Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৬ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-০২-২০১৯

ঐশ্বর্য ও উচ্চতায় রবীন্দ্র ছোটগল্প

রাহাত খান


ঐশ্বর্য ও উচ্চতায় রবীন্দ্র ছোটগল্প

গল্পগুচ্ছের রবীন্দ্রনাথ নামে জমিদার। ছত্রধারী এক রাজপুত্র বলেও মনে হয় যেনবা। ধারণা করা যেতেই পারে, লোকটি পাইক-পেয়াদা দ্বারা পরিবেষ্টিত। রাজস্ব আদায়ে খুব হিসেবি। রাজস্ব আদায়ে একটু হেরফের হলে হিংস্র ও দয়ামায়াহীন হয়ে ওঠেন। পদ্য লেখা, গদ্যে হাত দেওয়া, এসবই বুঝিবা গ্রাম-জীবনের নির্বাসিত মুহূর্তগুলো ভুলে থাকার জন্য করা। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর জমিদারদের চরিত্র তো মোটামুটি এ রকমই ছিল। খাজনা দিতে বিলম্ব হলে প্রজাদের কাচারিবাড়িতে ধরে এনে শাস্তি দেওয়া। কখনওবা ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। নারী-লোলুপতা, রঙমহলে নর্তকীবিলাস; উৎপীড়িত প্রজা থেকে আদায়কৃত টাকা নিয়ে হাওয়া খেতে যাওয়া, এ রকমই তো ছিল তখন জমিদারদের চাল-চরিত। তবে শিলাইদহে আসার পর তো বটেই, কলকাতায় বসবাসকালীনও জমিদারসুলভ এসব কা কীর্তি এবং রীতিনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রকৃত পরিচয়ে তিনি ছিলেন ঘরে বাস করা এক সন্ন্যাসী, সর্বদা যিনি সাহিত্যশিল্পে মশগুল ছিলেন।

তিনি তার স্বভাব ও ধাতটা পেয়েছিলেন বাবা দেবেন ঠাকুরের। পিতা ছিলেন অধ্যাত্মসাধক, একেশ্বরবাদী এবং মানবকল্যাণে ব্রতী। রবীন্দ্রনাথ তার বাবার চরিত্রগত সবক'টা বৈশিষ্ট্য পেয়েছিলেন যেনবা উত্তরাধিকার সূত্রে। জমিদার ছিলেন। যৌবনে দেখতে ছিলেন যেনবা রূপবান এক রাজপুত্র। বৈভবের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু তারপরও বরাবর ছিলেন মানুষ, প্রকৃতি এবং অধরা এক জগতের প্রতি আকৃষ্ট। সংসারে বসবাস করা এক সন্ন্যাসী যেন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন- কথাটা বলতে হলো এ জন্যই যে, সত্যি সত্যি জমিদারি দেখাশোনা করতে তাকে যেতে হয়েছিল কলকাতা থেকে বহু দূরে, পূর্ব বাংলার শিলাইদহ নামে একটা গ্রামে। এর পেছনে বহুশ্রুত একটা গল্প রয়েছে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বেশিরভাগ জমিদারি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে। জমিদারি চালাতেন মহর্ষির মেজো পুত্র। হঠাৎ তার অকালপ্রয়াণে শূন্যস্থান পূরণ করবে কে- এ নিয়ে কয়েকটা দিন খুবই চিন্তাভাবনা করতে হলো মহর্ষিকে। শেষে ছেলেদের নিয়ে বৈঠক ডেকে তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন, জমিদারি চালাবে কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ।

পিতৃ আজ্ঞা শুনে রবীন্দ্রনাথের মনের অবস্থাটা কী হয়েছিল? কল্পনা করি, হয়তো বজ্রাহতের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতাকে কেন্দ্র করে তখন রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব একটি সাহিত্যভুবন গড়ে ওঠে। এ ছাড়া কলকাতার শিক্ষিত, বিদ্যোৎসাহীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়-সূত্র গড়ে ওঠা, ত্রিপুরার মহারাজা, কোচবিহারের মহারানী, অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং মেলামেশা করা- এসব আকর্ষণ তো ছিলই। ছিল কবিতায়, কখনও কখনও সমালোচনায় বিহারীলাল, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশব সেন প্রমুখ। বর্ষীয়ান কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কিছু কিছু স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ। কলকাতায় আনন্দ-উদ্দীপনা ভরা একটি জগৎ ছিল তার। এসব স্বীকৃতি, অর্জন ও নাগরিক আনন্দপূর্ণ জীবন ছেড়ে পূর্ববঙ্গের কোথাকার এক শিলাইদহ গ্রামে বসবাস করতে যাওয়া মানে তো রবীন্দ্রনাথকে হঠাৎ বিনা অপরাধে নির্বাসনে পাঠানো।

কিন্তু পিতৃ আজ্ঞা মেনে নেওয়া ছাড়া তো কোনো উপায়ও নেই। আরাম-আয়েশ করে যাওয়া যায়, জমিদারদের তেমন একটা বোটে করে সবশেষে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের উদ্দেশে রওনা দেন। নদীপথে শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া তো দেখার বা করার কিছু নেই। ভাগীরথী ও গঙ্গা পার হয়ে বোট এসে জল নিল দিগন্তপল্গাবী পদ্মার। বোট ভেসে চলে জনপদের দিকে। আকাশ কখনও শূন্যের ও নীলের বৃহৎ বিস্তার। কখনও নানা বর্ণিল মেঘমালায় আচ্ছন্ন। কখনও ঝড় ও বৃষ্টি। কখনও রোদ। আর লোকালয়ে ঢুকে পদ্মা তো অনেকটাই সীমিত, এমনকি কোথাও কোথাও অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ। পদ্মার জলে ভেসে ওঠা বালুচরের পিঠও দেখা যায়। নদীর দু'পাশে জনপদ।

সবচেয়ে বেশি দেখার মতো ছিল পদ্মা তীরবর্তী জনপদগুলো। নদীর তীর ধরে লোকজনের আসা-যাওয়া। উল্টানো নৌকার গলুইয়ে বসে গ্রামের দুষ্টু ছেলেদের দুলে দুলে খেলা করা। আরও কত কি। শহর ছেড়ে দুঃখভারাক্রান্তচিত্তে গ্রামে আসতে বাধ্য হওয়া কবি দেখেন এবং অনুভব করেন, নদীর দু'পাশের এবং ভেতরের জনপদগুলো যেন হাজার বছরের বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখের একটি প্রাচীন সভ্যতা। 

বোটে করে শিলাইদহে আসতে আসতে বিশাল জলস্রোত, দিগন্তহীন অবারিত আকাশ এবং দু'পাশে জনপদের নানা দৃশ্য দেখে দেখে রবীন্দ্রনাথ তার বিরহ-কাতরতা ভুলে যেতে পেরেছিলেন অনেকটা। একটি নতুন জগৎ আবিস্কৃত হয়েছিল তার কাছে, যার আস্বাদন সম্পূর্ণ ভিন্ন। জমিদারি দেখার কাজে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ সব মিলিয়ে আট-ন' বছরের বেশি ছিলেন না। এই সময়টুকুতে জন্ম নেন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন রবীন্দ্রনাথ। সত্যিকারের বাংলাদেশ, সত্যিকারের প্রকৃতি-লীলা, সত্যিকারের মানুষ দেখা, চেনা, বোঝার অভিজ্ঞতা শিলাইদহে এবং পূর্ববাংলার বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণেই তার অর্জিত হয়েছিল। আমি মনে করি, রবীন্দ্র-প্রতিভার বিকাশ এবং পূর্ণতা লাভ শিলাইদহে বসবাসকালীন জীবনেই হয়। আর রবীন্দ্র-প্রতিভার পূর্ণতা-প্রাপ্তির লীলা-রহস্যের নামই বোধকরি গল্পগুচ্ছ।

ছোট ও বড় আকারের কয়েকটি গল্প শিলাইদহে জমিদারি চালাতে যাওয়ার আগেই লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে ছোটগল্পের প্রকৃত ধরন ও প্রাণসত্তা তখনও তেমন করে ধরা দেয়নি তার কাছে। এ সময় ইউরোপীয় সাহিত্যে ছোটগল্পের একটি স্বর্ণযুগ চলছিল। নির্মিত হচ্ছিল হীরকখে র মতো একেকটি দ্যুতিময় ছোটগল্প, বিশেষ করে ফ্লবেয়ার এবং তার শিষ্য মোপাসাঁর হাতে। ভাব-শিষ্য হলেও অচিরে ছোটগল্পে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করে ফেলেন মোপাসাঁ। ফ্লবেয়ার ও মোপাসাঁর ছোটগল্পে দুটি স্বতন্ত্র ধারা যেন ছোটগল্পের শেষ সংজ্ঞাটি তৈরি করে যাচ্ছিল।

তবে আশ্চর্য হলেও সত্য, শিলাইদহে যাওয়ার পর মানুষ ও প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসে রবীন্দ্রনাথের হাতে স্বভাব-বৈশিষ্ট্যে সম্পূর্ণ আলাদা ছোটগল্পের যে তৃতীয় ধারাটি তৈরি হয়, ছোটগল্পের শেষ ও নির্ভুল সংজ্ঞাটি তৈরি হয় সেই ধারাতেই। বিশ্ব ছোটগল্পের খুব উল্লেখযোগ্য শেষ জাদুকর যেন রবীন্দ্রনাথ, আর কেউ নন।

তবে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকর্মে যত সেরা হন, কাউকে তো শেষ কবি, শেষ ছোটগল্পকার ইত্যাদি বলা যায় না। ঊনবিংশ শতকে ফ্লবেয়ার, মোপাসাঁ ও রবীন্দ্রনাথের হাতে ছোটগল্পের তিনটি শক্তিশালী ধারা তৈরি হয়েছিল, ইতিহাসের নিরিখে এটুকুই মাত্র বলা যায়। সময়ের প্রয়োজন মিটিয়েও তারা কালোত্তীর্ণ, বলা যায় বড়জোর এই কথাটাও। এরপরও তো সময় থেমে নেই। গল্পগুচ্ছের আলোচনা যেহেতু, বলা যায় ছোটগল্পও তেমনি থেমে নেই। স্প্যানিশ, জার্মানি, আরবি, আফ্রিকান, ইংরেজি, উর্দু-হিন্দি, জাপানি এমনকি বাংলা সাহিত্যেও সময় একই ধারা মেনে অহর্নিশ বয়ে চলেছে। রবীন্দ্র-পরবর্তী সময় থেকে এখনাবধি বাংলা ভাষায় ছোটগল্পের নানা নিরীক্ষা; প্রথা-ভাঙার নানা প্রচেষ্টা চলছেই। যেমন চলছে বিশ্বের অন্যান্য ভাষায়। বাংলা সাহিত্যের পেছন ফিরে তাকিয়ে বড়জোর বলা যায়, ছোটগল্পের আরম্ভ রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এবং এখন পর্যন্ত ছোটগল্পে তার ঐশ্বর্য ও উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি কেউ। যদিও রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে একটি-দুটি কালোত্তীর্ণ ছোটগল্প লিখেছেন বহু লেখকই। তবে কবিতায় যেমন, ছোটগল্পেও তেমন, সাহিত্যকর্মে বাঙালিকে তাকাতে হয় রবীন্দ্রনাথের দিকেই। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় এ জন্য যে, তার তৈরি করে যাওয়া ভাষায় আমরা লিখছি।

গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ লেখা হয় রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ তথা পূর্ববাংলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকালে। বেশিরভাগ গল্পে রয়েছে দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের কাহিনী। এ ছাড়া আছে প্রকৃতি, নানান প্রকাশে, নানান বিস্তারে। সবই গল্পের প্রয়োজনে। প্রকৃতির বর্ণনায় অতিরঞ্জন বেশ খানিকটা আছে। তবে বলতেই হয়, সহজ ও স্বাভাবিক বর্ণনায় প্রকৃতি এসেছে গল্পের প্রয়োজনেই। গল্পের সহায়ক উপকরণ হিসেবে।

গল্পগুচ্ছের বেশিরভাগ গল্পের উপসংহারই ভয়াবহ রকম মর্মস্পর্শী। ভয়াবহ রকম বললাম, কারণ মানুষের জীবনের অতলস্পর্শী মর্মবেদনা অনেক পাঠক-পাঠিকার পক্ষেই সহনীয় হওয়ার নয়। এ জন্য শুরুতে বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ শুধু নামে জমিদার। আসলে তিনি ছিলেন যে কোনো মানুষের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারেন, তেমন একজন সংবেদনশীল ও অনুসন্ধানী মানুষ। প্রকৃতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, নাট্যকাব্য এবং গল্পগুচ্ছে জুগিয়েছে কোনো এক অজানা রহস্যলোক বা বলা যাক অধ্যাত্মবোধের খাদ্য। প্রকৃতিই সৃষ্টি জগতের মূলশক্তি। এই সত্য নাগরিকবোধের লেখকেরা উপলব্ধি করতে নাও পারেন। ভাবতে পারেন, গল্পের যে কোনো সংকট বা বিস্তারে প্রকৃতিকে টেনে আনা তো এক হিসেবে জীবন-সত্য না বোঝারই পরিচয়। এ নিয়ে আমি কোনো রকম তর্কে যেতে চাই না। আমি মনে করি, প্রকৃতিই প্রকৃত সত্য ও শক্তির আধার। গল্পগুচ্ছে প্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন মানুষের জীবন-সত্য ও অধ্যাত্মলোকের অধরা বাস্তবতাকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রকৃতি যেন তা বর্তমান এবং অনন্তের সুর ধারণ করে আছে গল্পগুচ্ছে [কবিতায় তো বটেই], ঠিক যেমনটা হওয়া দরকার। ঘাটের কথা, রাজপথের কথা কিংবা পোস্টমাস্টারের কাহিনীটি আর কীভাবেইবা বর্ণনা করা যেত মহাকালরূপী প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া?

নিছক প্রকৃতিই যদি গল্পগুচ্ছের গল্পগুলোর প্রতিপাদ্য হতো, তাহলে প্রকৃতিকে অনাবশ্যক বললেও বলা যেত। কিন্তু আগেই বলেছি, মানুষ এবং মানুষের জীবনে পৌষ-ফাগুনের পালাটি কীর্তন করাই ছিল গল্প রচনার পেছনকার উদ্দেশ্য। পূর্ববঙ্গে বসবাসকালে, আমরা যাদের বলি সাধারণ বা প্রান্তিক মানুষ, তাদেরকে তাদের সম্পূর্ণতা-অসম্পূর্ণতাসহ এমনভাবে চিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ঘটনাকে কীভাবে সম্পূর্ণ গ্রাস করা যায়, কীভাবে মানুষের মর্মমূলে প্রবেশের দরজাটি খুলতে হয়, কীভাবে এসব ইতিবৃত্তকে ভাষা ও প্রাণ দিয়ে চিরন্তনী করে তুলতে হয়, গল্পগুচ্ছের বেশিরভাগ গল্পে তার স্বাক্ষর রবীন্দ্রনাথ রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে পারি ছুটি, এক রাত্রি, বোষ্টমী, মুসলমানির গল্প, যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ, রাম-কানাই'র নির্বুদ্ধিতা, মাস্টার মশায়, আপদ, ক্ষুধিত পাষাণ, জীবিত ও মৃত ইত্যাকার গল্প।

গল্পগুচ্ছের সবক'টি গল্পের আলোচনা করার মতো বাক্যসম্পদ আমার কতটা আছে, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে যথেষ্টই। তা ছাড়া রবীন্দ্র-আলোচনার জন্য এতখানি স্পেস কোনো সম্পাদক দেবেন বলেও আমার ভরসা হয় না। গল্পগুচ্ছের দুটি বৈশিষ্ট্য এবং লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সম্পর্কে তার এক জীবনীকারের একটি উক্তি উল্লেখ করেই এ আলোচনার ইতি ঘটাতে চাই।

কবিতা বলি, গল্প বলি- শিল্প-সাহিত্যের যে কোনো প্রকাশেই লেখক বা শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু না কিছু ছায়াপাত ঘটেই। গল্পগুচ্ছের কঙ্কাল, ক্ষুধিত পাষাণ, গিন্নি, কাবুলিওয়ালাসহ গোটা কয় গল্পে সে রকমটাই হয়েছে। এসব গল্পে রবীন্দ্রনাথ নিজে অনেকটাই আছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের লেখা নব্বই ভাগ গল্পে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াপাত ঘটেনি। বিশেষ করে আট-নয় বছর পূর্ববঙ্গে বসবাসকালে যে গল্পগুলো [গল্পগুচ্ছের বেশিরভাগ] লিখেছেন, সেখানে গল্পের মানুষগুলো আছে, চারপাশজুড়ে থাকা প্রকৃতি আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নেই কণামাত্র। ব্যক্তি-রবীন্দ্রনাথ [বোষ্টমী গল্পটি ছাড়া] সম্পূর্ণই অনুপস্থিত। গল্পের আড়ালে থাকা ব্যক্তি-লেখকের এই অনুপস্থিতি, মানুষ ও তার সুখ-দুঃখের জীবন এবং গল্পের সহায়ক প্রকৃতিকে আত্মস্থ করতে পারা এবং জীবন ও সময়কে সহজের পথে বইতে দেওয়া বিশাল, অতিকায় এক শক্তিরই পরিচায়ক। কোনো গল্প লেখকের জন্য প্রায় অসম্ভব এই শক্তি অর্জন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যাকে বিশ্বসাহিত্যে গল্পের তৃতীয় ধারা বলে মানি, রবীন্দ্রনাথের হাতে যার নির্মাণ, সেই তৃতীয় ধারার গল্পের সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য ব্যক্তিলেখকের গল্পের এই আড়ালে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। একটুও তাড়িত বা উচ্ছ্বসিত না হয়ে গল্পে আবেগকে একটু একটু ছড়িয়ে দেওয়া, নিষ্পৃহতা এবং জীবন-সত্যের উপলব্ধিকে মর্মস্পর্শী করা তোলা- এসবই গল্পগুচ্ছে গল্পগুলোর স্বাভাবিক রূপ ও রীতি।

গল্পগুচ্ছের গল্পগুলোর আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, জীবনে বহমান বেদনা ও হাস্যরসের হাত ধরাধরি করে চলা। রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি গল্পে জীবনের এই স্বাভাবিক রূপটি আমরা খুঁজে পাই। অতিবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ইত্যাকার সত্য ও দর্শন বোঝাতে গিয়ে বহু সেরা লেখকও জীবন যে সুখ-দুঃখের, বেদনা ও হাস্যরসের মেলবন্ধন তা বেমালুম ভুলে যান। এমন অনেক গল্প-লেখক আছেন, বিশ্বের প্রায় সব ভাষায়ই, যারা জীবনকে মনে করেন শুধু দুঃখের পাঁচালি এবং দর্শনের বড় বড় থিওরি আউড়ে যান তাদের গল্পে। একটুও চিন্তা না করে যে দর্শনের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য দর্শন। সেখানে মানুষের মনের ভেতর ফল্কগ্দুধারার মতো বয়ে চলেছে যে আনন্দধারা, লেখার সময় সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। এসব লেখককে রবীন্দ্রনাথের গল্পপাঠের প্রেসক্রিপশন দেওয়াই যায়। কারণ রবীন্দ্রনাথ একটুও কবিত্ব করে বা বাড়াবাড়ি করে বলছি না- চিরকালের সত্য যা, সেই গল্প লিখে রেখে গেছেন বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে সাহিত্যের নিবিষ্ট ছাত্রের জন্য।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি সম্পর্কে উক্তিটি করেছিলেন গাদ্দিয়ানো নামে তার এক জীবনীকার [দ্রষ্টব্য সার্জ ব্রেমলির লেখা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, অনুবাদ যশোধরা রায় চৌধুরী]। ষোড়শ শতকের এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিত্রশিল্পী সম্পর্কে গাদ্দিয়ানো একটু বেশি গদগদ হয়েই বলেছিলেন, 'তার মনোহর, উদার, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব তার শারীরিক সৌন্দর্যের থেকে কিছু কম ছিল না। তার আবিস্কারের প্রতিভা ছিল আশ্চর্য এবং তিনি ছিলেন [তার শিল্পকর্মে] রূপ ও সৌষ্ঠব বিষয়ক যাবতীয় প্রশ্নের চূড়ান্ত বিচারক। বিশেষত যে গুণ বিস্ময়কর, তা হলো তার সঙ্গীত-প্রতিভা। লায়ারে নিজেই সঙ্গত করতেন নিজের গানের সঙ্গে, সমস্ত সভাকে মুগ্ধ করতেন।'

সবই ঠিক আছে। শুধু যোগ করতে হবে কবিতা, গল্প-উপন্যাস এবং কাব্যনাটিকাগুলো। আবেগে একটুও গদগদ না হয়ে বলা যায়, এসবই সত্য ভাষণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেলায়ও।ৎ

এমএ/ ১০:০০/ ০২ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে