১

'লঙ ওয়েটিং' ছবির কাহিনী এবং বাংলাদেশের রাজনীতি

আবদুল গাফফার চৌধুরী


'লঙ ওয়েটিং' ছবির কাহিনী এবং বাংলাদেশের রাজনীতি
আমার কৈশোর, সেই পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, তখন হলিউডের ওয়েস্টার্ন ছবি দেখার খুব শখ ছিল (এখনও যে নেই তা বলছি না)। তখন ঢাকার দুটি প্রেক্ষাগৃহে কেবল ইংরেজী ছবি দেখানো হতো। একটি ছিল গুলিস্তান হলের কাছে। নাম ব্রিটানিয়া। অন্যটি ছিল পুরনো ঢাকায়, সেন্ট্রাল জেলের সম্মুখভাগের যে রাস্তাটি বংশালের দিকে চলে গেছে, তার এক বাইলেনে। সম্ভবত আলি নকির দেউড়ি নাম ছিল। সিনেমা হলটির নাম ছিল নিউ পিকচার প্যালেস অথবা নিউ পিকচার হাউস। এই দুটি সিনেমা হলের একটিও এখন নেই।

ব্রিটানিয়া এবং নিউ পিকচার প্যালেসে আমি কেবল ওয়েস্টার্ন ছবি নয়, সে যুগের অনেক নাম করা ইংরেজী ছবি দেখেছি। যেমন 'ড. জেকিল এ্যান্ড মি. হাইড, 'গিভ আস দিস ডে', 'স্ট্রেঞ্জার ইন এ ট্রেন', 'থ্রি মাস্কেটিয়ার্স' এবং আরও অনেক ছবি। ঢাকার তখনকার এলিট ক্লাসের প্রায় সকলকেই এই দুটি ছবিঘরে দেখা যেত। আর কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা তো ভিড় জমাতই।
এই নিউ পিকচার প্যালেসে আমি একবার কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গে দল বেঁধে একটি ওয়েস্টার্ন ছবি দেখতে গিয়েছিলাম। একটি নয়, দুটি ওয়েস্টার্ন। একটির নাম 'হাইনুন', অন্যটির নাম 'লঙ ওয়েটিং'। দ্বিতীয় ছবিটির ভিলেনের নাম আমার মনে নেই। কিন্তু হিরোর নাম মনে আছে_ গ্রেগরি পেক। লঙ ওয়েটিংয়ের ছবির কাহিনীটি আমার মনে কেন এত প্রবলভাবে গেঁথে গিয়েছিল তা আমি জানি না। ওয়েস্টার্ন সব ছবির কাহিনীই তো প্রায় এক ধাঁচের। কিন্তু লঙ ওয়েটিং ছবিটির কাহিনী আমার কাছে অন্য ধাঁচের মনে হয়েছে।

সংৰেপে ছবির কাহিনী হলো, এক দুর্ধর্ষ ভিলেনের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিনটি আসন্ন হয়ে এসেছে। ধরা পড়ার আগে সে আমেরিকায় বহু স্টেট, সিটিতে দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাকে ধরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পৰে ছিল অসাধ্য। তারপর একদিন একটি সিটির শেরিফ তাকে হঠাৎ ধরে ফেলতে সক্ষম হন। ভিলেনকে লিন্চ্ করে ফেলা হতো। কিন্তু শেরিফই তাকে বাঁচিয়ে বিচারে সোপর্দ করেন। বিচারে তার বারো বছর জেল হয়।
প্রহরী বেষ্টিত অবস্থায় জেলে যাওয়ার সময় ওই সিটি শেরিফ ও শহরবাসীকে ধমক দিয়ে যায়, সে জেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই এই সিটি এবং তার শেরিফকে দেখে নেবে।

দীর্ঘ বারো বছর ভিলেনের সহকর্মীরা অপেক্ষা করেছে, কবে তাদের লিডার ফিরে আসেন। আর শহরবাসীরা আতঙ্কে দিন গুনেছে কবে সে ফিরে এসে আবার তাদের ওপর চড়াও হয়। শেষ পর্যন্ত তার ছাড়া পাওয়ার দিনটি এল এবং এও জানা গেল, ভিলেন প্রথমেই ট্রেনে চেপে এই সিটিতে এসে নামবে। তার দলবলও অন্যান্য এলাকা থেকে এই সিটিতে এসে জমা হচ্ছে। শহরটির চারদিকে ভয়ঙ্কর থমথমে ভাব।

সিটির আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা শেরিফকে গিয়ে ধরল, আমাদের বাঁচান। অন্য শহর থেকে সেনাবাহিনী আনান। আমাদের যুবকদের হাতে অস্ত্র দিন। আপনি এখন খুবই বৃদ্ধ হয়েছেন। ওই দুর্ধর্ষ ভিলেনের সঙ্গে কিছু পুলিশ কনস্টেবল নিয়ে পেরে উঠবেন না। শেরিফ তাদের অভয় দিলেন, তিনি বেঁচে থাকতে ভিলেন তাদের কিছুই করতে পারবে না।

নির্দিষ্ট দিনটি এল। একটি ট্রেনে চেপে ভিলেন সিটিতে আসছে। শহরটি প্রায় জনশূন্য। অধিকাংশ নরনারী ভয়ে আত্মগোপন করেছে। স্টেশনটি পর্যন্ত ফাঁকা। কেবল ভিলেনের দলবল তার জন্য অপেৰা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি এসে পস্নাটফরমে দাঁড়াল। এই সময় দেখা গেল, বৃদ্ধ শেরিফ একটা লাঠিতে ভর দিয়ে পস্নাটফরমে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কোমরে কয়েকটি রিভলবার গোঁজা।
ভিলেনও এসে পস্নাটফরমে নামল। তার কোমরেও রিভলবার গোঁজা। শেরিফকে দেখেই সে অট্টহাসি করে উঠল, 'কী, আমাকে আবার গ্রেফতার করতে এসেছেন? আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই।' শেরিফ বললেন, না, তোমাকে গ্রেফতার করতে আসিনি। শুধু বলতে এসেছি, তুমি এই শহরে ঢুকবে না। এটা শেরিফ হিসেবে আমার আদেশ। তুমি দলবল নিয়ে এখনই এ শহর থেকে পরের ট্রেনেই অন্য কোথাও চলে যাও। কেউ তোমাকে কিছু বলবে না।
ভিলেন বলল, আমাকে আদেশ দেয়া আপনার জন্য স্পর্ধা ছাড়া আর কিছু নয়। আমি যদি আপনার আদেশ না মানি?

শেরিফ বললেন, তাহলে তোমার সঙ্গে আমার যুদ্ধ হবে।
ভিলেন অট্টহাস্য করে বলল, আমার সশস্ত্র দলবল দেখেছেন? কয়েকজন পুঁচকে পুলিশ নিয়ে আপনি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন?

শেরিফ বললেন, আমি অহেতুক রক্তপাত ঘটাতে চাই না। যুদ্ধ হবে তোমার সঙ্গে আমার। রিভলবার হাতে আমরা ডুয়েল লড়ব। আমাকে হত্যা করতে পারলে তুমি শহরে ঢুকবে। সাহস থাকলে আমাদের সঙ্গে ডুয়েলে আস।

ভিলেন আরও অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ল। বলল, এ বৃদ্ধ বয়সে, যেখানে আপনার হাত কাঁপে, আপনি সেখানে রিভলবার হাতে ডুয়েল লড়বেন? বেশ, আপনার যখন মরার সাধ হয়েছে, তখন আমি রাজি।
একটা ফাঁকা জায়গায় নির্দিষ্ট দূরত্বে দু'জনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ডুয়েল দেখার জন্য কিছু শহরবাসীও তখন লুকানো অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সেখানে জড়ো হয়েছে। রেফারি কিছু দূরে দাঁড়িয়ে হুইসেল বাজালেন। সঙ্গে সঙ্গে দু'দুটি রিভলবার গর্জে উঠল। রুদ্ধশ্বাসে দু'পৰের লোকেরা তাকাচ্ছে দু'জনের দিকে। গুলির ধোঁয়া কেটে যেতেই দেখা গেল, রক্তাক্ত দেহে ভিলেন মাটিতে পড়ে আছে। তার দেহে প্রাণ নেই। শেরিফ তার লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

শহরবাসীরা উলস্নাসধ্বনি করে শেরিফকে সংবর্ধনা জানাতে ছুটে গেল। ভিলেনের দলবল পালাল। শহরবাসী শেরিফকে অভিনন্দন জানাতে তাকে স্পর্শ করতে যেতেই তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তার দেহ তখন নিথর এবং প্রাণহীন। ভিলেনের গুলি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু এ বৃদ্ধ বয়সে ডুয়েল লড়ার উত্তেজনা তার সহ্য হয়নি। তিনি হার্টফেল করে মারা গেছেন। কিন্তু লঙ ওয়েটিংয়ের পর তার শহরকে দুর্বৃত্তের কবলমুক্ত করে গেছেন।

এ ওয়েস্টার্ন ছবিটির কাহিনী আমার প্রায়ই মনে পড়ে। কিন্তু এখন একটু বেশি বেশি মনে পড়ে এ কারণে যে, এখন ঢাকার কাগজ খুললেই দেখি, এককালের সন্ত্রাস ও দুর্নীতির দুর্গ হাওয়া ভবনের অধীশ্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলে তার দলবলের মধ্যে লঙ ওয়েটিংয়ের উত্তেজনা এবং তিনি আসছেন, আসবেন বলে সারাদেশে এ উত্তেজনার প্লবন সৃষ্টির চেষ্টা।
তার মা ইতোমধ্যেই তার মাথায় ভবিষ্যতে রাজ্য শাসনের মুকুট পরানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তার দলবল তাকে 'তারুণ্যের অহঙ্কার', 'বাংলার ভবিষ্যত' ইত্যাদি নানা শিরোপা পরিয়ে বাংলার মানুষকে জানাচ্ছে, দেশের 'মহাত্রাতা' শীঘ্রই দেশে ফিরবেন এবং দেশের শাসনভার গ্রহণ করবেন। শুধু তার দলবল নয়, ব্যারিস্টার মওদুদসহ বিএনপির শীর্ষনেতারাও এ আশায় মাথা নিচু করে লক্স ওয়েটিংয়ের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন এবং নতুন প্রভুকে কুর্নিশ করে তার অনুগ্রহের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার আশা করেছেন। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে_ ভয় ও আশঙ্কায় কাঁপছে; বাংলাদেশে কি আবার বর্গির রাজত্ব ফিরে আসবে?

ওয়েস্টার্ন ছবি 'লক্স ওয়েটিংয়ের' ভিলেনের ভাগ্যে যা ঘটেছিল, তারেক রহমানের ভাগ্যে তা ঘটবে, আমি অবশ্যই তা বলি না। আমি তা কামনাও করি না। বালাই ষাট! তিনি দেশে ফিরেও যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুন, তার ভাঙ্গা হাড়ে জোড়া লাগুক, এ কামনা সর্বান্তঃকরণে করি। শুধু এইটুকু চাই, বাংলার মানুষের ঘাড়ে আবার সওয়ার হওয়ার সুযোগ যেন তার না ঘটে। তারেক রহমান তার মায়ের অপত্য স্নেহ, বিএনপির অন্ধ আনুগত্য, একশ্রেণীর আত্মবিকৃত বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার সমর্থন নিয়ে আবার যদি বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে সওয়ারের সুযোগ পান, তাহলে এ দেশটির ভাগ্যে যে অভিশাপ নেমে আসবে, তা এখন আমরা কল্পনাও করতে পারছি না_

আমি বিএনপির রাজনীতির বিরোধী। কিন্তু বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাক তা কামনা করি না। বরং চাই, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসুক, জায়ামায়াতের মতো সিন্দাবাদের দৈত্যকে কাঁধ থেকে নামাক এবং গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক রীতিতে দেশ শাসনের সুযোগ পাক। দেশে সুস্থ দ্বিদলীয় অথবা বহুদলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পাক। কিন্তু তারেক রহমানের ছাত্রাবস্থা থেকে তার যে ইতিহাস আমি জানি, 'লঙ ওয়েটিং' ছবির ভিলেনের কীর্তি তার কাছে কিছু নয়।

বাংলাদেশে তারেক রহমানের মতো গণতান্ত্রিক রাজনীতির অ-আ-ক-খ না জানা; এক দুর্বৃত্ত যুবককে যদি বিচার করে দ- দেয়া না হয়, তাহলে তার পাইকপেয়াদা বাবর, মামুন বা দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামিদের বিচার করা ও দ- দেয়া অর্থহীন হয়ে যাবে। পালের গোঁদাকে বিচার করা না গেলে অন্যদের বিচারের অর্থ কি দাঁড়াবে? বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে এত দুর্বৃত্তপনার পরও যদি তারেক রহমান বিচার এড়াতে পারেন, তাহলে ব্যারিস্টার রফিকুল হকের সেই কথাই সত্য হবে যে, 'বাংলাদেশে মানুষ দেখে বিচার করা হয়; আইন দেখে বিচার করা হয় না।'

সবচাইতে বিস্ময়কর, আমাদের দেশের সুশীল সমাজের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এবং একশ্রেণীর মিডিয়ার ভূমিকা। ফেনীর জয়নাল হাজারী বা নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমানের নাম উঠলেই এরা সন্ত্রাসী বলে এমন শোরগোল তোলেন যে, মনে হয় এদের রাজনীতির জন্য বুঝি সারাদেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব, ভাল বা মন্দ যা-ই হোক, ফেনী বা নারায়ণগঞ্জের মতো শহর বা জেলাতেই সীমাবদ্ধ; সারাদেশে নয়। কিন্তু যে ব্যক্তির দৌরাত্ম্য সারাদেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল এবং যাকে আবার ৰমতায় আনার জন্য বিরাট চক্রান্ত চলছে, যিনি ক্ষমতায় এলে দেশটির সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে, সে সম্পর্কে এ তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং 'নিরপেৰ' মিডিয়া সম্পূর্ণ নীরব।

আফগানিসত্মানের ইতিহাসে পড়েছি গত শতকের গোড়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রানত্মে আফগানিসত্মানের স্বাধীনচেতা বাদশাহ আমানুলস্না যখন সিংহাসনচু্যত হন এবং বাচ্চা-ই-সাক্কো নামে এক দসু্য কাবুলের সিংহাসন দখল করে, তখন সাক্কো প্রচুর অর্থ বিলিয়ে একদল লোককে কাবুলের রাসত্মায় তাকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য নামিয়েছিল। তারা বাচ্চা-ই-সাক্কোকে 'ফখরে ফখরে আগান' (আফগানিস্তানের গর্ব) অভিহিত করে ওই মিছিলে সেস্নাগান দিয়েছিল। এ মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন কাবুলের কয়েকজন নামকরা বুদ্ধিজীবী। সৈয়দ মুজতবা আলী এদের আখ্যা দিয়েছিলেন 'কাবুলী কুবুদ্ধিজীবী।'

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, আজ এ দেশেও তো এই কুবুদ্ধিজীবীদের অভাব নেই।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে