Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩০ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-০২-২০১৯

“ইন স্যানড্রি ল্যাঙ্কুয়েজেস - একটি অভিজ্ঞতা”

মম কাজী


“ইন স্যানড্রি ল্যাঙ্কুয়েজেস - একটি অভিজ্ঞতা”

টরন্টোতে এখন স্বপ্নের সময় চলছে। বহু প্রতিক্ষিত গ্রীষ্মকাল তার সকল রুপ রস গন্ধ যেন উদারহাতে ঢেলে দিয়ে নববধুরূপে সাজিয়েছে টরন্টোকে।আর স্কুলগামী ছোট্ট বন্ধুরা টানা দুই মাসের গরমের ছুটিতে যখন খুশিতে পাগলপ্রায়, তাদের বাবা মায়েরা স্কুল ছুটির এই দিনগুলোতে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। তাই নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনে মুখরিত শহরের আকাশ বাতাস। 

বলা হয়, আপনি যদি পৃথিবীর বেশিরভাগ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতা একটি শহর থেকে নিতে চান তবে টরন্টোর কোনও তুলনা নেই। মিশ্রসংস্কৃতির এক অভুতপূর্ব উদাহরন আমাদের এই শহর। সকল জাতির এত প্রাণচন্চল সংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং অবাধ স্বাধীনতা আ র কোথাও দেখা যায় না। 

এই প্রবনতাকে কেন্দ্র করে টরন্টো ল্যাবরটরী থিয়েটরের প্রযোজনায় ও আর্টিস্টিক ডিরেক্টর আর্ট বি’র  পরিচালনায় নাটক “ইন সানড্রি ল্যাংগুয়েজেস” দেখার এক বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল সুহৃদ এবং বড়ভাই “দেশেবিদেশে” মিডিয়ার কর্ণধার নজরুল মিন্টো ভাইয়ার আমন্ত্রণে।  নাটকটির সহযোগিতায় ছিল টরন্টো আর্টস কাউন্সিল, অন্টারিও আর্টস কাউন্সিল ও কানাডা কাউন্সিল ফর আর্টস। যদিও নাটকটি গত ২০১৪ সাল হতে কানাডার মঞ্চে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় নিরীক্ষামূলক নাটকটিতে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের অভিনয় শিল্পী রিয়াজ মাহমুদ যুক্ত হয়েছিলেন।আমি দেখতে যাই এই পর্বের সর্বশেষ পরিবেশনা শুক্রবার ২৮ জুন,২০১৯।

আমি নাটক বড় ভালোবাসি। আর দাওয়াত পেয়ে TTC এর মাধ্যমে পরিচিত থিয়েটারে কাঁটায় কাঁটায় সাতটার সময় কিছুটা দিশেহারা অবস্থায় পৌঁছে ভালোই একটা সিট পেয়ে গেলাম। বলতেই হয় নাটক দেখার ক্ষেত্রে সিটের পজিশন এবং থিয়েটারের মান অত্যন্ত বিরাট ভূমিকা পালন করে। প্রায় ১০০ আসনভুক্ত কমিউনিটি থিয়েটারটি এক অঙ্কের নাটিকার জন্য যথাযোগ্য ছিল।

নাটকের নামটি কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারনা দিয়ে দেয়। ২০০ টিরও বেশি ভাষা প্রতিদিন চাঙ্গা করে রাখে তারুন্যদীপ্ত এই শহরকে। মিশ্র সংস্কৃতির সাথে সাথে মিশ্র ভাষা যদিও আমাদের এই দেশকে রঙিন করে তোলে তার সাথে সাথে ভাষা বিড়ম্বনাও কিন্তু খুব কম নয়। একজন নতুন মানুষের জন্য এই যে ভাষার সাথে বোঝাপড়া, নতুন করে ইংরেজী শেখা, তার উপরে নতুন জীবন আরম্ভ করার যে যুদ্ধ, তার অপূর্ব বহি:প্রকাশ ঘটেছে এই নাটকে। মনের ভাব প্রকাশ করার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম মুখের বলা কথা। কিন্তু এর সাথে সাথে আমরা আমাদের শারিরীক ভাষার মাধ্যমেও মনের ভাব অনেকখানিই প্রকাশ করে থাকি। আমি চমৎকৃত হয়ে গিয়েছিলাম যখন কফি কিনতে যাওয়ার মত সামান্য দৈনন্দিন ঘটনার যে সংগ্রাম তা নানা জাতির শারিরীক ভাষা বিশেষ করে হাত নাড়ানোর মাধ্যমে যে বহি:প্রকাশ তা ছোট টেলিভিশন স্ক্রিনেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। আমরা যেমন বলি,” একদেশের বুলি, আরেকদেশের গালি।” এ কথাটিরও আক্ষরিক উদাহরন দেখানো হয়েছিল এই দৃশ্যে। অসাধারন হাতের অভিনয়, অসাধারন চিন্তা কাজ করেছে এই দৃশ্যের পেছনে তা তো বোঝাই যায়। পায়ের ভাষাচর্চা আমরা দেখেছি যখন আমাদের নিকটজন রিয়াজ মাহমুদ তাঁর “সোনালী ডানার চিল” কবিতাটি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে আবৃত্তি করছিলেন, তখন লাভিনিয়া তার পায়ের মাধ্যমে আকাশে উড়তে থাকা সেই চিলটিই যেন আমাদের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। আর আমার বিশ্বাস যারা বাংলা বোঝেন নি তারাও কেবল এই আলোছায়ার খেলায় পায়ের অভিনয়ের জন্যই কবিতাটি বুঝতে পেরেছিলেন। এই যে মনের মাঝের অনুভূতি প্রকাশের নানা মাধ্যম তা বোঝানোটাই এই নাটকের মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার ধারনা।

নাটকে আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার উঠে এসেছিল। আমরা যারা শ্বেত-ত্বকের অধিকারী না, তারা যে প্রশ্নটির সম্মুখীন সর্বদা হয়ে থাকি- 
“Where are you from?”
“তুমি কোথা থেকে এসেছো?”

আমরা হয়তো অনেকেই জানি না টরন্টোর মত মিশ্রসংস্কৃতির এই শহরে এই প্রশ্নটি শোভন নয়। এটি বর্নবাদেরই একটি উদাহরন মাত্র - যেহেতু একমাত্র আদিবাসীরা ছাড়া বাকি সকলেই কোনও না কোনও সময়ে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই দেশে। নাটকটি আমাদের ভাবতে শেখায় দেশান্তর, ফিরে দেখা সেই ছোটবেলার কথা ।শেকড়ের টানের ব্যাথা, বর্ণবাদের তিক্ততা এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম।আমরা সকলেই যেন নিজের প্রতিচ্ছবি অভিনেতাদের মাঝে দেখতে পাই। 

সামান্য বাসা ভাড়া করতে গিয়ে আমাদের রিয়াজ মাহমুদের যে ভোগান্তি এবং মারিয়া করদোনির যন্ত্রমানবীর অভিব্যক্তি দর্শকের মাঝেও তাদের উদ্বেগ সন্চালিত করে। একজন ফরাসি রমনি এবং একজন ইরাকি তরুন ট্যাক্সি চালকের ভুল বোঝাবোঝি যদিও দর্শকদের হাসায় তবে এ যে কত বড় সমস্যা তাও বোঝা যায়। 

ইন সানড্রি ল্যাংগুয়েজেস নাটকটির আরও কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মাঝে ছিল আলো আঁধারের চমৎকার ব্যবহার। একমাত্র অত্যন্ত গুনি পরিচালকই আলোর এত অদ্ভুত ব্যবহার করতে পারেন। যদিও পরবর্তীতে বলা হয়, যে মন্চে যথাযোগ্য পর্দা নেই, কিন্তু না বললে দর্শক হয়ত টেরই পেত না অন্ধকারকে কি সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিটি দৃশ্য পরিবর্তনের জন্য। 

বিভিন্ন জাতিস্বত্তাকে মাথায় রেখে প্রতিটি অভিনেতার পোশাক নির্বাচনের মাধ্যমেও নাটকের আয়োজকদের যোগ্যতা প্রকাশিত হয়। ছোট খাট বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করার জন্য ছোট চাকা লাগানো টেলিভিশন পর্দাটির ব্যবহারও পরিচালকের মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়। এর মাঝে আমরা অভিনেতাদের বিশেষ চেহারার পরিবর্তন, হাত-পায়ের অভিনয়, ছায়ার খেলা ইত্যাদি উপভোগ করতে পারি।ছোট মন্চের পুরোটা ব্যবহার করে, সাজসরঞ্জামের স্বল্পতাকে জয় করে দর্শকের আকর্ষন ধরে রাখাটাও চাট্টিখানি কথা নয়।

অভিনয়ের দিক থেকে আমি তো অবশ্যই আমাদের নিজস্ব রিয়াজ মাহমুদকে অভিনন্দন জানাতে চাই।অসম্ভব সুন্দর করে তিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর চরিত্রের ছেলেবেলায়। বাবা মায়ের সাথে অভিজ্ঞতা, নতুন দেশে এসে নানা রকম তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো হৃদয়বিদারক অভিনয়ের মাধ্যমে আমরা টের পাই। কিন্তু বাকিদের মাঝে আহমেদ মনেকার সাবলিল অভিনয়ের কথা না বললেই নয়। চমত্কারভাবে তিনি যেমন নিজেকে উপস্হাপন করেছেন, তেমনি নাটকের অন্তর্নিহিত তথ্য দর্শকদের শৈল্পিকভাবে দিতে পেরেছেন।  নাটকের মধ্যে তিনি দর্শকসারীর মাঝ থেকে আমাদের কমিউনিটির অতি পরিচিত মুখ মিজান ভাইকে নিয়ে যেয়ে সকল দর্শকদের একাত্ব করতে সার্থক হয়েছেন। অভিনেতাদের মাঝে আরফিনা লেমির কথাও বলতে হয়। অত্যন্ত প্রানবন্ত উপস্থাপনা। আর্ট বাবাইয়ান্টাসের পরিচালনা, অভিনয় এবং মিউজিক ছিল দেখার মত। 

টরন্টোবাসী হিসেবে আমার মজা লেগেছিল অতি পরিচিত কিছু টরন্টোভিত্তিক রেফারেন্স শুনে, যেমন, কেনজিংটন মার্কেট, টিটিসি, রাপটর্স, ডাবল ডাবল কফি ইত্যাদি। নাটকের শুরুতে যখন অন্ধকারের মাঝে নানা ভাষার দুর্বোধ্য সংমিশ্রন বলা হচ্ছিল তখন আমার সকালে কাজে যাওয়ার সময় টিটিসির প্রতিদিনের যাত্রার অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। শব্দগুলো জট পাকিয়ে তেমনই মনে হচ্ছিল।

নাটক শেষ হওয়ার পরে মনে হল এ যেন আমাদের সকলেরই মনের কথা। দর্শকের তুমুল করতালির থেকে বোঝা যায় এটি সমাদৃত। তবে দর্শকদের জন্য আরও একটি বিষ্ময় অপেক্ষা করছিল আর তা হল আমাদের কমিউনিটির আবৃত্তি তারকা ম্যারি রাশেদিনের গান ও কবিতার পরিবেশনা এবং নৃত্য জগতের রানী অরুনা হয়দারের পরিবেশনা। বাঙালী হিসেবে গর্বিত হবার জন্য হয়তো আর কিছুরই প্রোয়োজন ছিল না। এই পরিবেশনাটি শেষ হয় বিখ্যাত আইনজীবি চয়নিকা দত্তের অত্যন্ত তথ্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে। একুশের ইতিহাস, একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সম্মান প্রদান করার ইতিহাস এবং টরন্টোতে একুশের ভাস্কর্য তৈরী করার অসাধারন প্রয়াস সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। 

সর্বশেষে থিয়েটার থেকে বের হবার পরে বিকেলটাকে হঠাৎ করে অন্যরকম মনে হল। মনে হল, বিধাতার অসীম দয়ার নিদর্শনস্বরূপ আমি আজ অবাধ স্বাধীনতার এই শহরে এসে পৌঁছেছি। এই মানুষগুলোর মাঝে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পেরেছি। আমি কৃতজ্ঞ এই সকলের প্রতি, এই মানুষগুলোর প্রতি এবং সুন্দর এই বিকেলের প্রতি।

কানাডা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে