Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯ , ৭ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০৮-২০১৯

ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার যুবকের হৃদয়বিদারক গল্প

আনু হোসেন


ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার যুবকের হৃদয়বিদারক গল্প

ঢাকা, ০৮ জুলাই- তিউনেশিয়া ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৬৪ বাংলাদেশীর মধ্যে দেশে ফিরেছেন এ পর্যন্ত ৫৬ জন। দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন আরো ৮ জন। তিউনেশিয়া থেকে দেশে ফেরা ৫৬ জনের মধ্যে একজন হচ্ছেন গাজীপরের টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার হারুনুর রশীদের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ২৬ শে জুন বিকাল ৫টা ১৫ মিনিটে কাতার এয়ারওয়েজের কিআর -৬৩৪ ফ্লাইটে করে তৃতীয় ধাপে দেশে ফেরেন। ইতালিতে যাওয়ার আশায় দালাল ধরে ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশ ছেড়েছিলেন তিনি।

রবিবারে (৭ জুলাই) তিনি নিজে জানিয়েছেন দুঃস্বময় দিনগুলোর কথা। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সেগুলো তুলে ধরা হলো।

যেভাবে জেগেছিলো ইতালি যাওয়ার বাসনা: পারিবারকে সচ্ছল করার স্বপ্ন ও উন্নত জীবনের আশায় ১১ লাখ টাকা ঋণ করে ইতালি যাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন ৪২ বছর বয়সী রাজ্জাক। দুই মেয়ে ও এক ছেলের এই পিতা ভেবেছিলেন, একবার ইতালি যেতে পারলে জীবন বদলে যাবে। উত্তর-প্রজন্ম নির্বিঘ্নে একটা জীবন কাটাতে পারবে। এজন্য বিভিন্ন এনজিও, সমিতি এবং স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে জোগাড় করা হয় ওই ১১ লাখ টাকা। তারপর সেটি তুলে দেন দালাল রেবার হাতে। মাদারীপুরের এক স্বজনের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এই রেবার। রেবাই তাকে ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায়। রেবার সঙ্গে আলাপ করেই বিদেশযাত্রার বাসনা পাকাপোক্ত হয় রাজ্জাকের মনে। বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় রেবার পরামর্শে চূড়ান্তভাবে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ভ্রমণ ভিসায় দুবাই, তারপর মিসরে চার মাস বন্দি: ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশের আরও ৬৪ জনের সঙ্গে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আরব আমিরাতের দুবাই প্রদেশের আজমান শহরে গিয়ে পৌঁছান রাজ্জাক। সেখান থেকে মিসরে নেওয়া হয় তাদের। দীর্ঘ চার মাস একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয়। সেই ঘরে কোন আলো বাতাস ছিলো না । একটু শব্দ হলেই চলতো অমানবিক নির্যাতন। সেই ঘরেই বাংলাদেশি ৬৪ জন ছাড়াও মিসরের ১০ এবং মরক্কোর একজনসহ মোট ৭৫ জন ছিলেন। বাড়িতে ফোন করার কথা বললে বা কোন কিছু চাইলেই সেখানে লিবিয়া প্রবাসী গোপালগঞ্জ জেলার মোকসেদপুর উপজেলার দালাল বুলেট ও মমিন তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। চার মাস বন্দি অবস্থায় মাত্র তিনদিন গোসল করেছেন তিনি। গোসলের জন্য দেওয়া হতো মাত্র সাত লিটার পানি। দিনে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হতো, খাবার হিসেবে দেওয়া হতো সেন্ডইস জাতীয় এক প্রকার শুকনো খাবার।

৪০-৫০ জনের ধারণক্ষমতার একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তোলা হয় ৭৫ জনকে: সাগর পাড়ে জাহাজে চড়ার কথা বলে চার মাস পর সেখান থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়। নির্জন বুনো, মেঠো ও কর্দমাক্ত, জলপথে হাঁটতে বলা হয়। অস্বীকৃতি জানালেই গুলি করে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়। বুলেটের ভয়ে ৬-৭ কিলোমিটার পথ দৌড়ে পাড়ি দিতে হয় তাদের। এরপর দেখা যায় সাগর পাড়। যেখানে জাহাজে চড়ার কথা, সেখানে গিয়ে দেখা যায় ৪০-৫০ জনের ধারণক্ষমতার একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নৌকার কাছে যেতেই সাগরের ঢেউয়ের গর্জন শুনে ভয় পেয়ে নৌকায় উঠতে অস্বীকৃতি জানালে পিস্তলের ভয় দেখিয়ে সেই নৌকায় তোলা হয় ৭৫ জনকে।

কখনও ভাবিনি বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের কাছে ফিরতে পাবো: সেদিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সাগরে প্রচণ্ড ঢেউ ছিল। যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরেই তেল শেষ হয়ে যায় নৌকার। কোনও ধরনের খাবার ছিল না সঙ্গে। পানির পিপাসায় নিরুপায় হয়ে একজন আরেকজন প্রসাব পান করেছি। খাবার না পেয়ে সবাই মৃত্যুর মুখোমুখি ছিলাম। ১৫-২০ ফুট উঁচু ঢেউ আসে একটু পরপর। মনে হয় এই বুঝি মারা গেছি। অনেকে রক্তবমি করেছে। প্রতিটা মুহূর্তে ছিল মৃত্যুর হাতছানি। কখনও ভাবিনি বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের কাছে ফিরতে পারবো। ৬৪ ঘণ্টা এভাবেই ভেসে থাকি। এরপর একটি তেলের জাহাজ সাগর দিয়ে যেতে দেখি। আমরা সবাই ওই জাহাজকে হাত ইশারা করে ডাকার চেষ্টা করেছি এবং হেল্প, হেল্প, বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করেছি। পরে তিউনিসিয়ার ওই তেলবাহী জাহাজের কাছে ভিড়লে তারাও আমাদের তাদের জাহাজে তুলতে অস্বীকৃতি জানান, পরে সাগরে ঝাপ দিতে চাইলে তারা আমাদেরকে জাহাজে ওঠান। ওই জাহাজেও ১৯ দিন কাটে দিনে একবেলা খাবার খেয়ে।

এখনও হতাশা আর উৎকন্ঠায় আব্দুর রাজ্জাক: প্রাণ নিয়ে ফেরায় যেমন পরিবারের মাঝে স্বস্তি বিরাজ করছে তেমনি হতাশা আর উৎকন্ঠাও কাজ করছে আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারে। ঋণ নেওয়া ১১ লাখ টাকা শোধ করার কথা মনে হলে আবারও শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। এখন কী করে এই টাকা শোধ করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না রাজ্জাক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র পুত্রসন্তান আব্দুর রাজ্জাক সবার বড়। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। এলাকাতেই ছোট্ট একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ভালোই চলছিল তার ব্যবসা। এরমধ্যেই ইতালি যাওয়ার ভূত এলোমেলো করে দিয়ে গেছে সবকিছু।

এ ব্যাপারে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘দালাল রেবার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।’ এই ঋণের বোঝার কথা চিন্তা করে পরিবারের অন্যরাও ভেঙে পড়েছেন। প্রতিদিন ঋণদাতারা ঋণ পরিশোধ করার জন্য বাড়িতে এসে চাপ প্রয়োগ করছে। এখন কি করব ভেবে পাচ্ছি না।

সূত্র: বিডি২৪লাইভ
এমএ/ ০২:২২/ ০৮ জুলাই

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে