Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৬-০৭-২০১৯

নওগাঁয় আম বিপ্লব

আসিফুর রহমান সাগর ও তন্ময় ভৌমিক


নওগাঁয় আম বিপ্লব

নওগাঁ, ৮ জুন- নীরবে এক বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। বছরে একটা ফসল দিয়ে বিরান হয়ে পড়ে থাকা জমিগুলো ভরে উঠছে সবুজ গাছে। ফলছে ফল। সাত বছর আগেও চিত্রটা ছিল ভিন্ন। অথচ মাত্র সাত বছরেই আম উত্পাদনে নওগাঁ জেলার আমচাষিরা উঠে এসেছে সামনের কাতারে। গত সাত বছরে যেখানে নওগাঁয় মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল, সেখানে বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এক ফসলি জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষের চেয়ে আম চাষ লাভজনক হওয়ায় ভবিষ্যতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলেছে। যেখানে ভালো মানের আমের কথা বলতে আমরা বুঝি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও দিনাজপুরের কথা, সেখানে নওগাঁর চাষিরা যে এভাবে আম উত্পাদনে এগিয়ে এসেছে, সে কথা কেউ জানে না।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল। বর্তমানে প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে। রাজশাহীতে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান ছিল সাত বছর আগে। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার ৪৬৩ হেক্টর জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে। আর নাটোর জেলায় বর্তমানে মাত্র ৪ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা আহসান হাবিব খান জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার মধ্যে নওগাঁয় আমের বাগান যেভাবে গড়ে উঠছে তা বিস্ময়কর। মাটির কারণে স্বাদে, গুণে নওগাঁর আম অতুলনীয়। বর্ষা মৌসুম ছাড়া আর কোনো সময় ফসল হয় না— এমন জমিকে এক ফসলি জমি বলা হয়ে থাকে। সরকারের নির্দেশ রয়েছে নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুরের এক ফসলি জমিতে স্বল্প সেচ চাহিদাসম্পন্ন ফসল উত্পাদন করা। এর মধ্যে আম চাষ সবচেয়ে লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আম চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তিনি আশা করছেন, এক ফসলি জমিতে আম চাষ করার ফলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, ও নাটোর জেলার চেয়ে নওগাঁয় বছরে যেভাবে আমবাগান গড়ে উঠছে, তাতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলছে।

মাটির বৈশিষ্ট্যগত কারণে নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আমের ভরা মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পাইকারি বাজার গড়ে না তোলায় আমচাষিরা নায্যমূল্য পান না। জেলায় ভবিষ্যতে আরো বেশি আম উত্পাদন করার লক্ষ্যে আম গবেষণাকেন্দ্র, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নওগাঁর পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, পত্নীতলা, মান্দা, ধামইরহাট, নিয়ামতপুর বিরান বরেন্দ্রভূমি, স্থানীয় ভাষায় ‘ঠাঠা বরেন্দ্রভূমি’ হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলে পানির স্তর মাটির অনেক নিচে হওয়ায় বছরের বেশি সময় ধরে জমি পতিত থাকে। আমন ধান ছাড়া ইরি-বোরো ধান চাষ হয় না। বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে শুধু আমন ধান চাষ হয়ে থাকে। ধানের চেয়ে আম চাষে বেশি লাভ পাওয়ায় নওগাঁর ১১টি উপজেলার মধ্যে এসব অঞ্চলে দিন দিন শত শত বিঘা জমিতে উন্নত (হাইব্রিড) জাতের আমবাগান গড়ে উঠছে। গত সাত বছর আগে জেলায় মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। এ বছর জেলায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় গত দুবছর থেকে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রঞ্জিত কুমার মল্লিক জানান, জেলায় প্রতিবছর শত শত টন আম উত্পাদিত হলেও পাইকারি বাজার না থাকায় দ্রুত কম দামে আম বিক্রি করে দেন আমচাষিরা। প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমবাগান গড়ে উঠছে।

ধান চাষ ছেড়ে আম উত্পাদন : নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) আ জা মু আহসান শহীদ সরকার জানান, জেলায় ইরি-বোরো ধান প্রতি বিঘায় মাত্র ২০ থেকে ২৪ মণ আর আমন ১০ থেকে ১৪ মণ উত্পাদন হয়ে থাকে। খরচ বাদ দিয়ে ধান চাষিদের তেমন লাভ থাকে না। অথচ এক বিঘা জমিতে ৩০টি আম গাছ লাগানো যায়। আম গাছ লাগানোর ৪-৫ বছরের পর প্রতি গাছ থেকে দেড় থেকে দুই মণ আম পাওয়া যায়। এর ফলে প্রতি বিঘা থেকে আম বিক্রি হয় ৪০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুরে বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষ করার পর পানির অভাবে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আর কোনো ফসল উত্পাদন করা সম্ভব হয় না। সরকারের নির্দেশ রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি কম ব্যবহার করে স্বল্প সেচ চাহিদা সম্পন্ন ফসল উত্পাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা। ধান চাষে অধিক পানি লাগায় স্বল্প সেচ চাহিদা সম্পন্ন আম চাষে কৃষকদের উত্সাহিত করা হচ্ছে।

পোরশা উপজেলার নীতপুর বাজার এলাকার বাঙ্গালপাড়ার আমির উদ্দিন জানান, জমিতে আমের বাগানে সরিষা, ডাল, গম, ধান চাষ করায় কৃষকরা এক বিঘা জমিতে বছরে লক্ষাধিক টাকা আয় করে থাকেন। ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করে যে লাভ হয় তার চেয়ে কয়েকগুণ লাভ বেশি হয় আম চাষে। এ জন্যেই এলাকার কৃষকরা আম বাগানের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

পোরশা উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের নুরুজ্জামান জানান, এক বিঘা জমি থেকে ধান চাষে বছরে আয় হয় মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। অথচ তিন-চার বছরের একটি আম বাগান থেকে প্রতি বছর ৪০ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয় এক বিঘা জমিতে। বয়স বাড়লে আম উত্পাদন বেশি হয়। ফলে টাকার পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।

সাপাহার পোস্টঅফিস পাড়ার গোলাপ খন্দকার প্রতি বছর ২ লাখ টাকা শর্তে ১০ বিঘা জমি ১২ বছরের জন্যে ২৪ লাখ টাকা দিয়ে লিজ নিয়েছেন। সেই জমিতে বারি-৪ জাতের আম লাগিয়েছেন। তিনি জানান, দেড় বছর থেকে দুই বছরের মধ্যে আম সংগ্রহ শুরু হবে। ১২ বছরে এই জমি থেকে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার আম বিক্রি হবে।

নাগফজলি আমের দিকে আগ্রহ কৃষকদের : জেলায় গুটি, ল্যাংরা, ফজলি, ক্ষিরসাপাতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, নাগফজলি, গৌড়মতি এ রকমের উন্নত জাতের আম চাষ হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়ে থাকে। এ সকল আমের বিশেষ জাতের মধ্যে আম ‘নাগফজলি’। এই নাগফজলি বিশেষ করে পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে। এই আম প্রথমে ১৪/১৫ বছর আগে বদলগাছীতে চাষ শুরু হলেও বর্তমানে পত্নীতলায় বেশি চাষ হয়ে থাকে।

পত্নীতলার নজিপুর মহল্লার ধরনীকান্ত ও শান্ত কুমার জানান, পত্নীতলায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে কলম পদ্ধতির মাধ্যমে এই নাগফজলি আম গাছ তৈরি করা হয়। খেতে সুস্বাদু, আঁশ কম, অন্য আমের তুলনায় কম পচনশীল ও বাজারে চাহিদা থাকায় ও মাটির গুণাগুণের কারণে পত্নীতলায় আম চাষিরা দিনদিন নাগফজলি আমের চাষে ঝুঁকে পড়েছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পত্নীতলায় ছোট ছোট নাগফজলি আমের বাগান গড়ে উঠেছে।

সূত্র: ইত্তেফাক 
এনইউ / ০৮ জুন

 

নওগা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে