Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-১০-২০১৯

স্বনামধন্য জীবিত ব্যক্তিরাও ভূতের কবলে পড়েন

আবদুল গাফফার চৌধুরী


স্বনামধন্য জীবিত ব্যক্তিরাও ভূতের কবলে পড়েন

ঘোস্ট কথাটার অর্থ ভূত। আজকাল সব দেশেই ঘোস্ট রাইটার আছেন। তাঁরা নামিদামি ব্যক্তিদের হয়ে তাঁদের রচনা, বিবৃতি, এমনকি বইও লেখেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ লিখে দেওয়ার জন্যও ঘোস্ট রাইটার আছেন। আইয়ুবের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বা বেনজির ভুট্টোর আত্মজীবনীমূলক বই ‘ডটারস অব ইস্ট’ লেখার জন্যও ঘোস্ট রাইটার ছিলেন।

এই ঘোস্ট রাইটার ভূত নন, সবাই জীবিত মানুষ। তবু তাঁদের শ্যাডো রাইটার বা ছায়া লেখক না বলে কেন ভূত লেখক বলা হয়, তা আমি জানি না। এই ঘোস্ট রাইটারদের একটা গুণ, তাঁরা মূল লেখক যা বলেন বা ব্রিফ করেন, তা হুবহু লিখে দেন, নিজেরা কিছু যোগ করেন না। তাঁদের নামও প্রকাশ করা হয় না। কোনো কোনো ঘোস্ট রাইটার আবার সুযোগ বুঝে তাঁদের নিজেদের কথা মূল লেখকের কথা বলে চালিয়ে দেন, তার নজির আছে।

আমাদের কাল্পনিক ভূতরা যেমন মাঝেমধ্যে স্থানবিশেষে উপদ্রব সৃষ্টি করে, তেমনি ভূত লেখকরাও মাঝেমধ্যে নিজেদের কোনো স্বার্থ উদ্ধার বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্ররোচিত কিংবা প্রলোভিত হয়ে মূল লেখকের অজান্তে তাঁর বক্তব্য বিকৃত করেন অথবা নিজেদের কোনো কথা যোগ করেন। এটা কোনো সময় ধরা পড়ে, কখনো আবার ধরা পড়ে না। ধরা পড়লে তখন বাজার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স,’ ‘ম্যান আন্ডার আয়রন মাস্ক’ প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থের লেখক আলেকজান্ডার ডুমা শেষ বয়সে লিখতে পারতেন না। ঘোস্ট রাইটারদের দ্বারা তিনি বই লেখাতেন। তিনি নিজেও সেই বই পড়ে দেখতেন না। ডুমার পুত্রও ছিলেন সাহিত্যিক। পিতার চেয়ে বেশি নাম করেছিলেন। এ নিয়ে পিতা-পুত্রে দ্বন্দ্ব এবং দুজনের মধ্যে কথা বলা বন্ধ ছিল। একদিন বাড়ির দোরগোড়ায় পিতা-পুত্রের দেখা। পিতা পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমার লেটেস্ট বইটা পড়েছে তো?’ পুত্র উগ্র কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, ‘তুমি নিজে পড়েছ?’

বার্নার্ড শ শর্টহ্যান্ডে লিখতেন। তাঁর সেক্রেটারি পুরো লেখা টাইপ করে দিলে তিনি পরিমার্জনা করতেন। এরপর প্রকাশকের কাছে যেত। একবার তাঁর সেক্রেটারি এক নাটকে সোশ্যালিজম সম্পর্কে নিজের অভিমত ঢুকিয়ে দেন। তা বার্নার্ড শর নজর এড়ায়। কিন্তু তা পাঠ করে প্রকাশকের সন্দেহ হয়। তিনি শকে জানান। বইটি ছাপার আগেই সংশোধিত হয়। ঘোস্ট রাইটারদের নিয়ে এ রকম বহু গল্প আছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর বিবৃতি-বক্তৃতা নিয়েও তাঁদের কারসাজির গল্প আছে। সে কথায় পরে আসব।

বাংলা সাহিত্যেও ঘোস্ট রাইটার বা ভূতের উপদ্রবের অনেক গল্প আছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলও তাঁদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। তবে হালে বাংলাদেশে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা ভূতের উপদ্রব নয়, তাকে বলা চলে ভূতের ষড়যন্ত্র। ২০১৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনাপতি, স্বাধীন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার (অব.) মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করে একটি বই লেখেন। নাম ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’।

এ কে খন্দকার সবার শ্রদ্ধাভাজন এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। মানুষের কাছে তাঁর কথার দাম আছে। এ রকম একজন ব্যক্তি তাঁর বইতে লিখলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে জয় পাকিস্তান বলেছেন।’ তারপর আরো মন্তব্য করলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এ কথা তিনি মনে করেন না।’ এই মন্তব্য চারদিকে হৈচৈ ফেলে দেয়। এই তত্ত্ব বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের শত্রুদের একটা মিথ্যা প্রচারণা। এই প্রচারণায় কণ্ঠ মেলান কী করে এ কে খন্দকারের মতো ব্যক্তিত্ব? এ জন্য সদস্যদের চাপের মুখে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতির পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি।

দীর্ঘ সাড়ে চার বছর এ কে খন্দকার নীরব ছিলেন। সম্প্রতি তিনি ও তাঁর স্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাঁর বইয়ে অসত্য কাহিনি যোজনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁর বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অসত্য কাহিনি থাকায় তিনি জাতির পিতা এবং জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি এখন বয়োবৃদ্ধ। কানে কম শোনেন। স্মৃতিও দুর্বল। তাঁকে কিভাবে বিভ্রান্ত করে বিতর্কিত কথাগুলো বলানো হয়েছে এবং এই অসত্য কথাগুলো ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিভাবে তা সংশোধন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, সে কথাও বলেছেন। স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি যাতে ভুলগুলো সংশোধন করতে না পারেন, সে জন্য দীর্ঘদিন তাঁকে পাহারা দিয়ে রাখা হয়েছিল।

এ কে খন্দকার যদিও তাঁর ওপর ‘নিযুক্ত’ ঘোস্ট রাইটার ‘আছরের’ কথা বলেননি; কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে বলা তাঁর বক্তব্য শুনে বুঝতে অসুবিধা হয় না, তাঁকে দিয়ে বই লেখানোর ব্যাপারে বাইরে থেকে ঘোস্ট রাইটার নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং বইটির অসত্য অংশ সংশোধন করার ব্যাপারে তাঁরাই এত দিন বাধা সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়তেই তাঁরা সাততাড়াতাড়ি বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাঁরা কারা? এ কে খন্দকার তাঁদের তিনজনের নাম বলেছেন। এই ত্রয়ী  (Trio) আমাদের তথাকথিত সুধীসমাজের মুজিববিদ্বেষী তিন সুধী।

বঙ্গবন্ধুকে তাঁর সারা জীবন অপ্রচার, মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়েছে। একবার তাঁর ঘনিষ্ঠ এক ঘোস্ট রাইটার তাঁর বিবৃতিতে তথ্য বিকৃতি ঘটিয়ে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করেছিলেন। ছয় দফার প্রচার অভিযানে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময় বারবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে যান।

এই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের এক বিখ্যাত সাংবাদিক জেড এ সুলেরি সামরিক জান্তার হয়ে লাহোরের পাকিস্তান টাইমস পত্রিকায় তাঁর ‘মেন অ্যান্ড ম্যাটার্স’ কলামে ছয় দফার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। এতে তিনি লেখন, ‘শেখ মুজিব আর কী চান? রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিফটি ফিফটি প্যারিটি প্রবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তানিদের হাতে ক্ষমতার অর্ধাংশ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার সেকেন্ড ক্যাপিটাল ও সেকেন্ড পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তথাপি মুজিব খুশি নন। তিনি ভারতের চক্রান্তে পা দিয়ে পাকিস্তান ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছেন।’

ইত্তেফাকের মানিক মিয়া তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে সুলেরির বক্তব্যের একটা জবাব দেন। বঙ্গবন্ধু লাহোর যাত্রার আগে তাঁর ঘনিষ্ঠ এক সাংবাদিকের কাছে তাঁর একটি বিবৃতির খসড়া দেন। পশ্চিম পাকিস্তানে ছয় দফার বিরুদ্ধে জোর অপপ্রচার শুরু হলে তিনি তাঁর এই বিবৃতি সংবাদপত্রে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই সাংবাদিক ছিলেন তৎকালের চীনপন্থী বাম। এই ধরনের দুজন চীনপন্থী (ভাসানীপন্থী ন্যাপের সমর্থক) তরুণ সাংবাদিককে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে স্নেহ ও বিশ্বাস করতেন। ছয় দফা আন্দোলনের সময় এই দুজনের প্রথমজনের মারফত মওলানা ভাসানীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখতেন। এই সাংবাদিকের এখন মৃত্যু হয়েছে। তাই তাঁর নাম আর উল্লেখ করলাম না। দ্বিতীয়জন এখনো বেঁচে আছেন। তবে আর আগের রাজনৈতিক ভূমিকায় নেই।

যা-ই হোক, বঙ্গবন্ধু (তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) যখন লাহোরে তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর বিরুদ্ধে জোর প্রপাগান্ডা শুরু হয়। লাহোরের মোচি গেটের জনসভায় বঙ্গবন্ধু যেদিন বক্তৃতা দেন, সেদিনই জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে তাঁর একটি বিবৃতি বের হয়। এতে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসা হলে তিনি ছয় দফা দাবি ছেড়ে দেবেন।’

বঙ্গবন্ধু এই কথা বলেছেন শুনে সারা দেশে হৈচৈ পড়ে গেল, বিশেষ করে তখনকার আওয়ামী লীগপন্থী দৈনিক ইত্তেফাকে বিবৃতিটি প্রকাশিত হওয়ায় তা আরো বিশ্বাসযোগ্যতা পেল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শত্রুরা সরব হয়ে উঠল। তারা বলতে শুরু করল—শেখ মুজিবের ছয় দফা একটা ভাঁওতা। তিনি সামরিক শাসকদের সঙ্গে আপস করার জন্য এখন ছয় দফা থেকে সরে আসতে চান।

বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে এলেন। দেখা গেল, তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতি যদি ঢাকায় হতো, তাহলে ছয় দফার একটি-দুটি দাবি বাদ দেওয়া যেত। এখন কোনো দাবিই বাদ দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব প্যারামিলিশিয়া গঠন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য তার এখতিয়ারে আনয়ন—এই দুটি দাবি তো নয়ই।’

এই বিবৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতে গিয়ে কী করে পাল্টে গেল, তা ছিল এক রহস্য। আমি বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কি তাঁর চীনপন্থী সাংবাদিক অনুসারীকে সন্দেহ করেন? তিনি বললেন, না। হয়তো তিনি ইংরেজিতে ড্রাফট করে দেওয়া বিবৃতির অংশটি পড়তে ভুল করেছেন। অন্তত সেটাই সেই সাংবাদিকের কৈফিয়ত। বঙ্গবন্ধু তা বিশ্বাস করেন। তাঁর বিবৃতিটি সংশোধিত হওয়ার পর বিতর্কের অবসান হয়। এটাও আমার কাছে ছিল এক ভৌতিক রহস্য।

এয়ার মার্শালের কপাল ভালো, তিনি সাড়ে চার বছর পরে হলেও এই ‘ত্রয়ী ভূতের’ কবলমুক্ত হতে পেরেছেন। এর আগে এই ত্রয়ী ভূত ও তাঁদের সঙ্গীরা আরেকজন প্রগতিশীল সাহসী বুদ্ধিজীবীকে বিতর্কিত ও হেয় করেছেন, তিনি ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলী। বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার চেষ্টায় সবার শ্রদ্ধাভাজন এই মানুষটিকেও ‘এই ত্রয়ীভূত’ বিতর্কিত করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধি করতে চেয়েছিলেন। এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার তাঁদের ভৌতিক মুখোশ খুলে দিয়ে দেশ ও জাতির পরম উপকার করেছেন। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

আর/০৮:১৪/১১ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে