Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (20 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১২-২০১৯

প্রাইভেটকারের লাগাম টানবে কে

রাজীব আহাম্মদ


প্রাইভেটকারের লাগাম টানবে কে

ঢাকা, ১৩ জুলাই- ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর রোড। শনিবার দুপুর। আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা স্কুলগুলো সবে ছুটি হয়েছে। চার লেনের সড়কে স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিতে আসা ছয় সারি প্রাইভেটকার! ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটি লেগুনা, রিকশা, মোটরসাইকেল। এক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে একটিও বাস নেই। শুধু ধানমণ্ডি নয়, যানজটের ঢাকায় এ দৃশ্য নিত্যদিনের।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেটকার। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা দুই লাখ ৮৩ হাজার ৬১টি। গত আট বছরে ঢাকায় এক লাখ ২০ হাজার প্রাইভেটকার বেড়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০টি প্রাইভেটকার নামছে ঢাকার রাস্তায়।

এদিকে, যানজট নিরসনে ঢাকার তিন প্রধান সড়কে বন্ধ হচ্ছে রিকশা। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হবে কবে। গত বছরের অক্টোবরে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনে গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছে। তবে বিধিমালা না হওয়ায় আইনটি এখনও কার্যকর হয়নি। আইনের ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, 'সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা, কোনো ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা কোনো এলাকার জন্য মোটর যান রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বা সীমা নির্ধারণ করিতে পারিবে।'

প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার বলেছেন, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যায় নিয়ন্ত্রণ আনা হবে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক ঘোষণা দিয়েছিলেন, রাজধানীর দুটি সড়ক প্রাইভেটকারমুক্ত হবে। তিন বছরেও তা হয়নি। মাসের প্রথম শুক্রবার মানিক মিয়া এভিনিউ প্রাইভেটকারমুক্ত রাখার উদ্যোগ গতি হারিয়েছে মাস না ঘুরতেই।

ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মারুফ রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, রিকশা বন্ধে খুব বেশি সুফল আসবে না। অতীতে অনেক রাস্তায় রিকশা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু যানজট কমেনি। যানজট কমাতে হলে প্রাইভেট গাড়ি কমাতে হবে। বাসভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

গত ১৯ জুন ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে ঢাকা যানবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সভায় রাজধানীতে চলাচলকারী অবৈধ রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যান বন্ধে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকনকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি গত সপ্তাহে ঢাকার তিন সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত দেয়।

২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ বছরে ঢাকায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটার হয়েছে। যানজটে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। গত বছর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। দিনের ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যানজটে। বছরে যানজটে ক্ষতি হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যানজট বর্তমান গতিতে বাড়লে ২০২৭ সালে ঢাকায় গাড়ির গতি এক কিলোমিটারে নেমে আসবে।

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেটকার ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন। প্রধান সড়কে রিকশা থাকা উচিত নয়। তবে শুধু রিকশা বন্ধ করে যানজট কমবে না। প্রাইভেট গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গণপরিবহনকে শক্তিশালী করতে হবে। গণপরিবহন যাত্রীবান্ধব ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে প্রাইভেট গাড়ি কমবে না।

প্রাইভেটকার বৃদ্ধির জন্য 'ভ্রান্ত নীতি' ও গণপরিবহনের দুরবস্থাকে দায়ী করেছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক। তিনি বলেন, বাসের গতি বাড়াতে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে সুবিধা হয়েছে প্রাইভেটকারের। সাধারণ মানুষ এতে প্রাইভেটকারে ঝুঁকেছেন। ঢাকায় ভালো মানের বাস সেবা নেই। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধায় মধ্যবিত্তও প্রাইভেটকারে ঝুঁকেছে। গাড়ি বেড়েছে, সড়ক বাড়েনি। তাই যানজটে শহর স্থবির হয়ে গেছে। ঢাকাকে বাঁচাতে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। কিন্তু তার আগে বিকল্প যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ফেলোদের গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ঢাকার সড়কের ৭৬ ভাগ প্রাইভেট গাড়ির দখলে। কিন্তু প্রাইভেট গাড়ির যাত্রী মাত্র ৬ শতাংশ। বাকি ২৪ ভাগ সড়ক ব্যবহারের সুযোগ ৯৪ ভাগ যাত্রীর।

এআরআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে বছর বছর প্রাইভেট গাড়িতে ট্রিপ বাড়ছে। ২০১৩ সালে মোট ট্রিপে ৬ দশমিক ৪৩ ভাগ হতো প্রাইভেটকারে। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ২২। ২০২৫ সাল নাগাদ তা দাঁড়াবে ১১ দশমিক ১২ শতাংশে।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত ঢাকায় নতুন প্রাইভেটকার নেমেছে ছয় হাজার ৪৭৬টি। ২০১৮ সালে প্রাইভেটকার নিবন্ধিত হয়েছে ১৬ হাজার ৩১৯টি। তার আগের বছর নিবন্ধিত হয় ১৯ হাজার ৫৭৩টি। অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন সুবিধা চালুর পর প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়ছে। অন্য জেলায় নিবন্ধিত গাড়িও ঢাকায় চলছে। সম্প্রতি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সুপারিশ করেছে, ঢাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে অন্য জেলার নিবন্ধিত প্রাইভেট গাড়ি ঢাকায় চলা বন্ধ করতে হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, গ্যাসে গাড়ি চালানোর সুযোগ-সুবিধা আসার পর এক দশকে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। প্রাইভেট গাড়িতে ভর্তুকি মূল্যের গ্যাস বন্ধ করতে হবে। প্রাইভেটকারের ওপর কর ও নিবন্ধন ফি বাড়াতে হবে।

গত মাসে 'দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি' করেছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কমিটির আহ্বায়ক সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনু বিভাগ) আবদুল মালেক। সদস্য সচিব বিআরটিএর পরিচালক মাহবুব-ই রাব্বানী।

কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মালেক বলেছেন, তাদের কমিটি যানজট নয়, দুর্ঘটনার বিষয়ে কাজ করবে। প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণে নয়, মহাসড়কে যেসব অবৈধ ছোট যানবাহন বেপরোয়াভাবে চলছে, তা কীভাবে থামানো যায় সে জন্য সুপারিশ করবে কমিটি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) যানজটের কারণ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দেয় ২০১২ সালে। তাতে বলা হয়েছিল, ছুটির সময়ে শুধু ধানমণ্ডিতেই ২৬ হাজার প্রাইভেট আসে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে। পুরো এলাকায় যানজট সৃষ্টি করে এসব গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি ঠেকাতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে স্কুলে বাস দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ২০১০ সালে রাজধানীর ১৪টি রুটে দেওয়া হয়েছিল বিআরটিসির স্কুলবাস। যাত্রীর অভাব ও লোকসানের কারণে স্কুলবাস বন্ধ হয়ে যায় বছর না ঘুরতেই।

সূত্র: সমকাল

আর/০৮:১৪/১৩ জুলাই

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে