Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৬ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-২৯-২০১৯

ব্রিটিশ রাজনীতিতে চায়ের পেয়ালায় তুফান

আবদুল গাফফার চৌধুরী


ব্রিটিশ রাজনীতিতে চায়ের পেয়ালায় তুফান

গত শুক্রবার (২১ জুন) লন্ডনে একটি মজাদার ঘটনা ঘটেছে। শনিবারের গার্ডিয়ান ঘটনাটিকে প্রথম পৃষ্ঠায় লিড নিউজ করেছে। সাউথ লন্ডনের একটি ফ্ল্যাট থেকে নানারকম চিৎকার, ধস্তাধস্তি ও হাঙ্গামার শব্দ শুনতে পান ওই ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীরা। একটা ভিক্টোরিয়ান হাউসকে কনভার্ট করে ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে। এই ফ্ল্যাটের একটিতেই বাস করেন ব্রিটেনের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার পার্টনার ক্যারি সাইমন্ডসকে নিয়ে। বরিস জনসন ও ক্যারি সাইমন্ডসের মধ্যেই গণ্ডগোল চলছিল। পাড়া কাঁপানো গণ্ডগোল। প্রতিবেশী বলছেন, রাতে ভেতর থেকে প্লেট ভাঙার আওয়াজ শোনা গেছে। নারী কণ্ঠের আর্তনাদ শোনা গেছে। সাইমন্ডসকে বলতে শোনা গেছে, জনসন মদ ঢেলে আমার সোফা নষ্ট করেছে। সে একদম নষ্ট হয়েছে। তাকে আরও বলতে শোনা গেছে, 'গেট আউট ফ্রম মাই ফ্ল্যাট।' জনসনের জবাব- নো।

প্রতিবেশী সাইমন্ডসের নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, জনসনের ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে স্ট্ক্রিমিং ও লাউড ব্যাং (loud bang) শোনা যাচ্ছে। প্রতিবেশী কয়েক দফা ওই ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দেন। কিন্তু কেউ দরজা খোলেনি। অতঃপর শঙ্কিত প্রতিবেশী ৯৯৯ কল করেন। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ কার ও ভ্যান ছুটে আসে। ততক্ষণে জনসন ও সাইমন্ডস নিজেদের মধ্যে আপস করে ফেলেছেন। পুলিশকে তারা জানান, তাদের মধ্যে কিছু তর্কাতর্কি হচ্ছিল, কোনো গণ্ডগোল নেই। ফলে পুলিশ বিদায় নেয়। বরিস জনসন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, সম্ভবত এটা জেনেই পুলিশ ঘটনাটা ধামাচাপা দিতে চাচ্ছিল। গার্ডিয়ান পুলিশের কাছে জানতে চাইলে তারা প্রথম বলেছে, এমন কোনো ঘটনার কথা তাদের জানা নেই। গার্ডিয়ান ঘটনার কেস নম্বর, পুলিশের গাড়ির নম্বর ইত্যাদি দেওয়ার পর তারা এক বিবৃতিতে ঘটনার কথা স্বীকার করে এবং জানায়, তারা ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা না ঘটায় পুলিশ অ্যাকশন নেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখেনি।

বরিস জনসনের ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক জীবনও বিতর্কিত। গত বছর স্ত্রী জেরিমা কুটলারের সঙ্গে তার ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান হয়। তাও তিক্ততা ও পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে। এরপর ক্যারি সাইমন্ডসের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানাজানি হয় এবং তারা লিভিং টুগেদার শুরু করেন। লন্ডনের মেয়র পদে কয়েক দফা নির্বাচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় কেন লিডিংস্টোনকে হারিয়ে লন্ডনের মেয়র হওয়ার পর বরিস রাজনীতির সামনের সারিতে উঠে আসেন। এরপর টোরি দলীয় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারেও তাকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটে 'হ্যাঁ'পন্থিরা জয়ী এবং 'না'পন্থিরা পরাজিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী পদে ক্যামেরন ইস্তফা দেন। টোরি পার্টি এবং লেবার-দুই দলই ব্রেক্সিট প্রশ্নে বিভক্ত। এ সময় বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছিল। তবে কপাল খারাপ। তিনি হতে পারেননি। তেরেসা মে নেতা নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। বরিস তার মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদেও তিনি কোনো চমক দেখাতে পারেননি। পরে এই পদও তাকে ছাড়তে হয়।

ব্রেক্সিট নিয়ে ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে টোরি পার্টির মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। তেরেসা মে তার মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও আস্থা হারান। টোরি পার্টিতে নেতৃত্ব সংকট দেখা দেয়। এই সুযোগে বরিস জনসন নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শীর্ষে উঠে আসেন। টোরি পার্টির নেতা নির্বাচনে গত বৃহস্পতিবারও টোরি এমপিদের ভোট গণনায় দেখা যায় বরিস শীর্ষে।

এমনকি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি হান্টও পেছনে পড়ে গেছেন। মিডিয়া বরিস জনসনকে ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করে। তারপরই এই বিনামেঘে বজ্রপাত। মাত্র দু'দিনের হেরফেরে বরিসের ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনার পর বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, টোরি এমপিদের মধ্যে তার সমর্থন ২৭ পয়েন্ট থেকে ১১ পয়েন্টে নেমে গেছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন বেশি কমেছে। সুযোগ বুঝে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হান্টের সমর্থকরা অভিযোগ তুলেছেন, ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্য বরিস একজন ঝুঁকিপূর্ণ লোক। তার প্রাইভেট লাইফ জটিল।

তাছাড়া ব্রেক্সিট প্রশ্নে তার পলিসিও টোরি দলের অনেকের পছন্দ নয়। এক টোরি নেতা বলেছেন, নো ডিল ভূমিকা নিয়ে বরিস বেশি বাড়াবাড়ি করলে প্রধানমন্ত্রী পদে যেদিন তিনি শপথ নেবেন, তার পরদিনই টোরি এমপিদের অনাস্থা ভোটে পদ হারাবেন। শুক্রবারের ঘটনা সম্পর্কে বরিস নীরব। সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার তিনি এ যাবৎ এড়িয়ে চলছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ডের সঙ্গে বরিস জনসনের চেহারা ও চরিত্রগত একটা মিল আছে। অন্যদিকে ট্রাম্পও চান বরিসকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে। তেরেসা মের মন্ত্রিসভার প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বরিস তেমন সাফল্য দেখাতে না পারলেও লন্ডনের সাবেক মেয়র হিসেবে তার কিছু কিছু সাফল্য টোরি পার্টির মেজরিটি এমপিদের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্ম দিয়েছে, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি হান্টের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভালো করবেন।

২১ জুনের (শুক্রবার) গৃহবিবাদের কথা জানাজানি হওয়ার পরও একাধিক জনমত জরিপে দেখা যায়, বরিসের ভাবমূর্তি তেমন টান ধরেনি। ইতিপূর্বে পারিবারিক অথবা নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে পশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতার পতন হয়েছে বা ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেছে। বরিস জনসনের বেলাতেও এটা ঘটার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তিনি তা এড়াতে পারছেন এর একটা বড় কারণ, তার যে প্রতিবেশী মধ্যরাতে পাশের ফ্ল্যাটে (বরিস জনসনের) গণ্ডগোল শুনে পুলিশে খবর দিয়েছেন, তিনি শুধু এ কাজটি করেই ক্ষান্ত থাকেননি, জনসন ও তার পার্টনার ক্যারি সাইমন্ডসের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় রেকর্ড করেছেন এবং তা শুধু পুলিশকে নয়, বরিসবিরোধী একটি সংবাদপত্রকেও দিয়েছেন। জনমত জরিপে দেখা যায়- অনেকেই বলেছেন, স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে ঝগড়া অহরহই ঘটে থাকে। বরিস জনসন পাবলিক ফিগার বলেই এটা গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবেশী এই ঝগড়ার কথা পুলিশকে জানিয়েছেন ভালো কথা; কিন্তু তিনি তা রেকর্ড করে বরিসের বিরোধী সংবাদপত্রে দিতে গেলেন কেন? তাতে মনে হয়, তিনি বরিসবিরোধী ক্যাম্পের লোক এবং তাদের হয়েই মূলত কাজটা করেছেন।

বরিস জনসন দৃশ্যত এই ঘটনাটিকে গুরুত্ব দেননি। নিজে এ পর্যন্ত মুখ খোলেননি। কিন্তু অন্যভাবে দেখাতে চেয়েছেন, ঘটনাটি কিছুই নয়। চায়ের পেয়ালায় তুফান। ২৬ জুনের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরপরই বান্ধবীর সঙ্গে তার একটি মধুর সম্পর্কের ছবি ব্রিটিশ সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, বরিস ও ক্যারি কিশোর-কিশোরীর মতো মুগ্ধ চোখে দু'জনে দু'জনের দিকে চেয়ে আছেন। ছবিটি কে তুলেছেন, তা জানানো হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ব্রেক্সিট সমস্যা থেকে এই বরিস উপাখ্যানেরও জন্ম। তা টোরি পার্লামেন্টারি দলের নতুন নেতা নির্বাচনে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। বরিস ও জেরেমি হান্ট দু'জনেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হলে ইসি থেকে ব্রেক্সিট প্রশ্নে বেশি ডিল আদায় করবেন। বরিস তো স্পষ্ট কথা বলেছেন, ৩১ অক্টোবর তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়বেনই।

নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় তিনি জেরেমি হান্টের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেন। হয়তো তিনিই ব্রিটেনের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। তাতে রাতারাতি ব্রেক্সিট সমস্যার সমাধান হবে না। ব্রেক্সিট প্রশ্নে ব্রিটিশ জাতি গভীরভাবে দ্বিধাবিভক্ত। ব্রিটিশ রাজনীতিতে এখন এমন ব্যক্তিত্বশালী ও শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন, যিনি শুধু ক্ষমতাসীন টোরি দলকেই ঐক্যবদ্ধ করবেন না, গোটা ব্রিটিশ জাতিকেই ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। বরিস জনসন বা জেরেমি হান্ট তা করতে পারবেন কি-না সন্দেহ। ব্রিটিশ জাতি বহুকাল 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' বা 'বিভক্ত করো ও শাসন করো' নীতি দ্বারা গোটা বিশ্বকে পদানত রেখেছে। এবার নিজেই সে সেই বিভক্তিকরণের রাজনীতির কোপে পড়েছে। ত্রাণ সহজে মিলবে না।

আর/০৮:১৪/২৯ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে