Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৯ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০৬-২০১৯

উপমহাদেশের জন্য অশনিসংকেত

এম সাখাওয়াত হোসেন


উপমহাদেশের জন্য অশনিসংকেত

সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনেকটা আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, রাজ্য হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করেছেন সে দেশের রাষ্ট্রপতি। বহুল আলোচিত ৩৭০ ধারা শুধু রদ নয়, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দুই ভাগ করে দুটি 'ইউনিয়ন টেরিটোরি' বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে। এখন সেখানে দুটি অঞ্চল থাকবে- জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ। দু'জন লেফটেন্যান্ট গভর্নর এখন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এই দুই রাজ্য শাসন করবেন। তবে লাদাখে কোনো বিধানসভা থাকবে না; জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভা থাকবে। 

অনেকে বলতে পারেন, জম্মু-কাশ্মীরের এই 'মর্যাদা হ্রাস' ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীর ইস্যু অতীতে কখনোই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল না। এই কাশ্মীর নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি, ভূ-রাজনীতি অস্থির অবস্থায় ছিল ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হওয়ার একেবারে ঊষালগ্নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল এই কাশ্মীর নিয়ে। এখন যে আমরা পাকিস্তানশাসিত ও ভারতশাসিত কাশ্মীরের মানচিত্র দেখি, সেটা ছিল ওই যুদ্ধেরই পরিণতি। আবার ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধেও কাশ্মীরের মানচিত্র আরেক দফা বদল হয়। লাদাখের কিছু অংশ চীনের দখলে, তারা সেটাকে বলে আকসাই চীন। বর্তমানে লাদাখের যে সীমানা রয়েছে, বেইজিং সেটা মানে না। তারা মনে করে লাদাখ হচ্ছে তিব্বতের অংশ।

১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকবার যুদ্ধ হয়েছিল কাশ্মীর প্রশ্নেই। ওই যুদ্ধ যদিও কাশ্মীর অঞ্চলে 'জিরো সাম' ফলাফল বয়ে এনেছিল, তার টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। বাঙালিরা ওই যুদ্ধের সময় বুঝতে পারে, পূর্ব পাকিস্তান কতটা অরক্ষিত এবং এ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। তাদের লক্ষ্য কাশ্মীরের দিকে। পরের বছর বঙ্গবন্ধু যে ছয় দফা উত্থাপন করেন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়। সত্তর সালের নির্বাচনে এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। তার পথ ধরে আসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

একাত্তরের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হয় 'নিউক্লিয়ার রেস'। কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন- এর তিন দিকেই রয়েছে পরমাণু শক্তিধর তিনটি দেশ। ভারত ও পাকিস্তান ছাড়াও চীন। মূল কাশ্মীর এখন তিনটি দেশের মধ্যেই বিভক্ত। ফলে কাশ্মীর এখন কেবল ভারত ও পাকিস্তানের ইস্যু নয়, চীনের জন্যও বড় ব্যাপার। ত্রিপক্ষীয় এই সংকট নতুন মাত্রা পায় ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর। সর্বশেষ 'ড্রামা' শুরু হয়েছিল ভারতীয় অংশের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে। তারপর পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা, বৈমানিক আটক। এখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদ করা হলো। আমি মনে করি, এর মধ্য দিয়ে কেবল ভারত ও পাকিস্তানের জন্য নয়, গোটা উপমহাদেশের জন্য বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। এর মধ্যে চীন তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও জড়িয়ে পড়তে পারে।

বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারেই বলা হয়েছিল ৩৭০ অনুচ্ছেদ তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু বিষয়টি সহজ ছিল না। কারণ ভারত ভাগের সময় 'শেরে কাশ্মীর' হিসেবে খ্যাত শেখ আব্দুল্লাহ পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। পরে বিশেষ মর্যাদায় স্বায়ত্তশাসন মেনে নিয়েছিলেন। তখন কাশ্মীরের আলাদা পতাকা ছিল; মুখ্যমন্ত্রী নয়, কাশ্মীর সরকারের প্রধানকে বলা হতো 'প্রধানমন্ত্রী'। জওয়াহেরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেলসহ ভারতীয় সংবিধান প্রণেতারা অখণ্ডতার স্বার্থেই এসব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব স্বাতন্ত্র্য হারাতে হয় কাশ্মীরকে। এখন ৩৭০ অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত মর্যাদাও থাকল না। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে কাশ্মীরের বাইরের ভারতীয়রা সেখানে ভূমি ক্রয় করতে পারত না বা বসতি স্থাপন করতে পারত না। এখন যে কোনো ভারতীয় নাগরিক সেখানে বসতি স্থাপন করতে পারবে। এমনকি সরকার দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও জনসাধারণকে নিয়ে যেতে পারবে। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। 

কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। সেটাতে আরও কোন কোন পক্ষ জড়িয়ে পড়তে পারে, এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। ভারত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে কথা বলে থাকে, কাশ্মীরের মর্যাদা রদ সেটার বিপরীত। এতে বহির্বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। ভারত জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হওয়ার যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটা হবে সুদূরপরাহত।

কাশ্মীরের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্যও চিন্তার বিষয়। নির্বাচনী ইশতেহারের দোহাই দিয়ে বিজেপি সরকার যদি এত বড় কাজ করতে পারে, এনআরসি বা নাগরিকপুঞ্জি নিবন্ধনও করতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গে এখনই করতে না পারলেও আসামে করতে পারবে। তারা বহুদিন ধরে ওই রাজ্যের বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে 'বাংলাদেশি' আখ্যা দিয়ে আসছে। তাদের যদি ঠেলে সীমান্তের এপাশে পাঠায়, বাংলাদেশের জন্য বিরাট সমস্যা হবে। এছাড়া কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে যদি সংঘাতময় পরিস্থিতি দেখা যায়, তাতে করে উপমহাদেশে নিশ্চিতভাবেই অস্থিরতা দেখা দেবে; বাংলাদেশ তা থেকে দূরে থাকতে পারবে না।

কাশ্মীরে অস্থিরতা ও নিপীড়ন যদি বাড়ে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদও ছড়িয়ে পড়বে। পাকিস্তান বা ভারত সেই সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে পারবে না। আল কায়দার দক্ষিণ এশিয়া শাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আইএস ইতিমধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশে তৎপরতা বাড়িয়েছে। শ্রীলংকায় তারা উপস্থিতি জানান দিয়েছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মীরে নজর দেবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু উপমহাদেশের সবচেয়ে সেক্যুলার ও শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ সেখান থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারবে না। 

নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে