Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১১-২০১৯

উৎকণ্ঠার মাঝেই উৎসব

সেলিনা হোসেন


উৎকণ্ঠার মাঝেই উৎসব

এবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জনপদে বন্যার কারণে মানুষের যে বিপন্ন-বিপর্যস্ত দশা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা অত্যন্ত মর্মবেদনার। বন্যা-উত্তর পরিস্থিতির বহুবিধ নেতিবাচকতা সম্পর্কে সচেতন মানুষ মাত্রই জানা আছে। দেশের বিভিন্ন জনপদের মানুষ এখনও বানের পানিতে ভাসছে আবার অনেকে সেই নেতিবাচকতারই মুখোমুখি। এর মধ্যে এবার ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আরও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ডেঙ্গু এবার শুধু রাজধানী ঢাকায়ই নয়, ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে হাসপাতালে স্বজনরা আক্রান্তদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছেন। মহানগর-নগর-শহর এমনকি গ্রামীণ জনপদেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহতার খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে যাদের আমরা হারিয়েছি, সেই সংখ্যাটাও কম নয়। এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে ঈদুল আজহা। তবুও এই অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠার মাঝেই উৎসবের প্রস্তুতি।

উৎসব মানবিক আবেগের আনন্দঘন এক সর্বজনীন বহিঃপ্রকাশ। এক অর্থে সভ্যতার শুরুর সঙ্গে উৎসবের যোগ নিবিড়। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেই উৎসব সম্পর্কিত। আর এই প্রসঙ্গে ধরে নিতে হবে যে, শুরুর সময়ে এই উৎসব ছিল ব্যক্তির- তার হৃদয়-অনুভবের আনন্দ-উচ্ছল বর্ণাঢ্য প্রকাশ। মানুষ সঙ্গীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, অভিনয়, দেয়ালচিত্র অঙ্কন ইত্যাদির মাধ্যমে আপন সৃজনশীলতার যে প্রকাশ ঘটিয়েছিল, সেটি ছিল উৎসবের মূল সূচনা। কালপরিক্রমায় তা ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে প্রসারিত হয়েছে, পরবর্তী সময়ে সমষ্টি থেকে গোত্রে, গোত্র থেকে জাতিতে এবং রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর কোনো কোনো উৎসব ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।

উৎসব মানুষের মিলন মেলা। এখানে অংশগ্রহণ করে মানুষ প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট কিংবা গৎবাঁধা জীবনের ঊর্ধ্বে অন্যরকম আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করতে চায়। এই আনন্দ তাকে দেয় ক্ষণিকের স্বস্তি এবং একই সঙ্গে তার চেতনায় সঞ্চারিত করে শুভবোধ ও মঙ্গলচিন্তা। উৎসবের মূল সুর নষ্টচিন্তার বাইরে সত্য, সুন্দর এবং শুভবোধের মধ্যে আপন চেতনাকে প্রসারিত করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'উৎসব' প্রবন্ধে বলেছেন, 'উৎসবের দিনে আমরা যে সত্যের নামে বৃহত্তর লোকে সম্মিলিত হই, তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম।... উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুলপাতার দ্বারা সাজাই, দীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এইরূপে মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিনকে বৎসরের সাধারণ দিনগুলির মুকুটমণি স্বরূপ করিয়া তুলি।'

বাংলাদেশের উৎসব বাঙালির জীবনেও মুকুটমণিস্বরূপ। এই উৎসবকে মোটা দাগে তিনটি বৈশিষ্ট্যে ভাগ করা যায়। যেমন : সাংস্কৃতিক উৎসব, জাতীয় দিবসের উৎসব এবং ধর্মীয় উৎসব। সাংস্কৃতিক উৎসবের মধ্যে পড়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং দেশজুড়ে অসংখ্য লোকমেলা। জাতীয় দিবসের উৎসবগুলো হলো- স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি। ধর্মীয় উৎসবে আছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, শবেবরাত, মহররম, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, বড়দিন, বৈশাখী পূর্ণিমা, বিজু উৎসব এবং ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আরও নানা ধরনের উৎসব। উৎসব তার বিশিষ্টতা এবং বহুমুখী চরিত্র অর্জন করেছে নানা কারণে। বিভিন্ন জাতিসত্তা তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য নিজস্ব উৎসব পালন করে। সেটা হতে পারে সামাজিক, হতে পারে ধর্মীয়। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ভেতর দিয়ে উৎসব ক্রম-রূপান্তরে এগিয়েছে। কখনও সময় বদলে গেছে, কখনও বদলে গেছে উৎসবের আয়োজন। বদলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কালের বিবর্তনে সময়ের উপযোগী হওয়ার কারণেই এমনটি ঘটেছে।


বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ধর্মীয় তাৎপর্যের বাইরেও রয়েছে উৎসবের মানবিক আবেদন। রমজানের এক মাস সাধনার পর ঈদুল ফিতর উৎসব আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়। ঈদের জামাত ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আহ্বান করে। নতুন কাপড় পরে শিশু-কিশোরদের কলহাস্য মুখরিত করে তোলে চারদিক। ঈদের আগের দিন চাঁদ দেখার আনন্দ উৎসবের আমেজ ঘনিয়ে তোলে! ইতিহাস থেকে জানা যায়, চাঁদ দেখার ঐতিহ্য পুরান ঢাকায় বেশ আনুষ্ঠানিকতা পেত। মুঘল সুবেদার ইসলাম খান শাসনভার নিয়ে ঢাকায় আসার পর ঈদের আনন্দ অন্য রকম করে ফেলেন। চাঁদ দেখার পর গোলন্দাজ বাহিনী কামান দেগে ঈদের ঘোষণা দিত। তখন থেকেই ঈদ উপলক্ষে ঢাকায় মেলার আয়োজন করা হতো। ইতিহাসবিদ, গবেষকরা জানান, আঠারো শতক থেকে ঢাকায় ঈদমেলার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। বিশ শতকের প্রথম দিকে এই মেলা ঢাকার ঈদ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ইসলামপুর, সোয়ারীঘাট, লালবাগ, চকবাজার ইত্যাদি জায়গায় এসব মেলা বসত। নারী-পুরুষ-শিশু সবাই আসত মেলায়। আশরাফউজ্জামান 'ঢাকায় ঈদ' প্রসঙ্গে লিখেছেন, 'খেলাধুলার আয়োজন হতো ঈদের দিন। ঘুড়ি ওড়ানো ছিল তখন সবচেয়ে শখের মেলা। নবাব-বাদশাহ থেকে মহল্লাবাসীরা পর্যন্ত মেতে উঠত ঘুড়ির খেলা নিয়ে। আকাশে কবুতর উড়িয়েও আনন্দ পেত অনেকে। ঈদের দিনে বুড়িগঙ্গায় নৌকাবাইচ হতো খুব ঘটা করে। ইসলামপুর আর চকবাজারে বসত ঈদের মেলা। নানা রকম পণ্য সম্ভার নিয়ে ব্যবসায়ীরা আসত দূর থেকে। সন্ধ্যায় বাতি দিয়ে সাজানো হতো ঢাকা শহর।' এখনও ঈদের দিনে আলো দিয়ে সাজানো হয় শহর। ঢাকার বিভিন্ন মাঠে মেলা বসে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। হস্তশিল্পের সামগ্রীও পাওয়া যায়। তবে এটা সত্যি, নানা বিবরণ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় দেখা যায় যে, আগের দিনের ঈদ-উৎসবের চেয়ে বর্তমানের ঈদ-উৎসব অনেক ম্লান হয়ে গেছে। বাংলাদেশের 'মহররম মেলা' ধর্মীয় উৎসবের মেলা। যদিও এটি একটি শোকের অনুষ্ঠান; কিন্তু কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় এ অনুষ্ঠান স্মরণের একটি ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত লাভ করেছে। বাংলাদেশের মুসলমানরা ঈদুল আজহা এবং শবেবরাতও উদযাপন করে আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে কোরবানির তাৎপর্য গভীর। কিন্তু কোরবানি করার ক্ষমতা এ দেশের সব মানুষের নেই, গরিবের মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণ এই ঈদ-উৎসবের আনন্দ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। তবে এ কথা সত্য, ইদানীং কোরবানির প্রাণী কেনার প্রতিযোগিতা ত্যাগের মহিমার চেয়ে অর্থের ঝনঝনানি বেশি প্রদর্শন করে বলে এই উৎসবের গভীর তাৎপর্য অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, দম্ভ বা অহঙ্কারের আবরণে শুধু ধর্মীয় চেতনাই নয়, কোনো কিছুই ঢেকে রাখায় কোনো সুফল নেই।

বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা সর্বজন স্বীকৃত। ঈদ কিংবা দুর্গোৎসবেও এর প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি। গৌরবের সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপাদানগুলো উচ্চারণ করে থাকি। প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আমার শ্বশুরবাড়ি বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা গ্রামে। আমরা ঢাকায় কোরবানি দিই না। প্রতি বছর সেখানে ছাগল-ভেড়া পাঠিয়ে দিই এবং আমরা কখনও গরু-মহিষ কোরবানি দিই না। ছাগল-ভেড়া সেখানে প্রতি ঈদুল আজহায় কোরবানি হয় এবং এই কোরবানির মাংস সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। সব ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষদের এই যে আনন্দে অংশীদার হওয়া, এটাই আমাদের উৎসবের ভিন্ন ঐতিহ্যমণ্ডিত দিক। এর মধ্য দিয়েই আমাদের অসাম্প্রদায়িক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকেন নেপাল কুণ্ডু, মিলন মিত্র, সোহরাব, হাশেম প্রমুখরা। কোরবানির মাংস হিন্দু-মুসলিম সবাই ভাগ করেন এবং মিলন নিজে আমাকে বলেছেন, তার বউ ভাত রান্না করে অপেক্ষা করে কখন ভেড়া কিংবা ছাগলের মাংস সে নিয়ে যাবে। তারা এই মাংস রান্না করে স্বজনদের নিয়ে আনন্দে ভাগাভাগি করে খায়। ধর্মীয় উৎসবের ও সম্প্রীতির জায়গটা এভাবে উৎসবের আনন্দে সংযুক্ত করি। মিলন ওদেরকে বলতে শুনেছি, এই হলো পবিত্র কোরবনির মাংস। এই যে এক ধর্মের মানুষের প্রতি অন্য ধর্মের মানুষের শ্রদ্ধা, ধর্মের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ তা কত তাৎপর্যপূর্ণ এ আর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের দাবি রাখে না। এগুলোই তো আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শন।

মুক্ত করো ভয়, নিজেকে করো জয়- এর মর্মকথা আমরা জানি। নিজেকে জয় করার মধ্য দিয়েই আমরা সবকিছুর বিকাশ ঘটাতে পারি। এখানেই বাঙালি অনন্য নিদর্শন স্থাপন করেছে সামাজিকতায়; উৎসব, সংস্কৃতি ও নানাক্ষেত্রে উৎকর্ষের বিকাশ ঘটিয়ে। আমরা এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সম্প্রীতির আরও দৃঢ় বন্ধন চাই। কখনও আমাদের সম্প্রীতির বন্ধনে ফাটল ধরাতে চেয়েছে অশুভ শক্তি। কিন্তু শুভবোধ ও চেতনাসম্পন্ন মানুষ ওই অশুভ তৎপরতা রুখে দিয়ে মৈত্রীর বন্ধনটাই মজবুত করেছে। আমাদের শক্তি এখানেই। এই শক্তিবলেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই রক্তস্নাত বাংলাদেশে আমরা উৎসব আরও আলোকিত করব। আমরা এটাই বিশ্বাস করি, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। উৎসবের এই আবেদন আমাদের সমাজে যত পুষ্ট হবে, ততই মানবিকতাও বিকশিত হবে। হিংসা-দ্বেষ-সংঘাত দূর হবে।

লেখিকা: কথাসাহিত্যিক; চেয়ারম্যান বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

আর/০৮:১৪/১২ আগস্ট

মুক্তমঞ্চ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে