Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৯ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (14 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৭-২০১৯

টেষ্ট করলাম - “Taste of Bangladesh''

মম কাজী


টেষ্ট করলাম - “Taste of Bangladesh''

আজ থেকে ১২ টি বছর আগে প্রায় ১২,৫০০ কিলোমিটার দুরত্ব পার হয়ে ভাইবোনের অমূল্য সান্নিধ্য ছেড়ে যখন এই শহরে এসে পৌছি তখন মনে হয়েছিল এরচেয়ে নিরানন্দ জায়গা বোধহয় পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।কারন ছিল খুব অল্প বয়সে একা একা চলে আসা এবং ভালো করে বাংলা বলতে না পারা একটিমাত্র জামাই এর সাথে সংসার শুরু করা। আর নতুন দেশে মানিয়ে চলা নতুন ভাষায় কথা বলার এক যুদ্ধ তো ছিলই।তাই কোনও এক মন খারাপের দিনে আমার পতিদেব দয়া পরবশ হয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন “Taste of Danforth” নামক অসাধারন এক উৎসবে। আগষ্টের গরমে ঘেমে চপচপে হয়ে গেলেও অসাধারন লেগেছিল ড্যানফোর্থের গ্রীক টাউনের সেই আয়োজন। আর কেবলই মনে হয়েছিল- ইশ্!!! যদি কোনওদিন আমাদের বাঙালিদেরও এমন এক অনুষ্ঠান হত যেখানে বাংলাদেশ ও সংস্কৃতি বিশেষ করে খাবারে দেশের গন্ধ থাকত - তবে না জানি কত ভালো লাগত।

আজ এই বারো বছর পরে এক তুচ্ছ বাঙালির মনের গহীনে লালিত আশা পূর্ন হল। 

বেশ কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চলছিল এই “ Taste of Bangladesh” এর। বেশ কয়েকজনের মুখে মুখেও চলছিল এর কথা।অনুষ্ঠানে গান গাওয়ারও একটা ছোট্ট অনুরোধ এসেছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম আর দশটা বাঙালি মেলার মতই হয়তো হবে এই আয়োজন কিন্তু মধ্য দুপুরে যেই না গিয়েছি ড্যানফোর্থে আমি এই সুবিশাল আয়োজন দেখেই বাকরুদ্ধ। ড্যানফোর্থ এভিনিউয়ের ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে শিবলি এভিনিউ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। ওই সড়কের যানচলাচল বন্ধ করে ৫ আগস্ট সোমবার আয়োজন করা হয় এই উৎসবের। দুপুর ১টা থেকে শুরু হয়ে রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত চলে এই অনুষ্ঠান। সকলের জন্য উম্মুক্ত ছিল এই মেলা। টরন্টো ও এর আশেপাশের  বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলাদেশীরা এসে জড়ো হয়েছিল এই মিলন মেলায় । ভিক্টরিয়া-ডেনফোর্থ   ইন্টারসেকশনের কাছাকাছি মঞ্চ তৈরী করা হয়েছিল। নানা বিজ্ঞজনের মত অনুযায়ী এই প্রচন্ড গরমে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের সমাগম হয় এই সুবিশাল মিলনমেলায়।”Taste of Bangladesh” যে কেবল খাবারের স্বাদ নয় বরং আমাদের সমগ্র বাঙালিপনা তা বহু মুখোরোচক খাবারের পাশাপাশি দেশিয় আমেজে বহু বহু স্টল দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীগন প্রমান করেন। পসার সাজিয়ে তারা বসেন হরেক রকম পন্যের। ছিল নানা রকম শাড়ি, সেলোয়ার, কামিজ আর বাংলাদেশের তৈরী নানা রকম  গ্রার্মেন্টস, তৈরী পোশাক, কুটীর শিল্পের হাতে তৈরি কারুকাজ, তৈজসপত্র, খেলনা, ঘর সাজানোর রকমারি উপাদান। ক্রয়বিক্রয় ছিল বেশ জমজমাট। খাবারের মাঝে আইসক্রিম থেকে শুরু করে চটপটি, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চিকেন, বিরিয়ানিসহ আরও অনেক কিছু। বিশাল আয়তনের এই মেলা আর সারাদিন ধরে আগত উপচে পড়া জনমানুষের ভিড় আসলেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল আমার নিজের বাংলাদেশে। 

মেলার প্রধান আকর্ষন ছিল এর অত্যন্ত সফল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের বহু দিন ধরে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড সংগীত শিল্পী “নগরবাউল” ব্যান্ডের জেমস টরন্টো মাতান তাঁর কালজয়ী “রাতের তারা আমার কি তুই বলতে পারিস”, “পাগলা হাওয়ার তালে” আর “আমি তারায় তারায় কাটিয়ে দেব” এসব গান। দর্শকরা তাল মিলান তাঁর গানের সাথে এবং বহু দূর থেকে শোনা যায় এই সমবেত সংগীত। জেমস ছাড়াও গান পরিবেশন করেন দেশের বিখ্যাত শিল্পী রিজিয়া পারভীন এবং তপন চৌধুরী।অসাধারন ছিল তাঁদের পারফর্মেন্স। তবে আমাদের টরন্টোর নিজস্ব শিল্পীরাও কিছু কম যায় নি। কোকিলকন্ঠি নাফিয়া ঊর্মি, মুক্তা সরোয়ারের, সুকন্যা নৃত্যাঙ্গন, নৃত্যকলা কেন্দ্র, প্রমিনেন্ট প্রত্যয় কানাডার থেকে মম কাজী, কামরান করিম, রাইসা, মাইসা সকলেই দুর্দান্ত বিনোদন উপহার দেন। 

মঞ্চে অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপিকা দিলারা নাহার বাবু ,ফারহানা আহমদ, আসমা হক, ফাইযা ইসলাম,  রাইদাহ ফাইরুজ মিষ্টি এবং তানবীর কোহিনুর l
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের এমপি ন্যাথানিয়েল এরিস্কিন-স্মিথ, ফেডারেল মন্ত্রী বিল ব্লেয়ারের প্রতিনিধি ডানকান টলি, বক্তব্য রাখেন স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্ট এর এমপিপি বাংলাদেশি মেয়ে ডলি বেগম, বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের সিটি কাউন্সিলর ব্রাড ব্রাডফোর্ড, এবং স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্ট এর সিটি কাউন্সিলর গ্যারি ক্রোফোর্ড।”
কানাডার মাটিতে এটিই ছিল সর্ববৃহৎ বাঙালিদের অনুষ্ঠান। প্রথমবারের এই উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত সফল। যদিও কিছু কিছু জায়গায় সামান্য ভুল ত্রুটি ছিল যেমন জাতীয় সংগীতের ভুল পরিবেশনা, পার্কিং স্বল্পতা, মঞ্চের অবস্থান, চেয়ার স্বল্পতা, আবর্জনা পরিহার ও সর্বোপরি সাউন্ড সিস্টেমের সম্পর্কে কিছু অভিযোগ উঠেছে কিন্তু প্রথমবার হিসেবে আমি মনে করি এই দিকগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে নিজেদের সহযোগিতা প্রদান করে আগামী অনুষ্ঠানগুলো আরও বেশি সাফল্যমন্ডিত করা যায়।
অনুষ্ঠানটি সফল করে তুলতে যাদের পরিশ্রম অনস্বীকার্য তারা হলেন প্রধান উপদেষ্টা সৈয়দ শামসুল আলম, চেয়ারম্যান শক্তি দেব, কনভেনর ফরিদা হক, প্রধান সমন্বয়কারী রাসেল রহমান ও মেম্বার সেক্রেটারী আবুল আজাদ।এছাড়াও মনির ইসলাম, জামাল হোসেন, আসাবউদ্দিন আসাদ ও ওমর জাহিদ-এর অবদান ছিল মুখ্য।

বিদেশের মাটিতে বসে এমন দেশের স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য আয়োজকদের অনেক ধন্যবাদ। সেই দুপুর থেকে গান গেয়ে, অন্যদের গানের সাথে নেচে, আইসক্রিম, ফুচকা, তান্দুরি চিকেন খেয়ে, পরিচিত সকল মানুষের সাথে আড্ডা মেরে, ঈদের জন্য জামাই এর থেকে তিনটা জামা ও অন্যদের জন্য উপহার কিনে যখন সামনে একটা চেয়ার দখল করে বসলাম তখন বিকেলের রোদ অদৃশ্য হয়ে রাতের ঝিলিমিলি রাস্তার বাতি হলুদ আলোয় সকলের মাঝে এক স্বপ্নের শিহরণ বইয়ে দিল। আর যখন জেমস শেষ করলেন তার অসাধারন পরিবেশনা, আমি ভীড়ের মাঝে হেটে বহু দূরে পার্ক করা গাড়ীর দিকে যেতে যেতে আকাশের দিকে চেয়ে মিটিমিটি তারার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম- আসলেই তো-
“রাতের তারা আমার কি তুই বলতে পারিস,
কোথায় আছে কেমন আছে মা?” 

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে