Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯ , ২৮ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (18 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৭-২০১৯

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে যা জানলাম

আকতার হোসেন


বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে যা জানলাম

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ার পর একটি প্রশ্ন মনের মধ্যে দানা বেঁধে উঠেছে আর তা হলো, তিনি কি শৈশবে অজানা অচেনা কোনও ব্যক্তির চিন্তা ভাবনা দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন? বঙ্গবন্ধুর যে রাজনৈতিক আদর্শ ছিল অর্থাৎ দেশ, জনগণ, অধিকার ও নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থাকা, সেটা হয়তো তিনি পরিবার থেকে পাননি। কেননা, অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু নিকটজনের কথা আমরা জানতে পেরেছি। জেনেছি তার পরিবারের ঘনিষ্ঠজনের কথা। বিশেষ করে তিনি যে তার বাবাকে কতটা মান্য করতেন সেটাও খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে এই বইটিতে। তবু প্রতিবাদী এবং অন্যায়ের মুখোমুখি হবার যে সাহস তিনি বুকে নিয়ে চলতেন সেই বিশেষ গুণের প্রতি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রবাহের বাইরে যদি একক কোনও ব্যক্তির অস্বচ্ছ অবদান থেকে থাকে, মনে হয় সেই ব্যক্তিটির প্রচ্ছন্ন প্রকাশ এ বইতে লুকিয়ে আছে। আমি চেষ্টা করবো বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করা কল্পিত সেই ব্যক্তিটি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরতে।

আমাদের চারিপাশে দেখা কোনও বিশেষ আচরণ, বিশেষ উক্তি, বিশেষ ঘটনা, কিংবা নির্দেশনা কখন কোন অবস্থায় কার মনে দাগ কেটে যায় সেটা অনেক ক্ষেত্রে খোলাসা করে বলা মুস্কিল। যে আদর্শ কিংবা ব্রত দ্বারা অনেকে অনুপ্রাণিত হন, তা চুলচেরা বিচার না করেই হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সাফল্যের ছাপ রেখে যান। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই পড়ে জানা যায় যে, দাবি আদায়ের লক্ষে তিনি আজীবন বিশ্বাস ও ভরসা রেখেছেন আন্দোলন ও প্রতিবাদী ভাষাতে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আমরা দেখতে পাই তিনি লিখেছেন, ‘তিতুমীরের জেহাদ, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়জি আন্দোলন সম্বন্ধে আলোচনা করেই আমি পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস বলতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৩)

এ প্রসঙ্গে বলতে পারি যে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুর বাল্যকাল ও কিশোর জীবনের যতোটুকু কথা ছাপা হয়েছে, তা সে সময়কার সামাজিক ও কৃষিভিত্তিক আন্দোলনের উৎসাহ যোগানো ‘ব্রতচারী সমিতি’র আদর্শের খুব কাছাকাছি।

গ্রাম্য সংস্কৃতি, নৃত্য সংগীত তথা গ্রাম বাংলার প্রতিটি অণু পরমাণুকে বঙ্গবন্ধু ভালোবাসতেন জীবন বাজি রেখে। এগুলোই ছিল তৎকালীন ‘ব্রতচারী সমিতির’ কাজের লক্ষণ। তাই মনে হয়, বঙ্গবন্ধু হয়তো বাল্যকাল থেকেই ‘গুরু সদয় দত্ত’ কিংবা ‘ব্রতচারী সমিতি’ দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। যদিও অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ কথার সপক্ষে কোনও উল্লেখ বা স্বীকারোক্তি নেই। শুধু একটি উক্তি ছাড়া। ‘আমি ব্রতচারী খুব ভাল পারতাম’।

বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ অঞ্চলের (ব্রিটিশ আমলের করিমগঞ্জ মহকুমা) কৃতি সন্তান ছিলেন গুরু সদয় দত্ত। তিনি ব্রিটিশ সরকারের একজন বাঙালি কর্মকর্তা হয়েও মনে করতেন বাংলার জাতীয় জীবনকে পুন:জাগ্রত করতে হলে ‘ষোলআনা বাঙালি হতে হবে’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন বাঙালি তার নিজস্ব ভূমিতে, নিজস্ব ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও পালা পার্বণকে আদর্শ মনে করে ‘ব্রতচারী’ হবে। ‘ব্রত’ মানে পণ বা প্রতিজ্ঞা। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিজ্ঞা নিয়ে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে যারা চলেন – তাদেরকেই বলা হয় ‘ব্রতচারী’।

গুরু সদয় দত্ত ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের আন্দোলন ‘ব্রতচারী সমিতি’। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে এই সমিতির বিস্তার ঘটেছিল। গুরু সদয় দত্ত বিলেত থেকে পড়ালেখা শেষ করে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিতে (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) যোগ দিয়েও গতানুগতিক রুটিন ওয়ার্কের বাইরে নানামুখী সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতেন। কৃষকদের উন্নত জীবনের কথা চিন্তা করে তিনি সমবায় প্রথায় চাষের প্রকল্প শুরু করেছিলেন। তারই উদ্যোগে গ্রাম বাংলায় ‘স্বদেশী কৃষি ও শিল্প মেলা’ প্রচলিত হয়েছিল। গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি প্রচলন করেছিলেন ‘গ্রামের ডাক’ নামে একটি পত্রিকা। তার লেখা একটি লাইন থেকেই বোঝা যায় গ্রাম বাংলার উন্নয়ন নিয়ে তিনি কতটা ভাবতেন। গুরু সদয় দত্ত লিখেছেন, ‘পূজবি যদি ভারত মাকে, সাড়া দে গ্রামের ডাকে’

জেলা প্রশাসকের কাজে কর্মরত অবস্থায় দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে প্রগতিশীল কার্যকলাপে লিপ্ত থাকায় এবং ইংরেজদের ছেড়ে কথা না বলার কারণে তাকে একাধিকবার শাস্তি-মুলুক বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু স্বদেশী চেতনায় বিশ্বাসী এই মহান লোকটাকে কোন কিছু থেকেই বিরত রাখা যায় নি। ময়মনসিংহ থাকাকালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘লোক নৃত্য ও লোকগীতি সমিতি’। বীরভূমে গড়ে তুলছিলেন ‘বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি’। প্রকাশ করেছিলেন ‘পল্লি সম্পদ’ পত্রিকা। খুঁজে খুঁজে পুনরুদ্ধার ও নতুন নিয়মে লোকজ ঐতিহ্য চর্চা করার শিক্ষা দিতেন তিনি। যেমন: যুদ্ধ নৃত্য, সারি, ধামাই, কাঠি নৃত্য, বাউল গান ইত্যাদি। তারই অনুপ্রেরণায় ১৯৩২ এ অনুষ্ঠিত হয় একটি ‘লোক নৃত্য শিবির’। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৪ সালে চালু করেন ‘ব্রতচারী সমিতি’। সেই থেকে শুরু হলো ব্রতচারী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে গুরু সদয় দত্তের মন্ত্রে বাংলার মানুষ পেল নতুন একটি স্লোগান। ‘জয় সোনার বাংলা, অথবা সংক্ষেপে ‘জ সো বা’।

গুরু সদয় দত্তকে গান্ধীজী বলেছিলেন, ‘আমি দুঃখের সাথে স্বীকার করছি আপনার এই আন্দোলনের কথা আমার অনেক আগেই জানা উচিত ছিল অথচ তা আমি জানতাম না’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আন্দোলন সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ব্রতচারী বাংলাদেশে ছাড়িয়ে পরুক এই কামনা করি’। নৃত্য ও সঙ্গীত চর্চার মধ্য দিয়ে ‘মুক্তির কথা’ গ্রাম বাংলায় প্রচার করার উদ্দেশ্য গুরু সদয় দত্ত বলেছেন; গ্রামের দুর্দশা মুক্তিতেই দেশের মুক্তি। তিনি আরও বলেন,

গাহো জয়, গাহো জয়, গাহো বাংলার জয়-

দেহে নাহি ক্লান্তি। বুকে নাহি ভয়।

‘নব-জাগ্রত সেই বাংলার জয়।

গুরু সদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রতচারী আন্দোলনে’ যোগ দেওয়ার জন্য একজন আগ্রহী সদস্যকে প্রথমে তিনিটি উক্তি স্বীকার করে নিতে হত। উক্তিগুলো হলো:

আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি বাংলার সেবা করব
আমি বাংলা ব্রতচারী হব।
এরপর এ সংগঠনের সদস্য পদের জন্য আবেদন করে যদি কেউ তা লাভ করতেন তবে তাকে পঞ্চ ব্রত বা পাঁচটি প্রতিজ্ঞা করে শপথ করতে হতো। সেই পাঁচটি ব্রতগুলো হল:

(১) জ্ঞান ব্রত (২) শ্রম ব্রত (৩) সত্য ব্রত (৪) ঐক্য ব্রত  ও (৫) আনন্দ ব্রত।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে আমার কথার সমর্থন খুঁজে পাওয়া যাবে। যেমন বইটির ১ নম্বর পৃষ্ঠায় পড়লাম বঙ্গবন্ধু বলছেন তাকে অনেকেই আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছে। বিশেষ করে তার পরমা স্ত্রী যাকে তিনি ‘রেণু’ বলে সম্বোধন করতেন, তিনিই বঙ্গবন্ধুকে অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এর পরিপ্রেক্ষিতে যা বলেছেন সেটা প্রথম পৃষ্ঠাতেই রয়েছে।

‘বলতাম, লিখতে যে পারি না; আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি’

এই যে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘লিখতে যে পারি না’। এর ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও দেখতে পাওয়া গেছে। ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি আবারও বলেছেন; ‘ভাষার উপর আমার দখলও নাই’ এবং ১৪২ পৃষ্ঠায় বলেছেন; ‘এই সময় পাঞ্জাবে প্রগতিশীল লেখকদের একটা কনফারেন্স হয়। লেখক আমি নই, একজন অতিথি হিসাবে যোগদান করলাম’।

তার মানে তিনি নেহায়েত একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা, এর বাইরে আর কিছু নন তাই হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি যে লেখক নন অর্থাৎ যার লেখা বই নিয়ে বিশ্বের অগুনিত পাঠকের আজ যে আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং বিভিন্ন ভাষায় যে বই অনূদিত হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি অবস্থায় (১৯৬৬-৬৭) যখন এই বইয়ের কথাগুলো তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন তখন তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন আগামীতে তার লেখা নিয়ে এত সব কাণ্ড হবে?

যাইহোক, দেখা যাক ১ নম্বর পৃষ্ঠার উল্লেখিত পরের কথাগুলো।

‘শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি’

কথা হলো, কী ছিল তার সেই নীতি ও আদর্শ? কে তার মধ্যে গেঁথে দিয়েছিল এমন একটি আদর্শ যার প্রতি বঙ্গবন্ধু জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত অটল ছিলেন?

চলুন যাওয়া যাক ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি কি বলছেন –

‘১৯৩৪ সালে যখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি তখন ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম’।

বঙ্গবন্ধু বলছেন ‘লিখতে যে পারি না’  অথবা ‘ভাষার উপর আমার দখল নাই’ কিংবা ‘লেখক আমি নই’, এ সমস্ত বলার পরেও ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় স্বীকার করে নিচ্ছেন একটি কাজ তিনি ভাল পারতেন। শুধু ভাল পারতেনই না ‘খুব’ ভাল পারতেন। তিনি বললেন, খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এরপর বলছেন খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতাম।

যে সময়ের ঘটনা তিনি বলছেন তখন তিনি সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন এবং তখন তার বয়স হয়েছিল ১৪ বছর। মানে একজন তরতাজা তরুণ। আসুন কেন তিনি বললেন খুব ভালো ব্রতচারী করতে পারতেন সেই দিকটায় একটু গুরুত্ব দেওয়া যাক।

ঐক্যবদ্ধভাবে লোক সঙ্গীত ও লোকনৃত্য (নানান খেলাধুলা, লাল-সাদা রঙের কাপড় পরে, হাতে হাত ধরে অথবা একজন অন্যজনের কোমর ধরে দলবদ্ধ নৃত্য), চর্চার মাধ্যমে মানসিক ও আত্মিক বিকাশ লাভ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা ছিল ‘ব্রতচারী সমিতি’র আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ব মানব হওয়ার লক্ষে শাশ্বত বাঙ্গালি হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা গুরু সদয় দত্ত লিখেছেন;

ষোল আনা বাঙ্গালি হ

বিশ্ব মানব হবি যদি

শাশ্বত বাঙ্গালি হ

আমরা কি পরবর্তী জীবনে বঙ্গবন্ধুকে (১) ষোলআনা বাঙ্গালি হিসাবে পাইনি? আর এই যে বলা হলো ‘বিশ্ব মানব হবি যদি শাশ্বত বাঙ্গালি হ। তিনি কি (২) বিশ্ব মানব হতে পেরেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন, তার দেওয়া ৭ মার্চের ভাষণ কি আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে যায়গা করে নিতে পেরেছে? স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন সংগ্রামে হিমালয়ের চেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে তিনি কি বিশ্বের স্বাধীনতাকামী নেতাদের রোল মডেল হননি? তিনি কি বিশ্বের প্রথম নেতা নন, একই স্থানে দেওয়া যার পরপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ জনসভার ভাষণই জাতীর কাছে ঐতিহাসিক ভাষণের মর্যাদা লাভ করেছে। তিনি কি বিশ্বের অন্যতম নেতা নন যিনি পরপর দুটি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে সফলতা লাভ করেছেন। যেভাবেই দেখেন না কেন, বঙ্গবন্ধু এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি বিশ্বমানব। শুধু সঠিক প্রচার পেলেই বিশ্ব জানবে তার কীর্ত্তি, তিনি দিবেন রাজনৈতিক ও দাবি আদায়ের অনুপ্রেরণা।

আমরা তার বিখ্যাত একটি উচ্চারণ শুনেছিলাম, যেটা তিনি ‘জুলিও কুরি’ উপাধি গ্রহণ করতে গিয়ে বলেছিলেন। ‘বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে’। এর মানে বঙ্গবন্ধু পুরো পৃথিবীর খোঁজ খবর রেখেই বলেছিলেন পৃথিবীটা আজ দুই ভাগে বিভক্ত (শোষক আর শোষিত)। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে তিনি নিজেকে শোষিতের পাশে দাঁড় করিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি বাংলার মানুষ হয়েও বিশ্ব মানব হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তিনি যে বিশ্বের সর্বত্র নন্দিত হয়েছেন তা নয়, তিনি নিজ জন্মভূমি ও বিশ্বকে নিয়ে চিন্তা চেতনায় নিয়োজিত ছিলেন। খেয়াল রাখেন নি কে কোথায় তাকে কি কি বলল। তার বিশ্বাস ও কর্ম সব সময় কাজের মধ্যে প্রতিফলন করতে চাইতেন। একজন রাষ্ট্র নেতা বা সরকার প্রধান না হয়েও সেই পাকিস্তান আমলের গোঁড়ার দিকে শুধু রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা করতে গিয়ে তিনি জেলখানায় বসে পরদেশ এবং বিশ্ব মানব সমাজ সম্পর্কে লিখেছেন;

পৃষ্ঠা: ২৭৯

‘সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুভাবে বাস করা আমাদের কর্তব্য। কোন যুদ্ধ জোটে যোগদান করার কথা আমাদের চিন্তা করাও পাপ। কারণ,  আমাদের বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য সাহায্য করা দরকার’

ফিরে যাই অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। সূচিপত্রের আগের পৃষ্ঠায় যেখানে বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে লেখা একটি ইংরেজি উক্তি ছাপিয়ে দেয়া আছে। সেখানে তিনি বলেছেন;

As a man, what concerns mankind concerns me…

‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়’

বিস্তারিত বলার আগে শুধু এইটুকুই বলবো যে, আমার দেখা বঙ্গবন্ধুর দুটি উজ্জ্বল দিক হলো, তিনি ষোলআনা বাঙালি এবং বিশ্বমানব হওয়া এ দুটি ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তার অবস্থান প্রমাণ করে গেছেন। যে বার্তা গুরু সদয় দত্তের নির্দেশনার মধ্যে পাওয়া গেছে।

আর একবার মিলিয়ে দেখুন ব্রতচারী আন্দোলনে সদস্য পদ লাভের জন্য প্রথমে যে তিনটি উক্তি স্বীকার করে নিতে হত সে উক্তিগুলো কী ছিল? সেগুলো ছিল;

আমি বাংলাকে ভালোবাসি

আমি বাংলার সেবা করব

আমি বাংলা ব্রতচারী হব।

তাহলে কী প্রশ্ন জাগে না, কে ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মানুষ? তিনি কি হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিংবা গুরু সদয় দত্ত? অথবা অন্য কেউ?

আসুন আরও গভীর ভাবে লক্ষ্য করি বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন। ফিরে যাই আবারো সেই পৃষ্ঠা নম্বর ১ এ। যেখানে তিনি লিখেছেন;

‘একদিন সন্ধ্যায় বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে জমাদার সাহেব চলে গেলেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা’

লক্ষণীয়, একজন রাজনৈতিক শিষ্য তার রাজনৈতিক গুরুর কথা ভাববেন, নানান কথা মনে করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু খোলা জানালা দিয়ে আকাশের দিকে একজন কবির মতো কেন চেয়ে থাকবেন? তাহলে তিনি কি গুরু সদয় দত্তের মতো একজন কবি ছিলেন? কিংবা ইচ্ছে ও চেষ্টা করলে কবি খ্যাতি পেতে পারতেন? কবি ও কবিতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন বলেই কি তার মনের মধ্যে কাব্যিক ভাব বাসা বেঁধে বসেছিল? তা না হলে দেশ ও জাতির ক্রান্তি লগ্নে দেওয়া তার একটি রাজনৈতিক ভাষণ শুনে কেন বিদেশি পত্রিকা হেড লাইন করেছিল, এ পোয়েট অব পলিটিক্স?

এই বইটি যারা মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন তারা সহজেই বুঝতে পেরেছেন যে  বঙ্গবন্ধু একজন কবি মনের মানুষ ছিলেন, তিনি ছিলেন শিল্প-মনা। সঙ্গীত প্রিয় লোকও তাকে বলা যায়। এছাড়া রাজনীতি সচেতন ও দেশ প্রেম সেখানেও তো তিনি আছেন বীর দর্পে। এসব বিচার করে বলা যেতেই পারে গুরু সদয় দত্ত যেন তার মধ্যে একাকার হয়ে গেছেন।

পূর্বে উল্লেখিত পঞ্চ ব্রত অর্থাৎ (১) জ্ঞান ব্রত (২) শ্রম ব্রত (৩) সত্য ব্রত (৪) ঐক্য ব্রত ও (৫) আনন্দ ব্রত। এগুলোর কোন ছাপ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে পাওয়া যায় কি না আসুন এবার সেটা একটু খুঁজে দেখি।

জ্ঞান ব্রত

বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনী লেখার শুরুতে তার বংশ পরিচয় দিতে শুরু করেন। মোগল আমলে তাদের ইটের তৈরি দালান কোঠা ছিল, ছিল পরিবারটির সুদিন। তারপর বলছেন:

‘শেখ বংশ কেমন করে বিরাট সম্পদের মালিক থেকে আস্তে আস্তে ধ্বংসের দিকে গিয়েছিল তার কিছু কিছু ঘটনা বাড়ির মুরুব্বিদের কাছ থেকে এবং আমাদের দেশের চারণ কবিদের গান থেকে আমি জেনেছি’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৩)

লক্ষণীয়, এখানে বড় দাগের কথাটি হল চারণ কবিদের কাছ থেকে তার গল্প শোনা ও জ্ঞান অর্জন করা। আসুন আরও একটু এগিয়ে যাই। দেখার চেষ্টা করছি  জ্ঞান ব্রত নিয়ে আরও কিছু পাওয়া যায় কিনা।

‘আমি চলে আসলাম ওদের কাছে। দিনভর বই পড়তাম, রাতে ঘুরে বেড়াতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬৬)

‘কোরআন শরিফের বাংলা তরজমাও কয়েক খণ্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৮০)

‘লাহোর রওয়ানা করলাম। খাজা আব্দুর রহিম পূর্বে আই-সি-এস ছিলেন, খুবই ভদ্রলোক। আমাকে তার কাছ রাখলেন, ‘জাভেদ মঞ্জিলে’। ‘জাভেদ মঞ্জিল’ কবি আল্লামা ইকবালের বাড়ি। কবি এখানে বসেই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আল্লামা শুধু কবি ছিলেন না, একজন দার্শনিকও ছিলেন। আমি প্রথমে তার মাজার জিয়ারত করতে গেলাম এবং নিজেকে ধন্য মনে করলাম। আল্লামা যেখানে বসে সাধনা করেছেন সেখানে থাকার সুযোগ পেয়েছি’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২১৭)

‘শান্তি সম্মেলন শুরু হল। তিনশত আটাত্তর জন সদস্য সাঁইত্রিশটা দেশ থেকে যোগদান করেছে। সাঁইত্রিশটা দেশের পতাকা উড়ছে। আমরা পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা একপাশে বসেছি। বক্তৃতা চলছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি তবুও আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২২৮)

‘এখানে রুশ লেখক অ্যাসিমভের সাথে আলাপ হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এই সম্মেলনেই আমি মোলাকাত করি তুরস্কের বিখ্যাত কবি নাজিম হিকমতের সাথে। বহুদিন দেশের জেলে ছিলেন। এখন তিনি দেশ ত্যাগ করে  রাশিয়ায় আছেন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২২৯)

‘গ্রামের অনেক মাতবর শ্রেণীর লোক আছেন, যারা বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। কথা খুব সুন্দর করে বলতে পারেন। এক কথায় তো বোঝানোও যায় না। পাকিস্তান খারাপ না, পাকিস্তান তো আমাদেরই দেশ। যাদের হাতে ইংরেজ ক্ষমতা দিয়ে গেছে তারা জনগণের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থই বেশি দেখছে। পাকিস্তান কি করে গড়তে হবে, জনগণের কি করে উন্নতি করা যাবে সেদিকে ক্ষমতাসীনদের খেয়াল নাই। ১৯৫২ সালে ঢাকায় গুলি হওয়ার পরে গ্রামে গ্রামে জনসাধারণ বুঝতে আরম্ভ করেছে যে, যারা শাসন করছে তারা জনগণের আপনজন নয়’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২০৯)

‘জনতার বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়। শাসক যখন শোষক হয় অথবা শোষকদের সাহায্য করতে আরম্ভ করে তখন দেশের ও জনগণের মঙ্গল হওয়ার চেয়ে অমঙ্গলই বেশি হয়’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২১০)

‘আমি, বেগম হককে ভাবী বলতাম, ভাবী আমাকেও দু’একখানা বই পাঠাতেন। হক সাহেবকে বলে দিতেন, আমার কিছু দরকার হলে যেন খবর দেই। আমি (জেলে) ফুলের বাগান করতাম। তাদের দেখা হবার দিনে ফুল তুলে হয় ফুলের মালা, না হয় তোড়া বানিয়ে দিতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬৯)

শুরুতে যে বলেছিলাম ‘গুরু সদয় দত্ত’ মনে করতেন বাংলার জাতীয় জীবনকে পুন:জাগ্রত করতে হলে তাকে ষোল আনা বাঙালি হতে হবে। এই পুন:জাগ্রত বলতে গুরু সদয় দত্ত যে কথাটা বলেছিলেন তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। বঙ্গবন্ধু, গ্রাম বাংলা তথা- দেশের সাধারণ মানুষ ও তাদের অধিকার নিয়েই আজীবন কথা বলেছেন। গ্রাম বাংলার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে থেকেছেন আজীবন। সবার উপরে গ্রাম বাংলা সত্য এই কথা তিনি বারবার প্রকাশ করেছেন।

‘মাস্টার সাহেব একটা মুসলিম সেবা সমিতি গঠন করেন, যার দ্বারা গরিব ছেলেদের সাহায্য করতেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠাতেন সকল মুসলমান বাড়ি থেকে। প্রত্যেক রবিবার আমরা থলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে চাউল উঠিয়ে আনতাম এবং সেই চাউল বিক্রি করে তিনি গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচ দিতেন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৯)

পরাধীন ভারতে যা কিছু ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে যেত তাই বঙ্গবন্ধুকে আকর্ষণ করতো। মাদারীপুরে ‘শান্তি সেনা’ নামে একটি সংগঠন করেছিলেন পূর্ণচন্দ্র দাস। বিভিন্ন শাখায় শান্তি সেনাদের ভাগ করে শরীর চর্চা ও মল্ল কসরত শেখানো হত। ধীরেধীরে এই শান্তি সেনারা রংপুর, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পরে। কবি নজরুল ইসলাম তার ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় লিখেছেন, ‘জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ, জয় যুগে-যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন! স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর’। মনে হয় বঙ্গবন্ধু এই শান্তি সেনা নামক স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারাও আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তা না হলে কেন উল্লেখ করলেন-

‘তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক… পনের ষোল বছরের ছেলেদের স্বদেশীরা দলে ভেড়াত। আমাকে রোজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার উপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে।’ (পৃষ্ঠা নম্বর: ৯)

‘ইংরেজের কথা হল, বাংলার মানুষ যদি মরে তো মরুক, যুদ্ধের সাহায্য আগে। যুদ্ধের সরঞ্জাম প্রথম স্থান পাবে। ট্রেনে অস্ত্র যাবে, তারপর যদি জায়গা থাকে তবে রিলিফের খাবার যাবে। যুদ্ধ করে ইংরেজ, আর না খেয়ে মরে বাঙালি; যে বাঙালির কোনও কিছুরই অভাব ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলাদেশে দখল করে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়, তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত। সেই বাংলাদেশের এই দুরবস্থা চোখে দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি করছে। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, – একটু ফেন দাও। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। হোস্টেলের যা বাঁচে দুপুরে ও রাতে বুভুক্ষুদের বসিয়ে ভাগ করে দেই, কিন্তু কি হবে এতে? এই সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৮)

‘এই সময় থেকে মুসলিম লীগের মধ্যে দুইটি দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একটা প্রগতিবাদী দল, আর একটা প্রতিক্রিয়াশীল। শহীদ সাহেবের (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই, জনগণের প্রতিষ্ঠান চাই’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭)

‘সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৪৮)

অন্যের দেশের পাহাড় পর্বত মরুভূমি দেখে নিজের দেশ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখছেন-

‘পানির দেশের মানুষ আমরা, পানিকে বড় ভালবাসি। আর মরুভূমির ভিতর এই পানির জায়গাটুকু ছাড়তে কত যে কষ্ট হয় তা কি করে বোঝাব’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৫৬)

‘ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার লোক, খুলনা ও বরিশালে ধান কাটবার মরশুমে দল বেঁধে দিনমজুর হিসাবে যেত। এরা ধান কেটে ঘরে উঠিয়ে দিত। পরিবর্তে একটা অংশ পেত। এদের ‘দাওয়াল’ বলা হতো। হাজার হাজার লোক নৌকা করে যেত। আসবার সময় তাদের অংশের ধান নিজদের নৌকা করে বাড়িতে নিয়ে আসত। এমনিভাবে কুমিল্লা জেলার দাওয়ালরা সিলেট জেলায় যেত। এরা প্রায় সকলেই গরীব ও দিনমজুর। প্রায় দুই মাসের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে এদের যেতে হত। যাবার বেলায় মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সংসার খরচের জন্য দিয়ে যেত। ফিরে এসে ধার শোধ করত।’

‘দাওয়ালরা যখন ধান কাটতে যায়, তখন সরকার কোন বাধা দিল না। যখন তারা দুই মাস পর্যন্ত ধান কেটে তাদের ভাগ নৌকায় তুলে রওয়ানা করল বাড়ির দিকে তাদের বুভুক্ষ মা-বোন, স্ত্রী ও সন্তানদের খাওয়াবার জন্য, যারা পথ চেয়ে আছে, আর কোন মতে ধার করে সংসার চালাচ্ছে – কখন তাদের স্বামী ভাই বাবা ফিরে আসবে ধান নিয়ে, পেট ভরে কিছুদিন ভাত খাবে, এই আশায়- তখন নৌকা রওয়ানা করার সাথে সাথে তাদের পথ রোধ করা হল। ধান নিতে পারবে না, সরকারের হুকুম। শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধান নামিয়ে রেখে লোকগুলিকে ছেড়ে দেওয়া হল। এ খবর পেয়ে আমার পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব হল না। আমি তীব্র প্রতিবাদ করলাম। সভা সমিতি করলাম। সরকারি কর্মচারীদের সাথে সাক্ষাৎ করলাম কিন্তু কোনো ফল হল না।’ (পৃষ্ঠা নম্বর: ১০৩-১০৪)

‘মধুমতীর একদিকে ফরিদপুর, অন্যদিকে যশোর ও খুলনা জেলা। নদীটা এক জায়গায় খুব চওড়া। ঠিক যখন আমাদের নৌকা সেই জায়গায় এসে হাজির আমি তখন ক্লান্ত ছিলাম বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পানির দেশের মানুষ নৌকায় ঘুমাতে কোনও কষ্ট হয় না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১২৫)

‘যা হবার পূর্ব বাংলায় হোক, পূর্ব বাংলার জেলে ভাত পাওয়া যায়, পাঞ্জাবের রুটি খেলে আমি বাঁচতে পারব না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৪২)

‘দিল্লি পৌঁছালাম এবং সোজা রেলস্টেশনে হাজির হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ওয়েটিংরুমে মালপত্র রাখলাম। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে দেখি দুজন প্যাসেঞ্জার নেমে গেছেন, একজন আছেন। তিনি পশ্চিম বাংলার লোক। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি? কোথায় যাব? আমি সত্য কথাই বললাম। লাহোর থেকে এসেছি, পূর্ব বাংলায় যাব। আমার বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। অনেক আলাপ হল, পূর্ব বাংলার মাছ ও তরকারি, পূর্ব বাংলার আলো-বাতাস’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৪৪)

‘দশটায় আমাকে কোর্টে হাজির করল। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম দিলেন, আমাকে থানা এরিয়ার মধ্য রাখতে। কোর্ট থেকে থানা প্রায় এক মাইল, আমাকে হেঁটে যেতে হবে। গোপালগঞ্জের প্রত্যেকটা জিনিসের সাথে আমি পরিচিত। এখানকার স্কুলে লেখাপড়া করেছি, মাঠে খেলাধুলা করেছি, নদীতে সাঁতার কেটেছি। প্রতিটি মানুষকে আমি জানি আর তারাও আমাকে জানে। এমন একটা বাড়ি হিন্দু-মুসলমান নাই যা আমি জানতাম না। এই শহরের আলো বাতাসে আমি মানুষ হয়েছি। এখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছে। কিছুদূর পরেই দু’পাশে  দোকান, প্রত্যেকটা দোকানদারদের আমি নাম জানতাম। সকলকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে করতেই থানার দিকে চললাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭৬)

‘আমি এই প্রথম করাচি দেখলাম; ভাবলাম এই আমাদের রাজধানী! বাঙালিরা কয়জন তাদের রাজধানী দেখতে সুযোগ পাবে! আমরা জন্মগ্রহণ করেছি সবুজের দেশে, যেদিকে তাকানো যায় সবুজের মেলা। মরুভূমির এই পাষাণ বালু আমাদের পছন্দ হবে কেন? প্রকৃতির সাথে মানুষের মনেরও একটা সম্বন্ধ আছে। বালুর দেশের মানুষের মনও বালুর মতো উড়ে বেড়ায়। আর পলিমাটির বাংলার মানুষের মন ঐ রকমই নরম, ঐ রকমই সবুজ। প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যে আমাদের জন্ম, সৌন্দর্যই আমরা ভালোবাসি’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২১৪)

‘সাংহাই থেকে আমরা হ্যাংচোতে আসলাম। একে চিনের কাশ্মীর বলা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ফলে ফুলে ভরা এই দেশটা। হ্যাংচো ও ক্যান্টন দেখলে মন হবে যেন পূর্ব বাংলা। সবুজের মেলা চারিদিকে। মেয়েরা এখানে নৌকা চালায়। আমি নৌকা বাইতে জানি। পানির দেশের মানুষ। আমি লেকে নৌকা বাইতে শুরু করলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৩৩)

সত্য ব্রত

অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে দেখতে পাবেন এই বইয়ে বঙ্গবন্ধুর যতটুকু লেখা স্থান পেয়েছে তাতে কোনও কথা বা মতামত দিক পরিবর্তন করে নি। তার সত্য ব্রত সার্থকভাবেই উঠে এসেছে এই বইটিতে। আসুন সত্য ব্রতের সপক্ষে কিছু কথা পাঠ করা যাক।

‘আমি মুখে যা বলি তাই বিশ্বাস করি। আমার পেটে আর মুখে এক কথা। আমি কথা চাবাই না, যা বিশ্বাস করি বলি। সেজন্য বিপদেও পড়তে হয়, এটা আমার স্বভাবের দোষও বলতে পারেন, গুণও বলতে পারেন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২১৮)

‘এরপর ক্যাবিনেট আলোচনা শুরু হলো। অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়, সে কথা আমার পক্ষে বলা উচিত না, কারণ ক্যাবিনেটে মিটিংয়ের খবর বাইরে বলা উচিত না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৬৫)

‘আমি হক সাহেবের (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) কাছে আবার হাজির হয়ে বললাম, নানা- ব্যাপার কি? এ সমস্ত কি হচ্ছে, আমরা তো মন্ত্রী হতে চাই নাই। আমাদের ভিতরে এনে এ সমস্ত ষড়যন্ত্র কেন’? (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৬৭)

‘প্রধানমন্ত্রী, মোহাম্মদ আলী বগুড়া আমাদের তার রুমে বসতে দিলেন। হক সাহেবও (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) আছেন সেখানে। মোহাম্মদ আলী (প্রধানমন্ত্রী) বেয়াদবের মতো হক সাহেবের সাথে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছিল। এমন সময় মোহাম্মদ আলী আমাকে বললেন, কি মুজিবুর রহমান, তোমার বিরুদ্ধে বিরাট ফাইল আছে আমার কাছে। এই কথা বলে ইয়াংকিদের মতো ভাব করে পিছন থেকে ফাইল এনে টেবিলে রাখলেন। আমি বললাম, ফাইল তো থাকবেই, আপনাদের বদৌলতে আমাকে তো অনেক জেল খাটতে হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধেও একটা ফাইল প্রাদেশিক সরকারের কাছে আছে। তিনি বললেন, এর অর্থ। আমি বললাম, আমরা যখন ১৯৪৮ সালে প্রথম বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করি, তখন আপনি (আন্দোলন বিরোধীদের) গোপনে দুইশত টাকা চান্দা দিয়েছিলেন, মনে আছে আপনার’?  (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৬৮)

‘আপনি তো (হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী) এখন মোহম্মদ আলী সাহেবের আইনমন্ত্রী। তিনি বললেন, রাগ করেছ বোধহয়। বললাম, রাগ করব কেন স্যার, ভাবছি সারা জীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না? তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন, বুঝেছি, আর বলতে হবে না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৮৬)

শ্রম ব্রত

প্রিয় পাঠক, এখনো কি মনে হচ্ছে না যে বঙ্গবন্ধু হয়তো নীতিতে, বিশ্বাসে ও অভ্যাসে ব্রতচারী আন্দোলনের ব্রত সমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন? আসুন দেখা যাক তার শ্রম ব্রতের পক্ষে কিছু উল্লেখযোগ্য উক্তি।

“এই সময় ফজলুর রহমান সাহেব আমাকে ডাকলেন, তিনি চিফ হুইপ ছিলেন। আমাকে বললেন, ‘আপনাকে এই বারটার সময় আসাম-বেঙ্গল ট্রেনে রংপুর যেতে হবে। মুসলিম লীগের একজন এমএলএ, যিনি খান বাহাদুরও ছিলেন তাকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি না গেলে অন্য কেউ আনতে পারবে না”। আমি বেকার হোস্টেলে এসে একটা হাত ব্যাগে কয়েকটা কাপড় নিয়ে সোজা স্টেশনে চলে আসলাম। খাওয়ার সময় পেলাম না। ট্রেনে চেপে বসলাম। পৌঁছলাম রাত একটায়। পথে কিছু খেতে পারি নাই। রিকশাওয়ালা খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি চিনে, আমাকে ঠিকই পৌঁছে দিল। আমি অনেক ডাকাডাকি করে তাকে তুললাম। চিঠি দিলাম। তিনি আমাকে জানেন। বললেন, ‘আগামীকাল আমি যাব’। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন না কিছু খাব কি না? পথে খেয়েছি কি না? বললেন, “এখন তো রাত তিনটা বাজে, বিছানার কি দরকার হবে”? বললাম, দরকার নাই, যে সময়টা আছে বসেই কাটিয়ে দিব। একদিকে পেট টনটন করছে, অন্যদিকে অচেনা রংপুরের মশা। গতরাতে কলকাতায় বেকার হোস্টেলে ভাত খেয়েছি। বললাম, এক গ্লাস পানি পাঠিয়ে দিলে ভাল হয়’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৩৪)

‘আমাকে যে কাজ দেওয়া হত আমি নিষ্ঠার সাথে সে কাজ করতাম। কোনোদিন ফাঁকি দিতাম না। ভীষণভাবে পরিশ্রম করতে পারতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৩৭)

‘আমাকে তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল। ঢাকা জেলে আমাকে সুতা কাটতে দিয়েছিল। আমি যা পারতাম তাই করতাম। আমার খুব ভাল লাগত’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭৫)

‘কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে চিন্তা করতেও ভয় হয়। মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু’এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। এদিকে হোস্টেলগুলিতে চাউল, আটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। কোন দোকান কেউ খোলে না লুট হয়ে যাবার ভয়ে। শহীদ সাহেব বললেন, নবাবজাদা নসরুল্লাহকে ভার দিয়েছি তার সাথে দেখা কর। তিনি আমাদের নিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গেলেন এবং বললেন, চাউল এখানে রাখা হয়েছে তোমরা নেবার বন্দোবস্ত কর। আমাদের কাছে গাড়ি নাই। মিলিটারি নিয়ে গিয়েছে প্রায় সমস্ত গাড়ি। আমরা ঠেলা গাড়ি আনলাম। কিন্তু ঠেলবে কে? আমি, নূরুদ্দিন ও নূরুল হুদা এই তিনজনে ঠেলাগাড়িতে চাউল বোঝই করে ঠেলতে শুরু করলাম। নূরুদ্দিন সাহেব তো তালপাতার সেপাই। শরীরে একটুও বল নাই। আমরা তিনজনে ঠেলাগাড়ি করে বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেলে চাউল পৌঁছে দিলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৬৬)

‘আমি বললাম, বয়স্ক লোক না পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠান গড়ব না মনে করেছেন! দেখবেন এরাই একদিন এই জেলার নেতা হয়ে কাজ করতে পারবে। যেখানে এডভোকেট সাহেবরা যেতে পারে নাই, সে সমস্ত জেলায় আমি একলাই যেতাম এবং সভা করতাম, কমিটি গঠন করতাম। জুন, জুলাই, আগস্ট মাস পর্যন্ত আমি বিশ্রাম না করে প্রায় সমস্ত জেলা ও মহকুমা ঘুরে লীগ শাখা গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২২০)

‘তারপর অনশন ধর্মঘট শুরু করলাম। আমাদের দুজনেরই শরীর খারাপ। মহিউদ্দিন ভুগছে পুরিসিস রোগে, আর আমি ভুগছি নানা রোগে। আমার হার্টের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে বুঝতে পারলাম। প্যালপিটিশন হয় ভীষণভাবে। নি:শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। ভাবলাম আর বেশি দিন নাই। আমাদের অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে এসেছে যে, যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যুর শান্তি ছায়ায় চিরদিনের জন্য স্থান পেতে পারি। অনেক লোক আছে । কাজ পড়ে থাকবে না। দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসি, তাদের জন্যই জীবন দিতে পারলাম। এই শান্তি। আমার চিঠি চারখানা একজন কর্মচারীকে ডেকে তার কাছে দিয়ে বললাম, আমার মৃত্যুর পরে চিঠি চারখানা ফরিদপুরে আমার এক আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি কথা দিলেন। আমি তার কাছ থেকে ওয়াদা নিলাম। বারবার আব্বা মা ভাইবোনদের চেহারা ভেসে আসছিল আমার চোখের সামনে। রেণুর কি দশা হবে? হাচিনা কামালকে একবার দেখতেও পারলাম না। মহিউদ্দিন ও আমি পাশাপাশি দুইটা খাট পেতে নিয়েছিলাম। একজন আরেকজনের হাত ধরে শুয়ে থাকতাম। দুজনেই চুপচাপ পড়ে থাকি। আমার বুকের ব্যথা শুরু হয়েছে। দুইজনেই শুয়ে শুয়ে কয়েদির সাহায্যে ওজু করে খোদার কাছে মাপ চেয়ে নিলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২০১-২০৫)

আনন্দ ব্রত

বঙ্গবন্ধুর আনন্দ ব্রতের কিছু উদাহরণ। অতি দু:খেও তার আনন্দ ব্রত লক্ষ্য করা গেছে।

‘অসহ্য যন্ত্রণা আমার শরীরে। ডাক্তার ডাকতে হবে – কাউকেই চিনি জানি না। একজন স্বেচ্ছাসেবককে বলা হল, তিনি বললেন, ‘আভি নেহি, থোড়া বাদ। তাকে আর দেখা গেল না। ‘থোড়া বাদই রয়ে গেল’।

‘ইলিয়ট হোস্টেল আর বেকার হোস্টেল পাশাপাশি, আমরা ঠাট্টা করে বলতাম ‘ইডিয়ট হোস্টেল’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২৬)

‘মওলানা আজাদ সোবহানী সাহেবকে হাশিম সাহেব আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন কলকাতায়। আমাদের নিয়ে তিনি ক্লাস করেছিলেন। আমার সহকর্মীরা অধিক রাত পর্যন্ত তার আলোচনা শুনতেন। আমার পক্ষে ধৈর্য ধরে বসে থাকা কষ্টকর। কিছু সময় যোগদান করেই ভাগতাম। হাশিম সাহেব তখন চোখে খুব কম দেখতেন বলে রক্ষা। আমি পিছন থেকে ভাগতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৪১)

‘তাজউদ্দীন আহমদ (এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) আটক পড়েছে। তাকে নিষেধ করা হয়েছে গ্রেফতার না হতে। তাজউদ্দীন বুদ্ধিমানের মতো কাজ করল। বলে দিল, “আমি প্রেস রিপোর্টার”। একটা কাগজ বের করে কে কে গ্রেফতার হল, তাদের নাম লিখতে শুরু করল। আমি তাকে চোখ টিপ মারলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১১৭)

‘জেলে যারা আছে, তাদের মধ্যেও দুইটা গ্রুপ ছিল। আমাদের খেলাধুলা করে সময় কেটে যেত। আমার কাছে বরকত থাকত। রাতে বরকত গান গাইত, চমৎকার গাইতে পারত। এরা দল বেঁধে ডাক্তার সাহেবের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। বরকত ছিল দুষ্ট বেশি। ডাক্তার সাহেব আসলেই বলত, – আমার পায়ে ব্যথা, কিছু দুধ ও ডিম পাস করে দেন। সকলেই হেসে ফেলত তার কথায়।

‘খালেক নেওয়াজকে নিয়ে আর এক মহাবিপদ ছিল। ওর গায়ে বড় বড় লোম ছিল। সমস্ত গা লোমে ভরা। ছাত্ররা ছারপোকা ধরে চুপি চুপি ওর শরীরে ছেড়ে দিত’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১১৭-১১৮)

‘রাত দশটা এগারটায় হবে এমন সময় খুলনায় ট্রেন পৌঁছাল। সকল যাত্রী নেমে যাওয়ার পরে আমার পাঞ্জাবি খুলে বিছানার মধ্যে দিয়ে দিলাম। লুঙ্গি পরা ছিল, লুঙ্গিটা একটু উপরে উঠিয়ে বেঁধে নিলাম। বিছানটা ঘাড়ে, আর সুটকেসটা হাতে নিয়ে নেমে পড়লাম। কুলিদের মত ছুটতে লাগলাম, জাহাজ ঘাটের দিকে। গোয়েন্দা বিভাগের লোক তো আছেই। চিনতে পারল না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৪৬)

‘১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছে। আমার তিনবার জেলে আসতে হল, এইবার নিয়ে। আমরা যে কামরায় আছি সেখানে আমরা তিনজন ছাড়াও কয়েকজন ডিভিশন কয়েদি আছে। শামসুল হক সাহেবে মাত্র দেড় মাস পূর্বে বিবাহ করেছিলেন। হক সাহেব ও তার বেগম আফিয়া খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। এক অন্যকে পছন্দ করেই বিবাহ করেছিলেন। আমাকে বেশি কিছু বললে আমি তাকে বউ পাগল বলতাম’।  (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬৮)

সঙ্গীতের প্রতি তার আগ্রহ ও অনুকম্পা দেখুন। গুরু সদয় দত্ত তার চিন্তা চেতনা সঙ্গীত নৃত্য খেলাধুলার মাধ্যমে প্রচার করতেন যাতে সহজে তার কথা সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারে। সঙ্গীতের গুরুত্ব তাই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনকেও দারুণভাবে স্পর্শ করেছে বারবার। ছুঁয়ে গেছে আমাদের জাতির পিতার অন্তরও।

‘আমার কাছে তখন হিন্দু মুসলমান বলে কোন জিনিস ছিল না। হিন্দু ছেলেদের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব ছিল। এক সাথে গান বাজনা, খেলাধুলা, বেড়ান – সবই চলত’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১১)

‘খাজাবাবার দরগার পাশে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান হচ্ছে। যদিও বুঝতাম না ভাল করে, তবুও মনে হত আরও শুনি। বাইরে এসে গানের আসরে বসলাম। অনেকক্ষণ গান শুনলাম, যাকে আমরা কাওয়ালী বলি। ইচ্ছা হয় না উঠে আসি। তবুও আসতে হবে।’ (পৃষ্ঠা নম্বর: ৫৬)

“এই সময় ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানার কৃষ্ণনগরের জনাব রফিকুল হোসেন এক সভার আয়োজন করেন। কৃষ্ণনগর হাইস্কুলের দ্বারোদঘাটন করার জন্য। সেখানে বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দিন আহম্মদ, সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন আহম্মদ গান গাইবেন। আমাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বাংলার গ্রামে গ্রামে আব্বাসউদ্দিন সাহেব জনপ্রিয় ছিলেন। জনসাধারণ তার গান শুনবার জন্য পাগল হয়ে যেত। তার গান ছিল বাংলার জনগণের প্রাণের গান। বাংলার মাটির সাথে ছিল তার নাড়ির সম্বন্ধ। আব্বাসউদ্দিন সাহেব, সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন সাহেব গান গাইলেন। অধিক রাত পর্যন্ত আসর চলল। পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম। পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তার গান শুনছে। আমি আব্বাসউদ্দিন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে’। আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম’।  (পৃষ্ঠা নম্বর: ১১০-১১১)

‘জেল অফিসের পিছনে সামান্য জায়গা ছিল। বিকালে ওখানে আমি হাঁটাচলা করতাম। এই অন্ধকূপের মধ্যে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। জানালা নেই মাত্র একটা দরজা, তার সামনেও আবার দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। রাজশাহীর একজন সিপাহির ডিউটি প্রায়ই ওখানেই পড়ত। চমৎকার গান গাইত। সে আসলেই তার গান শুনতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৮৫)

শিল্প সাহিত্য কিংবা তাঁর কবি মনের ছোঁয়া পাওয়া যায় বেশ কিছু লেখার মাঝে। যেমন:

‘আজমীর শরীফকে বিদায় দিয়ে আবার আমরা ট্রেনে উঠে বসলাম। আগ্রার দিকে, যেখানে মমতাজ বেগম শুয়ে আছেন তাজমহলকে বুকে করে। বহুদিনের স্বপ্ন তাজমহল দেখব। তাজমহলের কথা জানে না, এমন মানুষ দুনিয়ায় খুব বিরল। আমাদের দেরি আর সইছে না। মনে হচ্ছে ট্রেন খুব আস্তে আস্তে চলছে। কারণ তাজ দেখার আগ্রহ আমাদের পেয়ে বসেছে। আমরা তো ভাবিনি ঠিক পূর্ণিমার দিনে আগ্রা পৌঁছাব। আমরা হিসাব করে দিন ঠিক করে আসি নাই। মনে মনে পূর্ণিমাকে ধন্যবাদ দিলাম, আর আমাদের কপালকে ধন্যবাদ না দিলে অন্যায় হত, তাই তাকেও দিলাম।

মন তো মানছে না, কি দেখলাম ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। ভাষার উপর আমার দখলও নাই। শুধু মনে হল, এও কি সত্য। কল্পনা যা করেছিলাম, তার চেয়ে যে এ অনেক সুন্দর ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। তাজকে ভালভাবে দেখতে হলে আসতে হবে সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাবার সময়, চাঁদ যখন হেসে উঠবে তখন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৫৬-৫৭)

‘সূর্য অস্তাচলগামী, পূর্ণ চন্দ্রের সময়ই অনেক লোক বিশেষ করে আসে। সূর্য যখন অস্ত গেল, সোনালি রঙ আকাশ থেকে ছুটে আসছে। মনে হল, তাজের যেন আর একটা নতুন রূপ। সন্ধ্যার একটু পরেই চাঁদ দেখা দিল। চাঁদ অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে আসছে আর সাথে সাথে তাজ যেন ঘোমটা ফেলে দিয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে। কি অপূর্ব দেখতে। আজও একুশ বৎসর পরে লিখতে বসে তাজের রূপকে আমি ভুলি নাই। আর ভুলতেও পারব না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৫৯)

‘এক একজন এক একটা জায়গা দেখতে চায়। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তানসেনের বাড়ি। শেষ পর্যন্ত তানসেনের বাড়ি দেখতে গেলাম। তার বাড়িটা প্রাসাদের বাইরে, পাহাড়ের ওপর ছোট্ট একটা বাড়ি। বোধহয় সঙ্গীত সাধনায় ব্যাঘাত হবে, তাই তিনি দূরে থাকতেই ভালোবাসতেন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৬০)

যারা চোখ বন্ধ করে ঘটনার দৃশ্যপট দেখতে পান তাদের কাছে মনে হবে পরবর্তী ঘটনাগুলো বুঝি কোন চলচ্চিত্রের দৃশ্য। আমার জানা মতে এমন কোনও জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশে নেই যিনি একজন সাহিত্যিকের মতন করে তার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা করেছেন। বড়ই সাধুবাদ জানাতে হয় বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যরসকে। এত বছর পরও তার লেখা পড়ে সবগুলো দৃশ্যপট পরিষ্কার দেখতে পাই, এখানেই প্রমাণিত হয় তিনি মাটির চোখ দিয়ে বাংলার সরল জীবনকে দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই ষোল আনা বাঙালি ছিলেন।

‘টাকা দিয়ে আব্বা বললেন, কোনো কিছুই শুনতে চাই না। বিএ পাশ ভালভাবে করতে হবে। অনেক সময় নষ্ট করেছ, পাকিস্তান আন্দোলন বলে কিছু বলি নাই। এখন কিছুদিন লেখাপড়া কর। আব্বা, মা, ভাইবোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি, – কিছু টাকা হাত করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্রুজল’ বোধহয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। বলল, – “একবার কলকাতা গেলে আর আসতে চাও না। এবার কলেজ ছুটি হলেই বাড়ি এস”। (পৃষ্ঠা নম্বর: ৬১)

‘রেণু আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় নীরবে চোখের পানি ফেলেছিল। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম না। একটা চুমা দিয়ে বিদায় নিলাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬৫)

‘আমাদের মামলা শুরু হয়ে গেছে, পনের দিন পর পর কোর্টে যেতে হত। যেদিন হক সাহেবের সাথে তার বেগম দেখা করতে আসতেন সেদিন হক সাহেবের সাথে কথা বলা কষ্টকর হত। সত্যই আমার দু:খ হত। দেড় মাসও একসাথে থাকতে পারল না বেচারী! । আমি ফুলের বাগান করতাম। তাদের দেখা হবার দিনে ফুল তুলে হয় ফুলের মালা, না হয় ফুলের তোড়া বানিয়ে দিতাম’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৬৯)

‘পাটগাতি স্টেশন থেকে আমরা ওঠানামা করি। আমাকে সকলেই জানে। স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের বাড়ির খবর কিছু জানে কি না? যা ভয় করেছিলাম তাই হল, পূর্বের রাতে আমার মা, আব্বা, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা হয়ে গেছেন আমাকে দেখতে। এক জাহাজে আমি এসেছি। আর এক জাহাজে ওরা ঢাকায় গিয়েছে। দুই জাহাজের দেখাও হয়েছে একই নদীতে। শুধু দেখা হল না আমাদের’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭৬)

‘জেলে মধ্যে এক বৎসর হয়েছে, সন্ধ্যার পরে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেয়। জানালা দিয়ে শুধু কিছু জ্যোৎস্না বা তারাগুলি দেখার চেষ্টা করেছি। আজ আর ঘরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বাইরে বসে রইলাম, পুলিশ আমাকে পাহারা দিচ্ছে। পুলিশ কর্মচারী যিনি রাতে ডিউটি করেছিলেন, তিনিও এসে বসলেন। বাইরে শোবার ইচ্ছা করছিল, কিন্তু উপায় নাই। গোপালগঞ্জের মশা নামকরা। একটু সুযোগ পেলেই আর রক্ষা নাই। অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে রইলাম নদীর দিকে মুখ করে। নৌকা যাচ্ছে আর নৌকা আসছে। পুলিশদের বললাম আমার জন্য চিন্তা করবেন না, ঘুমিয়ে থাকেন। বেশি সময় বসতে পারলাম না, কোথাও সাড়া শব্দ নাই। মাত্র এগারটা বাজে, মনে হল সারা দেশ ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু দুইখানা নৌকা চলছে, তার শব্দ পাই’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১৭৭-১৭৮)

‘বিকেলে করাচি রওয়ানা করলাম, শহীদ সাহেব নিজে গাড়ি চালালেন, আমি তার পাশেই বসলাম। রাস্তায় এডভোকেট সাহেবরা আমাকে পূর্ব বাংলার অবস্থার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। আমার কাছে তারা নজরুল ইসলামের কবিতা শুনতে চাইলেন। আমি তাদের ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’, ‘সাম্য’ – আরও কয়েকটা কবিতার কিছু অংশ শুনালাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতাও দু’একটার কয়েক লাইন শুনালাম। শহীদ সাহেব তাদের ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলেন’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ২১৭)

ঐক্য ব্রত:

ইতিহাস পাতা থেকে দেখা যায় বৃহত্তম লক্ষ সামনে রেখে একটি  রাজনৈতিক চেতনায় সমগ্র বাঙালির আস্থা অর্জন করতে বঙ্গবন্ধুর মতো করে আর কেউ পারে নাই। দেশে কিংবা বিদেশে, নিজ দেশে কিংবা পর দেশে, বাংলা ভাষায় কথা বলে এমন মানুষদের একটি অভিন্ন প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে তিনি যতটা সফল হয়েছেন তা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আসুন দেখা যাক বঙ্গবন্ধু যখন বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন নি তখন তিনি ঐক্য ব্রত নিয়ে কী ভাবতেন।

‘প্রথমে ঠিক হল, একটা যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে, যে কোন দলের লোক এতে যোগদান করতে পারবে। তবে সক্রিয় রাজনীতি থেকে যতখানি দূরে রাখা যায় তার চেষ্টা করা হবে। আমি বললাম, এর একমাত্র কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে – যাকে ইংরেজরা বলে, “কমিউনাল হারমনি’, তার জন্য চেষ্টা করা । একমাত্র ‘কমিউনাল হারমনি’র  জন্য কর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজই আমাদের নাই। দুই মাস হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন কোন দাবি করা উচিত হবে না’।  (পৃষ্ঠা নম্বর: ৮৫)

‘আমি তাদের বলেছিলাম, প্রথমে সংঘবদ্ধ হোন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন। তা না হলে কর্তৃপক্ষ মানবে না’। (পৃষ্ঠা নম্বর: ১১২)

ঐক্যের কথা বলতে গেলে এক বাক্যে বলতে হয়ে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একটি জনপদকে স্বাধীনতার পক্ষে যে ভাবে তিনি ঐক্যবদ্ধ করে গিয়েছিলেন সেটা তার অনুপস্থিতে একটুও অন্য বাঁক নেয় নি। সত্তরের দশকের শুরুতেই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ঠিক এর আগের বছরগুলোতে অর্থাৎ ষাট দশকের বেশিরভাগ সময় ধরে চলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুখী সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে বাধা এলে বঙ্গবন্ধু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। বাংলা গান, কবিতা কিংবা কবি এগুলোকে বাঁচাতে তিনি এগিয়ে এলে এই মনে করে যে বাঙালি জাতিসত্তায় আঘাত যেন চ্যালেঞ্জের সাথে মোকাবেলা করা হয়। এই প্রচেষ্টায় জয়ী হলে জাতি এবং সংস্কৃতির জয় হবে। আর সেই চিহ্নিত ভিন্ন সত্ত্বা নিয়ে তিনি এগিয়ে গিয়ে গড়ে তুলবেন এক জাতির এক দেশ। অর্থাৎ বাঙালিদের জন্য বাংলাদেশ।

এ লক্ষে ভাষাভিত্তিক চেতনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শিল্পী সাহিত্যিক তথা শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি আপামর জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতে তিনি সফল হন। যেমন: ১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সংসদ সদস্যদের সম্মানে ঢাকার কার্জন হলে আয়োজন করা হয়েছিল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বাঙালি সংস্কৃতিকেই তুলে ধরার লক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি এল রায়, নজরুল ইসলাম, এবং বাংলার লোক সঙ্গীত গাইবার ব্যবস্থা করেছিলেন।  ডি এল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গান, অতএব সেই গানটি ছাড়াও সেই অনুষ্ঠানে ‘আমার সোনার বাংলা’-ও গাওয়া হয়েছিল।

একটি দেশের কবিতা কিংবা গান সৃষ্টি হয় মাটির শেকড় থেকে এবং সেগুলো নিজ নিজ দেশের মাটির গন্ধই ছড়ায়। যখন একজন রাজনৈতিক নেতা কেবল ক্ষমতা ও শাসনভার নেবার চিন্তায় রাজনীতি না করে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে সুবাস নিতে চেষ্টা করেন আমারা তাকেই বলি দেশের নেতা, দশের নেতা। তাই হয়তো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে  কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন, ‘এই দেশেতে জন্ম আমার যেন এই দেশেতে মরি’।

আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সময়কালকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে চেষ্টা করি তবে দেখব, তার জীবনটাই কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে। তা সত্ত্বেও জাতির মুক্তি এবং জাতির শক্তি সম্পর্কে তাঁর ছিল গভীর উপলব্ধি। বাংলা ভাষায় ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘মুক্তি’ এই শব্দ দুইটি তিনি নিজের নামের সাথে একাত্ম করে ফেলেছেন। এ ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘মুক্তি’র শক্তি তিনি যার কাছ থেকেই পেয়ে থাকুন না কেন এবং সে যদি হয় উল্লেখিত গুরু সদয় দত্ত কিংবা সমসাময়িক দেশ মুক্তি আন্দোলনের প্রবাহ, এতদিন পর আজও আমরা বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে ষোলআনা বাঙালি হওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। সেকারণেই তিনি জাতির পিতা। যদি এ ব্যাপারে কারোর কোনও সন্দেহ থেকে থাকে অথবা দ্বিমত পোষণ করেন, তাকে অনুরোধ করবো মনোযোগ দিয়ে আবারো বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে।

আসুন সবশেষে অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে উদ্ধার করা বঙ্গবন্ধুর কিছু অমর বাণীর সাথে পরিচিত হওয়া যাক। যেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছেন প্রকৃত বঙ্গবন্ধু। গুরু সদয় দত্ত যেভাবে বলেছিলেন বাংলার জাতীয় জীবনকে পুন:জাগ্রত করতে হলে ষোলআনা বাঙালি হতে হবে, অথবা তার সেই বিখ্যাত উক্তি- ‘গাহো জয়, গাহো জয়, গাহো বাংলার জয়’, বঙ্গবন্ধুর বিশেষ বাণীগুলোর দিকে মনোযোগী হলে দেখা যাবে গুরু সদয় দত্ত আর বঙ্গবন্ধুর সুর যেন কোথায় এসে একটি সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছে।

‘একটা দালান ভেঙে পড়েছে, যেখানে বিষাক্ত সর্পকুল দয়া করে আশ্রয় নিয়েছে’ (পৃ: ৩)

‘ইংরেজরা মুসলমানদের ভাল চোখে দেখত না’ (পৃ: ৫)

 ‘আমি কোন কাজেই ‘না’ বলতাম না’ (পৃ: ১৯)

‘পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে’ (পৃ: ৪৭)

‘অন্ধ কুসংস্কার ও অলৌকিক বিশ্বাসও বাঙালির দুঃখের আর একটি কারণ’ (পৃ: ৪৮)

‘নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়’ (পৃ: ৭৯)

‘আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই’ (পৃ: ৮০)

‘যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না (পৃ: ৮০)

‘যে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত তাদের মত হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আর যারা বাবা মায়ের স্নেহ আর আশীর্বাদ পায় তাদের মত সৌভাগ্যবান কয়জন!’ (পৃ: ৮৭)

‘উর্দু কি করে যে ইসলামিক ভাষা হল আমরা বুঝতে পারলাম না’ (পৃ: ৯৮)

‘কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে’ (পৃ: ১০০)

‘অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি খোদা আমাকে দিয়েছেন’ (পৃ: ১০৯)

‘জনসাধারণ চলছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন’ (পৃ: ১০৯)

‘প্রথমে সংঘবদ্ধ হোন, তারপর দাবিদাওয়া পেশ করেন, তা নাহলে কর্তৃপক্ষ মানবে না’ (পৃ: ১১২)

‘এখন বিলাত গিয়ে কি হবে, অর্থ উপার্জন করতে আমি পারব না’ (পৃ: ১২৫)

‘অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলতে পারে না’ (পৃ: ১২৬)

‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না’ (পৃ: ১২৬)

‘যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন’ (পৃ: ১২৮)

‘নির্যাতনের ভয় পেলে বেশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়’ (পৃ: ১২৮)

‘দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে’ (পৃ: ১৬৪)

‘দাঙ্গা করা উচিত না; যে কোনো দোষ করে না, তাকে হত্যা করা পাপ’ (পৃ: ১৭০)

‘স্বাধীন দেশের মানুষের ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাই, এর চেয়ে দু:খের বিষয় আর কি হতে পারে?’ (পৃ: ১৭১)

‘বাল্যস্মৃতি কেউ সহজে ভোলে না’ (পৃ: ১৭৭)

‘যে দেশের বিচার ও ইনসাফ মিথ্যার উপর নির্ভরশীল সেদেশের মানুষ সত্যিকারের ইনসাফ পেতে পারে কি না সন্দেহ!’ (পৃ: ১৯০)

‘আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ’ (পৃ: ১৯১)

‘মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতি সহ্য করতে পারে না’ (পৃ: ১৯৭)

‘মানুষকে ব্যবহার, ভালবাসা ও প্রীতি দিয়েই জয় করা যায়, অত্যাচার, জুলুম ও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না’ (পৃ: ২০০)

‘মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে’ (পৃ: ২০৪)

‘মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়’ (পৃ: ২০৭)

‘জনমতের বিরুদ্ধে যেতে শোষকরাও ভয় পায়’ (পৃ: ২১০)

‘আমি মুখে যা বলি, তাই বিশ্বাস করি। আমার পেটে আর মুখে এক কথা। আমি কথা চাবাই না’ (পৃ: ২১৮)

‘চিনের লোকেরা বাঙালিদের মত বক্তৃতা করতে আর বক্তৃতা শুনতে ভালবাসে’ (পৃ: ২২৪)

‘রাজ-রাজড়ার কাণ্ড সব দেশেই একই রকম ছিল। জনগণের টাকা তাদের আরাম আয়েশের জন্য ব্যয় করতেন, কোন বাধা ছিল না’ (পৃ: ২২৭)

‘ঘষামাজা করে রঙ লাগালে যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয় তাতে সত্যিকারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। নিজস্বতা চাপা পড়ে’ (পৃ: ২৩৩)

‘বিদেশে না গেলে নিজের দেশকে ভালভাবে চেনা কষ্টকর’  (পৃ: ২৩৪)

‘পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না’ (পৃ: ২৩৪)

‘একমত না হওয়ার জন্য যে অন্যকে হত্যা করা হবে, এটা যে ইসলাম পছন্দ করে না এবং একে অন্যায় মনে করা হয়- এইটুকু ধারণা আমার আছে’ (পৃ: ২৪০)

‘যাদের সাথে নীতির মিল নাই, তাদের সাথে মিলে সাময়িকভাবে কোনো ফল পাওয়া যেতে পারে, তবে ভবিষ্যতে ঐক্য থাকতে পারে না। তাতে দেশের উপকার হওয়ার চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়ে থাকে’ (পৃ: ২৪৫)

‘যাদের নীতি ও আদর্শ নাই তাদের সাথে ঐক্যফ্রন্ট করার অর্থ হল কতকগুলি মরা লোককে বাঁচিয়ে তোলা (পৃ: ২৪৮)

‘আওয়ামী লীগের একটা জিনিসেরই অভাব ছিল, সেটা হল অর্থবল। তবে নি:স্বার্থ এক বিরাট কর্মীবাহিনী ছিল, যাদের মূল্য টাকায় দেওয়া যায় না’ (পৃ: ২৪৯)

‘যেখানে আদর্শের মিল নাই সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না’ (পৃ: ২৫০)

‘মানুষকে ভালবাসলে মানুষও ভালবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে। (পৃ: ২৫৭)

‘বাঙালিরা রাজনীতির জ্ঞান রাখে এবং রাজনৈতিক চেতনাশীল’ (পৃ: ২৫৭)

‘জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালবাসে; কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দিবে না’ (পৃ: ২৫৮)

‘যুগ যুগ ধরে পুঁজিপতিরা তাদের শ্রেণী স্বার্থে এবং রাজনৈতিক কারণে গরিব শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি সৃষ্টি করে চলেছে’ (পৃ: ২৬৬)

‘নীতিবিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়, কিন্তু সংগ্রামের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না’ (পৃ: ২৭৩)

‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’ (পৃ: ২৭৩)

‘কোন যুদ্ধ জোটে যোগদান করার কথা আমাদের চিন্তা করাও পাপ’ (পৃ: ২৭৯)

‘অনেক দিন কারাগারে বন্দি থাকার পরে মুক্তির আদেশ পেয়ে, জেলগেট থেকে আবার ফিরে আসা যে কত কষ্টকর এবং কত বড় ব্যথা, তা ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝা কষ্টকর’ (পৃ: ২৮০)

-বঙ্গবন্ধু

অসমাপ্ত আত্মজীবনী

এনইউ / ১৭ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে