Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৬ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২২-২০১৯

প্রিয়া সাহা, আপনি দারুণ একটি ভুল করেছেন

আবদুল গাফফার চৌধুরী


প্রিয়া সাহা, আপনি দারুণ একটি ভুল করেছেন

ওয়াশিংটনে প্রায় প্রতিবছরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশে-বিদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানান। এ বছরও এই আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই আলোচনা বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলেন প্রিয়া সাহা। তাঁকে আমি চিনি না। জীবনে এই প্রথম তাঁর নাম শুনেছি। তাঁকে চেনা না চেনা বড় কথা নয়। বড় কথা ওয়াশিংটন বৈঠকে দেওয়া তাঁর বক্তব্য।

তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) উগ্র মৌলবাদীদের চরম নির্যাতনের শিকার। তিন কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু গুম (disappear)হয়ে গেছে। এখন যে এক কোটি ৮০ লাখ ধর্মীয় সংখ্যালঘু বাংলাদেশে আছে, তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ।’ প্রিয়া সাহা তাদের রক্ষা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে অনুরোধ জানিয়েছেন।

এই খবর জানার পর কারো কারো হয়তো মনে হতে পারে, এটি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে খেপিয়ে তোলার জন্য তাঁর শত্রুশিবিরের আরেক দফা ষড়যন্ত্র। মার্কিন প্রশাসনে এমনিতে হাসিনা সরকারবিরোধী একটি শক্তিশালী গ্রুপ আছে। এই ধরনের প্রচারণা দ্বারা সেই গ্রুপকে সাহায্য জোগানো হচ্ছে।

এই ষড়যন্ত্র আগেও হয়েছে। বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে এই পরিষদে ভাঙন ধরানো হয়। পরিষদের একটি অংশ সাম্প্রদায়িক ভূমিকা গ্রহণ করে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের সত্য-মিথ্যা কাহিনি প্রচার করে একদিকে আমেরিকা এবং অন্যদিকে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারকে তারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

বিএনপির খপ্পরে পড়া ঐক্য পরিষদের একাংশের এই অপচেষ্টা অবশ্য সফল হয়নি। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বেশির ভাগ নেতা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের। তাঁরা বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ইকুয়াল রাইটস অ্যান্ড অপরচুনিটি চান; কিন্তু সংখ্যালঘুরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হোক, তা তাঁরা চান না।

এ জন্য এত দিন পর ওয়াশিংটনে প্রিয়া সাহা নামে বাংলাদেশি এক নারীর বক্তব্য শুনে এবং ট্রাম্পের মতো এক বর্ণবিদ্বেষী ও এথনিক সংখ্যালঘুবিরোধী মার্কিন নেতার হাত ধরে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষার জন্য তিনি কাকুতি-মিনতি করায় প্রথমে মনে হয়েছিল, এটি বাংলাদেশ ও অসাম্প্রদায়িক হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র হয়তো।

একটু খোঁজখবর নিয়েছি। প্রিয়া সাহা বাংলাদেশেরই বাসিন্দা। তাঁর স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তা। তাঁর ছেলে-মেয়েরা ওয়াশিংটনেই লেখাপড়া করেন। তিনি সম্ভবত ঐক্য পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যখন জানতে পারলাম, তিনি গত সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে পাননি, তখন এমনও সন্দেহ হয়েছিল, এটি হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর ব্যক্তিগত রাগের জন্য তিনি করেছেন।

পরে তাঁর পরিচিতজনের সঙ্গে আলাপ করে বুঝেছি, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়ায় তাঁর রাগ আছে। সেটি ওয়াশিংটনে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার একটি গৌণ কারণ হতে পারে, তবে মুখ্য কারণ নয়। দুটি মুখ্য কারণ হতে পারে—আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া সত্ত্বেও তাঁর মনে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়ে গেছে এবং বিদেশে গিয়ে বিতর্কিত কথা বলে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও লাইমলাইটে আসতে চান তিনি।

যদি তা প্রিয়া সাহার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তিনি তাতে সফল হয়েছেন। তিনি ও তাঁর বক্তব্য এখন দেশে-বিদেশে আলোচিত। তাঁর ওয়াশিংটন-বক্তব্যের দ্বিতীয় কারণ হতে পারে, ঐক্য পরিষদের ভেতরের এবং বাইরের সাম্প্রদায়িকতামনা এক শ্রেণির ব্যক্তির উদ্দেশ্য পূরণ করার কাজে তিনি জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ব্যবহৃত হয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে, প্রিয়া সাহাকে তাঁর বক্তব্যের জন্য কোনো ধরনের হেনস্তা না করা। আমি গত রবিবার (২১ জুলাই) আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে জেনেছি, সরকার প্রিয়া সাহাকে হেনস্তা করবে না, বরং তাঁর সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে বসে তাঁর বক্তব্যের কারণগুলো জানার এবং তাঁর মন থেকে বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করবে। কোনো মহল তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইলে তাদের খপ্পর থেকেও তাঁকে এভাবেই উদ্ধার করা দরকার।

আমি প্রিয়া সাহাকে বলব, আপনার বক্তব্যে সত্যতা থাকলেও তা এককালে মুসলিম লীগের এবং পরবর্তীকালে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমান বাংলাদেশ ও হাসিনা সরকারের জন্য প্রযোজ্য নয়। হাসিনা সরকারের আমলেও দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক নির্যাতন আছে। তা অতীত থেকে পাওয়া। রাতারাতি তা দূর করা যাবে না। ব্রিটেনে কঠোর বর্ণবাদবিরোধী আইন করেও কি বর্ণবিদ্বেষ, অশ্বেতাঙ্গদের নির্যাতন ও হত্যা একেবারে বন্ধ করা গেছে?

আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষার জন্য আবেদন জানিয়ে তিনি তো শিয়ালের কাছে মুরগি পাহারা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। আমেরিকায় কালো এবং বহিরাগত সম্প্রদায়ের অবস্থা কী? তাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের জন্য ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট এবং রেসিস্ট বলে তাঁর দেশেই অভিযোগ উঠেছে। বহিরাগত ঠেকানোর নামে তিনি সীমান্তে যে নির্যাতন শুরু করেছেন, মায়ের বুক থেকে শিশুকে ছিনিয়ে আলাদা বন্দিশিবিরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, তা সারা বিশ্বে নিন্দিত হয়েছে এবং মার্কিন কংগ্রেসের একজন নারী সদস্য ট্রাম্পের বন্দিশিবিরকে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

যে ট্রাম্প চান আমেরিকা থেকে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন, চারজন অশ্বেতাঙ্গ নারী কংগ্রেস সদস্যকে যিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন আমেরিকা থেকে ভাগো, যিনি চান সংখ্যালঘুদের সব ধরনের অধিকার হরণ, তাঁর কাছে প্রিয়া সাহা চেয়েছেন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা! এটি যে তাঁর কত বড় ভুল এবং দেশবিরোধী ভূমিকা, তা কি তিনি বুঝতে পারেননি?

সংখ্যালঘু নির্যাতন সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে সত্যতা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সঠিক নয়। তিনি বলেছেন, তিন কোটি ৭০ লাখ ধর্মীয় সংখ্যালঘু গুম (disappear)হয়েছে। আমার সংখ্যাটি জানা নেই। তবে এই ধরনের এক বিরাটসংখ্যক সংখ্যালঘু ১৯৪৭ সাল থেকে দেশত্যাগ করেছে। এটি ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফল। দেশভাগের পরপরই তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ দুই বাংলাতেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় এবং পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে লোকবিনিময়ের চুক্তি হয়। এই চুক্তি নেহরু-লিয়াকত চুক্তি নামে খ্যাত। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে এক কোটির ওপর ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভারতে চলে যায়। তারা কেউ গুম হয়নি।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব-মোনেম জমানায় ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আবার সংখ্যালঘুদের মধ্যে ব্যাপক দেশত্যাগের হিড়িক দেখা দেয়। এই সময় ৫০ হাজারের ওপর সংখ্যালঘু দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগ করেনি, বরং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে আসতে চেয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কৌশলে তাদের জমিজমা, বসতবাড়ি দখল, মন্দির দখল শুরু হয়। এ কাজে পাকিস্তান আমলে প্রণীত ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ দখলদারদের সহায়তা জোগায়।

জেনারেল এরশাদের আমলে একবার এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চরম নির্যাতন হয়। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের হিসাব মতে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ থেকে এক মাসের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু দেশ ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। সুতরাং প্রিয়া সাহা যে বলেছেন তিন কোটির ওপর সংখ্যালঘু গুম হয়ে গেছে, এ কথা সঠিক নয়। তাদের মোটা অংশই দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় চলে গেছে।

আওয়ামী লীগ দেশে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতা অনেকটাই দূর করেছে, সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বন্ধ করেছে। কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকে সমাজদেহে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ বহমান, তা এখনো দূর করতে পারেনি। হাসিনা সরকার তা দূর করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে আরো অনেক সময় লাগবে। ভারতে প্রায় ১০০ বছর গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও হত্যা কি বন্ধ করা গেছে?

প্রিয়া সাহা বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌলবাদীদের নির্যাতনের শিকার। অতীতে এটি হয়তো সত্য ছিল। বর্তমানে সম্পূর্ণ অসত্য প্রচার। ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সময়েও দেখা গেছে উগ্র মৌলবাদীদের নির্যাতনের শিকার মুসলমানরাই বেশি। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রেও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে মুসলমান নারী, বিশেষ করে মাদরাসার ছাত্রীর সংখ্যাই বেশি।

আসলে বাংলাদেশে বর্তমানে যা চলছে, তা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার সঙ্গে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বিরাটসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠেরও দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। ধর্মান্ধতা ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির এই লড়াই বাংলাদেশে এখনো চলছে। এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু-নির্বিশেষে সেক্যুলারিজমে বিশ্বাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের এক জাতীয়তা ও সম-অধিকারে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধেই চলছে মৌলবাদী শিবিরের অপপ্রচার ও সন্ত্রাস। প্রিয়া সাহার ওয়াশিংটন-বক্তব্য এই শিবিরের অপপ্রচারেই সহায়তা জোগাবে।

সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও নির্যাতন নির্মূল করতে আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্যই এখনো সম্পূর্ণ সফল হয়নি। অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল করার পরও তার বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা আওয়ামী লীগের সুনাম বহন করছে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারকে হেয় করে নয়, তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র রক্ষায় সহায়তা দিয়ে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষা করতে পারে, ট্রাম্পের আশ্রয় ভিক্ষা করে নয়।

আর/০৮:১৪/২৩ জুলাই

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে